ধীমান দাশগুপ্ত- দেশ এবং রাষ্ট্র এই দুই শব্দের ব্যবহার করা নিয়ে লিখতে বসে সচেতন থাকি— দেশ সেই মৃত্তিকা, যেখানে আমার শিকড় আছে। সেখানকার চারণ আমার গান গায়, মাটি আমাকে খাবার জোগায়, যেখানের মানুষ আমার সুখে–দুঃখে পাশে দাঁড়ায়। অথচ রাষ্ট্র সেই দেশের বিত্তবান এবং শক্তিশালীর স্বার্থ রক্ষা করে, আমাকে আইনের, নিয়মের বেড়াজালে বাঁধে, কর আদায় করে, জেলে পুরে দেয়! রাষ্ট্র শোষণ করে, দেশ যত্ন দেয়। এই সময় ভারত ভূখণ্ডের শাসক রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যকে দেশপ্রেম বলে চালাতে চাইছে। এই ইতরের দেশ সেই কারণে আমার দেশ নয়।
রাষ্ট্র যখন মানুষকে বশে আনতে পারে না, সে যুদ্ধ বা দাঙ্গা বাধায়। সব যুদ্ধ এই জগতে শ্রেণিযুদ্ধ। দরিদ্রের ওপর বিত্তশালীর আগ্রাসন। মানব ইতিহাসের চার হাজার বছর ধরে রাষ্ট্রনায়কদের হয়ে লড়াই করেছে গরিব মানুষ, প্রাণ দিয়েছে গরিব মানুষ, মূল্য দিয়েছে গরিব মানুষ। দুটো বিশ্বযুদ্ধে লড়াই হল, ব্রিটেন–আমেরিকা–ফ্রান্স মিত্রশক্তির সঙ্গে জার্মানি–জাপান–ইটালির ফ্যাসিস্টদের, লড়ে মরল ভারতীয়রা। শুধু জাপানকে আটকাতে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি যুদ্ধের লেভি দিল ৩৮০০ কোটি টাকা। এই শোষণের ফল ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ, ৪৫ লক্ষ মানুষের অনাহারে মৃত্যু। আর? আর প্রায় দু লক্ষ মহিলা এবং শিশুকে দেশভাগের দাঙ্গার অজুহাতে ধর্ষণ করে খুন, বাংলায় এবং পাঞ্জাবে। ব্রিটিশরা শুরু করল, পরম্পরা বয়ে নিয়ে চলল তথাকথিত স্বাধীন ভারতের সরকার। ৭০ বছর পরে, সেই ট্র্যাডিশন এখনও চলেছে— উন্নাও, কাশ্মীর, সুরাটে। ভারতে প্রত্যেকটি নথিবদ্ধ ধর্ষণের পরিবর্তে ৩৭৬টি ধর্ষণ অকথিত রয়ে যায়। ফলে কতগুলি ৮ বছর, ১১ বছরের শিশুকে এখনও অবধি এই নৃশংসতার বলি হতে হয়েছে, কে জানে!‌ তার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে কতজন পিতা, আত্মীয়–বন্ধুকে লক–আপে খুন করেছে এই রাষ্ট্রের পুলিস, তাই–‌বা কে জানে! যুদ্ধের সময়‌ বিজয়ী সেনাবাহিনী যেখানেই যায়, নারীদের ধর্ষণ করে, শিশুদের খুন। প্রাচীন গ্রিস থেকে জার্মানি অধিকৃত ফ্রান্স বা লাল ফৌজের দখল নেওয়া পূর্ব ইউরোপ— সর্বত্র এক ছবি। ভারতেও এখন যুদ্ধ চলছে। এক নিঃশব্দ গৃহযুদ্ধ! এই যুদ্ধের বলি আসিফাদের মতো শিশুপ্রাণ।  দক্ষিণপন্থা বা মধ্যপন্থা অথবা সুবিধাবাদী বামপন্থায় এখানে ফারাক নেই— রাষ্ট্রের দালাল মাত্রই আগ্রাসী এবং ধর্ষকামী!      
