শ্রীপর্ণা দত্ত

দিল্লির নিগমবোধ শ্মশানের আবর্জনার মধ্যে পচা কলা কুড়িয়ে খাচ্ছিল ওরা। আপনি বলবেন, ব্যস!‌ তিষ্ঠ ক্ষণকাল!‌ বিজন ভট্টাচার্যের ‘‌নবান্ন’‌, বা প্রেমেন্দ্র মিত্তিরের ‘‌ফ্যান’‌— চিরকেলে বাঙালি আবেগ। আকালের সন্ধান তো বাঙালির ক্যামেরাতেই চোখ রেখে। আমরা চিরকাল এভাবেই ওদের দেখি। তাপ্পর খানিক ল্যাদ খেয়ে টুইট করি— যারা মরতে চায়, তাদের আটকাবেন না মোদিজি। অবশ্য মোদিজির রিঅ্যাকশনটা আরও মারাত্মক!‌ কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রম মন্ত্রক বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু, দুর্দশা নিয়ে তাদের কাছে কোনও তথ্য নেই। ওরা কাজ করে। যে হাইরাইজের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে শুয়ে, বসে, বা ওয়ার্ক ফ্রম হোমের দিব্যি দিয়ে আপনি–আমি ওদের নিয়ে স্ট্যাটাস দিচ্ছি, সেই হাইরাইজগুলো ওদের শ্রমে, ঘামে নির্মিত। যে কমোডে বসে সক্কাল বেলার প্রথম ফ্লাশ, সেটাও ওরা বসিয়ে দিয়েছে। যে শীতাতপ যন্ত্র এই লকডাউনের বন্দিত্বে আপনার রক্তচাপকে স্থিতিশীল রাখছে, ওটাও ওরাই দেওয়ালে বসিয়ে দিয়ে গিয়েছে। তারপর মাইলের পর মাইল হেঁটেছে ঘরে ফিরবে বলে। সঙ্গে পোয়াতি বউ বা কচি বাচ্চা। জল নেই, খাবার নেই, ছায়া নেই, নিরাপত্তা নেই, প্রবল সংক্রমণের ভয় প্রতি পদক্ষেপে— তবু ওরা হেঁটেছে। গুজরাট থেকে বিহার, দিল্লি থেকে বাংলা, মুম্বই থেকে উত্তরপ্রদেশ। আরও কত কত রুট ম্যাপ। হাঁটুগেড়ে পেছন দিক করে বসিয়ে ওদের ওপর যখন জীবাণুনাশক স্প্রে করা হয়, আমরা খানিক নিশ্চিন্ত হই। যাক গে বাবা, ছোটলোকগুলোর থেকে যেন মহামারী না হয়। অন্যদিকে দেশজুড়ে লকডাউন চলাকালীন তথাকথিত প্রভাবশালী বিশেষ বিমানে ফেরার ছবি সামাজিক মাধ্যমে দেওয়ার বিলাসিতা করবেন আর বছর বারোর জামলো মাকদম বাড়ি ফিরবে বলে ১৪০ কিলোমিটার হাঁটবে। ছোট দেহ— খাবার নেই, জল নেই, শুধু বাড়ি ফিরতে হবে এই ইচ্ছে–আগুন সম্বল করে সে হাঁটবে। তারপর বাড়ির দোরগোড়ায় এসে শ্রান্ত, ক্লান্ত শরীরটুকু মাটির ওপর ঢলে পড়বে, প্রাণহীন, জলহীন একটা ১২ বছরের শরীর।
একটু বেশি রোজগার করবে বলে ওরা নিজ ভূম ছেড়ে অন্য রাজ্যে গিয়েছিল কাজ করতে। ১২ বছরের জামলোও গিয়েছিল, লঙ্কা খেতের মজুর হয়ে। ওর বয়সি অনেকেই এমন কাজ করে। আপনার–আমার ঘরের ছেলেটি যেমন ব্লুমিংটন বা নিউ ইয়র্ক গিয়েছে একটু বেশি রোজগার করতে, ঠিক তেমন। ওরা বেতন বৃদ্ধির জন্য সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেনি, এনআরসি বা ক্যা–এর পক্ষে বা বিপক্ষে মিছিলে হাঁটেনি, মোদি, মমতা, না কেজরি, উদ্ধব, সে নিয়ে বন্ধুরা মাতেনি তরজায়। খুপরি ঘরে দিন যাপন, রুটি–আচার বা বড়া পাও কিংবা ইডলি দিয়ে কোনও রকম খিদে মেটানো, সঙ্গে গুটখা বা দেশি মদ আর মোবাইলের খরচটুকু। বাকি রোজগার বাড়ির জন্য। ঘরে রেখে আসা বউ, বৃদ্ধ বাবা–মা, বা ছেলেপুলে নিয়ে একটু ভাল করে জাপটে ধরে বাঁচার জন্য এত শ্রম!‌ আমরা ওদের পরিযায়ী শ্রমিক বলি। আমার–আপনার ঘরের দুলাল বা মামণিরা, যারা স্টেটসে প্রায় সেটেলড (মাননীয় ট্রাম্পবাবু ঘরওয়াপসি না করা পর্যন্ত), তারাও এক অর্থে পরিযায়ী শ্রমিক। কিন্তু ডলারের কাঞ্চন কৌলীন্যে এই দুই পরিযায়ীর মধ্যে সোশ্যাল ডিসট্যান্স তৈরি হয়। তাই একদল ঘরে ফিরবে বলে ড্রিমলাইনার পাঠায় সরকার বাহাদুর, আর একজনের ঘরে ফেরার ভরসা পায়ে হাঁটা।
