কমল সাঁই

‘‌সাগরে যে অগ্নি থাকে কল্পনা সে নয় / তোমায় দেখে অবিশ্বাসীর হয়েছে প্রত্যয়।’‌ যাঁর সম্পর্কে কবির এই সশ্রদ্ধ উক্তি, সেই প্রাতঃস্মরণীয় মনীষী, ভারতীয় নবজাগরণ তথা পার্থিব মানবতাবাদের পথিকৃৎ, পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের দ্বিশতজন্মবর্ষ। ১৮২০–র ২৬ সেপ্টেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তদানীন্তন হুগলি,  বর্তমানে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে। এই দ্বিশতবর্ষকে সামনে রেখে কিছু মানুষ তাঁর প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা নিবেদনের চেষ্টা করছেন। কিন্তু এ কথাও ঠিক যে, বৃহত্তর জনজীবনে আজ পর্যন্ত তা নিয়ে তেমন আলোড়ন চোখে পড়ল না। তবে কি দেশের মানুষ বিদ্যাসাগরকে ভুলে গেছে? ভুলে যাওয়া একদিক থেকে চরম অকৃতজ্ঞতা! তার চেয়েও বড় এই ইতিহাস–বিস্মৃতি, শেষ বিচারে জাতির আত্মবিস্মৃতিরই নামান্তর।
আজ আমরা সকলেই মনে করি যে, আমরা মধ্যযুগের অচলায়তনে আটকে নেই। স্কুল–কলেজ, কলকারখানা, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা–সহ, ঠাটবাট–সর্বস্ব হলেও একটি গণতান্ত্রিক দেশে বাস করি আমরা। টোল চতুষ্পাঠীর শিক্ষা, ব্রাহ্মণদের শাস্ত্রশাসিত সমাজ এটা নয়। বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ আজ অতীত। শাস্ত্রবাক্যের দোহাই দিয়ে মৃত্যুপথযাত্রীর হাতে শিশুকন্যা সমর্পণ আর জাত–ধর্ম রক্ষার নামে তাকে ‘‌পবিত্র’‌ বালবিধবা সাজিয়ে তার জীবন তথা সমাজকে কলুষিত ও ধ্বংস করার ক্ষমতা আজ কারও নেই। কিন্তু একদিন মধ্যযুগীয় সেই অভিশপ্ত অচলায়তন তো ছিল। সেই অভিশাপ আজ যে নেই তার পেছনে কার অবদান?‌ এ প্রশ্নের উত্তর যদি আমরা না ভাবি তবে আমাদের চেয়ে অকৃতজ্ঞ আর কে আছে? যদিও এই অকৃতজ্ঞতা বিদ্যাসাগরের মতো যাঁরা মহৎ মানুষ, তাঁদের স্পর্শ করে না। বিদ্যাসাগর সে–যুগের সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ। সে যুগের সবচেয়ে বড় জ্ঞানী। জ্ঞানী মানুষ মাত্রেই গভীর ও উন্নততর হৃদয়বৃত্তির অধিকারী। সেই হৃদয়বৃত্তির জন্যই মানুষের প্রতি তাঁর দরদ। দরিদ্রের প্রতি, লাঞ্ছিত নারীর প্রতি।
শিক্ষাবিস্তার, স্কুল–কলেজ প্রতিষ্ঠা, পাঠ্যপুস্তক রচনা আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ পাঠক্রমের জন্য সংগ্রামই হোক কিংবা বিধবাবিবাহ চালু, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ রদের মতো সামাজিক সংস্কার— যুগান্তকারী এই প্রত্যেকটি কাজ তিনি করেছেন তাঁর হৃদয়বৃত্তির প্রেরণাতেই। ১৩০ বছর হল তিনি প্রয়াত। নিন্দা–প্রশংসা, স্তব–স্তুতি সব কিছুরই তিনি অতীত। জীবিত অবস্থাতেও এ সব তিনি প্রত্যাশা করেননি। মৃত্যুর পর পরবর্তী প্রজন্ম কৃতজ্ঞতায় তাঁর মতো মনীষীদের স্মরণ করবেন এই কারণেই অশেষ লাঞ্ছনা, আত্মত্যাগ সহ্য করে নতুন মানুষ নতুন সমাজের স্বপ্ন বিদ্যাসাগর দেখেছিলেন, তাও নয়। তাঁর অক্ষয় মনুষ্যত্ব, মানুষ হিসেবে মর্যাদাবোধ, তাঁর অর্জিত শিক্ষা আর মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালবাসার জন্যই তিনি শিক্ষাসংস্কার, সমাজসংস্কারের মতো দুরুহ কাজে হাত দেওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন। আমাদের দেশের রেনেসাঁ, বৈজ্ঞানিক ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক শিক্ষাবিস্তার, নারীশিক্ষা ও নারী স্বাধীনতা, জাতীয় মুক্তি আন্দোলন ও তার বিকাশ এবং ঔপনিবেশিক শাসন থেকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা পাওয়ার ইতিহাস পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদানকে বাদ দিয়ে লেখা হতে পারে না। একটি দেশের বিকাশ ও পরিবর্তনের ইতিহাসে একজন ব্যক্তিবিশেষের এত বিপুল অবদান যে কোনও দেশের ইতিহাসেই অত্যন্ত বিরল, বিস্ময়কর ও গৌরবজনক ঘটনা। একটি জাতি এ হেন   এক মহৎ মানুষের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকবে, শুধু তাই নয়, তারা সমাজের ভবিষ্যৎ বিকাশের স্বার্থে সেই মহান সংগ্রামের ইতিহাস চর্চা করবে, অনুপ্রাণিত হবে। সমকালীন সামাজিক সঙ্কট নিরসনে নিজেদের কর্তব্য নির্ধারণ করবে, এটাই অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রত্যাশা।
ফ্রান্স, ইংল্যান্ডের মতো দেশগুলি কোনও দিন রুশো, ভলতেয়ারের মতো ইওরোপীয় রেনেসাঁর মহৎ চরিত্রগুলিকে ভোলেনি। কিন্তু স্বাধীন ভারতের শাসকশ্রেণি বিদ্যাসাগরকে ভুলিয়ে দিতে বহুদূর পর্যন্ত সফল হয়েছে। তা যদি না হত তাহলে এই মহান মানুষটির মূর্তি ভাঙার মতো ঘৃণ্য অপকর্ম করে কেউ পার পেতে পারত না!
বিদ্যাসাগরের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে  রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘‌বিদ্যাসাগরের জীবনের প্রধান গৌরব তাঁর অজেয় পৌরুষ এবং অক্ষয় মনুষ্যত্ব।’‌ ধর্মান্ধতা কূপমণ্ডুকতা এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বিরামহীন সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তাঁর এই অজেয় পৌরুষ এবং অক্ষয় মনুষ্যত্বলাভ। এই অবিস্মরণীয় ইতিহাস আমরা ভুলে থাকতে পেরেছি, কারণ আমরা ভুলে বসে আছি আমাদের পারিপার্শ্বিককে, সমাজের বর্তমান পরিস্থিতিকে।
ধর্মান্ধতা, কূপমণ্ডুকতার বিরুদ্ধে বিজ্ঞান ধর্মনিরপেক্ষতা এবং আধুনিক গণতান্ত্রিক আদর্শের জন্য বিদ্যাসাগরের সংগ্রাম। আজ দেশের স্বাধীনতার সাত দশকেরও বেশি পরে সেই কূপমণ্ডুকতা, ধর্মান্ধতা এবং কুসংস্কার বিষবৃক্ষের মতো সমাজদেহের সর্বত্র তার ডালপালা বিস্তার করে চলেছে প্রতিদিন। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ যুক্তি ও বিজ্ঞানভিত্তিক মানসিকতা আজ বিপন্ন। ব্যক্তির জীবিকা, নিরাপত্তা ও সম্মানের ভিত্তিতে বাঁচার অধিকার, নারীশিক্ষা ও নারী স্বাধীনতা, শিক্ষার অধিকার, মত প্রকাশের অধিকার ইত্যাদি প্রতিটি অর্জিত অধিকার ভবিষ্যতের টিকে থাকবে কি না সে সব আজ প্রশ্নচিহ্নের সামনে।
আর সে–সময়ই বিদ্যাসাগরের জীবন–ইতিহাসের চর্চা বাস্তবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছে। রামমোহন এবং পরবর্তিকালে বিদ্যাসাগর একটা অন্ধকারময় যুগে দাঁড়িয়ে দেশ ও সমাজের অগ্রগতির জন্য একটি দুঃসাহসিক সংগ্রাম প্রায় একা শুরু করেছিলেন। তাঁকে, তাঁর সংগ্রামের ইতিহাসকে ভুলে গেলে সাকুল্যে ক্ষতি আজকের সমাজের বর্তমান প্রজন্মেরই। মানুষের ইতিহাসচর্চা কোনও বিলাসিতা মাত্র তো নয়! ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেই তো মানুষ বর্তমান সঙ্কট সমাধানের পথ খোঁজে।  
