সিদ্ধার্থ জোয়ারদার: করোনা ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বস্বাস্থ্যে ‘‌জরুরি অবস্থা’‌ জারি করেছে। বিশ্বব্যাপী এই নিয়ে হইচই পড়ে গেছে। সংবাদমাধ্যমের দৌলতে এখন আমরা সে ব্যাপারে সবাই একটু–আধটু ওয়াকিবহাল। এতে জনমানসে কিছুটা হলেও ভয় অথবা শঙ্কার বাতাবরণ তৈরি হয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই মাত্রায় সচেতনতা বা বিষয়টা সম্বন্ধে সম্যক ধারণা আমাদের হয়েছে কি?‌ সম্ভবত না। কারণ গণমাধ্যমগুলোতে পরস্পরবিরোধী নানা তথ্য পরিবেশিত হওয়ায় আমরা বোধহয় কিছুটা বিভ্রান্তই হচ্ছি।
সবচেয়ে গোলমাল প্রাণীবাহিত মানুষের রোগ বলে পরিচিতি হওয়ায় এই নতুন ভাইরাসের উৎপত্তি নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। আর তাই বিভিন্ন প্রাণীদের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত;‌ কখনও বাদুড়, কখনও রেকুন–কুকুর, কখনও ভাম প্রজাতির সিভেট বিড়াল, আবার কখনও সামুদ্রিক প্রাণী, এমনকী বিষধর সাপ— এরই প্রেক্ষিতে প্রাণী ও মানুষের চিরায়ত দ্বন্দ্ব আবার সামনে চলে আসছে। খাদ্য হিসাবে সামুদ্রিক মাছ, মাংস ও অন্যান্য প্রাণিজ আহারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। আর এ সবই হচ্ছে বিষয়গত সম্যক ধারণা না থাকার জন্য।
অথচ আমরা প্রায় প্রত্যেকেই জীবনের কোনও না কোনও সময়ে করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়েছি। সর্দি–জ্বর সৃষ্টিকারী চার ধরনের (‌পরিভাষায় স্ট্রেনের) করোনা ভাইরাস (‌২২৯ ই, এন এল ৬৩, ও সি ৪৩, এইচ কে ইউ ১)‌ আমাদের চারপাশের পরিবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবে এরা মারাত্মক বা প্রাণঘাতী নয় বলে হাঁচি, কাশি, সর্দি–জ্বরের মতো সাধারণ উপশম নিয়ে পাঁচ/‌ছয় দিন ভুগিয়ে চুপচাপ চলে যায়। শুধু মানুষেরই নয়, কুকুর, বিড়াল, গবাদি প্রাণী, শূকর, মুরগি, ইঁদুর— সকলেই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয় এবং তারা রোগের শিকার হয়। যেমন, করোনা ভাইরাস কুকুরে এন্টেরাইটিস, বিড়ালে পেরিটোনাইটিস, গরু ও শূকরে গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিস, মুরগিতে ব্রঙ্কাইটিস ও ইঁদুরে হেপাটাইটিস সৃষ্টি করে। অর্থাৎ প্রাণী দেহে এরা সর্দি–জ্বর না করে শরীরের অন্যান্য অঙ্গ আক্রমণ করে এবং নির্দিষ্ট প্রতিষেধক তৈরি করে। এমনকি কম ভয়াবহ হলেও কোনও কোনও ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন— মুরগির ব্রঙ্কাইটিস–এ মৃত্যুহার প্রায় ৩০%। তবে মহামারীতে ৭৫ শতাংশও হতে দেখা গেছে। 