আসিফার হত্যার প্রসঙ্গ এই রাষ্ট্রে প্রতিবাদের বান ডেকেছে, কারণ জায়গাটা কাশ্মীর এবং শিশুটি মুসলমান; সবচেয়ে জরুরি, আমাদের বুদ্ধিজীবীরা ‘সেকুলার’! চতুর ইংরেজ প্রশাসন একটা মিথ্যা শব্দ শিখিয়ে দেশটাকে লুঠ করে চলে গেছে সাত দশক আগে, নির্বোধ বুদ্ধিজীবীর দল এখনও জানলেন না, ‘সেকুলার’ মানে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ নয়। প্রথম এলিজাবেথের সময়কালে যে সব জমিদার ক্যাথলিক চার্চের অধীনে ছিল না, সেই সব ভূস্বামীকে সেকুলার বলা হত। কথাটার উল্লেখ এখানে জরুরি, কারণ আমাদের বুদ্ধিজীবীরা প্রায়শই বলেন, ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখতে! সেটা হয় না। কারণ, সেই আদিকাল থেকে ধর্মই রাজনীতির জন্ম দিয়েছে। অষ্টম হেনরি যদি ক্যাথরিন অফ অ্যারাগনকে বিবাহবিচ্ছেদ করার জন্য প্রোটেস্ট্যান্ট না হতেন, ১৬৪০–৫১ ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ধনতন্ত্রের জন্মই হত না। এই নিয়মের কোনও অন্যথা ঘটেনি সেই প্রাচীন পারস্য, গ্রিস বা রোম অবধি। ধর্মাচরণের ফলে সমাজের যে রাজনৈতিক বদল আসে, যার ফল আজকের এই আগ্রাসী রাষ্ট্রশক্তি। সেই রাষ্ট্রের দালালদের হাতেই আসিফারা ধর্ষিত হচ্ছে এবং খুন হচ্ছে। রাষ্ট্রনায়ক প্রধানমন্ত্রী এই কাজের নির্দেশ দিয়েছেন দলের লুম্পেনগুলোকে, এ আমি বিশ্বাস করি না। শুধু একটা অনুশোচনা প্রকাশের বিলম্বিত লয় বুঝিয়ে দেয় যে, উনি আদৌ অনুতপ্ত নন। প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় আছে বললে আদৌ অত্যুক্তি হবে না। কারণ, রাষ্ট্রসঙ্ঘ যখন ওঁকে বার্তা পাঠাচ্ছে, বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা চিঠি পাঠাচ্ছে, উনি ট্যুইটারে কমনওয়েলথ গেমসে সোনা, রূপো জয়ের জন্য খেলোয়াড়দের অভিনন্দন জানাচ্ছেন। আজ অবধি একটাও প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেননি, এখন শিশুহত্যা নিয়ে নীরব! এমন প্রধানমন্ত্রী যে রাষ্ট্রের, সেই ইতরের দেশ আমার দেশ নয়।
এই নৃশংসতা আমরা ইতিহাসে ফ্যাসিস্টদের মধ্যে দেখেছি। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, বেনিতো মুসোলিনি বা আডলফ হিটলারের মৃত্যুর পর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষের সঙ্গে সঙ্গে কি ফ্যাসিজম শেষ হয়ে গেছে? না যায়নি, একটু বদলেছে মাত্র। ঐতিহাসিক এরিখ হবস্‌বম ১৯৯৩ সালের রাষ্ট্রসঙ্ঘের পরিসংখ্যান দিয়ে আমাদের দেখিয়েছেন, দুটি বিশ্বযুদ্ধে মারা গেছিলেন সাড়ে ৬ কোটি মানুষ। অথচ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ৮০ বছর পরে দেখা যাচ্ছে ১৮.