শুভঙ্কর দে

বইয়ের সঙ্গে কবে যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল জানি না। তবে হাতে যখন পড়ার বই এল তখন মনে হত, কবে এর থেকে নিস্তার পাব? সেই আমিই পারিবারিক সূত্রে বইয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছি একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে। এখন বই শুধু আমার জীবন–জীবিকা নয়, বই আমার নেশা, বই আমার প্রাণ। বই থেকে নিজেকে আলাদা করতে পারি না একটা মুহূর্তও।
‘‌পাঠ্য বই’‌ ফেলে রেখে পাঠককে ‘‌অ–পাঠ্য’‌ বই পড়ানোর তাগিদ অনুভব করতাম সেই ছোট থেকে। সেই তাগিদ এখনও তাড়িয়ে বেড়ায়। আর কিছুদিন পরেই পূর্ণ এবং আংশিক গৃহবন্দিদশার একশো কুড়ি দিন পূর্ণ করব। শুধু মানুষের নয়, বইয়েরও বন্দিদশা। এই সময়টা কেমন কেটেছিল আমাদের বইপাড়ার? সময়টা যদি আমার স্কুলজীবন হত, মনে হয়, বেশ আনন্দে কাটত। কিন্তু সেই আনন্দ তো এখন নেই। তার বদলে অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা। বইয়ের ব্যবসা না হলে চলবে কী করে? এই দুঃসময়ে কি একদমই পাঠক পাব না? আর কি কোনওদিন পাব?‌
এপ্রিল মাসের একটা বিকেল। যতদূর মনে পড়ে পয়লা বৈশাখের আগে। মোটরবাইকে চেপে এক ভদ্রলোক আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন।
‘‌চিনতে পারছেন?’‌
 মুখ, হাত সবটাই কেমন ব্যান্ডেজ ভূতের মতো কাপড় জড়ানো, তার ওপর হেলমেট। বললাম, ‘‌এমন অবস্থায় কী করে চিনব?’
পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে ‘‌বাল্মীকি’‌ তাঁর আগের চেহারার ছবি দেখান, আর আমি ঠিক চিনে ফেলি রত্নাকরকে।
‘‌আপনি এই সময় এদিকে কেন?’‌
‘‌বই কিনতে এসেছি, দেখছি সবই বন্ধ।’‌ করুণ স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‌একটাও কি দোকান খোলা নেই? মেয়ের ক্লাস নাইনের বই লাগত। বাড়িতে খুব চাপ, কিছু বই কি জোগাড় করে দিতে পারেন?’‌
কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। পরিচিতদের ফোন করে ব্যবস্থা করতে হল।
গৃহবন্দি থাকার সময়ে অনেক ফোন পেয়েছি, ‘‌বইপাড়ায় কি একটাও বইয়ের দোকান খোলা আছে?’‌ অথবা ‘‌আপনাদের কি ই–বুক আছে?‌’ বাংলা ই–বুকের অভাবে সেই সময় অনেক বইয়ের পিডিএফ মোবাইল ফোনে আসত। বুঝতে পারতাম, মানুষ পড়তে চাইছেন। হাতে বই পাচ্ছেন না। টিকে থাকতে হলে, আমাদের আধুনিক হতে হবে।
মার্চ মাসের তেইশ তারিখ থেকে ঘরের মধ্যে। পাঠক তার আগে থেকেই বইপাড়ায় আসা কমিয়ে ফেলেছেন। লেখকদের সঙ্গে সান্ধ্য আড্ডাও বন্ধের মুখে। কেটে গেল আরও অনেকগুলো দিন। যত দিন যায় পরিচিত পাঠকদের ফোন আসতে থাকে। কীভাবে বই পেতে পারি?‌ আমরাও খুঁজতে থাকি বিকল্প পথ। আমার ভাই মুন্না পয়লা বৈশাখের পরে একটা পরিকল্পনা নিল। ঠিক হল আমরা হোম ডেলিভারি শুরু করব। পাঠকের বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছে দেব বই। এই ফঁাকে বলে রাখি, বইপাড়ায় যখন তালা ঝুলছে, এক ভদ্রলোক এলেন, ‘‌কিছু বই কেনা যাবে?’‌ তিনি প্রায় হাজার চারেক টাকার বই কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেদিন আরও ভাল করে বুঝেছিলাম, পাঠক আছে। তার কাছে বইকে পৌঁছতে হবে।
শুরু হল নতুন উদ্যম। কাছেপিঠে থাকা আমাদের কিছু কর্মীও উৎসাহ নিয়ে চলে এলেন। বাইক চালাতে পারেন, এমন একজনকে ডাকা হল মে মাসের গোড়ায়। তিনি সুমনদা। আমাদের ডিটিপি অপারেটর। প্রায় দেড় মাস কাজ নেই। সুমনদা আমাদের উদ্যোগে শামিল হয়ে গেলেন। লকডাউনের বাজারে তাঁর বাইক ছুটল পাঠকের বাড়ি বাড়ি। অলিতে গলিতে ঢুকে পড়ল দে’‌জ পাবলিশিং থেকে আসা বাইক–ভর্তি বই। কলকাতা ছাড়িয়ে বৃহত্তর কলকাতায়। বারাসত, ব্যারাকপুর, ওদিকে জোকা, গড়িয়া কোথায় যায়নি?‌ সুমনদা বাড়িতে বই পৌঁছে দিয়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা রোজগার করেছেন শুধু মে মাসেই।
