কৃষ্ণপ্রিয় দাশগুপ্ত: ভূত তাড়ানোর যজ্ঞ।
রাজস্থান সরগরম। ‌রাজ্যের বিধানসভায় ভূতেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথচ, ১৭ একর জমির ওপর প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বিধানসভা ভবনটি একেবারেই নতুন। একেবারেই চৌধুরি প্যালেসের মতো ২০০ বছরের প্রাচীন নয়। তবুও সেখানে ভূতের ভয়!‌ কেন?‌ কারণ, যেখানে বিধানসভা ভবনটি তৈরি হয়েছে, সেখানে আগে শ্মশান ছিল। বা কবরখানা ছিল। তাই রাজস্থান বিধানসভার মুখ্য সচেতক কালুলাল গুজ্জর এবং নাগাউরের বিজেপি বিধায়ক হাবিবুর রহমান একযোগে এই সিদ্ধান্তে এসেছেন, ‘‌বিধানসভায় ভূত আছে।’‌ এবং অন্তত এই একটা বিষয়ে, হিন্দু–‌মুসলমানকে একই কথা বলতে শোনা গেল। প্রসঙ্গত, এই রাজস্থানেই মালদার এক মুসলমান শ্রমিককে পিটিয়ে–কুপিয়ে খুন করেছে এক স্বঘোষিত হিন্দু মাতব্বর। এবং খুনের দৃশ্য ভিডিও হয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরছে এখনও। আর গোরক্ষার নামে মুসলমান খুন তো নিত্যদিনের ব্যাপার। গত ২৫ ফেব্রুয়ারিতেও আলওয়ারে এক মুসলমান যুবককে খুন করা হয়েছে। যাক সেকথা। ভূতে ফেরা যাক। 
শোনা যাচ্ছে, রাজস্থানের বিধায়কদের ওপরে ভূতের নজর পড়েছে। এবং সেই কারণেই ২০০ আসনের বিধানসভায় একটার পর একটা দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। কোনও বিধায়কের মৃত্যু হচ্ছে হঠাৎ। আবার কোনও বিধায়ক অপরাধ করে জেলে যাচ্ছেন। সবই নাকি ভূতেদের জন্যে। অতৃপ্ত–‌অশুভ–‌অশরীরীর দাপটে দলমত নির্বিশেষে বিধায়কেরা এক হয়েছেন। এবং তাঁরা খেয়াল করেছেন, ভূতের এই নজরেই নাকি রাজস্থান বিধানসভার সবকটি আসন, কখনও একটানা বেশি দিনের জন্য পূর্ণ থাকে না। এই কারণেই রাজ্যের শাসকদল বিজেপি–‌র দুই বিধায়ক হাবিবুর রহমান এবং কালুলাল গুজ্জর দাবি তুলেছেন, ভূতের প্রভাব কাটাতে বিধানসভায় পুরুত ডেকে যজ্ঞ করা হোক। বিধায়কদের একাংশও নাকি মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজের সকাশে এই যাগযজ্ঞের আর্জি জানিয়ে আসেন। প্রসঙ্গত, গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে বিজেপি বিধায়ক কল্যাণ সিং প্রয়াত হন। তাঁর মৃত্যুর পরেই নড়েচড়ে বসেন বিধায়কেরা। ভূতাতঙ্কে কেঁপে ওঠেন তাঁরা। কেন না, গত বছরেও আচমকা সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হন বিজেপি বিধায়ক কীর্তি কুমারী। তার আগে খুনের ঘটনায়, সমাজবাদী পার্টির এক বিধায়ক অভিযুক্ত হয়ে জেলে যান। তার আগের বিধানসভায় খুন এবং ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত হয়ে জেলে যান কংগ্রেসের তিন বিধায়ক। একের পর এক এমনই ঘটনায় ভূতের আতঙ্কে দিশেহারা বিধায়কেরা (‌মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে)‌‌ বিধানসভার মূল প্রবেশপথে, পুরুত দিয়ে যজ্ঞ করান ২৩ ফেব্রুয়ারি;‌ শুক্রবার। দেখা যাক আইনসভায় ভূতের উৎপাত কমে কিনা এরপর?‌
রাষ্ট্রীয় রক্ষা মহাযজ্ঞ।
