জাহির রায়হান: কথাটি ধ্রুব এবং অমোঘ সত্য। কথাটি সত্য কেন না ‘অন্ন’ নামক ধর্মের মূল কর্মই হল জাতি, গোত্র, বর্ণ, ধনী, দরিদ্র প্রমুখ নিরন্ন মানুষের উদরে প্রবেশ করে তার ক্ষুন্নিবৃত্তি করা, নিরপেক্ষ এবং নিশ্চিতভাবে। খাদ্য কখনই প্রশ্ন করে না, তুমি কে? কী তোমার ধর্ম পরিচয়?
অন্ন অহেতুক গোঁ ধরে থাকে না, তার মধ্যে নেই কোনও জটিলতা, আবার মানুষের গায়ের রং, মুখের মাপ, হাতের আঙুল ইত্যাদি নিয়ে তার নেই কোনও আগ্রহ বা ভাবান্তর। সে মনপ্রাণ দিয়ে নিজের ধর্ম পালন করে যায়, করে যায় ক্ষুধার্ত প্রাণীর ক্ষুধা নিবারণ। অন্যের ধর্ম এবং ধর্মসঙ্কট নিয়ে তার কোনও মাথাব্যথা নেই, ছিল না কোনও কালেই, সেই সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকেই।
কৈশোরের প্রারম্ভে দেখেছিলাম অনিল কাপুর অভিনীত ‘মিঃ ইন্ডিয়া’। লাল নীল রঙের জাদু ঘড়ির সাহায্য নিয়ে মিঃ ইন্ডিয়া বাতাসে অদৃশ্য হয়ে যান হঠাৎ হঠাৎ, তাঁর এক সাকরেদ ছাড়া অন্য আর কেউ তখন তাঁকে দেখতে পায় না। তাই তিনি সবার কাছে অধরা। আর সেই সুযোগে মিঃ ইন্ডিয়ারূপী অনিল কাপুর দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন করে থাকেন সকলের অগোচরে। বড়লোক বাড়ির সুখাদ্যে ভর্তি ডাইনিং টেবিল তুলে নিয়ে;‌ একরকম উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে নামিয়ে দেন অভুক্ত দরিদ্র ক্ষুধার্ত পরিবারের সম্মুখে, খালি পেটে খিদের আগুন নিয়ে যারা বসে থাকে পাকা সড়কের পাশে অসহায়। দৃশ্যটি আমাদের বুঝতে শেখায়, খাদ্যের নিজের নেই কোনও বাছবিচার, তাকে যে আধারে রাখা হয় সেখানেই সে পালন করে তার আপন ধর্ম। যে আহার ধনী পরিবারের খিদে মেটায়, সেই একই খাদ্য দরিদ্র মানুষেরও ক্ষুধা নিবৃত্তি ঘটায়, ঠিক একইভাবে। আবার সোশ্যাল মিডিয়াতে একটি ভিডিও চোখে পড়ে প্রায়শই। এক ব্যক্তি অন্যের এঁটো করা উচ্ছিষ্ট নিজে খেয়ে দাম মিটিয়ে দেন রেস্তোরাঁয়। পকেট থেকে প্যাকেট বের করে খরিদ্দারদের থালায় ফেলে যাওয়া খাবারের অবশিষ্টাংশ সংগ্রহ করে পৌঁছে দেন ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে। কারণ তিনি জানেন, খিদে কাকে বলে! তিনি জানেন ধর্মের জেহাদ নয়, পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন সংগ্রাম, ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াই। যে দেশে বহু মানুষের মুখে এখনও অন্ন জোটে না নিয়মিত, অনাহার অর্ধাহারে দিন কাটে বহু পরিবারের, সে দেশে ধর্ম আসলে বিলাসিতা, আর ভুখা পেটে বিলাসিতা করা মানায় না।
