সৌমেন জানা- চকচকে তকতকে পাকা রাস্তা। মাস খানেক হল তৈরি হয়েছে। এখন বৃষ্টির সময়। মাল বোঝাই ভারী গাড়ির চাপে রাস্তায় গর্ত হবে। জল জমবে। তার মানেই রাস্তার চোকলা উঠে যাওয়া। নতুন রাস্তা রাতারাতি খানা–খন্দে পাল্টে যাবে। মাঝে মাঝে এমনও হয় যে ধানের বীজতলা দিলে মনে হয় রাস্তাতেই চাষ হয়ে যাবে। এই অভিজ্ঞতা নতুন নয়। ছেলেবেলা থেকেই আমরা কমবেশি দেখে আসছি। রাস্তা তৈরির কাজে গলদ থাকলে, ফাঁকি থাকলে তার গুণমান খারাপ হয়। একবার গর্ত হলে, তাপ্পি দিয়ে মেরামত করে লাভ হয় না তেমন। পরের বর্ষায়, এমনকী তার আগেই আবার যেই কে সেই।
সামনে জ্যাম। এই তাড়াহুড়োর সময়ে। এগিয়ে দেখা গেল দু–তিনটে বালি বোঝাই লরি সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওভারলোড। তাই খাকি পোশাকধারী হাত তুলে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যদিও হাতটা ড্রাইভারের কাছে পাতা। কিছু একটা নিয়ে চট করে পকেটে ঢুকিয়ে নিল। সাময়িক জ্যাম কাটতেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। যারা প্রতিদিন রাস্তায় চলাফেরা করি তাদের কাছে এই দৃশ্য নতুন নয়। বালি, পাথর, গরু বোঝাই গাড়িগুলোই এসবের জন্য দায়ী।
বুকটা আনচান করছে। শহরের নামকরা ডাক্তারের কাছে ছুটলাম। তিনি মিনিট খানেক দেখেই একটা প্রেসক্রিপশন লিখে দিলেন। ওষুধের সঙ্গে সঙ্গে পেট, বুক আর হাতেরও একটা ছবি করিয়ে নিতে বললেন। বুকের ব্যথায় হাতের ছবি! উপায় কি? ডাক্তার বলেছেন, অসুবিধা আছে বলেই তো।
আজ খুশির দিন। পাশের বাড়ির ছেলেটা বেকার ছিল। ব্যবসা করবে বলে ব্যাঙ্কের দ্বারস্থ হয়েছিল। কালকে ‘‌স্বামী বিবেকানন্দ স্বনির্ভর কর্মসংস্থান প্রকল্প’‌–র লোন পেয়েছে। প্রায় আশি হাজার টাকা। কাগজপত্রের জন্য ম্যানেজারের আর্দালিকে দশ হাজার টাকা দিয়েছে। আর কাউন্সিলরের সার্টিফিকেটের জন্য দশ হাজার। যাক বাবা, তবুও পেয়েছে তো!
আমরা সবাই মনে হয় কমবেশি এই ছবিগুলোর সঙ্গে পরিচিত। ব্যাপারগুলো নৈতিক–অনৈতিক কিনা জানি না। তবে গা সওয়া হয়ে গেছে। এই যে অল্পকিছু টাকা সবাই দিই সেটার পরিবর্তে তো আমরা সবাই পরিষেবা পাই। এই কিছু টাকার জন্য কি বলব? আর যদি বলতেও হয় কাকে বলব? কে বলবে? রাস্তার কাজের বরাতের জন্য টেবিলের তলায় তো এটা দিতেই হয়। ব্যবসা করতে গেলে আইনরক্ষককে তো কিছু দিতেই হয়। শুধু তাই কি? প্রতিটা পরিষেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সমাজের কে এই কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে নেই? এই ‘‌কিছু’‌টাকে আমরা এখন এক নতুন নাম দিয়েছি। কাটমানি!
