গত কয়েকদিন ধরে দেখছি ‌আত্মহত্যা‌ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় খুব হইচই। একটি মর্মান্তিক ঘটনা নিয়ে কেউ কাঁদছেন। কেউ বলেছেন, রাতে ঘুমোতে পারছেন না। কেউ বলছেন, গভীর অবসাদে চলে যাচ্ছি। আমি সমব্যথী। এদের কষ্ট অনুভব করছি। নিজেও কষ্ট পাচ্ছি। যে–‌কোনও মৃত্যুই দুঃখের। আত্মহত্যা তো মর্মান্তিক। যদি গুণী কেউ এই ভয়ঙ্কর কাজটি করেন আপশোস হয়। আর তার বয়স যদি কম হয়, বলার কিছু থাকে না। খুব মন খারাপ হয়ে যায়। মনে হয়, এই বুড়ো বয়সে আমি রয়ে গেলাম, অথচ এই অল্প বয়সের মানুষটি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল!‌ নিজেকে অপরাধী লাগে। মনে হয়, এমন কোনও ইচ্ছাবল কেন নেই যেখানে আমরা পরস্পরের জীবন বিনিময় করতে পারি। পুরাণ, মহাকাব্য, মিথের মতো। আমার জীবন নিয়ে সে থেকে যাক এই চমৎকার পৃথিবীতে। হায়রে, তেমন তো হয় না। এই আত্মহনন ঠেকাতে আমার কি কোনও ভূমিকা ছিল না?‌ আমি কেন তাকে বোঝাতে পারলাম না, ‘‌এখনও অনেক আছে বাকি’‌?‌
তারপরেই ভাবি, পারতে হবে। পারতেই হবে আমাদের। তাই কিছু প্রশ্ন জাগে মনে।
১)‌ প্রায় রোজই সংবাদপত্রে আত্মহত্যার খবর পড়ছি। খুব ছোট করেই ছাপা হয়। ভিতরের কোনও পাতায়। চার–‌পঁাচ লাইনের খবর। অভাবের কারণে আত্মহত্যা। এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে কাজ চলে যাচ্ছে। ঋণ শোধ করতে পারছে না। বউ ছেলেমেয়েকে খেতে দিতে পারছে না। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। আচ্ছা, ফেসবুকে, হোয়াট্‌সঅ্যাপে, ইনস্টাগ্রামে, ইউটিউবে এদের নিয়ে ক’‌জন কঁাদছে?‌ ক’‌জন রাতে ঘুমোতে পারছে না?‌ ক’‌জন খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে?‌ নাকি এইসব আত্মহত্যা তেমন আত্মহত্যা নয়?‌ চোখের জল না ফেললেও চলে।‌
২)‌ সেদিন এক তরুণীর সঙ্গে কথা হল। মেয়েটি কলকাতার একটি শপিং মলে কাজ করে। উদয়াস্ত পরিশ্রম করতে হয়। দাঁড়িয়ে থাকতে হয় সারাদিন। সৎ পথে বঁাচবার লড়াই। মেয়েটি বলল, ‘‌জানেন দাদা, তিন মাস বেতন পাইনি। কাজটাও থাকবে না বলেছে। ওইটুকু টাকায় সংসার চলত। কী করব বুঝতে পারছি না।‌ মনে হচ্ছে সুইসাইড করি।’ এই তরুণী এ‌কজন নয়। এরকম কয়েক হাজার জন আছে। ফুটফুটে ছেলেমেয়ে সব। কর্মহীন হয়ে পড়ছে। ফেসবুকে, হোয়াট্‌সঅ্যাপে, ইনস্টাগ্রামে, ইউটিউবে এদের জন্য ক’‌জন কঁাদছে?‌ ক’‌জন রাতে ঘুমোতে পারছে না?‌ ক’‌জন খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে? ক’‌জন অবসাদে ডুবে যাচ্ছে?‌
