প্রদীপকুমার দত্ত: রাজ্যের পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকার ১৯৮০–‌এর দশকে প্রাথমিক স্তরে পাস–‌ফেল প্রথা এবং ইংরেজি তুলে দিয়েছিল। তাদের যুক্তি ছিল পাস–‌ফেল থাকলে ড্রপ আউট হয়, শিশুরা পরীক্ষা ভীতির ফলে পড়া ছেড়ে দেয়। আর চাষির ছেলে ইংরেজি শিখে কী করবে?‌ যদিও শাসক দলের নেতা–‌মন্ত্রীরা প্রায় সকলেই তাঁদের সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করতেন। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হন তদানীন্তন সময়ের বহু প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষানুরাগী মানুষ এবং ছাত্ররা। গড়ে তোলেন শিক্ষা সংকোচন বিরোধী ও স্বাধিকার রক্ষা কমিটি যা পরবর্তিকালে হয় অল বেঙ্গল সেভ এডুকেশন কমিটি। একের পর এক আন্দোলন ও শেষে একটি ছোট বামপন্থী দলের ডাকা সাধারণ ধর্মঘট, যা শিক্ষাবিদ এবং ‌বুদ্ধিজীবীরাও সমর্থন করেছিলেন,  সারা রাজ্যে এই ধর্মঘট সফল হওয়ার পর সরকার প্রাথমিক স্তরে ইংরেজি ফিরিয়ে আনলেও পাস–‌ফেল ফেরায়নি। পাস–‌ফেল চালুর দাবিতে একের পর এক আন্দোলন চলতে থাকে। ২০১১ সালের নির্বাচনে রাজ্যে পালাবদল ঘটে। নতুন সরকার বলে তারা শিক্ষা ক্ষেত্রে পূর্বতন সরকারের ভুল নীতিগুলি পরিবর্তন করবে। এর মধ্যেই পার্লামেন্টে পাস হয় শিশু শিক্ষার অধিকার আইন, ২০০৯। রাজ্য সরকার সেই আইনের দোহাই দিয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাস–‌ফেল তুলে দেয়, যদিও শিক্ষা যৌথ তালিকাভুক্ত হওয়ায় রাজ্য সরকারের সেই আইন মানার কোনও বাধ্যবাধকতা ছিল না। ফলে প্রথম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাস–‌ফেল প্রথা পুনঃপ্রবর্তনের দাবিতে আন্দোলন চলতে থাকে। সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়, রাজ্য সরকার যেমন কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন জনবিরোধী নীতির প্রতিবাদ করে, তেমনই শিশু শিক্ষার অধিকার আইনের বিরোধিতা করে পাস–‌ফেল ফিরিয়ে আনুক। কিন্তু সরকার অনড় থাকায় প্রথম শ্রেণি থেকে পাস–‌ফেল ফেরানোর দাবিতে আবার সেই ছোট বামপন্থী দলটি ১৭ জুলাই রাজ্যে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয়। ধর্মঘটের প্রতি প্রবল জনসমর্থন দেখে সরকার ওই দলটিকে ধর্মঘট প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়ে  লিখিতভাবে প্রতিশ্রুতি দেয়  যে সরকার আবার রাজ্যে পাস–‌ফেল চালু করবে। তবে কোন শ্রেণি থেকে এবং কবে থেকে তা চালু করা হবে তা তিনি বলেননি। যা–‌ই হোক, সরকারের অনুরোধে ধর্মঘট প্রত্যাহৃত হয়। পরবর্তিকালে  রাজ্য বিধানসভায় শিক্ষামন্ত্রী বলেন  শিক্ষাবিদ ও মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে ঠিক করা হবে কোন শ্রেণি থেকে এবং কবে থেকে তা চালু করা হবে। তদনুযায়ী ২২ ডিসেম্বর শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি কয়েকজন শিক্ষাবিদ, কয়েকটি শিক্ষক সংগঠন, অল বেঙ্গল সেভ এডুকেশন কমিটি,  কংগ্রেস, সিপিএম, এসইউসিআই (কমিউনিস্ট)–‌সহ কয়েকটি দলের রাজনৈতিক নেতাকে নিয়ে একটি বৈঠক করেন।  সংবাদপত্রগুলিতে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী সেই বৈঠকে অধ্যাপক পবিত্র সরকার ও সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী প্রাথমিক স্তরে পাস–‌ফেল ফেরানোর বিরোধিতা করেন। তাঁরা বলেন পাস–‌ফেল ফেরানো হোক পঞ্চম শ্রেণি থেকে। প্রাথমিক স্তরে পাস–‌ফেল চালু করার কথা বললে তাঁরা যে আগে পাস–‌ফেল তুলে দিয়ে ভুল করেছিলেন তা পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নেওয়া হয়। তাই তাঁরা তাঁদের সেই পুরনো যুক্তিই দেন যে পাস–‌ফেল চালু করলে ড্রপ আউট বাড়বে। পাস–‌ফেল থাকা না থাকার সঙ্গে যে ড্রপ আউটের কোনও সম্পর্ক নেই সে কথা আগে বহুবার আলোচিত হয়েছে। তাই বিস্তারিতভাবে আলোচনায় না গিয়ে শুধু দুটি কথা বলি। এখন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাস–‌ফেল না থাকা সত্ত্বেও যত ছাত্র প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয় তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয়, অর্থাৎ বাকিরা ড্রপ আউট।  