দোকান–বাজার, স্কুল–কলেজ, অফিস–আদালত, চায়ের ঠেক, সর্বত্রই এখন এক আলোচনা। না কাটমানি নেওয়াটা নিয়ে আলোচনা নয়। বরং কাটমানি খাওয়ার জন্য কেউ ঘেরাও হচ্ছেন, কেউ বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। আবার কেউ কেউ রসিদ–‌সহ কাটমানি ফেরত দিচ্ছেন। অনেকে তো বাড়ি বয়ে এসে হাতে টাকা ফেরত দিছেন। অনেক জায়গায় আবার বিক্ষোভকারীই জেলে যাচ্ছেন। আজ সোনারপুর তো কাল ওন্দা। সকালে সিতাই তো দুপুরে রাজারহাট, বিকেলে সাঁইথিয়া। যেন এক যাত্রাপালা চলছে। সংক্রমণের মতো চারিদিকে একটাই রব— কাটমানি।
অথচ বাঙালির কাছে কাটমানি নতুন কোনও শব্দ নয়। এমনকি বিদেশ বা গো–‌বলয় থেকে আমদানি করাও নয়। উপরি কিছু পেলে মন্দ কী? —এই ভাবনা সমাজের উচ্চস্তরীয় কিছু মানুষের মগজে ঘাই মারে। বাঁকা পথে রোজগার করে থুড়ি বাটপাড়ি করে ত্রিপল টাঙানো বাড়ি থেকে রাতারাতি পাকা বাড়ি হয়ে যায়। ঝাঁ চকচকে ফোর হুইলার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে। কাটমানির প্রক্রিয়াও এখন আধুনিক। ডিজিটাল যুগ বলে কথা। কেউ আর এখন অ্যানালগ যুগে নেই। কেউ উপহার নেন তো কেউ কেউ ক্লান্তি দূর করতে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের টাকায় দু–একবার বিদেশ ভ্রমণও করে আসেন।
এক টুকরো জমি কিনতে গেলে স্থানীয় ক্লাব বা নেতাকে কাটমানি দিতে হয়। এরপর নিজের কেনা জমিতে বাড়ি করবেন। তার প্ল্যান মিউনিসিপ্যালিটি বা পঞ্চায়েত থেকে পাশ করাতে গেলেও সেই কাটমানি। আপনার বাড়ি তৈরির সামগ্রী ইট, পাথর, বালির গাড়িকে রাস্তায় আইনরক্ষকের হাতে কাটমানি তুলে দিতে হয়। যা অবশেষে আপনার পকেট থেকেই যাবে। ছাদ ধসে পড়া স্কুল, ভেঙে যাওয়া নতুন পাকা রাস্তা, কলেজে ভর্তি— সমাজের প্রতিটা স্তরে কাটমানির রমরমা।
এসব ঘটনা তো আকছার শুনি আর কোনও কোনও ঘটনা ক্যামেরায় ধরা পড়ে গেলে মাঝেমধ্যে টিভিতেও দেখি। কিন্তু কখনও নিজের মনের চোখ খুলে দেখেছেন? আপনার সর্বাঙ্গও তো কাটমানিতে বিদ্ধ। অবাক হলেন বুঝি? আমরা কাটমানিখোর? না, তা ঠিক নয়। কিন্তু ওই একই দোষে সমান দোষী। কারণ আমরা সবাই জানি বিষয়টা কী আর কারা নেয়? এড়িয়ে যেতে যেতে ন্যায় আর অন্যায়ের পার্থক্যটুকু আমরা ভুলে গেছি অনেক আগেই। আমরা সবাই জানি। সবই বুঝি। তবু সোজাসুজি বলি না। এই আর কী। অনেকটা সেই গানটার মতো। ‘‌তুমিও বোঝ, আমিও বুঝি, বুঝেও বুঝি না /‌ তুমিও বলো, আমিও বলি, তবে সোজাসুজি না’‌।
কাটমানির চোরাবালিতে ডুবে আমরা সবাই। কিছু কিছু সময় নিজেরাই চোখ বন্ধ রাখি কিছু পাওয়ার জন্য। এই কেজো, কেঠো, ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট জীবনযাত্রায়, ‘‌এই দুনিয়ায় ভাই সবই হয়, সব সত্যি’‌ গান গেয়ে ভাবের ঘরে ডাকাতি ছাড়া আমরা আজ আর কিছুই করছি না। বিশ্বকবি বলে গেছেন, ‘‌অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে’‌। শুদ্ধিকরণ অভিযান একান্তই জরুরি। কিন্তু গুলের জগতে মশগুল হয়ে থাকার পরিবর্তে নিজের বিবেককে একটু ঝাঁকিয়ে দেখুন। এখন নেতা–নেত্রীরা টাকা ফেরত দিলেও তঁারা বদলাবেন না। দল পাল্টালেও চরিত্র বদল হবে না। সৎ নেতা রাতারাতি কোনও গাছের মগডাল থেকে আমাদের কোলে টুপ করে এসে পড়বে না। বদলাতে হবে আমাদেরকেই। তাই শুদ্ধিকরণটা নিজেদের থেকেই শুরু হোক!‌

জনপ্রিয়

Back To Top