শিবাশিস মুখার্জি

আমফান ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দুই ২৪ পরগনার দুই–‌তৃতীয়াংশ কৃষি জমি। এই অঞ্চলের নিয়মিত সমস্যা বন্যায় মাটিতে নোনার আধিক্য বৃদ্ধি এবং তার সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে করোনা ও ঝড়–‌পরবর্তী ক্ষয়িষ্ণু আর্থিক অবস্থা। এই সঙ্কট–মুহূর্তে চাষের খরচ জোগাড় করাই এখন প্রান্তিক চাষীদের অন্যতম মাথাব্যথা। খারিফ মরশুমে দুই পরগনার কিছু অঞ্চল ছাড়া বাদবাকি অংশে ধান চাষ হয়। কম লবণাক্ত অঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির ধান, যেমন মিনিকিট, প্রতীক্ষা, কনক, স্বর্ণমাসুরি ইত্যাদির চাষ হয়। আবার সুন্দরবন লাগোয়া অঞ্চলের লবণাক্ত জমিতে দুধেশ্বর, সুপার শ্যামলী, সন্তোষী, রণজিৎ, সবিতা, সি আর ১০১৭, ১০১৮ ইত্যাদি সহনশীল জাতের ধানের চাষ হয়। মূলত ঝড় এবং করোনা পরিস্থিতি এই অঞ্চলের আর্থিকভাবে দুর্বল ও প্রান্তিক চাষিদের জৈব সার ও কীটনাশক ব্যবহারের প্রতি আগ্রহ বাড়াচ্ছে। তপন নস্কর (ব্লক বাসন্তী‌, গ্রাম‌ জ্যোতিষপুর), মুক্তেশ্বর সেন (ব্লক পাথরপ্রতিমা,  গ্রাম‌ বনশ্যামনগর), নারায়ণ পট্টনায়ক (ব্লক পাথরপ্রতিমা, গ্রাম শ্রীপতিনগর) প্রমুখ কৃষকবন্ধুর গলায় একই সুর উঠে আসছে, যে ঝড়ের পর জৈবসার তৈরি করার কাঁচামাল যেমন, শুকনো পাতা, ডাল, আগাছা এমনকী মাঠে উপস্থিত শস্যের অবশিষ্টাংশের জোগান অফুরন্ত এবং গোবর ও গোমূত্র ব্যবহার করে এগুলিকে কম্পোস্টে রূপান্তরিত করা কয়েক মাসের ব্যাপার। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চল, যেমন গোসাবা, সাতজেলিয়া, রাঙাবেলিয়া, ছোটমোল্লাখালি, হিঙ্গলগঞ্জ, মিনাখাঁ, ন্যাজাট প্রভৃতি দ্বীপের চাষিদের কথা বলতে গিয়ে কৃষকবন্ধু রাধাকান্ত বারুই (মিনাখাঁ) ও ইব্রাহিম বক্স মাল্লা (‌গোসাবা) জানালেন, খামারজাত সার, কচুরিপানাজাত সার ব্যবহারের সঙ্গে নিমখোল দিয়ে ধানের জমি প্রস্তুত করা শুরু করেছে চাষিরা। কিন্তু শহর অঞ্চল লাগোয়া যেমন ভাঙড়, সোনারপুর, বারুইপুর অঞ্চলের প্রান্তিক ও নিম্নবিত্ত চাষিদের কাছে কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র আড়াপাঁচ ও নিমপীঠের বিশেষজ্ঞ দ্বারা প্রশিক্ষিত বিভিন্ন উন্নত জৈবসার, যেমন মুরগিসার, পঞ্চগব্য, পাতাসার ইত্যাদি তৈরির প্রযুক্তি থাকায় তঁারা এগুলি তৈরি ও ব্যবহারের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখিয়েছেন। পাথরপ্রতিমা ব্লকের এক কৃষক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সম্পাদক চিন্ময় মাইতি বললেন, বিলম্বিত বোধোদয় হলেও বর্তমানে সুন্দরবন অঞ্চলের চাষিরা মাটিতে জৈব কণার পরিমাণ বাড়ানোর দিকে নজর দিয়েছেন, মূলত ঘরোয়াভাবে কেঁচো সার উৎপাদনের পথে অনেকেই এগিয়েছেন।
