ধ্রুবজ্যোতি নন্দী- ভোটের দামামা বেজে গেছে। পাঁচ বছর আগের এই সময়টার কথা ভাবুন। বিজেপি জানিয়ে দিয়েছে, তারা ভোটে জিতলে নরেন্দ্র মোদিই হবেন প্রধানমন্ত্রী। তারপর থেকে অতি দ্রুত বিজেপি–‌র প্রচারের একমাত্র মুখ হয়ে উঠেছেন মোদি। রোজ বলছেন, ক্ষমতায় এসেই সারা দেশে ‘গুজরাট মডেল’ চালু করে অর্থনীতির হাল পাল্টে দেবেন। সেই স্বপ্নে দেশের মানুষ উদ্বেল হচ্ছে, সাড়া দিচ্ছে মোদির আবেদনে।
পাঁচ বছর পর অবশ্য মোদির মুখে আর গুজরাট মডেলের কথা শোনা যাচ্ছে না। যেমন যাচ্ছে না বিদেশ থেকে কালো টাকা উদ্ধার করে সরাসরি দেশবাসীর অ্যাকাউন্টে  জমা করার কথা, বা বছরে ২ কোটি নতুন চাকরির কথাও। কিন্তু তিনি না বললেও আমরা তো না ভেবে পারছি না যে, কী এমন ঘটল যাতে নির্বাচনী বৈতরণী পার করতে আর্থিক প্রগতির স্বপ্ন ফেরি ছেড়ে তাঁকে ভর করতে হয়েছে শুধুই যুদ্ধ–‌হুঙ্কারের ওপর? অথচ তাঁর আস্তিনে ছিল পণ্য পরিষেবা কর (জিএসটি) এবং দেউলিয়া আইন (আইবিসি) চালু করে অর্থনৈতিক সংস্কারের লক্ষ্যে জরুরি পদক্ষেপ করার মতো সাফল্য। না হয় সে কাজ শুরু হয়েছিল তাঁর পূর্ববর্তী সরকারের আমলে, আর চালু করার পথে তখন মোদির দলই ছিল সবচেয়ে বড় বাধা। ক্ষমতায় এসে সংসদে আইন অনুমোদন করাতে পারলেও দেশের মানুষকে তার সুফল কতটা পৌঁছে দেওয়া গেছে, সে প্রশ্ন অবশ্য থেকেই যায়। মোদি যখন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন, তখন অর্থাৎ ২০১৪ সালে জুন মাসের শেষে ভারতীয় ব্যাঙ্কগুলির মোট নন পারফর্মিং অ্যাসেট (এনপিএ)–‌র বহর ছিল প্রায় ২.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। ব্যাঙ্কের সেই অনাদায়ী ঋণ ৪ বছরে ৪ গুণেরও বেশি বেড়ে ২০১৮ সালের মার্চের শেষেই ১০ লক্ষ কোটি টাকা অতিক্রম করে বসে আছে। সংসদে দেউলিয়া আইন পাশ করানোর সাফল্যের আলো তাই ঢাকা পড়ে গেছে নীরব মোদি, মেহুল চোকসিদের তৈরি এই নিকষ অন্ধকারের আবহে। এরই মধ্যে ইতিহাসে ঠাঁই পাওয়ার লোভে মোদি তাড়াহুড়ো করে মাঝরাতে সংসদের অধিবেশন ডেকে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় নানা হারের জিএসটি চালু করলেন। তাতে সব রকম ব্যবসারই অপূরণীয় ক্ষতি হল, ধাক্কা খেল দেশের অর্থনীতি। লোকের মুখে মুখে ঘুরতে শুরু করল রাহুল গান্ধীর দেওয়া নাম ‘গব্বর সিং ট্যাক্স’। মানুষের ক্ষোভ সামলাতে তখন থেকে নিয়মিত সেই কর–‌হারের সংশোধন হয়েই চলেছে। তবে কর সংগ্রহ বেড়েছে, জিএসটি বাবদ সরকারের সংগ্রহ এখন মাসে ১ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কিন্তু তাতেও যে দেশের আর্থিক স্থিতি মজবুত হয়েছে, সে কথা বলা যাচ্ছে না। কারণ, আর্থিক ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখতে মোদি সরকার ব্যর্থ হয়েছে। তারই অভিঘাতে যে ডলারের দাম মোদি ক্ষমতায় আসার সময় ছিল ৬৩ টাকার আশপাশে, পাঁচ বছরে তা প্রায় ১২% বেড়ে ৭০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