এই দুঃসময়ের মধ্যেও পয়লা বৈশাখের পরে পরেই শংকর জেঠুর ফোন, ‘‌আমি একটা লেখা লিখে ফেলেছি। তুমি একবার চলে এসো।’‌
‘‌কী করে যাব?’‌
‘‌খবরের কাগজ থেকে লোক এসে লেখা নিয়ে যাচ্ছে, তুমি কেন আসতে পারবে না?’‌
আমার ড্রাইভারকে আসতে বললাম। চলে গেলাম শংকর জেঠুর বাড়ি। লকডাউনের মধ্যেই প্রকাশিত হল তঁার লেখা ‘‌দুঃসময়ের দিনলিপি’‌। ৩০০ টাকা দামের সেই বইয়ের পাঠক–চাহিদা মেটাতে আমাদের ‘‌বাইক’‌ তৈরি।
বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি সময়ে শমীক (বন্দ্যোপাধ্যায়) জেঠুর ফোন, ‘‌অপু, তোর কাজ তো আটকে গেল!’‌
‘‌কেন? কী হল? এই সময়েই তো কাজ বেশি হবে।’
‘‌কী করে লিখব?‌ আমার লেখার লাইন টানা পাতা আর নেই। আমায় কিছু রুল টানা খাতা পাঠিয়ে দিবি।’‌
কাগজ পাঠানো হল। সে এক রোমহর্ষক গল্পের মতো। এক পুলিশ বন্ধুর সাহায্য নিলাম।
এক পত্রিকা অফিস থেকে ফোন। খুব কম দামে একটা বিজ্ঞাপন চাই।
‘‌এই সময় বিজ্ঞাপন দিয়ে কী হবে?‌ কেউ তো আর বই কিনবে না।’‌
‘‌না অপু, তোমরা যে দে’‌জ পাবলিশিংয়ের ফেসবুক পেজে লেখকদের নিয়ে এত সুন্দর একেকটা বইকে তুলে ধরছ, ওটা নিয়ে একটা বিজ্ঞাপন দাও।’‌
একটা বিজ্ঞাপন দিলাম— ‌‘‌আপনার প্রিয় লেখক, আপনার প্রিয় বই, কীভাবে তৈরি হল। আসুন। শুনে নিই আমাদের ফেসবুক পেজে।’
লেখকদের এই বই লেখার অকথিত কাহিনি শোনার বিপুল সাড়া পাই। আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে সেই বইয়ের অর্ডার আসতে থাকে। আমাদের ‘‌বই–‌বাইক’ও‌ ছুটতে থাকে। আগরপাড়ার সৌমেন্দ্রবাবু নিলেন ১৩ হাজার টাকার বই। তাঁর মতো আরও কত পাঠক কত বই যে নিতে থাকলেন‌!‌ এই সময়টা বইপাড়া জুড়েই শুরু হয়েছিল পাঠকের বাড়িতে বই পৌঁছে দেওয়ার কাজ। স্কুল বইয়ের ক্ষেত্রে দেখলাম প্রকাশক, বিক্রেতারা বই–খাতা স্যানিটাইজ করে প্যাকিং করে বাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছেন। এমনকী জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকীর নির্দিষ্ট দিনেও উপহারের বই পাঠাতে হয়েছে আমাদের।
এর পর লকডাউন কিছুটা শিথিল হল। পোস্ট অফিস খুলল। কুরিয়ার সার্ভিস শুরু হল। শুরু করা গেল কলকাতার বাইরে বই পাঠানো। সামান্য দেরি হলেও কলকাতার বাইরে সারা পশ্চিমবঙ্গ, সারা ভারতে বাঙালি পাঠকের কাছে বই পৌঁছে দিতে শুরু করলাম। আমাদের হিসেবে, শুধুমাত্র জুন মাসে কলকাতার বাইরে বই পাঠানোর হিসেব ছিল স্বাভাবিক অবস্থায় পাঠানো বইয়ের চারগুণ। ভাবা যায়!‌
এর মধ্যে বিধ্বংসী আমফান ঝড়ে বইপাড়ায় হল বিপুল ক্ষতি। জলের তোড়ে, ঝড়ের দাপটে বই, বইয়ের দোকানের সাইনবোর্ড, ফুটপাথে থাকা কাউন্টার ভেসে গেল। দেখছি, তার মাঝেও পাঠক দাঁড়িয়ে আছেন। খুঁজছেন তাঁর প্রিয় বই। আমাদের দোকানের উঠোনে এক হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘‌আপনাদের ভিজে–যাওয়া, ফেলে দেবেন এমন কোনও বই আছে?‌ আমায় দেবেন?‌’‌
লেখক লেখেন আর প্রকাশক এমন পাঠকের জন্যেই বেঁচে থাকেন। এ–ও এক যুদ্ধ। অতিমারীর বিরুদ্ধে বইয়ের যুদ্ধ। লেখক, পাঠক, প্রকাশক এবং যিনি বই বাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছেন— সবাই মিলে লড়ছি।

লেখক দে’‌জ পাবলিশিংয়ের অন্যতম কর্ণধার।

জনপ্রিয়

Back To Top