আর ড্রপ আউটের একটি প্রধান কারণ পিতামাতার দারিদ্র। তাই সিপিএমের যুক্তি যে অন্তঃসারশূন্য সে কথা বলাই বাহুল্য। ছাত্রছাত্রীরা যতই ক্ষতিগ্রস্ত হোক, শিক্ষার মানের যতই অবনতি হোক, তাঁরা তাঁদের ভুল স্বীকারে রাজি নন। সেইসঙ্গে এবার তাঁরা রাজ্য সরকারকে আরএসএসের জুজু দেখাচ্ছেন এবং একটি আজব যুক্তি দিয়েছেন। তা হল স্কুলছুট ছাত্ররা আরএসএসের স্কুলে গিয়ে ভর্তি হবে কারণ সেখানে পাস–‌ফেল নেই। সিপিএমের শিক্ষক সংগঠন এবিটিএএবং সিপিআইয়ের শিক্ষক সংগঠন তো আরও এক কাঠি বাড়া। তাঁরা পাস–‌ফেল ফেরানোরই বিপক্ষে। 
কোনও কোনও মহল থেকে বলা হচ্ছে যাঁরা পাস–‌ফেলের পক্ষে তাঁরা ছাত্রদের ফেল করাতে চান। আসলে তাঁরা ছাত্রদের ফেল করাতে নয়, তাঁরা চান ছাত্রদের উপযুক্ত শিক্ষা দিতে। কোনও শ্রেণিতে ছাত্রদের যা শেখা উচিত সেটা না শিখলেও যদি কোনও ছাত্রকে উচ্চতর শ্রেণিতে উন্নীত করা হয় তাহলে সে স্বভাবতই উচ্চতর শ্রেণির পাঠ আয়ত্ত করতে পারবে না এবং ক্রমাগত পিছিয়ে পড়বে, আর শেষ পর্যন্ত পড়া ছেড়ে দেবে। তাই বর্তমান নিবন্ধকারের মতে পাস–‌ফেল না থাকলে ড্রপ আউট কমবে না। বামফ্রন্ট সরকারের গঠিত অশোক মিত্র কমিশনও ১৯৯২ সালে তাদের রিপোর্টে বলেছিল পাস–‌ফেল না থাকা সত্ত্বেও ড্রপ আউট কমেনি। পরবর্তীকালে যতগুলি কমিশন গঠিত হয়েছে সেগুলিও একই কথা বলেছে। ছাত্রছাত্রীরা যদি ঠিকমতো শিখতে পারে তাহলে ফেল করবে কেন? বরং পাস–‌ফেল না থাকায় যে শিক্ষার মানের অবনতি হয়েছে তা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সমীক্ষায় দেখা গেছে। 
কেউ কেউ বলেন, ফেল করলে ছাত্ররা হীনমন্যতায় ভুগবে, তাদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট হবে। তাঁরা কি ভেবে দেখেছেন, কিছুই না শিখে বছরের পর বছর উচ্চতর শ্রেণিতে উন্নীত হয়ে তারা যখন অষ্টম শ্রেণি পাসের সার্টিফিকেট পাবে এবং চাকরির জন্য চেষ্টা করবে কিন্তু চাকরির পরীক্ষা বা ইন্টারভিউয়ে ব্যর্থ হবে তখন তারা কি হীনমন্যতায় ভুগবে না বা তাদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট হবে না? 
আর একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা হল বেসরকারি স্কুলগুলিতে যেখানে অনেক টাকা দিয়ে পড়তে হয়, সে সব স্কুলে পাস–‌ফেল আছে। সেখানে কিন্তু ড্রপ আউট হয় না, কারণ সে সব স্কুলে পরিকাঠামো সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলির তুলনায় অনেক ভাল, সেখানে পড়াশোনার পরিবেশও অনেক ভাল। অথচ আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় সেই সব স্কুলে পড়ার সুযোগ সাধারণ ঘরের ছেলেমেয়েদের নেই, সেখানে শুধু অর্থবান পরিবারের সন্তানরাই পড়তে পারে। তাই গরিব ও মধ্যবিত্তদের সন্তানদের স্বার্থে পাস–‌ফেল ফেরানো দরকার। সেই সঙ্গে দরকার সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলির উপযুক্ত পরিকাঠামো গড়ে তোলা  যেদিকে কোনও সরকারেরই নজর নেই ; এমনকী শিশু শিক্ষার অধিকার আইনেও যেটুকু পরিকাঠামো, যে ছাত্র–‌শিক্ষক অনুপাতের কথা বলা হয়েছে তার ব্যবস্থা কোথাও করা হয়নি। তাই সারা বছর ধরে যে নিরবচ্ছিন্ন মূল্যায়নের কথা কেউ কেউ বলছেন তা করা কতটুকু সম্ভব?
ইংরেজি ২০১৮ সাল শুরু হয়ে গেল, আর কয়েক মাস পরেই শুরু হবে নতুন শিক্ষাবর্ষ। কিন্তু এখনও পাস–‌ফেল কোন শ্রেণি থেকে চালু হবে তার ঘোষণা হল না। ২০১৮–‌১৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে পাস–‌ফেল চালু করতে হলে অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা প্রয়োজন। মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ, শিক্ষার স্বার্থে  তিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করুন।  
লেখক প্রেসিডেন্সি কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান
 

জনপ্রিয়

Back To Top