নরেন্দ্র মোদি সমীপেষু,
শ্রদ্ধেয় প্রধানমন্ত্রীজি,
সুইৎজারল্যান্ডের দাভোসে হাড়হিম করা ঠান্ডায় আপনার বক্তৃতায় আপনি উল্লেখ করেছেন যে পৃথিবীতে এখন জলবায়ু পরিবর্তন এক অন্যতম প্রধান বিপদ। সন্দেহ নেই জলবায়ুর এই দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক পরিবর্তন মানুষেরই তৈরি। নতুন প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে যেমন এসেছে বাঁচার অনেক উপহার, ঠিক তেমনই তৈরি হচ্ছে সেই জীবনশৈলীর জন্য প্রযুক্তির হাত ধরে মৃত্যুর অভিশাপ। সন্দেহ নেই এখন থেকে এ বিষয়ে সচেতন না হলে প্রজাতি হিসেবে মানুষ ও এই সভ্যতা বিলুপ্ত হতে পারে। মানব সভ্যতা ধ্বংসের এক সম্ভাব্য বিপদকে চিহ্নিত করে এর থেকে উত্তরণের পথ খোঁজায় নজর দিতে বলেছেন আপনি। আপনি নিশ্চয়ই একমত হবেন যে আজকের জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ যদি মানব সভ্যতার অবতরণের পথ হয় তবে এ সভ্যতার উত্তরণেরও একটা পথ ছিল। সেই পথ ধরেই সভ্যতা এগিয়েছে। সভ্যতার এই বিবর্তনের পথে কোটি কোটি বছরের জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে টিকে থাকার লড়াইয়ের পথ চলতে চলতেই এককোষী অ্যামিবা থেকে আজ মানুষ এই পৃথিবীতে। ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে নরেন্দ্র মোদি, হরিপদ মিস্ত্রি থেকে সাইরাজ মিস্ত্রি সবাই। অথচ আপনার মন্ত্রিসভার এক শিক্ষামন্ত্রী ডঃ সত্যপাল সিং সর্বভারতীয় বৈদিক সম্মেলনের মঞ্চে দাবি করেছেন যে সভ্যতার বিবর্তনের ক্ষেত্রে বিশিষ্ট বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইনের তত্ত্ব মিথ্যা। মন্ত্রী এও দাবি করেছেন যে বাঁদর থেকে মানুষের বিবর্তন কখনও হয়নি কারণ তাঁর পড়া ইতিহাসে এমন তথ্যের কোনও উল্লেখ ছিল না। তাঁর আরও ভয়ঙ্কর দাবি যে ডারউইনের সভ্যতার বিবর্তনের তত্ত্বকে বিজ্ঞানের সিলেবাস থেকে বাদ দেওয়া হোক। দাবি ভয়ঙ্কর এই কারণেই যে আপনার মন্ত্রীমশাইয়ের আপন বিশ্বাস যা কোনওভাবেই যুক্তিনির্ভর নয় এমনকী বিজ্ঞানসম্মত তো নয়ই, সেটিকেই ডারউইনের বিকল্প তত্ত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন সরকারি ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করেই।
আপনি জলবায়ুর প্রাকৃতিক রূপ পরিবর্তন নিয়ে বিচলিত ঠিকই কিন্তু এ দেশের প্রেক্ষিতে আপনার দল ও প্রশাসনের মদতে সামাজিক জলবায়ু পরিবর্তনে যে ভয়াবহ বিপদ নতুন করে তৈরি হচ্ছে সেটিও এখন ‘‌চায়ে পে চর্চা’–‌র বিষয় হয়ে উঠেছে। এ দেশের সমন্বয়ী সমাজ কাঠামোকে অক্ষত রাখার প্রশ্নে এই সামাজিক জলবায়ুর পরিবর্তন উত্তরোত্তর মারাত্মক হয়ে উঠছে। শুধু দেশের শিক্ষামন্ত্রী ডারউইন তত্ত্বের ভুল ধরেছেন এমনটা নয়, আপনার দলের রাজস্থান সরকারের শিক্ষামন্ত্রী সম্প্রতি নিউটনের অভিকর্ষ সূত্রকেও ‘‌সেকেন্ড হ্যান্ড’‌ বলে চিহ্নিত করেছেন। তিনি দাবি করেছেন হাজার বছর আগে দ্বিতীয় ব্রহ্মগুপ্ত নাকি অভিকর্ষ সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন। আর ব্রহ্মগুপ্তের সেই আবিষ্কারকে নিউটনের বদলে বিজ্ঞানের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে উদ্যোগী হয়েছেন। শোনা যাচ্ছে সে রাজ্যে