দীপাঞ্জন চক্রবর্তী: প্রশ্ন হচ্ছে, কে কাকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করছে, শত্রুই বা কে?‌ দেশের আপামর জনসাধারণ?‌ বিগত পাঁচ বছরে বর্তমান সরকারের কাছ থেকে ২০১৪–‌র দেওয়া প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, সেই প্রশ্ন বারবার উঠছে, সারা ভারত জুড়েই উঠছে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহোদয় এবং তাঁর দল ভারতীয় জনতা পার্টি আদ্যোপান্ত দেশপ্রেমিক তথা সেনাবাহিনীর একনিষ্ঠ ভক্ত এবং সমর্থক। এতে সন্দেহের কোনও অবকাশই নেই, সেনাবাহিনীর প্রতি ভক্তি এতটাই বেশি যে মাঝে মাঝেই সেনাবাহিনীর উর্দি গায়ে চাপিয়ে দেশপ্রেমের জোয়ার আনার চেষ্টা করে ফেলেন। সে দিল্লি বিজেপি–‌র কার্যকর্তা মনোজ তিওয়ারি হোন অথবা আমাদের ৫৬ ইঞ্চির প্রধানমন্ত্রী ‘‌মহোদয়’‌। কিন্তু এগুলো সবই যে সাধারণ মানুষকে ‘‌ধোঁকা’‌ দেওয়ার জন্য নতুন নতুন মার্কেটিং স্ট্র‌্যাটেজি এবং যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহুল ব্যবহৃত সামরিক পরিভাষা ‘‌ক্যামোফ্লাজ’‌,‌ বা ‘‌কপট বেশ পরিধান অথবা চোখে ধুলো দেওয়া’‌। ২৩ মে যত ঘনিয়ে আসছে, সেই কপটতা কিন্তু ততই প্রকট হয়ে চলেছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহোদয় দু–তিন‌দিন আগেই মহারাষ্ট্রে এবং কর্ণাটকে নির্বাচনী জনসভায় এবারের নির্বাচনের প্রথমবারের ভোটারদের উদ্দেশে আহ্বান জানিয়েছিলেন, পুলওয়ামার শহিদদের ‘‌সম্মান’‌ দেওয়ার জন্যই যেন ওঁর পার্টিকে ভোট দেওয়া হয় এবং ওঁকে পুনরায় নির্বাচিত করা হয়। পুনর্নির্বাচিত হবেন কি হবেন না, সে প্রশ্নের জবাব ভারতবাসী ২৩ মে দেবেন, ‘‌শেষের সেদিন’‌ আর বেশি দূর নেই। যেহেতু আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহোদয় এবং ওঁর দল দেশপ্রেম নামের ক্যামোফ্লাজের আড়ালে অনেক জ্বলন্ত সমস্যা, তীক্ষ্ণ প্রশ্ন এবং সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগকে সাধারণ মানুষের সামনে থেকে সাময়িকভাবে সরিয়ে দিতে চাইছেন, তাই একজন প্রাক্তন ফৌজি তথা এনএসজি‌ কমান্ডো হিসেবে সরাসরি কিছু প্রশ্ন তোলা আমার অবশ্যকর্তব্য বলেই মনে করি, প্রশ্ন তুলছিও। একজন কমান্ডোর নিশানা খুব সোজাসুজি হয় এবং তা লক্ষ্যভ্রষ্ট না হয়েই শত্রুকে আঘাত করে। ঘুরিয়ে–‌পেঁচিয়ে বলার মতো ‘‌বুদ্ধিজীবী’‌সুলভ মানসিকতা একজন কমান্ডোর হয় না, হতে পারেও না।
