আনন্দ মুখোপাধ্যায়- বিচারবিভাগের সর্বোচ্চ স্তরে কী ধরনের প্রশাসনিক চাপ বিচারপতিদের সহ্য করতে হয়, তার নগ্নতম রূপ আমরা জরুরি অবস্থার সময়েই প্রত্যক্ষ করেছি। ফলে, সম্প্রতিকালে সুপ্রিম কোর্টের অলিন্দে তৈরি হওয়া অস্বচ্ছতা ও স্বৈরতান্ত্রিক পরিবেশের সাম্প্রতিক অভিযোগের প্রেক্ষাপটে একের পর এক সেই পুরোনো ঘটনাগুলি আবার নতুন করে মনে আতঙ্ক জাগাচ্ছে। দেশের বিচারব্যবস্থা গণতান্ত্রিক দেশে সাধারণ মানুষের শেষ ভরসার স্থল। সেটির সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠা ভয়ঙ্কর সাম্প্রতিক প্রবণতা।
দেশের বিচারবিভাগের সর্বোচ্চ ব্যক্তিটির বিরুদ্ধেই যখন দুর্নীতি ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে, আর নজিরবিহীনভাবে সেই অভিযোগ তুলেছেন খোদ সুপ্রিম কোর্টের চারজন বরিষ্ঠ বিচারপতি, তখন তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই ধরনের পরিস্থিতি গণতন্ত্রের পক্ষেও মোটেই মঙ্গলজনক নয়। সুপ্রিম কোর্টের চার বরিষ্ঠ বিচারপতি জে চেলামেশ্বর, রঞ্জন গগৈ, মদন বি লোকুর ও কুরিয়ন জোসেফ সাংবাদিক সম্মেলন করে অভিযোগ তোলেন, অতি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল মামলাগুলির বিচার করার জন্য গঠিত সাংবিধানিক বেঞ্চে তাঁদের অর্থাৎ উপরোক্ত বরিষ্ঠ চার বিচারপতির জায়গা হচ্ছে না। যেহেতু প্রধান বিচারপতিই ‘‌মাস্টার অফ রোস্টার’‌ অর্থাৎ কোন মামলা কোন বেঞ্চে শুনানি হবে, তা নির্ধারণ করার একমাত্র ক্ষমতা প্রধান বিচারপতির হাতেই থাকে, সেক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র নিজের ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে উপরোক্ত বিচারপতিদের এড়িয়ে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র বা নবাগত বিচারপতিদের নিয়ে বেঞ্চ গঠন করে গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলির শুনানি করাচ্ছেন। এবং সমস্ত সাংবিধানিক বেঞ্চেরই নেতৃত্বে রয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, লখনউয়ের একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ সংক্রান্ত দুর্নীতি মামলাটি শুনানির জন্য যখন বিচারপতি জে চেলামেশ্বর পাঁচ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ গড়ার নির্দেশ দিলেন, তার পরই প্রধান বিচারপতি আবার নিজের সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করে উক্ত বেঞ্চটিকে বাতিল বলে ঘোষণা করে নিজের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে মামলাটিকে রেখে দিলেন। এই সময় ভরা আদালতে আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ প্রধান বিচারপতির সততা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় তাঁদের মধ্যে তুমুল বাদানুবাদ হয়। অনেকেরই স্মরণে থাকতে পারে, দীপক মিশ্র সে–‌সময় প্রশান্ত ভূষণকে বলেছিলেন, আপনাকে আদালত অবমাননার দায়ে গ্রেপ্তার করা যেতে পারে। ভূষণ পাল্টা বলেন, তাহলে তেমনটাই করুন না!‌ তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনি তারও যোগ্য নন। ফলে বিচারবিভাগের সর্বোচ্চ অলিন্দেই যে দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছিল, তার আভাস দেশবাসী আগেই পেয়েছে। বেঞ্চ ও বারের একাংশের মধ্যে (‌অর্থাৎ আদালত ও আইনজীবীদের মধ্যে)‌ যে তিক্ততার সম্পর্ক গড়ে উঠছে, তাও একেবারেই অভিপ্রেত নয়।