৩)‌ দেখতে পাচ্ছি, আমার অনেকেই সিনেমায় নিবেদিত প্রাণ। সিনেমা জগতে কিছু হলে মন ভেঙে যাচ্ছে। যাওয়াই উচিত। ঘুম  চলে যাচ্ছে। যাওয়াই উচিত। গভীর ডিপ্রেশন হচ্ছে। হওয়াই উচিত। আচ্ছা, আমরা কি জানি, করোনা পরিস্থিতির জন্য টলিউড, বলিউডের, এমনকী হলিউডের কতজন শিল্পী, কলাকুশলী, হলের কর্মচারী উপার্জনহীন হয়ে পড়েছেন? এই সংখ্যা লক্ষ ছাড়ালেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমি একজন মেকআপ শিল্পীকে জানি, যিনি পথে ঘুরে ঘুরে সবজি বিক্রি করছেন। তিনি ফেস্টিভালে দেখানো হয়েছে এমন ছবিতেও কাজ করেছেন। ভদ্রলোক পরিচিত একজনকে ফোন করে বলেছেন, ‘‌আর টানতে পারছি না। ইচ্ছে করছে মরে যাই।’‌ ফেসবুকে, হোয়াট্‌সঅ্যাপে, ইনস্টাগ্রামে, ইউটিউবে এদের জন্য ক’‌জন কঁাদছে?‌ ক’‌জন রাতে ঘুমোতে পারছে না?‌ ক’‌জন খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে? ক’‌জন ডুবে যাচ্ছে অবসাদে?‌
৪) ‘‌প্রতিভাধর’‌ শিল্পীদের নিয়ে আমাদের খুব আবেগ‌। কোনও ‘‌প্রতিভাধর’ প্রয়াত হলে আমরা ফেসবুকে, হোয়াট্‌সঅ্যাপে, ইনস্টাগ্রামে, ইউটিউবে তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে একেবারে মাতোয়ারা হয়ে যাই। যাবই তো। আচ্ছা, আমি চলচ্চিত্র জগতের তিন ‘‌প্রতিভাধর’দের নাম বলছি। তুলসী চক্রবর্তী, রবি ঘোষ, অনুপকুমার। আচ্ছা, এদের মৃত্যুদিনে আমরা ফেসবুকে, হোয়াট্‌সঅ্যাপে, ইনস্টাগ্রামে, ইউটিউবে এক ফোঁটাও চোখের জল ফেলি?‌ চোখের জল না ফেলি স্মরণ করি কি?‌ সেই তারিখ আমাদের জানা আছে?‌ জানতে চাই?‌ নাকি এরা তেমন ‘‌প্রতিভাধর’ নন?‌ নাকি বাংলা ছবি বলে নাক সিঁটকোই?‌
৫)‌ আমরা কি জানি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (‌হু)‌–‌র রিপোর্ট হল এই পৃথিবীতে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন করে আত্মহত্যা করে?‌ কী ভয়ঙ্কর!‌ আচ্ছা, আত্মহত্যা নিয়ে আমাদের মনে যখন এতই দুঃখ, হু–‌এর এই রিপোর্ট নিয়ে আমরা ফেসবুকে, হোয়াট্‌সঅ্যাপে, ইনস্টাগ্রামে, ইউটিউবে কখনও কোনও আলোচনা করেছি? ফিরে তাকিয়েছি সেদিকে? এরকম একটা ভয়ঙ্কর তথ্য আদৌ জানি কি আমরা?‌‌ নাকি একটা ঘটনাই শুধু আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ,‌ বাকি সব শূন্য?‌ ‘‌হুজুগ’‌ তৈরি করে কোনও মর্মন্তুদ মৃত্যুকে অসম্মান করে ফেলছি না তো?‌
৬)‌ এবার একটু সিনেমা ছেড়ে অন্য বিষয়ে আসি। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে লড়াই করতে গিয়ে, ‘‌ব্রিটিশ পুলিশের হাতে ধরা দেব না’‌ এই প্রতিজ্ঞায় আত্মহত্যা করেছেন এমন একজনকেও কি আমরা স্মরণ করি?‌ তার বয়স যদি কম হয় চোখে কি জল আসে?‌ ক’‌জন রাতে ঘুমোতে পারি না?‌ ক’‌জন খাওয়া বন্ধ করি?‌ কান্নাকাটি না করি ফেসবুকে, হোয়াট্‌সঅ্যাপে, ইনস্টাগ্রামে, ইউটিউবে কখনও প্রফুল্ল চাকিকে নিয়ে আলোচনা করি? নাকি এই আত্মহত্যা ফেসবুকে আসবার মতো তেমন গুরুত্বপূর্ণ ‘‌আত্মহত্যা’‌ নয়?