তিনি কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচনাচক্রে গরুর নিঃশ্বাস থেকে অক্সিজেনপ্রাপ্তির দুর্লভ আবিষ্কারকেও জনপ্রিয় করে তুলেছেন। রাজনৈতিক তাগিদে বিজ্ঞানচর্চায় এমন হাস্যকর দাবি শুধু দেশের সম্মানকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভুলুণ্ঠিত করছে তা নয় পাশাপাশি ম্লান হচ্ছে এ দেশের মানুষের আত্মমর্যাদাও। হয়তো এ কথা আপনার অজানা নয় যে বিজেপি শাসিত রাজ্য মহারাষ্ট্রে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ানো হচ্ছে, ‘‌হাউস ওয়াইফরা গাধার মতো। সারাদিন শুধু খেটে মরে। তবে গাধারা একটু হলেও বেশি ভাল কারণ অভাব–অভিযোগ করে না, আর রাগ করে বাপের বাড়িও যায় না’‌। আপনার আরেক সাধের রাজ্য ছত্তিশগড়ে, সমাজবিজ্ঞানের সিলেবাসে ছাত্র–‌ছাত্রীরা শিখছে দেশের ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের কারণ মেয়েদের চাকরি করা। আর ‘‌পদ্মাবতী’‌ বিদ্রোহে আগুয়ান রাজ্য রাজস্থানের হাই স্কুলের সিলেবাসে মহান সাধুদের তালিকায় স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে ঠাঁই পেয়েছে, নাবালিকা ধর্ষণে অভিযুক্ত গুরু আশারাম বাপু। সত্যি অসাধারণ স্যর। আপনার ‘‌বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’‌ বিজ্ঞাপনের প্রয়োগ দেশের শিক্ষাভাবনায় রাজ্যে রাজ্যে।
আমার মতো অনেকেই আপনার ‘‌অচ্ছে দিন’‌–‌এর পথ চেয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য গত সাড়ে তিন বছর ধরে বিজ্ঞাপন আর বিভাজনের পথে হাঁটছে এই দেশ। ঘৃণার রাজনীতি রূপান্তরিত হচ্ছে রোজ হিংসার রাজনীতিতে। আর ও পথেই চলছে দেশের মানুষকে নিয়ন্ত্রণের রাজনীতিও। ইতিহাস বিকৃতির হাত ধরেই ঘৃণার রাজনীতি তৈরি হয়। এখনও তার অন্যথা হচ্ছে না। তাই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পুরাণ–রূপকথাকে ইতিহাস হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা চলছে দেশজুড়েই। তাই হয়তো আপনার ভাষণেও চলে আসে কর্ণের জন্মবৃত্তান্ত ব্যাখ্যায় টেস্ট টিউব বেবির জীববিজ্ঞানের ইতিহাস। একইভাবে গণেশের মাথায় হাতির শুঁড় এ দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাস, পুষ্পক রথের আদলে গড়া যন্ত্র প্রযুক্তির সাক্ষ্যের ইতিহাস। ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়ে বিকৃত জাতীয়তাবাদ গড়ে তোলার মরিয়া অপচেষ্টা চলছে দেশজুড়েই। পাশাপাশি চলছে নিজেদের অন্ধ মৌলবাদী ধ্যানধারণাকে ইতিহাসনির্ভর পথে প্রচার ও প্রসারের চক্রান্ত।
দেশের উন্নয়ন ভাবনায় আজ অন্যতম প্রধান উপাদান, মানুষের বিজ্ঞানচেতনা। কারণ এই চেতনা যুক্তিনির্ভর, সত্যনির্ভর, পরীক্ষানির্ভর। কোনওভাবেই তা বিশ্বাসনির্ভর নয়। স্যর, আপনার সরকারই কোটি কোটি টাকা খরচ করছে ‘‌স্বচ্ছ ভারত’‌ গড়তে। একবিংশ শতাব্দীতে পা মানুষকে এখনও সুস্বাস্থ্যের লক্ষ্যে শৌচাগারে পাঠাতে কালঘাম ছুটে যাচ্ছে বিজ্ঞানচেতনার অভাবে। সেখানে দেশের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই শিক্ষা–ব্যবস্থাতে যদি অবিজ্ঞান আর কুবিজ্ঞানের বিষ ঢোকানোর চেষ্টা হয় রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে তা হবে