বাহারউদ্দিন

আমরা নিঃসঙ্কোচে এ কথা বলতে পারি— প্রখর আত্মসচেতন, স্থিতধী রাজনীতিকদের অন্যতম ছিলেন প্রণববাবু। ভারতকে, নেহরু–‌ঘরানার মতো, তিনি যেভাবে, যতটা চেনার চেষ্টা করেছেন, সমকালের অন্য কেউ তা করেননি। তবু কেন জানি, সমাজপড়ুয়া রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরাও তাঁকে ঘিরে বিশেষ চর্চা করেননি। তাঁর আত্মনির্মাণের স্বপ্নকে যে প্রায় আশৈশব বহুমুখী চিন্তা, প্রচারবিমুখ জিজ্ঞাসা, বাঙালির মননের ঐতিহ্য, ভারতীয় বহুত্বের সাধনা, রবীন্দ্রচেতনা, আন্তর্জাতিকতা বোধ ছুঁয়ে থাকতে, এসব অনেকেরই নজরে পড়েনি। তাঁর রাজনীতি আর রাজনৈতিক বিচক্ষণতাই প্রধানত চর্চার বিষয় হয়ে ওঠে।
কবি মহম্মদ ইকবাল, ‘‌দি রিকনস্ট্রাকশন অফ রিলিজিয়াস থট ইন ইসলাম’–‌‌এর শুরুতেই তার স্বভাবপ্রাজ্ঞ ভঙ্গিতে লিখেছিলেন, জন্মের পর থেকে মানুষ ক্রমশ বড় হয়ে উঠতে চায়। এটা তার স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যাস। আর ব্যক্তিপ্রতিভা আত্মতার নির্মাণের স্বপ্ন দেখে। সে খুঁজতে থাকে অসীমের সুন্দরকে। রবীন্দ্রনাথও মানুষের পূর্ণতার বিকাশ দেখেছেন আত্মশক্তির উদ্বোধনে। সমাজ সংগঠনে, গঠনশীল রাজনীতিতে এবং সৃজনকর্মে যাঁরা অন্তর্দ্রষ্টা, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ধরনের উপলব্ধি সম্ভবত অধিকতর সত্য। বাঙালির সামাজিক ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ তো বটেই, বৈষম্যহীন সমাজগঠনের অন্যতম দিশারি স্বামী বিবেকানন্দও আমাদের সবার সামনেই গগনচুম্বী আদর্শ। প্রণববাবু ২০১২ সালের ২৫ জুলাই রাষ্ট্রপতির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের সংক্ষিপ্ত ভাষণে তাঁর সামাজিক ভাবনাচিন্তা উল্লেখ করে সরাসরি জানাতে ভোলেননি, সুবিচার‍ই হয়ে উঠুক ভারতীয় মহাজাতির অভিমুখ। ছাত্রজীবনের রাজনীতিতে, ব্যাঙ্ক জাতীয়করণের কঠিনতম পরিস্থিতিতে, এবং পরেও নানা স্তরে দেশ–‌বিদেশের সঙ্কটে তাঁর সদর্থক ভূমিকা কি প্রমাণ করে না পারিপার্শ্বিকের কাঁটা সরিয়ে, অমোঘ, নৈর্ব্যক্তিক নির্মাণের রাস্তা বেছে নিয়েছিল তাঁর ব্যক্তিত্ব?