৭ কোটি মানুষকে ‘মানবসম্মতিক্রমে হত্যা’ করা হয়েছে। মানে, দুটি যুদ্ধে নিহত মানুষের দ্বিগুণ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে যুদ্ধাবকাশে। ফ্যাসিস্টরা বেঁচে আছে, লুকিয়ে আছে আমাদের মধ্যে। আজকের সমাজে ফ্যাসিজম লুকিয়ে রয়েছে এমন এক ক্ষমতার কোষে যা রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি— এই ভয়াবহতার নাম অথরিটারিয়ানিজম বা গোদা বাংলায় প্রশাসনবাদ। এদের আচরণ পরিবারের রক্ষনশীল পিতার মতো, এরা মনে করে পুরস্কার এবং শাস্তির সর্বময় কর্তা এরাই। সমাজতাত্ত্বিক আশিস নন্দীর মতে, এরা সনাতনী ধ্যান–‌ধারণায় বিশ্বাসী, শাসকশ্রেণির নির্দেশিত মূল্যবোধে বিশ্বাসী। এরা নিজেদের এবং নিজের পিতা–মাতার প্রতি মোহগ্রস্ত, পদমর্যাদার মোহে আচ্ছন্ন এবং মানুষের যৌন ভূমিকা নিয়ে বিশেষ চিন্তিত। এঁদের সামাজিক নীতিবোধ প্রখর, গেঁাড়ামি প্রবল এবং বাস্তববাদকে সৃজনশীলতার ওপরে স্থান দেন। এঁরা জীবনের এমন এক অর্থ এবং স্বচ্ছতা খুঁজে বেড়ান, যা তাঁর নিজের নয়। এঁরা রক্ষণশীল পিতা, অথবা পুরোহিত অথবা কড়া মাস্টার অথবা সামাজিক নেতা হতে পারেন। এঁরা সাধারণত মনের গভীরে যৌন অপরাধ–‌প্রবণতা পুষে রাখেন। পাঠক, আপনার চারিদিকে চেয়ে দেখুন, নিজের দিকেও চেয়ে দেখুন, কতজন এমন লোলুপ মুখোশধারী দেখতে পান প্রাত্যহিক জীবনে? অনেক, অনেক মানুষ— মূলত শহুরে মধ্যবিত্তদের মধ্যে এঁরা বিরাজমান। এঁদের আপনি অর্থনীতি, সমাজনীতি, মূল্যবোধ নিয়ে কথা বলতে শুনবেন, সমালোচনায় মুখর এঁরা— অথচ ক্ষমতায় আসীন কোনও মানুষ ডেকে পাঠালে সুড়সুড় করে পদানুসরণ করেন। এঁদের মতো মেরুদণ্ডহীন মানুষ ফ্যাসিস্ট হন; হিটলার–মুসোলিনি সমর্থক; মোহন ভাগবতের গোপনে প্রশংসা করেন; নরেন মোদিকে দেখে বলেন, ‘‌আহা, কোথা থেকে কোথায়!’‌ নাহ, এঁরা পুরুষ হবেন এমন কোনও মানে নেই; এঁরাও স্বৈরাচারী, এঁরাও ফ্যাসিস্ট। এঁরাই আসিফাদের ধর্ষণ করে খুন করেন। যে রাষ্ট্রে এঁরা আছেন, সেই ইতরের দেশ আমার নয়!
ছেড়ে চলে যেতে চাই, খোলাখুলি জানালাম ফেসবুকে। রাষ্ট্রবিহীন জীবন কাটাতে চাই বেদুইনের মতো। সম্ভব নয়, সংবিধানে অনুমতি নেই— জানালেন অগ্রজপ্রতিম ব্যবহারজীবী বন্ধু। ফ্রিডরিশ নিটশে এমনটা কাটিয়েছিলেন বহু বছর— শেষ জীবনটা এই দার্শনিককে রাষ্ট্র পাগলাগারদে ভরে দেয়। এমনই আগ্রাসী এই রাষ্ট্রব্যবস্থা। এরা শিশুদের খুনিদের জেলের আচ্ছাদন দেবে, পুলিসি নিরাপত্তা দেবে, অথচ মানুষকে মুক্ত জীবনের স্বাধীনতা দেবে না! ফলে আর মোমবাতি নয়, আগুন জ্বালতে হবে বিদ্রোহের। কারণ, এই বিকৃতকাম মানুষদের সঙ্ঘ, শিশুহত্যার এই বধ্যভূমি, এই ইতরের রাষ্ট্র আমাদের কারোর দেশ নয়।

মুম্বইয়ের প্রতিবাদে আমির খানের স্ত্রী কিরণ রাও। ছবি: পিটিআই

জনপ্রিয়

Back To Top