এক আত্মঘাতী চক্রান্ত। এমন অপচেষ্টা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসেরই নামান্তর মাত্র। কচিকাঁচাদের মগজে এই চিন্তার সন্ত্রাসের বীজ বোনা হলে সে মগজ সন্ত্রাসবাদের আদর্শে দীক্ষিত হয়ে উঠবে সন্দেহ নেই। আর হয়তো এভাবেই ধর্মীয় সন্ত্রাসের দীক্ষাভূমি হয়ে ওঠে শিক্ষাঙ্গন ও শিক্ষাসূচি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীজি, দাভোসের বিমানবন্দরে আপনার বিমানের চাকা ভূমি স্পর্শ করার আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গেই প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক সংস্থা অক্সফ্যার্মের রিপোর্ট। সে রিপোর্টে প্রকাশিত দেশের এক শতাংশ বিত্তবান মানুষের এখন কুক্ষিগত দেশের ৭৩%‌ সম্পদ। অপরাধ নেবেন না স্যর। বলতে বাধ্য হচ্ছি যে আপনার ‘‌সব কা সাথ, সব কা বিকাশ’–এ‌র তত্ত্ব এখন ডাহা ফেল। এবার সময় বিজ্ঞাপন বদলানোর। কথায় কথায় আপনার দল যে দেশে সার্জিকাল স্ট্রাইকের গল্প বলে গর্ব অনুভব করে সেই পাকিস্তানের উন্নয়ন সূচকের মান এ দেশের থেকে পনেরো ধাপ এগিয়ে। গত কয়েক বছর জুড়েই যে আর্থিক পর্বে আপনি দেশ চালনা করেছেন, তাতে উন্নয়নের ক্ষেত্রে সামাজিক বিয়োজন ঘটে চলেছে ব্যাপক হারে। বিজ্ঞানের সূত্র মেনেই ১%‌ বিত্তবান যদি গত এক বছরে দেশের ৪৮%‌ থেকে এক লাফে ৭৩%‌ সম্পদের মালিক হয়ে ওঠে তবে সে দেশের বিত্তহীন মানুষের হাল যে আরও করুণ হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সম্পদের এই কেন্দ্রীকরণের মধ্য দিয়েই প্রতিদিন শেষ হয়ে চলে বিকেন্দ্রীকরণের ধারণা। সেই ধারণার আবশ্যিক উপাদান মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য–‌কাজ–‌বাসস্থান সবই। ফলে এখন দেশের আমজনতার প্রান্তিক ও বিত্তহীন হওয়ার মূল্যেই বিত্তবান হয়ে উঠছে হাতে গোনা মানুষজন। এটাও এক ধরনের বিজ্ঞান। যে বিজ্ঞানকে আপনার শিক্ষামন্ত্রী চিনতে চান না ও চেনাতেও চান না মানুষকে। মুষ্টিমেয় বিত্তবানদের এই উত্তরণের পথকেই হয়তো দেশের শিক্ষামন্ত্রী বিবর্তনের পথ হিসেবে দেখতে চান, তাই হয়তো ডারউইনের বিবর্তনের তত্ত্ব বুঝতে ভুল করেন।
স্যর, আপনি এ দেশের শাসকদলের শীর্ষনেতা ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের অনুগত তো বটেই। কিন্তু একই সঙ্গে আপনি স্যর, ভারত নামে একটা ধর্মনিরপক্ষে দেশে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীও বটে। এক মহান চলচ্চিত্রকারের বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘‌হীরক রাজার দেশে’–‌র রাজ পেয়াদাদের মন্তব্য ছিল, ‘‌জানার কোনও শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই’‌। আপনার শিক্ষামন্ত্রীদের মেজাজে ওই হীরক রাজার রাজ পেয়াদাদের সুর শোনা যাচ্ছে, ‘‌স্যর, আপনি হীরক রাজার পথে’‌ হাঁটছেন না তো?‌ হীরক রাজার পরিণতির কথাটাও একটু মাথায় রাখবেন, স্যর। সেটা এড়াতে হলে কোটি কোটি মানুষের অভিভাবকত্বের দায় নিয়ে এখন সময় আত্মসমীক্ষার, আপনার সরকার ও আপনার দলের।
এই আশাতেই এই চিঠি লেখা।
পার্থপ্রতিম বিশ্বাস, অধ্যাপক, ‌নির্মাণ প্রযুক্তি বিভাগ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top