মন্ত্রীমশাই পুলওয়ামার শহিদদের হয়ে ভোট চাইছেন;‌‌ কিন্তু শহিদদের তোলা প্রশ্নের জবাব এখনও দিতে পারেননি। কীভাবে হল এত বড় ‘‌দুর্ঘটনা’‌, কে নেবে তার দায়ভার, আদৌ কি কারও শাস্তি হল, নাকি অন্ধকারে, অন্তরালে, কেউ পুরস্কৃত হল!‌ সত্যিই তো প্রাক্‌ নির্বাচনের দুর্দিনের বাজারে যেখানে রাফায়েল, ১৫ লাখ, ২ কোটি চাকরি, মেহুলভাই, মোদিভাই ইত্যাদির কুম্ভিপাকে জড়িয়ে ডুবে যেতে বসেছিলেন, ওই অবস্থায় আপনার এবং আপনার দলের কাছে নিতান্তই প্রয়োজন ছিল একটি ‘‌পুলওয়ামা’র‌, পেয়েছেনও। ৪০–এর বেশি শহিদের মৃতদেহ। কীভাবে এই ৪০–এর বেশি শহিদকে ব্যবহার করা যায় তা নিয়ে ভেবে ভেবে আপনি এবং আপনার সেনাপতি বিনিদ্র রজনী যাপন করেছেন, আমরা জানি। আমরা বুঝি।
দেশের মানুষ জানত, মানত, আপনি সংবিধান, সংসদ, গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষের এই মূল দুটি স্তম্ভকে অত্যন্ত সম্মান করেন। একজন প্রাক্তন ফৌজি হিসেবে সত্যি সত্যি আমি আপ্লুত হয়ে গিয়েছিলাম, ২০১৪ সালের সেদিন, যেদিন আপনি সংসদের দোরগোড়ায় মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করে সংসদে প্রবেশ করেছিলেন। ভেবেছিলাম এবার সংবিধান এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্মান জানানোর এক প্রধানমন্ত্রী পেলাম। যেভাবে আপনি দেশের অন্যতম সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একের পর এক জনসভায় শহিদদের নাম করে ভোট চেয়ে যাচ্ছেন, সত্যি ভাবতে বাধ্য হচ্ছি, এই না–হলে ৫৬ ইঞ্চি!‌ কিন্তু এই ৫৬ ইঞ্চি কোথায় ছিল যখন চীন মাসুদ আজহারকে নিয়ে আপনাকে পথে বসাল?‌
মায়ানমার অপারেশন এবং উরি অপারেশনের পর আপনি যখন আমাদের কমান্ডোদের আপনার বাসভবনে আপ্যায়িত করেছিলেন, সত্যি ভেবেছিলাম আপনার কাছ থেকে এবার কিছু পাওয়া যাবে। পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু পাওয়া গেল না কিছুই। এই চাওয়া–‌পাওয়া কোনও ব্যক্তিগত চাওয়া–‌পাওয়া নয়, একজন ফৌজি হিসেবে, দেশের এক ক্ষুদ্র সিপাহি হিসেবে ভারতমাতার জন্যই কিছু চেয়েছিলাম, ফৌজ এবং ফৌজিদের জন্য কিছু চেয়েছিলাম, কী পাওয়া গেল?‌ গত ৪–‌৫ বছরে শুধু বিএসএফ–এ ৫০০–‌র ওপর আত্মহত্যার ঘটনা, কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদী হামলায় আমার ফৌজি ভাইদের নিহত হওয়ার ঘটনায় ১০৬ শতাংশ বৃদ্ধি। আপনার প্রবল ঢক্কানিনাদিত OROP,‌ ফৌজ এবং আমলাতন্ত্রের সমান অধিকারের প্রশ্নে আপনার সুচিন্তিত বাধা প্রদর্শন, আধাসামরিক শহিদদের ‘শহিদ’ মর্যাদা দেওয়া নিয়ে আপনার দীর্ঘসূত্রতা ইত্যাদি ইত্যাদি। বিশ্বাস করুন, খবরের কাগজের পুরো পাতাও কম পড়ে যাবে আপনার এবং আপনার সরকারের ফৌজের প্রতি ‘‌সম্মান’‌ প্রদর্শনের নমুনায়।