পাঞ্জাব প্রদেশের গুরুদ্বারগুলোতে প্রতিদিন আগত দর্শনার্থী ও অন্যদের জন্য তৈরি করা হয় প্রভূত পরিমাণে ডাল ও রুটি। বড় ঘরের মা জননীরা সে খাবার প্রস্তুত করার কাজে থাকেন সদা ব্যস্ত। রান্নাবান্না থেকে পরিবেশন সব কাজই নিজের হাতেই হাসিমুখে করেন তাঁরা সম্পূর্ণ দ্বিধামুক্ত মনে। ধর্ম, সম্প্রদায়, জাতি, গোষ্ঠী নির্বিশেষে অভুক্তের মুখে অন্ন তুলে দিয়ে পালন করেন মানব ধর্ম। সেখানে আপনি, আমি বা যে কেউ স্বাগত। কারও কোনওরূপ বাধ্যবাধকতা নেই, প্রবেশ দ্বারে কেউ আপনার নামটুকুও জানতে চাইবে না। কারণ তাঁরা জানেন, খাবারের মতো ক্ষুধারও কোনও জাত ধর্ম নেই। অভুক্ত অবস্থায় আপনি হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, জৈন বা খ্রিস্টান নন, আপনি ক্ষুধার্ত। আর সেই ক্ষুধার্তকে অন্ন দান করাই মানুষের পরম ধর্ম। মা মাসিরা গল্প করতেন, কারও বাড়ি এক গ্লাস জল চাইলে গৃহস্বামী জলের সঙ্গে কিছু খাবার নিদেন পক্ষে দু’খানি বাতাসাও এগিয়ে দেন আগন্তুককে, তার জাত ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন না করেই সে কাজটুকু তিনি করতে পারেন অনায়াস ভদ্রতায়।
উৎসব মুখর ভারতীয়দের উপলক্ষের অন্ত নেই। আর সে উপলক্ষে আয়োজিত উৎসবে খাওয়া দাওয়াও চলে ভালরকম। জগদ্ধাত্রী পূজা, অন্নপূর্ণা, কালী পুজোয় যে খিচুড়ি ভোগ তৈরি ও নরনারায়ণ সেবার আয়োজন করা হয় সেটাই ভারতীয় সংস্কৃতি। যে সংস্কৃতি আমাদের মানুষকেই নারায়ণ হিসেবে সেবা করতে শেখায়, আমাদের সেই সংস্কৃতি, সেই সামাজিকতা নিয়ে গর্বিত হওয়া উচিত। উদ্যোক্তারা কখনই নাম বা গোত্র ধরে ধরে খাবার পরিবেশন করে না সেখানে। বরং সর্ব বর্ণের সর্ব গোত্রের মিলন মেলা সাধিত হয় সেথায়। ধনীর পাশে দরিদ্র, দলিতের পাশে ব্রাহ্মণ আবার হিন্দুর পাশে ভিন্ন ধর্মীয় কেউ, আসলে মানুষের পাশে মানুষ, ক্ষুধার্তের পাশে ক্ষুধার্ত পাশাপাশি বসে গ্রহণ করেন সেই প্রসাদ, একযোগে ক্ষুন্নিবৃত্তি হয় সকল নিরন্নের। একইভাবে অমরনাথ যাত্রীদের সেবার্থে নানান খাবারের ডালি নিয়ে ভান্ডারা খুলে বসেন মানব দরদি বহু ব্যক্তি, বহু প্রতিষ্ঠান। যে দেশে মহরমের লাঠি খেলার কুশীলবদের জল সিন্নি এগিয়ে দেন হিন্দু ভাইয়েরা, সে দেশে খাবার বহনকারীর ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন তোলা মূর্খামির নামান্তর। তাই হিন্দু মুসলমান বিচার্য নয়, মানবতাই লক্ষ্য হোক।
যে ব্যক্তির পালন করা গরু মোষের দুধ খেয়ে মানুষ হয়েছি আমরা, তার ধর্ম জানেন? যে কৃষকের পরিশ্রমের ফসল কিনে অন্ন জোটে আপনার, জানেন তার ধর্ম কি ছিল? যে পাচকের রান্না করা খাবার খেয়ে ঢেকুর তুলেছেন অনুষ্ঠান বাড়ির চৌহদ্দিতে, সে কোন ধর্মের প্রতিনিধি তা নিয়েও কি মাথা ঘামিয়েছেন কোনওদিন? যদি আপনার উত্তর ‘না’ হয় তাহলে আপনি মানুষই আছেন এখনও, সেটাকে লালন করুন। আর যদি উত্তর হয় ‘হ্যাঁ’, তা হলে আগামীতে খাদ্যের অভাব, পানীয় জলের অভাব হতে পারে আপনার ও আপনার পরিবারের জীবন সঙ্কটের কারণ। নিজ ধর্মের চাল গম আটা কলা জল পানি সন্ধান করার চক্করে পড়ে আপনার না ক্ষুধা ও তেষ্টার চোটে প্রাণপাখি উড়ে পালায়, দেবী অন্নপূর্ণার কাছে প্রার্থনা জানাই তেমন দিন যেন আপনার না আসে, আপনার ঈশ্বর আপনার সহায় হোক।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top