২৩ ফেব্রুয়ারির ভূত তাড়ানোর যজ্ঞের পর, আধুনিক ভারতের সবচেয়ে বড় যজ্ঞ হতে চলেছে খোদ লালকেল্লায়। আয়োজক বিজেপি। মহাযজ্ঞ হবে ১৮ থেকে ২৫ মার্চ। প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনেক মন্ত্রীই নাকি শামিল হবেন এই যজ্ঞে। দাবি করেছেন মহাযজ্ঞের মূল হোতা, পূর্ব দিল্লির বিজেপি সাংসদ মহেশ গিরি। এলাহি এই মহাযজ্ঞে কী, কী হবে‌‌?‌ বিরাট আয়োজন!‌
লালকেল্লা চত্বরের বাইরের ১৫ একর জমিতে বৈদিক ভিলেজ তৈরি হবে। সেখানে ১০৮টা যজ্ঞকুণ্ড স্থাপন করা হবে। ১১১১ জন পুরোহিত ২.‌২৫ কোটি মন্ত্র উচ্চারণ করবেন। যেমন বিরাট আকারের ভারতমাতার মূর্তি থাকবে, তেমনই থাকবে জাতীয় পতাকা এবং হিন্দু পতাকা। যজ্ঞে, মন্ত্রোচ্চারণে, শত্রু বিনাশকারী দেবী বগলামুখীকে আহ্বান জানানো হবে। চারধাম–সহ, দেশের গ্রামে গ্রামে, শহরে শহরে, ঘরে ঘরে পৌঁছে মাটি সংগ্রহ করার কাজ শুরু হয়েছে। ওই মাটিতেই যজ্ঞকুণ্ড তৈরি হবে। এবং প্রত্যেকের কাছ থেকে অন্তত ১ চামচ ঘি নেওয়া হবে। সংগৃহীত ঘি দিয়েই যজ্ঞ হবে। যদিও, মহেশ গিরি জানিয়েছেন, দিল্লিবাসী প্রচুর ব্যবসায়ী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন এই হিন্দু আচারে। 
২০১৯ সালে দেশে সরকার গড়ার ভোট। ফলে, বিজেপির এই যজ্ঞে, দেশের এবং দেশের বাইরের শত্রুদের দমন করার, এবং ফের ক্ষমতায় আসার জন্য বগলামুখী বন্দনার আয়োজন এখন তুঙ্গে। একটা রথ বেরিয়ে পড়েছে ঘি–‌মাটি সংগ্রহে। এবং প্রচারের কাজে। মহেশ গিরি নিজের বাড়িতে একটা অফিস খুলেছেন। তিনি বলেছেন, ঘরে বাইরে যে যে শত্রু আমাদের দেশের বিনাশ চায় এই যজ্ঞে তাদেরই বিনাশ করা হবে। কাশ্মীর থেকে ডোকালাম— সব জায়গার মাটি আসবে। তিনি দাবি করেছেন, দেশে এত বড় আধ্যাত্মিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড আগে কখনও হয়নি। শঙ্কর মহাদেবন এবং কৈলাস খের গান গাইবেন যজ্ঞে। বলিউডের সেলিব্রিটিরা যজ্ঞস্থল আলো করবেন। দেশের নামকরা মিউজিশিয়ানরা আসবেন। যজ্ঞের থিম সং হবে। এলাহি কারবার!‌
তৈরি হচ্ছে এখন বৈদিক ভিলেজের খুঁটিনাটি। সেখানে রামলীলারও কথা আছে। অর্থাৎ, ভারতমাতা, বগলামুখী, রামচন্দ্র— সবাই মিলে বৈদিক হয়ে যাবেন এক লহমায়!‌ এবং বেদ মানেই হিন্দু, হিন্দু মানেই ভারতবাসী, ভারতবাসী মানেই বিজেপি— এই বার্তা রটে যাবে যজ্ঞকুণ্ডের আগুনের শিখা থেকে। আর তাতে ভর করেই ২০১৯–‌এ বিজেপি ফের ভারতের মসনদে গেড়ে বসবে। ১৮ মার্চ যজ্ঞ শুরু। দেখা যাক, কী হয়‌!‌
জাদু কি ঝাপ্পি।
২৫ ফেব্রুয়ারি মিরাটে আর এস এস–‌এর রাষ্ট্রোদয় সম্মেলন হল। সেই সম্মেলনে নাকি তিন লক্ষ স্বেচ্ছাসেবক নথিভুক্ত হয়েছেন। তাঁরা কী করবেন?‌ বিধান দিয়েছেন সঙ্ঘ প্রধান মোহন ভাগবত। দলিতদের কাছে টানতে, তাঁদের ঝাপ্পি দেবেন একেকজন স্বেচ্ছাসেবক। এঁরা গ্রামে গ্রামে ঘুরবেন। আপাতত এ কাজ শুরু হবে যোগীর রাজ্যের, পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের গ্রামে গ্রামে। তো হঠাৎ এই ঝাপ্পির কী প্রয়োজন পড়ল?‌ সঙ্ঘের খাঁকি পোশাকধারীরা হঠাৎ মুন্নাভাই হবেন কেন?‌ মোহন ভাগবত বলেছেন যে, ‘‌যাঁরাই ভারতমাতাকে মানেন তাঁরাই হিন্দু। সব হিন্দুকে নিজেদের ভাই বলে ভাবতে হবে। তাঁদের আলিঙ্গন করতে হবে।’‌