আপনার সুযোগ্য শিষ্য মাননীয় অজয় বিস্ত (‌যাঁকে কেউ কেউ যোগী বলেন) প্রকাশ্য জনসভায় আমাদের সম্বোধন করছেন ‘‌মোদির সেনা’‌ বলে!‌ আপনিও কি তাই মনে করেন?‌ সোজা কথা সোজা ভাবেই বলা যাক, আপনি একজন রাজনৈতিক নেতা হতে পারেন, ঘটনাচক্রে ভারতের প্রধানমন্ত্রীও আপনি, কিন্তু আপনার থেকে আমার মতো একজন সামান্য ফৌজি অফিসারের শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাদারি অভিজ্ঞতা এবং আত্মসম্মানবোধ অনেক বেশি। নিজের নাম লেখা ১৪ লাখি স্যুট কেনার ক্ষমতা আমাদের নেই। কিন্তু আমাদের আছে ইউনিফর্ম বা উর্দি, যা আমাদের দিয়েছে রাষ্ট্র, কোনও ‘‌ভাই’‌দের দয়ায় পাওয়া নয় এই উর্দি। কিছু মনে করবেন না, আমাদের রক্ত, ঘাম দিয়ে অর্জন করা ইউনিফর্ম পরার যোগ্যতা এবং অধিকার আপনার ও আপনার মনোজ তিওয়ারিদেরও নেই। দয়া করে আর্মড ফোর্সকে এই নোংরা রাজনীতির ব্যবসা থেকে দূরে রাখুন।
সমস্ত ফৌজি অফিসার কিন্তু জেনারেল ভি কে সিং নন। যে জেনারেল ভি কে সিং আপনার ক্যাবিনেটের মন্ত্রীও বটে। বালাকোট নিয়ে প্রশ্ন তোলার জন্য যিনি বিরোধীদের প্লেন থেকে দড়ি বেঁধে বালাকোটে ফেলে দিয়ে আসার হুমকি দেন, আবার যোগীর ‘‌মোদিসেনা’‌ বিবৃতির সমালোচনা করেন বিবিসি‌–‌তে, আবার যোগীর ধমক খেয়েই এক ঘণ্টার মধ্যে পুনর্মুষিকো ভব হয়ে গিলে ফেলেন বিবৃতি। সমস্ত ফৌজ আপনার কাছে মেরুদণ্ড বিক্রি করে দিয়েছে, দয়া করে ভাববেন না।
আরও একবার আপনাকে মনে করিয়ে দিতে চাই, আর্মড ফোর্সেস বিক্রি হওয়ার জন্য নয়, দেশকে রক্ষা করার জন্য। আবার একবার মনে করিয়ে দিতে চাই সেই পুরনো প্রবাদটিও— ‘Dead body speaks!‌’‌‌ মৃতরা কথা বলে, মৃতরাও কথা বলে। প্রশ্ন ওঠা শুরু হয়েছে, প্রশ্ন দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। প্রশ্ন পুলওয়ামার শহিদদের, কী করে বেমক্কা মারা গেলাম আমরা?‌ কেন?‌ কে দায়ী?‌ আমাদের মৃত্যুতে কি কারও সুবিধে হল?‌ নাকি কারও সুবিধে করে দেওয়ার জন্যই আমাদের মরতে হল?‌ আপনি যতবার নোংরা রাজনীতির জন্য ব্যবহার করবেন পুলওয়ামায় শহিদদের নাম, ফৌজি উর্দির ক্যামোফ্লাজের আড়ালে দেশভক্তির দোকান চালানোর চেষ্টা চালাবেন, ততই এই প্রশ্ন আপনাকে তাড়া করে বেড়াবে। নিশ্চিন্ত থাকুন।
‌‌‌জয়হিন্দ।‌‌
(‌লেখক প্রাক্তন ব্ল্যাক ক্যাট কম্যান্ডো)‌

জনপ্রিয়

Back To Top