প্রচেত গুপ্ত

কোভিড নিয়ে দুঃখের খবর তো সবার জানা, বরং কয়েকটা ভাল খবর দিয়ে আজকের লেখা শুরু করি।
কোভিড আক্রান্তদের ওপর পাড়া–‌প্রতিবেশীদের অমানবিক, নির্মম আচরণের কথা শুনে শুনে আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। কোভিড নিয়ে মানুষের যে এত আতঙ্ক, আমার তো মনে হয়, তার পিছনে এই সব ঘটনাও অনেকটা দায়ী। রোগের চিন্তা যত না হচ্ছে, তার থেকে বেশি চিন্তা হচ্ছে, অসুখ হলে ‘‌পাশের বাড়ি’‌র আচরণ কেমন হবে?‌ হঁাচি কাশির আওয়াজ হলে তারা ‘‌রে রে’‌ করে তেড়ে আসবে না তো?‌ একথা আগে লিখেছি।
কিন্তু সবটাই কি তাই?‌
একেবারেই নয়। বরং বলব, বেশিটাই তাই নয়। যদি তাই হত তাহলে হোম আইসোলেশনে থেকে এত মানুষ সুস্থ হয়ে উঠছেন কী করে?‌ গোটা বিশ্বেই হচ্ছে, আমাদের দেশেও হচ্ছে। আমাদের রাজ্যও তো পিছিয়ে নেই। যেদিন আমি এই লেখাটি লিখছি, সেদিন রাজ্যে সুস্থতার হার ৭০ শতাংশের বেশি (‌এই হার ওঠা নামা করে।)‌। অর্থাৎ বহু মানুষ সুস্থ হয়ে উঠছেন। তার মধ্যে হাসপাতালে যেমন হচ্ছেন, নিজের বাড়িতে থেকেও হচ্ছেন। কই সেখানে তো পাড়া–‌প্রতিবেশীদের কাছ থেকে তো কোনও আপত্তি আসেনি। আসলে বেশিরভাগ পাড়া–‌প্রতিবেশীরাই মানবিক, সুস্থ, বৈজ্ঞানিক মন নিয়ে আক্রান্তদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করছেন।
একটা সুন্দর উদাহরণ দিই।
হঠাৎই সেদিন পেয়ে যাই একটি ছোট্ট ভিডিও। ভিডিওটি এক গুণী নৃত্যশিল্পী প্রিয়াঙ্কা সরকার ঘোষের। তিনি ভরতনাট্যম ও বিবিধ সৃজনশীল নৃত্যে পারদর্শী। ‘‌নৃত্যম’‌ নামে তাঁর একটি নৃত্যচর্চার আকাদেমি রয়েছে। তবে ভিডিওটি নাচের নয়। সেখানে শিল্পী কোভিড নিয়ে তঁার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। কিছুদিন আগে শিল্পী নিজে এবং তঁার শ্বশুরমশাই কোভিডে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাঁরা দু’‌জন তো বটেই, শিল্পীর স্বামী এবং শাশুড়িকেও কোয়ারেন্টিনে থাকতে হয়। আতঙ্কিত না হয়ে, মনের জোরে, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠেছেন। সুস্থ হয়ে উঠেছেন নিজেদের ফ্ল্যাটে থেকেই। এই লড়াইয়ের কথাই গল্পের মতো করে, সহজ ভাবে শিল্পী বলেছেন। বলেছেন, অসুখ থেকে সেরে ওঠবার জন্য কী করছেন। বলেছেন, আতঙ্ক নয়, চিকিৎসকের কথা শুনে চলতে হবে। ভিডিওটি শুনলে মনে জোর আসে। এখানেই শেষ নয়। ভিডিওতে প্রিয়াঙ্কা জানিয়েছেন, এই ভয়ঙ্কর সময়, তাঁর প্রতিবেশী, পাড়ার মানুষ কত মানবিক ভাবে, বন্ধুর মতো, পরম আত্মীয়ের মতো তাঁদের পাশে ছিলেন। ওষুধ, বাজার পৌঁছে দিয়েছেন বাড়ির দরজায়। এমনকী দাম পর্যন্ত নিতেন না। বাইপাসের