সৌম্যেন্দ্র ব্যানার্জি- বিশ্ব আঙিনায় বর্নবৈষম্য, জাতিদাঙ্গা, জঙ্গি নাশকতা যত বেশি প্রকট, মহাত্মা গান্ধীকে নিয়ে চর্চা যেন ততটাই প্রাসঙ্গিক। একবিংশ শতাব্দীর কমিউনিস্ট চীনও এর ব্যাতিক্রম নয়। গান্ধী অবশ্য কমিউনিস্টশাসিত চীন দেখে যেতে পারেননি। তিনি কখনও চীন সফরও করেননি। কিন্তু বৃটিশদের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকায় গান্ধীজির সর্বপ্রথম অহিংস আন্দোলনের হাতেখড়ি হয়েছিল বিপুল সংখ্যক ভারতীয় ও চীনাদের সহযোগিতায়। গান্ধীজির আহ্বানে সাড়া দিয়ে চীনারাও ভারতীয়দের সঙ্গে কাঁধে কাধ মিলিয়ে লড়েছিল। 
১৯০৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ট্র্যান্সভাল প্রদেশের ঔপনেবেশিক সরকার এশীয় বাসিন্দা, বিশেষ করে ভারতীয় ও চীনা অভিবাসীদের উদ্দেশ্যে প্রস্তাবিত এশিয়াটিক রেজিস্ট্রেশন আইনের একটি বিলের খসড়া আইন সভায় উত্থাপন করে। এই আইনের মুখ্য উদ্দেশ্যই ছিল এশীয়দের সম্পত্তির মালিকানা থেকে বঞ্চিত করা, পরিচয়পত্র বহনে বাধ্য করা এবং তাদের ব্যবসা–বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কিছু নিষেধাজ্ঞা জারি করা। ভারতীয় সম্প্রদায়ের সুরক্ষা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার এশীয় সম্প্রদায়কে অসহনীয় অবমাননার হাত থেকে বঁাচাতে ১৯০৭ সালের জুন মাসে গান্ধীজির নেতৃত্বে প্রায় ৮০০০ ভারতীয়ের সঙ্গে ১১০০-র মত চীনারাও শান্তিপূর্ন প্রতিবাদে অংশ নেন। গান্ধীজির নেতৃত্বে এই অহিংস আন্দোলনই জন্ম দিয়েছিল এশীয় সংহতি আন্দোলন, যা ব্রিটিশদেরকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছিল। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গান্ধীজী ও চীনেদের নেতা ছিন লিওন কারাবরণ করেন। 
বলাই বাহুল্য দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকাকালীন গান্ধীজির সঙ্গে চীনা মানুষজনের মধুর সর্ম্পক গড়ে ওঠে। শুধু দক্ষিণ আফ্রিকার চীনা সম্প্রদায় নয়, মরিশাসের চীনা সম্প্রদায়ের সঙ্গেও গান্ধীজী নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। ১৯১৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে স্থায়ী ভাবে ভারতে ফিরে গান্ধীজী স্বাধীনতা আন্দোলনে নিজেকে নিয়োজিত করেন এবং মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই সমগ্র ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদী নেতা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। বিংশ শতকের গোড়া থেকেই বিশ্ব রাজনীতিতে ঝোড়ো হাওয়া বইতে থাকে। এশিয়ার সর্ববৃহৎ দুটি দেশ ভারত ও চীনের মানুষজন একই সময়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাত থেকে মুক্তি পেতে আন্দোলন শুরু করে। প্রতিবেশী দেশের রাজনৈতিক ঘটনাবলীর প্রতিও গান্ধীজির বিশেষ দৃষ্টি ছিল। ভারতেও অনেক চীনা মানুষের সঙ্গে তঁার যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। যাঁদের মধ্যে শিল্পী, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র ও রাষ্ট্রপ্রধানের মত ব্যাক্তিরাও ছিলেন।
১৯২৪ সালে গান্ধীজির অন্যতম শুভাকাঙ্খী রবীন্দ্রনাথ সর্বপ্রথম চীন সফরে গেলেন, যার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল ভারত ও চীনের হারিয়ে যাওয়া সাংস্কৃতিক সম্পর্ক এবং মৈত্রী বন্ধন কে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা।
রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণে ১৯২৮ সালে চীনের তরুণ পণ্ডিত তান ইয়ুন শান চীনা ভাষার শিক্ষক হিসেবে শান্তিনিকেতনে যোগ দেন। রবীন্দ্রনাথের বিশেষ ইচ্ছায় ও অধ্যাপক শানের কঠোর পরিশ্রমে ১৯৩৭ সালে শান্তিনিকেতনে চীনা ভবন গড়ে উঠল। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং গান্ধীজিকে আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু জরুরি কাজে বেলাগঁাও যেতে হয়েছিল বলে গান্ধীজী আসতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথের কর্মযজ্ঞের প্রতি গান্ধীজির বরাবরই বিশেষ শ্রদ্ধা ছিল। এই  উপলক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ কে তিনি এক চিঠিতে লিখলেন— ‘‌আত্মিকভাবে আপনাদের অনুষ্ঠানে আমি উপস্থিত থাকব।‌ চীন ভবন ভারত–চীন উভয় দেশের মিলনের প্রতীক হয়ে উঠুক, এই প্রার্থনা করি।’‌
অধ্যাপক তান ইয়ুন শান কে ব্যক্তিগতভাবে অপর এক চিঠিতে গান্ধীজি লিখলেন— ‘‌দুই জাতির সাংস্কৃতিক মিলন আমাদের কাম্য। তাতে আপনার ঘনিষ্ঠ প্রয়াস সার্থক হয়ে উঠুক।’‌ অধ্যাপক তানের সঙ্গে গান্ধীজির আগেই পরিচয়  হয়েছিল।১ ৯৩১ সালে অধ্যাপক তান বারদওলিতে গিয়ে গান্ধীজীর সঙ্গে দেখা করেন এবং লাসা থেকে নিয়ে যাওয়া গান্ধীজীকে তিব্বতী ভাষায় লেখা তিব্বতের ত্রয়োদশ ধর্ম গুরু দলাইলামার একটি গুরুত্বপূর্ন চিঠি তাঁর কাছে পৌঁছে দেন। গান্ধীজির সান্নিধ্য পেয়ে স্বভাবতই উচ্ছ্বসিত অধ্যাপক তান। রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য তরুণ, বুদ্ধিদীপ্ত এই চৈনিক অধ্যাপকের সঙ্গে কথোপকথনের পর গান্ধীজিও বেশ তৃপ্ত। আমিষভোজী চৈনিক তান–কে নিরামিষ খাওয়ারও পরামর্শ দেন গান্ধীজি। বারদওলি থেকে গান্ধীজির সঙ্গী হয়ে তান সুরাট ভ্রমণ করেন। রেল ষ্টেশনে পৌঁছানো মাত্র তান লক্ষ করেন, শত–সহস্র মানুষ তীব্র আগ্রহী গান্ধীজির একটিবার দর্শন পেতে। এই দৃশ্য দেখে তাঁর মনে ভেসে ওঠে প্রাচীনকালের বিখ্যাত চৈনিক দার্শনিক মেনসিয়াসের বানী— ‘‌A man who influences people with virtue, gets the heart of people’‌। 
অধ্যাপক তানের অনুরোধেই ৪ঠা মে ১৯৩১ সালে সবরমতী আশ্রম থেকে গান্ধীজি রাজনৈতিক সংঘর্ষে উত্তাল চীনের ছাত্রদের উদ্দেশ্যে এক বার্তায় জানালেন— My message to the Chinese students is– know that the deliverance of China is through Ahimsa, pure and unadulterated.’‌ চীনের প্রতি সর্বপ্রথম তাঁর এই বার্তা তৎকালীন চীনের সমস্ত গুরুত্বপূর্ন জার্নালগুলোতে প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৩৯ সালে শান্তিনিকেতনে পড়তে আসা রবীন্দ্রনাথের একমাত্র চৈনিক ছাত্র ওয়ে ফং চিয়েন গান্ধী দর্শনে ওয়ার্ধাতে যান ও গান্ধীর সান্নিধ্য লাভ করেন। তিনি ওয়ার্ধাতে একমাস গান্ধী আশ্রমে থাকেন ও গান্ধীবাদী আর্দশে প্রভাবিত হয়ে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অনেক গুরুত্বপূর্ন ঘটনার সাক্ষী থাকেন। ১৯৪০ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে শান্তিনিকেতনে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ চীনের বিখ্যাত চিত্র শিল্পী সু পেই হুং–এর সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর পরিচয় করিয়ে দেন। চীনাদের উপর চলতে থাকা জাপানিদের নির্মম  অত্যাচারের জন্য গান্ধীজি সু পেই হুং–এর কাছে গভীর সমবেদনা প্রকাশ করে। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সু পেই হুং গান্ধীজির উপর একটি অপূর্ব পেন্সিল–স্কেচ এঁকে উপহার দেন, যা দেখে গান্ধী খুশিতে আপ্লুত হয়ে মূল্যবান ছবিটিতে স্বাক্ষর করেন।