কাকদ্বীপ ও নামখানার সমবায় সংস্থা সুন্দরিনীর ব্লক অধ্যক্ষ শ্যামাপ্রসাদ দিন্দা জানালেন, গো–‌জাত দ্রব্য জমিতে ব্যবহারের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফ থেকেও ওই অঞ্চলের চাষিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এমনকী এ অঞ্চলে রোগ–‌পোকা আক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য সম্পূর্ণ জৈব উপায়, যেমন নিম তেলের ব্যবহার কিংবা  ট্রাইকোডার্মা বা সিউডোমোনাস প্রভৃতির ব্যবহারও বাড়ছে। চাষিরা যদিও রাসায়নিক ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধের কথা বলেননি, তবে খরচ কমানোর পথ হিসাবে এই সমস্ত জমিতে বা নিজের বাড়িতে প্রস্তুত সার ও বিষের ব্যবহারের কথা বলছেন।
একটি প্রশ্ন কৃষক মহলে উঠছে যে, এই অঞ্চলে সুষমভাবে ধান চাষের জন্য প্রতি হেক্টর মাটিতে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়ামের অনুপাত হওয়া উচিত ৮০:৪০:৪০। এই সব ঘরোয়া সার যা গড়ে ১–১.৫ শতাংশ নাইট্রোজেন এবং ০.৫–০.৮ শতাংশ ফসফরাস ও পটাশিয়াম প্রতি কেজিতে সরবরাহ করে তারা কি গাছের খাদ্যমৌলের চাহিদা মেটাতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তরে বরিষ্ঠ কৃষি বিশারদ ড.‌ হীরক ব্যানার্জি (অধ্যাপক, শস্যবিজ্ঞান বিভাগ, বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) জানিয়েছেন, ‘পুরো খাদ্যমৌলের চাহিদা যে প্রথমেই জৈবসার দিয়ে পূরণ করতে হবে, এমনটা নয়। স্থানীয় জোগানের ওপর নির্ভর করে চাষীই ঠিক করবেন কতটা পরিমাণ জৈবসার জমিতে প্রয়োগ করবেন। তাই প্রাথমিকভাবে মোট খাদ্যের চাহিদার ২৫–৫০ ভাগ যে–‌কোনও জৈবসারের মাধ্যমে মেটানো যেতে পারে। এতে একদিকে যেমন ধানের ফলন বজায় থাকবে, অন্যদিকে মাটির উর্বরতা ক্ষমতাও রক্ষা হবে। এর ফলে ধান ও চালের গুণগতমানও যথেষ্ট বৃদ্ধি পাবে।
অন্যদিকে ড.‌ বিপ্লব পাল (বরিষ্ঠ শিক্ষক, মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ, কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, নরেন্দ্রপুর) বলছেন, জীবাণুসারগুলো মূলত অল্প পরিমাণ খাদ্য সরবরাহ করলেও এগুলিতে উপকারী জীবাণু, যেমন নাইট্রোজেন আবদ্ধকারী জীবাণু, ফসফরাস ও পটাশিয়াম দ্রবীভূতকারী জীবাণু, উপকারী ছত্রাক প্রভৃতি বেশি মাত্রায় উপস্থিত থাকে, যা প্রাকৃতিক উপায়ে মাটির মধ্যে আটকে থাকা খাদ্যকে গাছ অবধি পৌঁছে দেয়। বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি কিংবা আমফানের মতো বিধ্বংসী ঝড় যেটাই কারণ হোক না কেন, প্রান্তিক বা আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া নিম্নবর্গীয় কৃষকদের রাসায়নিক কৃষিজ উপকরণের ওপর অন্ধ–‌নির্ভরতা কিছুটা হলেও আস্তে আস্তে কমছে। পরম্পরাগত জৈবসার ও কৃষিবিষ যে ক্রমেই এই স্থান দখল করতে শুরু করেছে এবং তা যে নিজের গুণাবলীর জন্য— এ কথা খুব সহজেই বলা যায়। এখন এটাই দেখার যে, জৈব উপাদানের দিকে ফিরে গিয়ে সুন্দরবন নিজের প্রাকৃতিক বৈচিত্র বৃদ্ধি করতে পারে কিনা।
(‌লেখক রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, নরেন্দ্রপুর–এর কৃষি জৈবপ্রযুক্তিবিদ্যা বিভাগের বরিষ্ঠ গবেষক)‌ 

জনপ্রিয়

Back To Top