পুজোর বেদিতে বসিয়ে, বিশেষণের পর বিশেষণ সাজিয়ে আড়াল করতে চাই না তাঁর প্রজ্ঞাকে। এটা অন্যায়। এতে ম্লান হয়ে যায় ব্যক্তি সুষমা আর মানবিক বোধ ও বুদ্ধি। কেবল ব্যক্তি নন, সমষ্টির প্রতিনিধি আর সামাজিক প্রণববাবুই আমাদের প্রধান আকর্ষণ। 
সান্নিধ্যের আলো
সেপ্টেম্বর–অক্টোবর ১৯৮৩। প্রতিক্ষণ পত্রিকায় অগ্নিগর্ভ পাকিস্তান ও ভারতের পাঞ্জাবকে নিয়ে এই লেখকের দুটি প্রচ্ছদ রচনা প্রকাশিত হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে খবর পেলাম, লেখা দুটি প্রণববাবু খুঁটিয়ে পড়েছেন। আলাপ করতে চান। কিন্তু নগণ্য, অপরিচিত এই তরুণের সে–‌সুযোগ কোথায়? উনি শ্রীমতী গান্ধীর মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, দিল্লিকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ঘুরে বেড়ান, কলকাতায় এসে কোথায় থাকেন, আদি বাড়ি কোথায়, এসব জানি না, সব ব্যাপারেই আনপড়।
অক্টোবরে শীত এসেও আসছে না। কালীপুজোর রাত। প্রতিক্ষণের সম্পাদক স্বপ্না দেবের বাড়িতে খিচুড়ি ভোজ খেতে গেছি। স্বপ্নাদি এসে কানে কানে বললেন, প্রণববাবু আসবেন, আলাপ করিয়ে দেব। আড়ষ্ট গ্রামীণ স্বভাব আমার। ওঁর মতো ভিআইপি থোড়াই আমাকে পাত্তা দেবেন। মিনিট কয়েক পর দেখি, ধুতি–পাঞ্জাবি পরা নাতিউচ্চ দেহের ফরসা মুখটি নিঃশব্দে হাজির। পুলিশের সাইরেন বাজল না, হইচইও চোখে পড়ল না, স্বপ্নাদি পরীক্ষার্থীর মতো প্রণববাবুর সামনে নিয়ে গিয়ে বললেন, এর নাম বাহার। হাসলেন, প্রাসঙ্গিক দু–একটা কথা সেরেই বললেন, চলো, দু’‌জনে এক সঙ্গে খেতে বসব। কম্পিটিশনে দেখা যাবে কে বেশি, কতক্ষণ খেতে পারে! এটা যে তাঁর সৌজন্য, অনুজের প্রতি এক ধরনের স্নেহ, তা বুঝতে পারিনি। প্রতিযোগিতার ঝুঁকি নিয়ে হাভাতের মতো খিচুড়ি গিলছি তো গিলছি। ওঁর দিকে খেয়াল নেই। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, উনি উঠে পড়েছেন। দিল্লি ফিরে যাবেন। না বলেও চলে যেতে পারতেন, সামনে এসে বললেন, ‘‌বাহার হরদম চালাও, মনে রেখো, আমি সকালে খেতে বসে রাতে কী খাব ভাবতে থাকি।’‌ ভাবলাম, আচ্ছা লোক তো, খাবার কম্পিটিশন শেষ হল না, চলে যাচ্ছেন! 
বরাবঁাকি থেকে ফেরার পথে
গ্রীষ্মকাল। ১৯৮৪। রাম–‌বাবরির নীরক্ত লড়াই তখন তুঙ্গে। প্রণববাবু রাজ্যসভার সদস্য, স্বভাবত উদ্বিগ্ন। উত্তরপ্রদেশের তখনকার মুখ্যমন্ত্রী বীরবাহাদুর সিং, সম্ভবত অরুণ নেহরুর পরামর্শে বন্ধ বাবরি মসজিদের তালা খুলে দিয়েছেন। বহু মানুষ ক্ষুব্ধ। বারবার পথে নামছেন। সৈয়দ শাহাবুদ্দিন (প্রয়াত এমপি) আর মুসলিম মজলিশ–‌এর মোশাওয়ারাত প্রথমে লং মার্চ ডেকে বসলেন। পরে স্থগিত রেখে ‘‌কালা দিবস’‌ পালনের আহ্বান। উত্তরপ্রদেশ অশান্ত। ফৈজাবাদ তার সহজাত শান্তি বজায় রাখল। বরাবঁাকির ইদগায় সমবেত হয়ে বিক্ষোভ দেখালেন মুসলিমরা। পিএসসি (উত্তরপ্রদেশের আর্মড পুলিশ) নির্বিকার গুলি চালাল। মারা পড়লেন তঁার নিরস্ত্র সৈনিকেরা। খবর পেয়ে লখনউ হয়ে বরাবঁাকিতে ছুটলাম। থমথমে পরিস্থিতি, নিহত–‌আহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে ফিরে এলাম দিল্লিতে। সৈয়দ শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে আলাপ আছে। মনে হল, কথা বলা দরকার। দুপুরে ওঁর বাড়ি থেকে বেরিয়ে পার্লামেন্ট হাউসের সামনের রাস্তা দিয়ে হঁাটছি, একা। আচমকা চোখে পড়ল প্রণববাবু হেঁটে যাচ্ছেন, পরনে সাধারণ জামাপ্যান্ট, হাতে একটি ইংরেজি পেপারব্যাক। ভাবলাম, ’‌৮৩ সালে ক্ষণিকের আলাপ, সে কি আর মনে আছে? পাশ কাটিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই থামিয়ে দিলেন, ‘‌কী বাহার, কোত্থেকে, কোথায় যাচ্ছো?’