যদিও এটি একটা নতুন ধরনের করোনা ভাইরাস, যা সার্স বা মার্স সৃষ্টিকারী ভাইরাস–এর মতোই প্রাণীদের দেহ থেকে জিন পরিবর্তন (‌পেপটিক মিউটেশন)‌ করে মানুষকে আক্রান্ত করার ক্ষমতা লাভ করেছে। অর্থাৎ প্রজাতি বাধা অতিক্রম করে মনুষ্যতর প্রাণী থেকে মানুষে চলে এসেছে। কী এই প্রজাতি বাধা?‌ এক কথায়, করোনা ভাইরাস বা অন্যান্য সমস্ত ভাইরাস–ই নির্দিষ্ট প্রাণিকুলকে আক্রমণে পারদর্শী। সবাইকে নয়। তার কারণ— ভাইরাস প্রাণীদেহে ঢুকতে গেলে, তাকে শরীরের যে কোনও কোষে আশ্রয় নিতে হয়। আর তাই তার প্রয়োজন কোষে ঢুকতে পারার ‘‌পারমিট’‌। সেটা হল, কোষের বাইরে ডিশ অ্যান্টেনার মতো বেরিয়ে থাকা কিছু গ্রাহক (‌রিসেপ্টর)‌–এর উপস্থিতি। ভাইরাসের গায়ে বেরিয়ে থাকে পেরেকের মতো কিছু জৈবাণু (‌লিগাও)‌, যা কিনা কেবলমাত্র নির্দিষ্ট গ্রাহকের সঙ্গে যুক্ত হতে সক্ষম। অর্থাৎ লিগাও যখন তার উপযোগী গ্রাহকের সংস্পর্শে আসে তখন তার সঙ্গে যুক্ত হয় ও রিসেপ্টরের সংযোগে কোষে ঢোকে। বোঝাই যাচ্ছে, যে কোনও ভাইরাস যে কোনও কোষে ঢুকতে পারবে না, যদি না তার কাছে রিসেপ্টর–উপযোগী লিগাও থাকে। তাই ভাইরাসের কোষ আক্রমণের ক্ষমতা সাধারণভাবে সীমিত। এ জন্য কোনও ভাইরাস শ্বাসনালি, কোনও ভাইরাস খাদ্যনালি, আবার কোনও ভাইরাস যকৃৎ, বৃক্ক, পাকস্থলী বা স্নায়ুতন্ত্র আক্রমণ করে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে অবশ্য ভাইরাস একাধিক অঙ্গ আক্রমণ করার ক্ষমতা রাখে। গ্রাহকের উপস্থিতি অনুযায়ী বিভিন্ন প্রাণীকোষকে আক্রমণ করার ক্ষমতা বিভিন্ন ভাইরাসের বিভিন্ন বলেই তারা নির্দিষ্ট প্রাণীকেই আক্রমণ করে। এটিকে আমরা বলি ‘‌স্পিসিস বেরিয়ার’‌ (‌প্রজাতিগত বাধা)‌। মুশকিল হচ্ছে, জিনের পরিবর্তন করে ভাইরাস তার খোলসের বাইরে বেরিয়ে থাকা পেরেকের (‌লিগাওয়ের)‌ গড়ন বদলে ফেলে। আর তাই পরিচিত গণ্ডির বাইরের গ্রাহক (‌রিসেপ্টর)‌–এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই পরিবর্তনের পরিণতি হতে পারে মারাত্মক। ভাইরাস তখন নির্দিষ্ট প্রাণীর নির্দিষ্ট কোষ ছেড়ে অন্য কোষকে আক্রমণে সক্ষম হয়ে উঠতে পারে। যেমনটা দেখা গেছিল ২০০২ সালে সার্স করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে। এই ভাইরাস বাদুড়ের কোষ ছেড়ে মানুষের শ্বাসনালির কোষে যুক্ত হওয়ার ক্ষমতা পেয়েছিল। ২০১২ সালে মার্স করোনার ক্ষেত্রে এরকমই ঘটেছিল, যখন এই ভাইরাস উটের শ্বাসনালির কোষ ছেড়ে মানুষের কোষকে আক্রমণে সক্ষম হয়ে উঠেছিল। এই পরিস্থিতিকেই প্রজাতিগত বাধা অতিক্রম বলে। এই সময়ে এই ভাইরাস ভয়ানক মারণক্ষম ও ছোঁয়াচে প্রকৃতির হয়।
‌সার্স করোনা ভাইরাস বিশ্বের ৩৭টি দেশের ৮০০০ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল ও ৭৭৪ জনের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। আবার সার্স করোনা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের ২৫০০ মানুষকে আক্রান্ত করে। ৮৫৮ জন এতে মারা যান। ২০১৬ সালে দক্ষিণ চীনে এরকমই বাদুড়ের করোনা ভাইরাস শূকরে ছড়িয়ে পড়ে ও সোয়াইন অ্যাকিউট ডায়ারিয়া সিনড্রোম (স্যাডস)‌ সৃষ্টি করে। এটি ২৪ হাজার শূকরের মৃত্যুর কারণ হয়। সুখের কথা, ওই সময়ে এই করোনা ভাইরাস মানুষে ছড়িয়ে পড়েনি। আশঙ্কার কথা, কিছু বন্যপ্রাণীতে করোনা ভাইরাস রোগ সৃষ্টি না করে শরীরে থেকে যায়। যেমন, সুস্থ শূকর, রেকুন–কুকুর বা সিভেট বিড়ালের দেহে করোনা ভাইরাস বছরের পর বছর থেকে যায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাদুড়ের করোনা ভাইরাস মানুষে ছড়িয়ে পড়তে গেলে সেই ভাইরাসকে রেকুন–‌কুকুর, ভাম প্রজাতির সিভেট বিড়াল জাতীয় প্রাণীতে বাসা বাঁধতে পারার ক্ষমতা রপ্ত করতে হবে। তবেই সে জিন পরিবর্তন করে আরও মারাত্মক হয়ে মানুষকে আক্রমণ করতে পারবে। যেমনটা দেখা গেছিল সার্স করোনার ক্ষেত্রে। অবশ্য মার্স করোনা মানুষে চলে আসে সরাসরি উটের দেহ থেকে।