জিএসটি চালু করার আগেই অবশ্য নোটবন্দির মতো আর্থিক বিপর্যয় ডেকে এনে ইতিহাসে চিরস্থায়ী ঠাঁই করে নিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। কৃষি, শিল্প, পরিষেবা, নির্মাণ, বাণিজ্য— অর্থনীতির প্রতিটি চালকশক্তিকে ওই একটি চালেই ধরাশায়ী করতে পেরেছিলেন তিনি। সংগঠিত শিল্পক্ষেত্রের পাশাপাশি ছোট আর মাঝারি শিল্পক্ষেত্রও পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল নগদ টাকার অভাবে। বৃহত্তম অর্থনীতিগুলির মধ্যে দ্রুততম বৃদ্ধির দেশ হওয়ার গর্ব মাটিতে মিশিয়ে মোদি দেশের অসংখ্য মানুষকে ফেলেছিলেন বিপুল হয়রানিতে। নোটবন্দির প্রতিটি ঘোষিত লক্ষ্য অপূর্ণ রেখে শেষ পর্যন্ত বাজারে চালু টাকার প্রায় পুরোটাই আবার ফেরত এসেছিল রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাছে এবং মনমোহন সিংয়ের আশঙ্কা নির্ভুল প্রমাণ করে দেশের অর্থনীতির বৃদ্ধি হার সঙ্কুচিত হয়েছিল ২%। সেই মলিন ছবি ঢাকতে আর্থিক বৃদ্ধি হারের মাপকাঠি বারবার পাল্টেছে মোদি সরকার। অবস্থা এমন হয়েছে যে, আর্থিক বৃদ্ধির ব্যাপারে সরকারি পরিসংখ্যানের আর কোনও বিশ্বাসযোগ্যতাই নেই অর্থনৈতিকদের কাছে!
অর্থনীতির পণ্ডিতরা তাই গত পাঁচ বছর ধরেই মোদির চক্ষুশূল। অমর্ত্য সেন, কৌশিক বসু, জঁ দ্রেজ, মৈত্রেশ ঘটকদের মতো বিশ্ববন্দিত অর্থনীতিবিদই শুধু নন, মোদির রোষে পড়েছেন আরও অনেকেই। অর্থনীতির কোনও বিশিষ্ট পণ্ডিতই পারেননি তাঁর সরকারের সঙ্গে কাজ করতে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তখনকার গভর্নর রঘুরাম রাজন তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন নোটবন্দির, মেয়াদ শেষ হতেই তিনি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়েছিলেন। তাঁর উত্তরসূরি উর্জিত প্যাটেল অবশ্য ততটা ধৈর্য ধরতেও পারেননি। ক্রমবর্ধমান আর্থিক ঘাটতি সামলাতে মোদি সরকার রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তহবিলে হাত বাড়াচ্ছে দেখে তিনি বিরোধিতা করেছিলেন। সরকার আর রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সঙ্ঘর্ষ যখন নিয়মিত ধোঁয়া ছড়াচ্ছে তখন, মেয়াদের মাঝপথেই, তিনি ইস্তফা দিয়ে সরে গিয়েছিলেন। একইভাবে পদত্যাগ করে সরে গেছেন নীতি আয়োগের প্রথম ভাইস চেয়ারম্যান অরবিন্দ পানাগড়িয়া। কেন? জনশ্রুতি বলে একে আরএসএসের নিরন্তর আক্রমণ, তার ওপর মোদির প্রশ্রয়–‌পুষ্ট নীতি আয়োগ সিইও অমিতাভ কান্তের খবরদারি। অর্থনীতিবিদ অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যমকে মোদি নিজে বেছে নিয়ে বসিয়েছিলেন