১৯৪২ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি প্রজাতন্ত্রী চীনের সমর নায়ক ও চীনের জাতীয় পার্টির নেতা রাষ্ট্র প্রধান চিয়াং  কাইশেক ও তাঁর ইংরেজী জানা উচ্চশিক্ষিত পত্নী সুং মেইলিং কলকাতা সফরে আসেন গান্ধীজির সঙ্গে এক  গুরুত্বপূর্ন বৈঠক করতে। বলা বাহুল্য, এই সময় দুটি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পট পরিবর্তনের শেষ পর্যায়  আসন্ন। পরাধীন ভারতের কোন সরকারি বাংলোতে নয়, মহাত্মা গান্ধীর বিশেষ আস্থাভাজন, স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং শিল্পপতি জিডি বিড়লার বাংলো ‘বিড়লা পার্ক’–এ আয়োজিত ৫ ঘণ্টার এই মিটিংয়ে গান্ধীজি ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন জহরলাল নেহরু। ফলপ্রসূ আলোচনা ছাড়াও, বিড়লা পরিবারের আতিথেয়তা বিশেষ ভাবে মুগ্ধ করেছিল বিদেশি অতিথিদের। সেই মিটিংয়ের কথা স্মরণ করে সেবাগ্রাম থেকে ১৪ই জুন গান্ধীজি চিয়াং কাইশেককে চিঠিতে লিখলেন— ‘I can never forget the five hours’ close contact I had with you, your noble wife in Calcutta.’ চীনাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা স্মরণ করে একই পত্রে তিনি লিখলেন— ‘‌Long ago, between 1905 and 1913, when I was in South Africa, I was in constant touch with the small Chinese colony in Johannesburg. .‌.‌.‌.‌.‌I came in touch with them in Mauritius also.’‌
ভারত ও চীনের মৈত্রী বন্ধনের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা বলতে গিয়ে গান্ধীজি চিয়াং কাইশেককে আরও লিখলেন— ‘‌I look forward to the day when a free India and a free China will co-operate together in friends‌hip and brotherhood for their own good and for the good of Asia and the world.‌’‌
গান্ধীজির সঙ্গে চীনের এই সম্পর্ক শুধুমাত্র প্রখ্যাত কিছু চীনা মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। গান্ধীজি কে, তঁার দর্শনই বা কী? গত শতকের বিশ দশক থেকেই চীনাদের মনে এই প্রশ্নগুলো উঠতে শুরু করে। কিছু চীনা বুদ্ধিজীবী মানুষ তাঁকে নিয়ে চর্চাও শুরু করেন। এরপর চীনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ১৯৪৯ সালে গনপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর তৎকালীন চীন সরকারের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য গান্ধী–চর্চায় ভঁাটা পড়লেও ১৯৮০ সালে থেকে উদার নীতির উপর ভর করেই চীনে আবার গান্ধীচর্চার জোয়ার এসেছে। বর্তমানে আর্থ সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে সামাজিক বৈষম্য, মানবাধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, দুর্নীতির মত বিভিন্ন ইস্যুর সমাধান প্রয়াসের লক্ষ্যে গান্ধীজী ও গান্ধী দর্শন চীনেদের কাছে আজ আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।‌

জনপ্রিয়

Back To Top