কাছে, তিলজলার পিকনিক গার্ডেনের একটি অ্যাপার্টমেন্টে তঁারা থাকেন। এলাকার মানু্ষের, প্রতিবেশীদের প্রতি শিল্পী কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। আমরাও জানাই। এদের সকলের জন্যই শিল্পী এবং তার পারিবার দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠেছেন। কাজে ফিরেছেন। প্রিয়াঙ্কাকে ধন্যবাদ। তাঁর এই বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে দায়িত্ব পালন করলেন। মনে জোর বাড়ালেন।
এবার বলি, আমাদের খুব পরিচিত এক সংগঠনের কথা।
উত্তর কলকাতা উদয়ের পথে। সংগঠনটি জন্মলগ্ন থেকেই ভাল কাজ করে আসছে। সামাজিক পরিষেবায় এদের জুড়ি মেলা ভার। সংগঠনের অন্যতম হোতা সঞ্জয় ঘোষ, ‘‌বাপ্পা’‌ নামে পরিচিত, কিছুতেই নিজের নাম বলতে দেয় না। বলছিও না। বহু নামীগুণী মানুষ স্বেচ্ছায় এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। অনেক বড় মানুষ এক ডাকে এদের অনুষ্ঠানে চলে আসেন। সংগঠনটির সবথেকে বড় গুণ, ভাল কাজ করবার সময়, এরা দলাদলি করে না, কোনও রং দেখে না। সব মতের মানুষকে কাছে টানে। খেলোয়াড়, অভিনেতা, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী। বই বিলি, রক্তদান, বৃক্ষরোপণ, হেলথ ক্যাম্প, বিজ্ঞান মেলা, নাট্য উৎসব— কত কিছুই না করে!‌ কোভিডের শুরু থেকে এই সংগঠনের সদস্যরা যেভাবে মানুষের পাশে দঁাড়িয়েছে তা দৃষ্টান্ত। দুঃস্থ মানুষকে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস বিলি করা থেকে শুরু করে প্রবীণদের বাড়িতে রেশন, ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার কাজে সব সময় পাওয়া গিয়েছে। এমনকী আমফানের ত্রাণ নিয়ে এরা পৌঁছেছে গ্রামে। এই ঘন দুঃসময়ে এবার নিজেদের আরও গুছিয়ে নিয়ে তৈরি করল ‌ ‘‌হাল ছেড়োনা বন্ধু.‌.‌.‌’‌ পরিষেবা। দিন রাত কোভিড, নন–‌কোভিড মানুষরা পাবেন সহায়তা। দৈনন্দিন পরিষেবা তো থাকবেই, কোভিডের কোনও লক্ষণ দেখা দিলেও যোগাযোগ করা যাবে। অ্যাম্বুল্যান্স, হাসপাতাল, সেফ হোম সম্পর্কে তথ্য মিলবে। এই পরিষেবার জন্য তাঁরা তিনটি ফোন নম্বর দিয়েছেন। ৯৮৩০১৭৩৮১৪ /‌ ৯৮৩০০৬৯৩৩১ /‌ ৯৮৩০০৫০৯৬০।
কাকে ধন্যবাদ দেব?‌ উদয়ের পথে সংগঠনের সম্পাদক অমিত চক্রবর্তীকে?‌ নাকি সভাপতি নবরত্ন ঝাউয়ারকে?‌ নাকি অন্যতম পৃষ্ঠপোষক উৎপল চ্যাটার্জির কথা বলব?‌ নাকি সংগঠনের সব সদস্যকে?‌ না, কাউকে বলব না। কারণ এরা ধন্যবাদ চান না। এরা কাজ করতে ভালবাসেন। এই সময়ে ঠিক যেমন মানুষের প্র‌য়োজন।