সরকারের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টার পদে। নোটবন্দির সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করে আড়াই বছরের মাথায় ইস্তফা দিয়ে আমেরিকায় ফিরে যাওয়ার সময় তিনিই কাঠগড়ায় তোলেন সরকারি পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতাকে। তিতিবিরক্ত মোদি বলেই বসলেন, হার্ভার্ডের চেয়ে অনেক ভাল হার্ড ওয়র্ক। অর্থমন্ত্রীর আসনে কোনও দিনই তিনি কোনও অর্থনীতিবিদকে যোগ্য মনে করেননি। কাজ চালিয়েছেন আইনজীবী অরুণ জেটলিকে দিয়ে। এবার রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর পদেও নিয়ে এলেন ইতিহাসের স্নাতক শক্তিকান্ত দাসকে।
নোটবন্দির পর থেকে পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তুমুল সমালোচনার মুখে মোদি সরকার ভাবল, পরিসংখ্যান যদি প্রকাশই না করা হয়, তবে আর প্রশ্ন তোলা হবে কী নিয়ে? দেশে বেকারের সংখ্যা নিয়ে রিপোর্ট তৈরি করেছিল শ্রম মন্ত্রকের অধীন লেবার ব্যুরো। তার হাল দেখে সরকার সে রিপোর্ট চেপে রাখল। ২৮ জানুয়ারি ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকাল কমিশনের দুই অ–‌সরকারি সদস্য পদত্যাগ করে অভিযোগ করলেন, চাকরি এবং বেকারত্ব নিয়ে তাঁদের রিপোর্ট প্রকাশ না করে ফেলে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে খবর বেরোল, এমপ্লয়মেন্ট–‌আনএমপ্লয়মেন্ট সার্ভে (ইইউএস) নামে আরও একটা সমীক্ষা করেছিল ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে অফিস, এনএসএসও নামেই যাদের পরিচিতি বেশি। চেপে রাখা সেই সমীক্ষায় বলা হয়েছে, দেশে বেকারত্বের হার এখন ৬.১%, যা গত ৪৫ বছরে সর্বোচ্চ। আরও একবার বোঝা গেল, অন্ধ হলেও প্রলয় বন্ধ থাকে না। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ঝুলি থেকে বেড়াল বার করে দিল সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমি (সিএমআইই)। এ মাসের গোড়ায় প্রকাশিত সেই রিপোর্টে বলা হয়েছে, কাজ খুঁজছেন এমন মানুষের মধ্যে ৭.২%–‌এর সামনে কোনও সুযোগ নেই। বেকারত্বের এই ৭.২% হার গত ৪৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ! শুধু তা–‌ই নয়, গত এক বছরে কমেছে দেশে মোট শ্রমিকের সংখ্যা, মোট কর্মীর সংখ্যাও। বেকারত্বের এই ভয়ঙ্কর চেহারা শেষ পর্যন্ত চেপে রাখা গেল না দেখে মোদির মুখপাত্ররা নিরুপায় হয়ে বলতে শুরু করলেন, সিএমআইই–এ‌র ওই রিপোর্টই ভুল। কিন্তু সিএমআইই–‌এর পরিসংখ্যান বিশ্বাস না করে মোদি সরকারের সাফাই বিশ্বাস করবেন, এমন চিন্তাশীল বুদ্ধিজীবী আর কজন? ফলে স্পষ্ট হয়ে উঠল বছরে ২ কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি পালনে মোদির সার্বিক ব্যর্থতার ছবি। মান্যতা পেল বিদগ্ধ অর্থনৈতিক মহলে মোদি জমানার আর্থিক বৃদ্ধিকে ‘জবলেস গ্রোথ’ হিসেবে চিহ্নিত করার যুক্তি।