৭)‌ আমরা কী চাই?‌ সোশ্যাল মিডিয়ায় কঁাদতে?‌ সবাইকে জানাতে যে আমি খুব দুঃখে র‌য়েছি?‌ আমার খুব ডিপ্রেশন হয়েছে?‌ যে এই কাজ করেছে তাকে নিয়ে কাটাছেঁড়া করতে?‌ নাকি আমি চাই, এধরনের ঘটনা কমাতে?‌ সে বিষয়ে ফেসবুকে, হোয়াট্‌সঅ্যাপে, ইনস্টাগ্রামে, ইউটিউবে একটা পথও দেখিয়েছি ?‌ না দেখাইনি। যা আমার বিষয় তাই নিয়ে জ্ঞান দিচ্ছি। একবারও লিখছি না, এই হচ্ছে হেল্প লাইনের নম্বর, এই হচ্ছে মনোচিকিৎসক, মনোবিদদের ফোন নম্বর। মনে অবসাদ এলে যোগাযোগ করো। আমি ফেসবুকে কঁাদলে আত্মহননে ইচ্ছুককে বঁাচানো যাবে কি?‌ আমাকে ঠিক করে নিতে হবে, আমি কঁাদতে চাই নাকি বাঁচাতে চাই।
এই প্রশ্নগুলো আমার ব্যক্তিগত মত। কারও ভাল লাগতে পারে, কারও নাও লাগতে পারে।
এবার আমি একটা কাজের কথা বলব। বইয়ের কথা।
বইয়ের নাম ‘এখনও অনেক আছে বাকি‌’‌। এই লেখার শিরোনামও সেখান থেকে নেওয়া। বইটির লেখক ডা.‌ গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি মেডিক্যাল কলেজে কর্মরত একজন মনোচিকিৎসক এবং প্রফেসর। মন বিষয়ক বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। মনের কথা নামে একটি পত্রিকার সম্পাদক। সুবক্তা এবং সুলেখক। বইটির পরিচয় দিয়েছেন— ‘‌আত্মহনন প্রতিরোধে কয়েকটি আন্তরিক ও প্রয়োজনীয় কথা’‌। এটি কোনও ‘‌সহজে ভাল হবার দশটি উপায়’‌ ধরনের নিম্নস্তরের মেডিক্যাল হ্যান্ডবুক নয়, এটি একটি সিরিয়াস বই। অথচ পড়বার সময় মনে হবে, পাশে বসে কোনও বন্ধু কথা বলছে। আত্মহত্যা নিয়ে অসাধারণ কাজ। বাংলায় যে এমন করে মনোচিকিৎসার বই লেখা সম্ভব, না পড়লে বিশ্বাস হত না। মনোচিকিৎসা বলি কেন, বলা উচিত মনকে ভালবাসার বই। গভীরে গিয়ে আলোচনা, অথচ কী সহজ ভঙ্গি!‌ অল্প বয়সি ছেলেমেয়ে থেকে বড়রা সবাই পড়তে পারবে। আমি জোর গলায় বলছি, এই বইটি সবার পড়া উচিত। হ্যঁা, আবার বলছি, পড়া দরকার। ফেসবুকে কঁাদতে চাই না, এই বইয়ের প্রচার করতে চাই। হোয়াট্‌সঅ্যাপে ডিপ্রেশনে ভুগতে চাই না, এই বইয়ের প্রচার করতে চাই। কেন এই বইয়ের হয়ে বলছি, বইটি পড়লেই বোঝা যাবে। যে মনে কষ্ট নিয়ে রয়েছে সে যেমন পড়বে, যে কষ্টে নেই, সেও পড়ুক। পাশের জনকেও পড়াবে। বইটির প্রকাশক পরম্পরা। কম দামে সুমুদ্রিত। বইতে প্রকাশকের একটি ফোন নম্বরও রয়েছে। নম্বরটি হল, ৯৯০৩০৯১২২৫।
একটি ছোট্ট ভিডিওর কথা বলে লেখা শেষ করব। সেদিন আত্মহত্যা প্রতিরোধে একটি চমৎকার ভিডিও দেখলাম। যে ভিডিওতে শোক আছে, কিন্তু বঁাচবার পথ দেখানো রয়েছে বেশি। লেখাটি চিকিৎসক, সাহিত্যিক দোলনচঁাপা দাশগুপ্তের। পাঠ করেছেন ডা.‌ গৌতম লাহিড়ী। যেমন সুন্দর লেখা, তেমন আপন করা কণ্ঠস্বর। ভিডিওর নাম ‘‌ভালবাসার ভাইরাস ছড়িয়ে দিন’।‌ ছবি, কথা দিয়ে ভিডিওটিকে সাজিয়েছেন ডা.‌ গৌতম বিশ্বাস। যিনি প্রচারে নেই, দারুণ দারুণ সব ফটো তোলায় রয়েছেন। এই ভিডিওটিতে দোলনচঁাপা বার্তা দিয়েছেন, ‘‌মনে কষ্ট হলে কথা বলুন’‌। মনোচিকিৎসক, মনোবিদরা তো আছেনই, কথা বলুন সংবেদনশীল মানুষদের সঙ্গেও। এই সাহিত্যগুণ সম্পন্ন এবং শিল্পসম্মত প্র‌য়োজনীয় ভিডিওটি দেখা যাবে ইউটিউবে।
আসুন, আমরা সবাই মিলে বলি, ঝলমলে, মেধাবী অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের মতো আর একটি ঘটনাও দেখতে চাই না। সে তারকাই হোক, আর সাধারণ ধুলোমাটির মানুষই হোক। আত্মহত্যার ভেদাভেদ নেই। সবটাই কষ্টের।‌

জনপ্রিয়

Back To Top