আজ দেখলাম, বিধাননগরে ‘‌স্পর্শ’‌ আর ‘‌প্রোটেক্ট দ্য ওয়ারিয়র’‌ নামে দুটি পরিষেবার সূচনা করেছেন মন্ত্রী সুজিত বসু। যারা হোম আইসোলেশনে রয়েছেন তাদের সঙ্গে চিকিৎসকদের ভিডিও কনফারেন্স করিয়ে দেবে। অতি প্রয়োজনের। তারাও দুটি ফোন নম্বর দিয়েছে। ৭৪৩৯৫৯৬৪৬০/‌৭৪৩৯৫৯৮৩৩৮। অতিমারীর মতো ভয়াবহতার বিরুদ্ধে সরকার একা যুদ্ধ করতে পারে না। এই পরিষেবাগুলি মানুষের বিরাট ভরসা।‌  
এবার বলি, এক চিকিৎসক দম্পতির কথা। শুনলে মন ভাল না হয়ে উপায় নেই। তার আগে ডাক্তারবাবুর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিই। ঘটনাটি লেখবার জন্য তঁার অনুমতি নিইনি। উনি কিছুতেই রাজি হতেন না। সেটাই স্বাভাবিক। বিষয়টা ব্যক্তিগত। তাই আমি পরিচয় বলব না। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, ঘটনাটি বলা দরকার। কোভিড আক্রান্ত মানুষের মনে জোর দেবে। বেঁচে থাকার অর্থ যে শুধু শরীরের নয়, মনেরও, সেই বার্তা পৌঁছোবে। শুধু ভিটামিন, প্যারাসিটামল, অ্যান্টি ভাইরাল দিয়ে এই রোগের সঙ্গে লড়াই করা যায় না। তার জন্য কবিতা লাগে, সুর লাগে।
এই ডাক্তার দম্পতি দুজনেই কোভিডে আক্রান্ত। এখন ভাল হয়ে উঠছেন। নিজেদের ফ্ল্যাটেই রয়েছেন। কিছুদিনের মধ্যে হয়তো কাজে যোগও দেবেন। তবে সবার মতো প্রথমদিনগুলিতে খানিকটা কাহিল হয়ে পড়েছিলেন। মনও খারাপ ছিল নিশ্চয়। হয়তো দুশ্চিন্তাও। কোভিড চিকিৎসকদের তো ছেড়ে কথা বলছে না। তবে যেহেতু দুজনেই শিল্প সাহিত্যকে ভালবাসার মানুষ তাই বই খুলে, গান শুনে যতটা সম্ভব মনের দিক থেকে ভাল থাকবার চেষ্টা করছিলেন। শরীর সবসময় অ্যালাউ দেয়নি। যখন দুর্বলতা কমতে লাগল দুজনে বই পড়া বাড়ালেন। ডাক্তারবাবু একটু একটু লেখালিখিও শুরু করলেন। এতটা পর্যন্ত মোটের ওপর ঠিক আছে, কিন্তু তারপরে ডাক্তারবাবু যে কাণ্ডটি করলেন তা অসাধারণ। একদিন বই খুলে কবিতা পড়তে পড়তে শঙ্খ ঘোষের একটি কবিতায় সুর দিয়ে বসলেন। কবিতার নাম, ‘‌দুই মুহূর্ত’‌। সুর দিয়ে গেয়ে উঠলেন গুনগুনিয়ে। মোবাইলে রেকর্ডও করে ফেললেন। পাশের ঘরে স্ত্রীকে পাঠিয়ে দিলেন। মন ভাল রাখবার সারপ্রাইজ গিফট। জীবনের প্রথম সুর?‌ নাকি জীবনে অনেক সুর থাকলে মনে এই সুর বেজে ওঠে? ‌গলায় হালকা ক্লান্তি, কিন্তু সুরে কোনও খামতি নেই ডাক্তারবাবুর। রাগের ছোঁয়ায় সুরটি দিয়েছেনও চমৎকার। গেয়েছেনও ভারি ভাল। ‘‌হাত তোল যদি নৃত্যনাট্য/‌ কথা বলো যদি ছন্দ.‌.‌.‌।’‌ আহা!‌
অভিনন্দন ডাক্তারবাবু।‌
ভাই, কোভিড, কেমন লাগছে?‌ কিছু মানুষের চরম সর্বনাশ করছ ঠিকই, কিন্তু সবাইকে পারবে না। প্রিয়াঙ্কার পাড়া–‌প্রতিবেশী, উদয়ের পথে সংগঠন, শঙ্খ ঘোষের কবিতার সুরের কাছে তোমাকে যে হারতেই হবে ভাই।

জনপ্রিয়

Back To Top