সাধারণ মানুষ বিদ্যাসাগরকে বড় মানুষ বলে মনে করলেও তাঁর সত্যিকারের স্বপ্ন কী ছিল, শিক্ষা সংক্রান্ত প্রশ্নে তাঁর পরিকল্পনা, ভাবনা–চিন্তাও কী ছিল, কেন তিনি বিধবাবিবাহ প্রচলন করেছিলেন, কেনই বা বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ রদ করার জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন। বেদ–বেদান্ত, শাস্ত্রীয় আচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন সে–সম্পর্কে সাধারণ মানুষ তো বটেই, অধিকাংশ শিক্ষিত মানুষও চর্চা করে না। তাদের মনোভাবটা অনেকটা এরকম যে, বিদ্যাসাগর একজন বড় মানুষ। তাঁকে শ্রদ্ধা করা উচিত। ব্যাস, এই পর্যন্তই। কিন্তু কী তাঁর স্বপ্ন ছিল এই সমাজ এই দেশকে নিয়ে, এই দেশের মানুষকে নিয়ে, শিশুদের নিয়ে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিয়ে, এদেশের নারীসমাজকে নিয়ে, সে সব আমরা ভেবে দেখি না। দেখলে তাঁর জন্মের এই দ্বিশতবর্ষে মানুষের মধ্যে অনেক বেশি আবেগ এবং উৎসাহ, উদ্দীপনার দেখা মিলত। শুধু তাই নয়, যে কোনও অন্যায়–অত্যাচার, দুর্নীতি  এত সহজে তাদের দাপট কায়েম করতে পারত না।
আমরা জানি, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, বৈজ্ঞানিক শিক্ষা প্রবর্তন, স্কুল–কলেজ প্রতিষ্ঠা, পাঠক্রম ও পাঠ্যপুস্তক রচনা, বাংলা ভাষা তো বটেই, আধুনিক ও উন্নত ভাষা, সাহিত্য সৃষ্টি এবং বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে এদেশের শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বাস্তবে পথপ্রদর্শকের। স্বাধীন ভারতে যাঁরা শিক্ষাবিদ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন, বিদ্যাসাগরের অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক ভূমিকার তুলনায় তাঁদের যে কারওরই তুলনা চলে না। অথচ তাঁর স্বপ্নের সম্পূর্ণ বিরোধী শিক্ষানীতি তাঁরই জন্মদিনে প্রবর্তন করা হয়েছে। প্রতিবাদ নিশ্চয় হয়েছে। কিন্তু ঝড় উঠেছে বলা যাবে না। তা ওঠাই ছিল স্বাভাবিক। একে যারা বিদ্যাসাগরের জীবনের ব্যর্থতা মনে করে হতাশ হয়, তাদের ভেবে দেখা দরকার? এ  ব্যর্থতার দায়ী কি বিদ্যাসাগর বা তাঁর মতো নিঃস্বার্থ মানবপ্রেমিক দেশসেবকদের? না কি এ ব্যর্থতার লজ্জা আসলে আমাদের দেশের পরিচালকদের, রাজনৈতিক নেতৃত্বের, শিক্ষিত সুধীসমাজের? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আজ সময় এসেছে।
আজ সারা দেশ গভীর সঙ্কটের আবর্তে নিমজ্জিত। একদিকে চরম অর্থনৈতিক মন্দা, কোটি কোটি বেকার, জরা মৃত্যু মহামারী অতিমারীর গভীরতম দুঃসময়ে যখন সমাজ ও অর্থনীতির নিজস্ব নিয়মকে অনুধাবন, যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক মানসিকতার চর্চা অনুশীলনের প্রয়োজন, তখন যুক্তিহীন মানসিকতা, অন্ধবিশ্বাস, ধর্মের নামে চরম ভণ্ডামি, সাম্প্রদায়িক হিংসা প্রতিদিন পরিকল্পিতভাবে বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে মানুষের প্রতি মহামানব বিদ্যাসাগরের গভীর উদার ও অকৃত্রিম ভালবাসা, যুক্তিবাদী বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে গ্রহণ করা, সামাজিক অগ্রগতির প্রয়োজনে সত্য প্রতিষ্ঠায় আপসহীনভাবে লড়াই করার সাহসের মতো শিক্ষণীয় মহৎ গুণগুলির চর্চা ও অনুশীলনই হবে তাঁর প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন।
(‌লেখক সারা বাংলা বিদ্যাসাগর দ্বিশতজন্মবর্ষ উদ্‌যাপন কমিটির সম্পাদক‌)‌
 

জনপ্রিয়

Back To Top