লোকে বলে, ক্রিকেট–‌ই নাকি একমাত্র পারে ভারত–‌পাকিস্তানকে ফের মুখোমুখি সুহৃদ করতে। আর ভোট–‌ই একমাত্র পারে, দলিতকে বুকে জড়িয়ে নিতে!‌ নয়তো, কেন্দ্রে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর, কেবল মুসলমান যে খুন হচ্ছেন তা তো নয়। প্রতিবাদীরা খুন হচ্ছেন এবং একই ভাবে, শাসকদলের মদতপুষ্ট হিন্দুদের আক্রমণে দলিতরাও খুন হচ্ছেন। বস্তুত, কেন্দ্রের সরকারের ওপর দলিতদের ক্ষোভ দিনে–দিনে বাড়ছে। আর লোকসভা ভোটও দিনে–দিনে এগিয়ে আসছে। মুসলমানদের নিয়ে তো আর বৃহত্তর হিন্দু সমাজ বানানো যায় না, তাই অন্তত, জাতিভেদ ভুলে যাতে বাকি সবাইকে নিয়ে একটা গোটা ‘‌হিন্দু সমাজ’‌ বানানো যায় ভোটের প্রাক্কালে;‌ তারই জন্যে আরএসএস হন্যে। এবং মোহন ভাগবতের এই ঝাপ্পি দর্শন। এখন জাতীয়তাবাদ আর হিন্দুত্ব মিলে–মিশে একাকার হবে। 
রাহুল গান্ধী একটু একটু করে দলিত–শিবিরে জনপ্রিয় হচ্ছেন। মায়াবতীও কার্যকরী। এই অবস্থায়, এই দুই শিবির থেকে দলিত ভোটকে নিজেদের ঝাঁপিতে নিয়ে আসতেই ঝাপ্পির ব্যবস্থা। হিন্দুত্বের ছত্রছায়ায় সবাই আছে— এটাই এখন বোঝাতে হবে। ফলে এই সময়টায়, দলিত ছেলেমেয়েদের কুপিয়ে–‌পিটিয়ে–‌গায়ে আগুন দিয়ে মেরে ফেললে সমূহ বিপদ। একে তো, কৃষক বুঝেছেন কাকে বলে ‘‌আচ্ছে দিন’‌, মধ্যবিত্ত বুঝেছেন ‘‌নোটবন্দির গুঁতো’‌ কেমন যন্ত্রণাদায়ক, গোটা দেশ বুঝেছে প্রধানমন্ত্রী কত বড় ‘‌চৌকিদার’‌, তার ওপর যদি যোগীর রাজ্যে কেবল রাজপুত–‌দলিত সঙ্ঘর্ষ চলতে থাকে, তবে দফারফা। ফলে, সঙ্ঘ প্রধান ভাগবত বাণী নিয়ে আসরে হাজির হয়েছেন। ‌মিরাটের সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘‌দেবতারাও দুর্বলকে ছেড়ে দেন না। ঘোড়া, হাতি আর ছাগলের মধ্যে ছাগলকে বলি দিতে বলেন দেবতারা। কারণ ছাগল দুর্বল। কিন্তু সত্যিকারের মানুষ দুর্বলকে রক্ষা করে। একেই বলে মানবিকতা। হিন্দু ধর্ম চিরকাল দুর্বলকে রক্ষা করে।’‌ ভাগবত বাণী:‌ কট্টর হিন্দুত্ব হল উদারতা এবং কট্টর হিন্দুত্ব হল অহিংসা। 
যদিও পরিসংখ্যান–‌তথ্য–‌ইতিহাস এ কথা বলে না। তবুও, যদি অন্তত ভোটের সময় বলেই, গ্রামে গ্রামে এইরকম ‘‌ঝাপ্পি অভিযান’‌ শুরু হয়, তা বেশ মজার হয় বটে। কেন না, এই সব ছাড়া কেন্দ্র সরকারের আর কী–ই বা করার আছে?‌ দেশের মোট সম্পদের ৭৩%‌ মাত্র ১%‌–‌এর হাতে। তারা না হয় অর্থ দেবে। কিন্তু ভোটটাও তো পেতে হবে। তারপর, চারদিকে সবাই নীরব কাণ্ডে যেমন সরব, তাতে একা সরকারি বুকনিতে চিড়ে ভিজবে না। তাই আসরে নামতে হল আরএসএস–কে। হিন্দুত্ব ছাড়া গতি নেই। তা ছাড়া, সংসদ ভবনকে ‘‌মন্দির জ্ঞানে’‌, মোদিজি তো সেই ২০১৪–‌তেই সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করেছিলেন। সরকারটা চলছেই তো ধর্মের নামে। এটাই তো এখনকার আধুনিক ভারত। এই ভারতের বিধানসভায় ভূত তাড়াতে যজ্ঞ হয়। লালকেল্লায় শত্রু তাড়াতে যজ্ঞ হয়। ভোটের জন্য মুন্নাভাই হতে হয়। সবটাই তো যেন একটা বিনোদন!‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top