অরুণাভ দাশ: প্রায় আড়াই মাস আগে প্রত্যর্পণ বিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে হংকংয়ের ‘‌বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল’‌‌ কার্যত দখল করে রেখেছিলেন বিক্ষোভকারীরা। ওই বিলে হংকংয়ের সন্দেহজনক আসামিদের বিচারের জন্য মূল চীনা ভূখণ্ডে পাঠানোর ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল হংকং কর্তৃপক্ষকে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ তীব্র থেকে তীব্রতর হতে দেখে হংকংয়ের মুখ্য কার্যনির্বাহী প্রশাসক কেরি ল্যাম বিলটিকে ‘‌কার্যত মৃত’ বলে ঘোষণা করেন। তবু বিক্ষোভ চলছে। কখনও কখনও ভয়ঙ্কর হিংসাত্মক চেহারা নিচ্ছে।
বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, এই বিল হংকংয়ের আইনি স্বাধীনতা খর্ব করার চেষ্টা। এটা শুধু বাতিল করলেই হবে না, ল্যামকে পদত্যাগ করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার গড়তে হবে। ক্ষোভ দেখাতে গিয়ে বিক্ষোভকারীরা হংকংয়ে আইন পরিষদ ভবনে জোর করে ঢুকে তুমুল ভাঙচুর চালিয়েছেন। মৌলিক আইনের বইটি ছিঁড়ে টুকরো করেছেন, বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চলের নিজস্ব প্রতীক নষ্ট করেছেন, এমনকী চীনের জাতীয় পতাকার অবমাননা করে উড়িয়েছেন ঔপনিবেশিক আমলের পতাকা।
বিশ্ববাণিজ্য ও অর্থনৈতিক লেনদেনের কেন্দ্র হিসেবে সারা পৃথিবীর সামনে দৃষ্টান্ত ছিল যে হংকং, বেশ কিছুদিন ধরে তার পরিচয় হয়ে উঠেছে গোলমাল ও শৃঙ্খলাহীনতা। রাস্তায় রাস্তায় চলছে অবরোধ, বাধা দেওয়া হচ্ছে যান চলাচলে, নাগরিক পরিষেবা ধ্বংস করা হচ্ছে, পুলিশের ওপরেও হামলা হচ্ছে। কখনও পেট্রল বোমা, কখনও ক্ষতিকর তরল রাসায়নিক বা বিষাক্ত পাউডার নিয়ে।
সম্প্রতি বিক্ষোভকারীরা জড়ো হয়েছিলেন হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। তার জেরে বহু উড়ান বাতিল করতে হয়। শয়ে শয়ে মানুষকে অভূতপূর্ব অসুবিধার মধ্যে পড়তে হয়। বিক্ষোভকারীদের মধ্যে কয়েকজন উগ্রপন্থী মূল চীনা ভূখণ্ডের ২ জন বাসিন্দাকে মারধর করেন। এঁদের মধ্যে একজন ছিলেন সাংবাদিক।
চোখে পড়ার মতো খারাপ ব্যাপার, বিক্ষোভে কয়েকজন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে মার্কিনি জাতীয় সঙ্গীত গাইছিলেন। বহু বিক্ষোভকারী মুখোশ পরে আছেন, ফলে আসলে তাঁরা কারা, সেই প্রশ্ন উঠছে।‌ যদি নিজেদের উদ্যেশ্যের প্রতি তাঁরা এত সৎ ও দায়বদ্ধ, তাহলে কেন তাঁরা মুখ লুকোচ্ছেন? তা ছাড়া, এই ধরনের বিশৃঙ্খলা সর্বতোভাবেই শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পরিসীমার বাইরে। যে হংকংকে বলা হয় ‘‌প্রাচ্যের মুক্তো’‌, সেখানে এ ধরনের আন্দোলন যে আইনের শাসন ও সামাজিক স্থিতাবস্থা ব্যাহত করে, তা বলাই বাহুল্য। তাও এই প্রতিবাদীরা সহানুভূতি পাচ্ছেন। বেশিরভাগই আসছেন পশ্চিমি দেশ, বিশেষত ব্রিটেন থেকে। যে ব্রিটেন ১৫০ বছর ধরে হংকংকে উপনিবেশ বানিয়ে রেখেছিল। ১৯৯৭ সালের ১ জুলাই হংকং অবশেষে চীনকে হস্তান্তর করেছিল ব্রিটেন। 
আন্দোলনকারীরা পুলিশের বিরুদ্ধে ‘‌নিষ্ঠুরতা’‌‌র অভিযোগ এনেছেন। এই অভিযোগ আন্তর্জাতিক মহলেও প্রচার করা হয়েছে। তবে, পুলিশকে যে ধরনের বিশাল আকারের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে, সেই তুলনায় আহত প্রতিবাদীর সংখ্যা খুবই কম। ‌পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে ৭৬০ জনকে। তাঁদের মধ্যে ১২০ জনের বিরুদ্ধে হিংসা ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। তাও তাদের প্রায় সবাইকেই জামিনে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে প্রথম শাস্তি পেয়েছেন মূল চীনা ভূখণ্ডের এক পর্যটক। ১৯ আগস্ট তাঁকে চার সপ্তাহের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। হংকংয়ে মার্কিন কনসাল জেনারেলের অফিসের দেওয়াল নোংরা করায় তাঁর এই শাস্তি। ঔপনিবেশিক আমলে এমন লঘু দণ্ডের কথা কল্পনাই করা যেত না। ভারতে ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসনে বিচার ব্যবস্থার হাস্যকর কাণ্ডকারখানার ভূরি ভূরি উদাহরণ। ‌