নতুন এই করোনা ভাইরাসের গ্রাহকের প্রকৃতি এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। তবে এই নভেল করোনা অতর্কিতে হওয়া মিউটেশনের এক মারাত্মক কুফল। তবে কোন কোন প্রাণীর শরীর পেরিয়ে মানুষে এসেছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। গবেষণা চলছে। এখন এই করোনা ভাইরাস যে মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা রাখে, তা জানা গেছে। আর তাই বিজ্ঞানীমহল এত চিন্তিত। কারণ নতুন সৃষ্টি এই করোনা ভাইরাস ঠিক কতটা ক্ষতি করতে পারে, সেটা আন্দাজ করা যায়নি এখনও। নজর রেখেছেন ওয়াকিবহাল মহল। তবে সুখের কথা, এই সময় পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার হলেও মৃত্যুহার ৫ শতাংশের নীচেই রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষিত ‘‌গ্লোবাল এমার্জেন্সি’‌–র অন্যতম কারণ— অপেক্ষাকৃত দুর্বল পরিকাঠামোযুক্ত রাষ্ট্রগুলোকে সাহায্য করার প্রয়াস নেওয়া। প্রশ্ন উঠছে, আফ্রিকা ও এশিয়ায় অবস্থিত স্বাস্থ্য পরিষেবায় পিছিয়ে থাকা রাষ্ট্রগুলো তো বটেই, আমাদের দেশও কি যথেষ্ট তৈরি এই নভেল ভাইরাসের সংক্রমণ ও মহামারী রুখতে?‌
মারাত্মক ছোঁয়াচে ও মারণক্ষম ভাইরাসের উপস্থিতি নির্ণয় ও নিশ্চিত ডায়াগনসিসের জন্য ‘‌বায়োসেফটি লেভেল ফোর’‌ স্তরের বীক্ষণাগার প্রয়োজন, যা আমাদের এই বিশাল দেশে এখন অপ্রতুল। বাড়ানো দরকার এই ধরনের মারাত্মক রোগের চিকিৎসায় নিবেদিত হাসপাতালের সংখ্যা। প্রয়োজন সারা বছর ব্যাপী প্রাণীবাহিত মানুষের রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাসের ওপর নজরদারি, যেখানে প্রাণী ও মানুষের ভাইরাস বিশেষজ্ঞদের তথ্য ও মতের আদানপ্রদান চলবে। সমস্যা সৃষ্টির আগেই জনস্বাস্থ্য রক্ষায় যৌথ প্রস্তুতি প্রয়োজন। আর সমস্যা সৃষ্টির পর প্রয়োজন যৌথ ‘‌র‌্যাপিড রেসপন্স টিম’‌–এর সক্রিয়তা। ‘‌ওয়ান হেলথ কনসেপ্ট’‌কে বাস্তবায়িত করতে আমাদের দু’‌দিকেই সমানভাবে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
(‌লেখক ভাইরোলজিস্ট ও পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী ও মৎস্যবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক)‌‌‌‌‌

ভয়ঙ্কর ফুল!‌ চিনে নিন করোনা ভাইরাসের আদল। বাইরের দিকের অংশগুলি অনেকটা ফুলের মঞ্জরীর মতো। যেন ভাইরাসের মুকুট বা করোনা। ভাইরাসের ভেতরে–‌থাকা ইলেকট্রনগুলিকে অণুবীক্ষণের নীচে ফেললে এমনই ছবি উঠে আসবে। সৌজন্যে সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ছবি:‌ এএফপি 

জনপ্রিয়

Back To Top