‌ ‘বরাবঁাকি গিয়েছিলাম, এখন হোটেলে যাব।’‌ কথা বলতে বলতে এগোচ্ছি। সামনেই তালকটোরা রোড। ‘‌আমার কোয়ার্টারে চলো, এক সঙ্গে খাব। আজও দু’‌জনের খাবার কম্পিটিশন!’‌ কথাটা স্মরণে আছে তা হলে? আমি অবাক, বাড়ি ঢুকেই হাতমুখ ধুয়ে আমাকে নিয়ে সোজা ডাইনিং টেবিলে। আবার ওই একই কথা, ‘‌দুপুরে তো খাচ্ছি, রাতে কী খাব ভাবছি!‌’‌ মনে মনে হাসলাম। ‘‌খেতে থাকো’‌ বলেই উনি হাত ধুয়ে সামনে বসলেন। ততক্ষণে জেনে গেছি, খাদ্যরসিক। তবে পরিমিত আহার। শুভ্রাদি বেরিয়ে এলেন। চমৎকার মহিলা, গান করেন, ছবি অঁাকেন, নিকট–‌আত্মীয়ের মতো ব্যবহার। খাওয়াদাওয়া শেষ হলে ভাবলাম, প্রণববাবু নিশ্চয়ই বিশ্রাম নেবেন, উঠে পড়া উচিত। আটকে দিলেন— বোসেও, গল্প করি। মুন্নি (শর্মিষ্ঠা) তখন ছোট, আলাপ হয়নি, দেখা যাচ্ছে ফোনে ব্যস্ত। গোটা বাড়ি এক সময় নিস্তব্ধ হয়ে এল, ঘর–‌ভর্তি বইয়ের তাক, যেন একটি লাইব্রেরি। এক পাশে সোফায় বসে দু’‌জনের আলাপ চলছে— পশ্চিম এশিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারতীয় রাজনীতি, সাহিত্য, দর্শন— বিচিত্র সব বিষয় নিয়ে। বয়সের ব্যবধান ভুলে সমবয়সির মতো কখনও বলছেন, কখনও শুনছেন। শিলং, গুয়াহাটি, ঢাকা আর কলকাতায় বহু মহান বিদ্যাদাতার সংস্পর্শে এসেছি আমি। কিন্তু শঙ্খ ঘোষ, আবু সয়ীদ আইয়ুব আর আনিসুজ্জামান ছাড়া এত নিষ্ঠাবান শ্রোতার সঙ্গে কখনও দেখা হয়নি। আমার সশ্রদ্ধ আকর্ষণ, যোগাযোগ, এই দুই সাক্ষাতেই থেমে যেতে পারত, থামেনি, পরে, গত কয়েক দশক জুড়ে আরও প্রশস্ত হতে থাকে। তঁার প্রবল ব্যস্ততাকে অস্বীকার করে যখন–তখন ফোন করেছি। প্রণববাবু স্বতন্ত্র। নিজে ফোন ধরে কথা বলতেন, সম্ভবত চেনা–‌অচেনা সবার সঙ্গে। দ্বিতীয়ত, কঠিন পরিস্থিতিতেও আবদার যুক্তিযুক্ত ও সঙ্গত হলে সাড়া দিতেন।
ইতিহাসের ইচ্ছেপূরণ
বুদ্ধি আর হৃদয়বৃত্তির সংযোগকে ইতিহাস গুরুত্ব দেয়, বিশেষ করে ব্যক্তিবিশেষের নির্মাণের প্রশস্ত, অপ্রশস্ত পথে। ইতিহাসের অঙ্গ–‌প্রত্যঙ্গ নেই। সে প্রতিষ্ঠান নয়। রাষ্ট্রের তঁাবেদার নয়, চলমান দর্শক। যঁার বড় হওয়ার কথা, নেতৃত্বের আসনে বসে যিনি তঁার সময়ের, ভবিষ্যতের নিশানা তৈরি করবেন, ইতিহাসের শিক্ষা তঁাকে সংযম আর যুক্তিময়তার মিশেলে অপরিহার্য, অপরিমেয় করে তোলে। এক সময়ে জনগণের ইচ্ছেরই পূর্ণাঙ্গ প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন তিনি। সাহিত্য অথবা সমাজবিদ্যা, চিত্রকলা অথবা বৃহত্তর সংস্কৃতি, রাজনীতি অথবা বিপ্লবে— মানববিদ্যার যে–‌কোনও অঙ্গনেই এই কথা অনিবার্য সত্য। ব্যক্তিপ্রতিভার বিকাশে, প্রতিটি উত্তরণের পূর্ণ হয় ইতিহাস ছেঁায়ার স্বপ্ন। মিরাটির বঙ্গসন্তানের প্রণব মুখার্জি হয়ে ওঠা, ক্রমাগত সর্বভারতীয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাঁর উজ্জ্বল বিচরণ সমাজের এ–‌রকমই এক আকাঙ্ক্ষাপূরণ।

জনপ্রিয়

Back To Top