কাজের সুযোগ তৈরিতে মোদি সরকারের এই মেগা–‌ব্যর্থতা আসলে নরেন্দ্র মোদির ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’–‌র ব্যর্থতা। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাক–‌ঢোল পিটিয়ে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’–‌র নৌকো ভাসিয়ে মোদি বলেছিলেন, তাঁর লক্ষ্য ২০২২ সালের মধ্যে ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর বা কারখানায় তৈরি জিনিসের উৎপাদন মূল্য জিডিপি–‌র ১৬% থেকে বাড়িয়ে ২৫% করা। দাবি করেছিলেন, সেই লক্ষ্যপূরণের সঙ্গে সঙ্গে দেশে ১০ কোটি নতুন চাকরি তৈরি হবে। কিন্তু বাস্তবে হল তার ঠিক উল্টো। সরকারের ভ্রূকুটি উপেক্ষা করে যারা বারবার পরিসংখ্যানে দেশের বাস্তব অবস্থাটা তুলে ধরেছে, সেই সিএমআইই জানাচ্ছে, ২০১৫ সালের পর থেকে শিল্পক্ষেত্রে নতুন বিনিয়োগ প্রতি বছরেই কমছে। তারা হিসেব দিয়েছে, গত পাঁচ বছরে মোদি সরকার ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরে যে পরিমাণ বিনিয়োগ আনতে পেরেছে, তা মনমোহন সিং সরকারের প্রথম পাঁচ বছরের চেয়ে, এমনকী দ্বিতীয় পাঁচ বছরের চেয়েও কম!
‘স্মার্ট সিটি’ হয়ে ওঠার পথে দেশের কোনও শহরই বিশেষ এগোতে পারেনি গত পাঁচ বছরে। তবে, গত পাঁচ বছরে পরিকাঠামো ও গ্রামাঞ্চলে সড়ক নির্মাণে নীতিন গাডকারির চমকপ্রদ সাফল্যের পরেও, মোদির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা কিন্তু শহরে নয়, গ্রামেই। কৃষিক্ষেত্রে, যেখানে পাঁচ বছরে আয় দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বসে আছেন মোদি, সেই প্রতিশ্রুতিকে ঘোরতম বিদ্রুপ করে ফসলের উপযুক্ত দাম না পেয়ে আত্মঘাতী চাষির সংখ্যা দিনে দিনে বেড়েছে। মধ্যপ্রদেশের মন্দসৌরে কৃষক মিছিলে গুলি চালিয়েছে তখনকার বিজেপি সরকার। ক্ষুব্ধ কৃষকদের মহামিছিল দেখেছে দিল্লি, তার আগে মুম্বই। সারা দেশের গ্রামাঞ্চল থেকে সমবেত বিপুল সংখ্যক কৃষকের দুঃখ–‌দুর্দশায় স্বতঃস্ফূর্ত সহমর্মিতা দেখিয়েছে দেশের বৃহত্তম দুটি শহর। তাই এখন ভোটের মুখে কৃষিক্ষেত্রের সাফল্য নিয়েও মুখ খোলার উপায় নেই নরেন্দ্র মোদির। আছে শুধু ভারতীয় যুদ্ধবিমান আকাশ সীমা পেরিয়ে পাকিস্তানের বালাকোটে বোমা ফেলে আসার ব্যাপারে হুহুঙ্কার। প্রতিশ্রুতি পালনে পাহাড়প্রমাণ ব্যর্থতার পর, গায়ে দুর্নীতির কলঙ্ক যখন দিনে দিনে চেপে বসছে, ক্ষমতায় ফিরতে নরেন্দ্র মোদির হাতে তখন একটা দু’‌মুখো পেন্সিল ছাড়া আর বিশেষ কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সেই পেন্সিলের একদিকে বিরোধীদের সম্পর্কে চূড়ান্ত ঘৃণা, অন্যদিকে যুদ্ধের হুঙ্কার।

জনপ্রিয়

Back To Top