আবার, সিবিআইয়ের বিশেষ বিচারক বি এইচ লোয়া–‌র আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় যেভাবে রহস্য দানা বেঁধেছে, সেখানেও অভিযোগের তীর প্রধান বিচারপতির দিকেই। এখানেও সেই বিতর্কিত মামলাটির বিচারের ভার প্রধান বিচারপতি নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছেন। এভাবে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচারের দায়িত্ব নিজের হাতে রাখায় বিদ্রোহী চার বিচারপতি স্বাভাবিকভাবেই প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তুলেছেন গত ১২ জানুয়ারি।
বহু প্রবীণ বিচারপতি ও আইনজ্ঞরা বিক্ষুব্ধ বিচারপতিদের জনসমক্ষে ক্ষোভ প্রকাশের পদ্ধতিকে সমর্থন করেননি বটে। কিন্তু, দিল্লি হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি এ পি শাহ আবার এই বিষয়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করে বিতর্কটিতে অন্য মাত্রা যোগ করেছেন। শাহ বলেছেন, ‘‌সাত–‌সাতটি সাংবিধানিক বেঞ্চেই প্রধান বিচারপতি নেতৃত্ব দিলেও সেখানে সিনিয়রিটির দিক থেকে সুপ্রিম কোর্টের ২নং থেকে ৫নং বিচারপতিদের কারও স্থান হল না কেন, এটা আমার কাছে বিস্ময়ের। বিষয়টি কখনওই নিছক কাকতালীয় হতে পারে না। আসলে, তাঁদের ইচ্ছাকৃতই সাংবিধানিক বেঞ্চের বাইরে রাখা হয়েছে। আমি এমন ধরনের ঘটনা আগে শুনিনি। আধার মামলা যখন এই দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সেই বেঞ্চে অন্তত একজন সিনিয়র বিচারপতিকে রাখা নিশ্চয়ই উচিত ছিল। বিচারপতি চেলামেশ্বর ও বোবদে–‌র মতো বিচারপতিরা যখন নিয়মিত গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলি শুনে এসেছেন, তখন তাঁদের একজনকে অন্তত এই বেঞ্চে রাখা উচিত ছিল বইকি!’‌‌ এ পি শাহ ছাড়াও সর্বোচ্চ আদালতের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি কে জি বালাকৃষ্ণন মন্তব্য করেছেন, প্রধান বিচারপতির নৈতিক কর্তব্য ও দায়িত্ব হল এমনভাবে সমস্ত মামলা বণ্টন করা, একজন বিচারপ্রার্থীও যাতে এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলতে না পারেন। সেক্ষেত্রে মুখ্য বিচারপতির সিদ্ধান্ত কখনওই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হওয়া উচিত নয় বরং সেখানে স্বচ্ছ মানসিকতার প্রকাশ থাকা উচিত। এভাবে খোদ বিচারব্যবস্থার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানেই যেখানে অস্বচ্ছতা, দুর্নীতি ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলছেন খোদ পদাসীন বিচারপতিদেরই একাংশ, তখন সাধারণ দেশবাসীর মনে এ প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, তবে কি প্রশাসনিক চাপের মুখে নতিস্বীকার করেই প্রধান বিচারপতি এই ধরনের একপেশে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন?‌ কারণ, জরুরি অবস্থার প্রাক্‌–‌মুহূর্তে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার যেভাবে বিচারবিভাগকে পদানত করার লক্ষ্যে তিনজন সিনিয়র মোস্ট বিচারপতির পদোন্নতি অগ্রাহ্য করে এ এন রায়‌কে প্রধান বিচারপতির পদে বসায়, সেই স্মৃতিই আবার যেন দগদগে হয়ে উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় বিচারব্যবস্থার কালো দিনগুলির কথা একটু স্মরণ করা যেতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের ১৩ জন বিচারপতির বেঞ্চ ১৯৭৩ সালের ২৪ এপ্রিল কেশবানন্দ ভারতী মামলায় রায়দান করে। যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের বক্তব্য ছিল, সংবিধানের মূল কাঠামো পরিবর্তনের অধিকার সংসদের নেই। অন্যদিকে, বিচারপতি এ এন রায়ের নেতৃত্বে ছ’‌জন বিচারপতির বক্তব্য ছিল, সংবিধান সংশোধনের ব্যাপারে সংসদের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এই রায় বেরোনোর পরদিনই প্রধান বিচারপতি এস এম সিকরি অবসরগ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, সিকরি কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের বক্তব্যের শরিক ছিলেন। তাঁর সঙ্গে সহমত পোষণ করেছিলেন সিনিয়র বিচারপতি জে এম শেলাট, কে এস হেগড়ে, এ এন গোভার প্রমুখ। এতকাল বিচারপতিদের মধ্যে থেকে সিনিয়রিটি হিসেবেই প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ব্যবস্থা চলে আসছিল। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে শেলাট, হেগড়ে ও গোভারের সিনিয়রিটি উপেক্ষা করে এই তিনজনকে ডিঙিয়ে বিচারপতি এ এন রায়কে প্রধান বিচারপতি‌ পদে আসীন করা হয়। যিনি পরবর্তী সময়ে ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ থেকে শুরু করে রাজন্যভাতা বিলোপ সংক্রান্ত মামলায় সরকারের পক্ষেই রায় দিয়েছিলেন। এমন–‌কি কেশবানন্দ ভারতী মামলার যুগান্তকারী রায় ঘোষণার পরেও উক্ত প্রধান বিচারপতি এ এন রায় আবার সেই রায় পর্যালোচনার জন্য নতুন বেঞ্চ গঠন করে আইনজ্ঞ মহলকে অবাক করে দিয়েছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, যেনতেনপ্রকারেণ জরুরি অবস্থার সময়কে কাজে লাগিয়ে পূর্বের ১৩ সদস্যের বেঞ্চের সংখ্যাগরিষ্ঠের রায়কে বদলে দিয়ে সরকারের তোষামোদ করা। যদিও শেষ পর্যন্ত ননী পালকিওয়ালার আবেগমথিত সওয়াল ও অন্যান্য বিচারপতির মানসিকতা আঁচ করেই তিনি সকলকে পুনরায় অবাক করে সেই বেঞ্চ বাতিল বলে ঘোষণা করেন। ফলে কেশবানন্দ ভারতী মামলায় পূর্বের রায়টিই বহাল রইল অর্থাৎ সংবিধানের মূল কাঠামোটি অপরিবর্তিত রইল।
অন্য একটি ঘটনায়, ১৯৭৬ সালে জরুরি অবস্থা জারি থাকাকালীন এডিএম জবলপুর বনাম শিবকান্ত শুক্লা ‘‌হেবিয়াস করপাস’‌ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির মধ্যে চারজনই তাঁদের রায়ে বলেন, জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর কোনও ব্যক্তির গ্রেপ্তারের আইনি বৈধতা নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না। এমন–‌কি সেই গ্রেপ্তার বেআইনিভাবে করা হলেও নয়। এই চার বিচারপতি ছিলেন, প্রধান বিচারপতি এ এন রায়, বিচারপতি হামিদুল্লাহ বেগ, বিচারপতি চন্দ্রচূড় ও বিচারপতি পি এন ভগবতী। একমাত্র বিচারপতি এইচ আর খান্না তাঁদের বক্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করেননি। যদিও জরুরি অবস্থা অবসানের পর বিচারপতি চন্দ্রচূড় স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে, নিজের জীবন হারানোর ভয়ে তিনি এমন রায় দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। অপরদিকে, বিচারপতি পি এন ভগবতী এক জায়গায় বলেন, তিনি সে–‌সময় সবেমাত্র সুপ্রিম কোর্টে প্রবেশ করেছেন। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে না পেরেই সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছিলেন। প্রধান বিচারপতি এ এন রায়ের অবসরগ্রহণের পরই সিনিয়র মোস্ট বিচারপতি এইচ আর খান্নাকে টপকে বিচারপতি হামিদুল্লাহ বেগ‌কে আবার প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত করা হল। সম্ভবত সরকারের প্রতি অনুগত থাকার কারণেই। অসম্মানিত হয়ে এইচ আর খান্না পদত্যাগ করলেন।
ভারতীয় বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এই কলঙ্কজনক অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি হবে না তো?‌ আসলে, আমরা যে ঘরপোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পাই।

লেখক আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী‌‌
 

জনপ্রিয়

Back To Top