ধ্রুবজ্যোতি নন্দী,ঢাকা: শাহবাগ মোড় থেকে টিচার্স স্টুডেন্টস চত্বর, সেখান থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, তার পর শহিদ মিনার চত্বর— চোখ যত দূর যায়, শুধু মানুষ আর মানুষ। নারী, পুরুষ, শিশু, তরুণ, বৃদ্ধ। কারও হাতে ফুলের তোড়া তো কেউ হাতে নিয়েছেন বাংলাদেশের পতাকা, কারও মাথায় আবার কাগজের ফেট্টিতে লেখা ‘‌একুশে ফেব্রুয়ারি’‌। শহিদ মিনারের বিশাল চওড়া সিঁড়ির ধাপ ছাপিয়ে উপচে পড়ছে পুষ্পার্ঘ্য। পুষ্পস্তবকের প্রথম জোড়াটি এসেছিল ঠিক মধ্যরাতে। ভাষা–‌শহিদদের স্মৃতিতর্পণ শুরু করেছিলেন দেশের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার পর সারা দিন ধরে ক্রমান্বয়ে এসেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক–ছাত্র–কর্মচারীদের নানা সংগঠন, বহু প্রতিষ্ঠান, অসংখ্য ব্যক্তি, এমন–‌কি বাংলাদেশ পুলিস সার্ভিসও। ঢেউয়ের মতো একের পর এক মিছিল এসে লুটিয়ে পড়েছে শহিদ মিনারের সিঁড়িতে। সারাক্ষণ চলেছে গান আর কবিতা, অমর একুশের স্মরণে। সেই অবিরাম স্রোতের মধ্যে স্থির হয়ে দঁাড়ানো প্রায় অসম্ভব। তবু তারই মধ্যে বার বার কানে এসেছে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে সমাজের সমস্ত স্তরে বাংলা ছেড়ে ইংরেজির দিকে ঝুঁকে পড়ার ক্রমবর্ধমান প্রবণতার জন্য, খবরের কাগজ–টেলিভিশনে অশুদ্ধ বাংলা প্রয়োগের জন্য, বাঙালির মুখের ভাষা এক বিজাতীয় খিচুড়ি হয়ে ওঠার জন্য গভীর আক্ষেপ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোক্টর অধ্যাপক এ কে এম গোলাম রব্বানি বলছিলেন, বছরে একদিন শ্রদ্ধা জানানোর জিনিস কি মাতৃভাষা? এ শ্রদ্ধা জরুরি সমস্ত বাঙালি পরিবারে, প্রতিদিনের নিত্য কাজে। স্বীকার করলেন, সে–কাজে পারিবারিক উদ্যোগ যেমন জরুরি, তেমনই তৎপরতা দরকার প্রশাসনিক এবং রাষ্ট্রীয় স্তরেও। আরও অনেক কিছু বলে চলেছেন ব্যস্ত অধ্যাপক, কিন্তু তঁার পাশ দিয়েই তখন দেখা যাচ্ছে ভাষা–শহিদের স্মৃতিতে অর্পিত যে পুষ্পস্তবকটি, তাতে বড় বড় হরফে লেখা ‘‌শ্রদ্ধাঞ্জলী’‌। এক দফা চোখ বোলাতেই নজরে পড়ল সেটি কোনও ব্যতিক্রম নয়। বহু সংগঠনের তরফেই নিবেদিত হয়েছে এমন বেশ কিছু ‘‌গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি’‌। শহিদ মিনার চত্বর ছেড়ে জগন্নাথ হল ডান দিকে রেখে কিছুটা এগোতেই পরপর চোখে পড়ল কয়েকটি দেওয়াল–‌লিখন:‌ ‘শহীদ নয়, লিখুন শহিদ’। ‘অঞ্জলী ভুল, লিখুন অঞ্জলি’। ততক্ষণে দিনের আলো নিবু–‌নিবু, ধাতব চাদরের ওপর লেখা সেই গ্রাফিতির ছবি, ফ্ল্যাশের আলোয় তোলা গেল না কিছুতেই। ক্যামেরায় না–ই হল, মনের মধ্যে সেই ছবি জমিয়ে রাখতে রাখতে ভাবছিলাম, ভাষার জন্যে যঁারা প্রাণ দিয়েছেন, তঁাদের প্রতি আর কোনও শ্রদ্ধা কি হতে পারত এর চেয়ে যথাযথ, উপযুক্ত এবং জরুরি? জয়তু ভাষা দিবস। ‌‌‌‌‌‌

ছবি: প্রতিবেদক

জনপ্রিয়

Back To Top