একথা অবশ্য অস্বীকার করা যায় না যে, প্রতিবাদীদের পিছনে সাধারণ মানুষের একাংশের সমর্থন রয়েছে। তবে এভাবে আইনকানুন ভেঙে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কোনও যুক্তি থাকতে পারে না। এতে শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ শহুরে কেন্দ্র হিসেবে হংকংয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন উঠে যায়। সেই সঙ্গে ১৯৯৭ সালে হস্তান্তরের সময় যে বোঝাপড়া হয়েছিল, সেই ‘‌এক দেশ দুই ব্যবস্থা’কেও চ্যালেঞ্জ করা হয়। ওই বোঝাপড়া অনুযায়ী, হংকং বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চলের শাসনপদ্ধতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মূল চীনা ভূখণ্ডের চেয়ে আলাদা।‌ ওই নীতি অনুযায়ী, হংকংয়ের রয়েছে নিজস্ব সরকার, আইনসভা, আইনি ব্যবস্থা, নিজস্ব পুলিশবাহিনী, টাকাপয়সা সংক্রান্ত ব্যবস্থা, শিক্ষাগত ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগত ব্যবস্থা ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যম। বস্তুত, ‘এক দেশ, দুই ব্যবস্থা’ ভালই কাজ করেছে এবং এর ফলে থাকার, পড়াশোনার এবং ব্যবসা করার ঈর্ষণীয় রকমের ভাল জায়গা হয়ে উঠেছে হংকং। 
গত ২২ বছরে চীনের সামগ্রিক উন্নয়নে হংকং যেমন অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছে, তেমনই হংকংয়ের উত্থানে চীনের মূল ভূখণ্ডের অবদানও কিছু কম নয়। হংকংয়ের জিডিপি–‌র টানা বৃদ্ধি হচ্ছে। ২০১৮ সালে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৩৬০০০ কোটি ডলার। এটা ১৯৯৬ সালের জিডিপি–‌র দ্বিগুণ। হংকংয়ে ১৯৯৭ সালে পর্যটকের সংখ্যা ছিল এক কোটি ৪ লক্ষ। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৬ কোটি ৫০ লক্ষ। 
বিশ্বমানের বিকাশশীল আর্থিক, বাণিজ্যিক ও বন্দর হিসেবে হংকংয়ের অবস্থান শীর্ষে। ব্যবসার পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক স্তরের প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতির সুবাদে হংকং পেয়েছে সবচেয়ে বেশি প্রত্যক্ষ লগ্নি। এখানে ব্যবসা করে প্রায় ৭ হাজার বিদেশি সংস্থা এবং এখানে থাকেন ৬ লক্ষ বিদেশি, যাঁদের মধ্যে ৫০ হাজার ভারতীয়। ভারত ও হংকংয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। সুতরাং, বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা শুধু হংকং আর চীনের ক্ষতিই করবে না। ভারত–‌সহ আন্তর্জাতিক মহলের কাছেও এটা গভীর উদ্বেগের বিষয়। 
হতে পারে বিক্ষোভের পিছনে কিছু সাধারণ মানুষের সমর্থন রয়েছে। কিন্তু ‘‌নির্দিষ্ট কিছু বহিরাগত শক্তি’‌র তরফে উস্কানি ও উৎসাহ দেওয়ার বিষয়টিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। খেয়াল রাখতে হবে, হংকংকে চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা করা অসম্ভব। কারণ, সংবিধান অনুযায়ী দুটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের ডাকে সাড়া দিয়ে বিক্ষোভকারীরা আলোচনায় বসলে, সেটাই হবে কাম্য এবং সবার পক্ষেই মঙ্গলজনক। অচলাবস্থা কাটানোর জন্য এটাই সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সমাধান সূত্র। 
বিক্ষোভকারীদের বুঝতে হবে যে, বিক্ষোভ দেখানোর অধিকার তাঁদের রয়েছে কিন্তু হিংসাত্মক পথ সমাধানের দিকে যায় না।‌‌‌

 

‌রণক্ষেত্র রাজপথ!‌ হংকংয়ে। ছবি:‌ এএফপি

জনপ্রিয়

Back To Top