ঘরে ফিরতে চেয়ে ওরা স্টেশনে ভিড় করলে, পুলিশ গিয়ে লাঠিপেটা করে। কিন্তু থাকবে কোথায়? হোম কোয়ারেন্টিন? টাকা নেই, খাবার নেই, যে কাজ করত সেটা আছে না গেছে কিচ্ছু জানা নেই, কীভাবে ফিরবে, বা আদৌ ফিরবে কি না, তাও অনিশ্চিত। তবুও ঘরে ফিরতে চায়। চেনা মুখ দেখতে চায়। আমেরিকা, চীন, ইতালি, ইংল্যান্ড— বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যখন এই মারণ ভাইরাসের হানায় প্রায় এলোমেলো, সেখানে চিকিৎসা পরিষেবায় প্রায় পিছনের সারিতে থাকা একটা দেশ কোন পরিকাঠামো নিয়ে লড়বে? একশো তিরিশ কোটির দেশে এখনও সংখ্যাতত্ত্বের হিসেবে কোভিড ১৯–এর যা সংক্রমণ, সবই বিদেশ যোগে। সে অর্থে যদি আন্তর্জাতিক উড়ান চলাচল আরও আগে বন্ধ করা হত, বা বিদেশাগতদের চিহ্নিত করে হাসপাতালের নজরদারিতে কোয়ারেন্টিনে রাখার উপযুক্ত ব্যবস্থা করা হত, সেক্ষেত্রে হয়তো আর একটু প্রতিরোধ সম্ভব হত।
আজ পরিযায়ী শ্রমিক ঘরে ফিরতে চেয়ে স্টেশনে ভিড় করলে, আপনি–আমি গোষ্ঠী সংক্রমণের ভয়ে আঁতকে উঠি। অথচ বিলেত–ফেরত গায়িকা, বা আমলা–পুত্র, বা হামবড়া কোনও লক্ষ্মীছানার কাণ্ডজ্ঞানহীনতা বা অপদার্থতা আমাদের অতটা বিচলিত করে না। আসলে সংক্রমণেরও এলিট–সাবঅলটার্ন আছে বাপু। সো কলড শিক্ষিতদের ক্যালাসনেসে আমরা মুগ্ধ। অথচ সরকার বাহাদুরের সদিচ্ছা হলে হয়তো এই ঘরে ফিরতে চাওয়া মানুষগুলোর কিছুটা স্বস্তি হত। বিজনেস টুডের ২০১৯–এর তথ্য অনুসারে, দেশের বড় শহরগুলোয় প্রায় ১ লক্ষ ২৮ হাজার ফ্ল্যাট বিক্রি হয়নি। এই অবিক্রীত ফ্ল্যাট বা বড় ধর্মস্থান অথবা ময়দানে অস্থায়ী পরিকাঠামো তৈরি করে এই লোকগুলোকে লকডাউনের সময়টুকুতে অন্তত থাকতে দেওয়া যেত। বেসরকারি একটি সংবাদ মাধ্যমের মার্চ ২০২০–র একটি তথ্য অনুসারে, এফসিআই গোডাউনে প্রতি পাঁচ বছরে প্রায় ৩৮ হাজার মেট্রিক টন খাদ্যশস্য পচে নষ্ট হয়। নষ্ট না করে কাজহীন ওই অভুক্ত মানুষগুলোর অন্তত খাওয়ার ব্যবস্থা করা যেত। হয়তো হয়তো হয়তো!
রামায়ণে সীতার জন্মকাহিনির সঙ্গে এমন এক মহামারীর গল্প ও এক শাসকের কথা জড়িয়ে আছে। মিথিলায় প্রবল মহামারীর সঙ্কটে রাজা জনক খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি কুলগুরু শতানন্দের পরামর্শ নেন। শতানন্দ জনককে লক্ষ্মীর উপাসনা করার কথা বলেন। লক্ষ্মী, অর্থাৎ শ্রী। লক্ষ্মীদেবী রাজা জনককে কৃষিকাজের পরামর্শ দেন ও রাজকোষ থেকে প্রজা কল্যাণে ব্যয় করার কথা বলেন। রাজার কাজ শুধু অস্ত্রধারণ নয়, প্রজার শ্রমে অংশগ্রহণ প্রকৃত শাসকের কাজ। এবং এই কৃষিকাজ করতে গিয়েই জনক সীতাকে লাভ করেন। এ কালের রামভক্তরা রাজা জনকের থেকে শিক্ষা নিতে পারতেন। করোনা প্রতিরোধে লকডাউন একমাত্র পথ হলেও, পরবর্তী ক্ষেত্রে আর্থিক মন্দা ও বেকারত্ব দেশকে এক গভীর সঙ্কটের মধ্যে ফেলেছে। জিডিপি ঋণাত্মক হয়ে গিয়েছে। কাজ হারিয়েছেন বহু মানুষ। সরকারি ক্ষেত্রগুলো ক্রমে বেসরকারীকরণের জন্য উন্মুক্ত করছে কেন্দ্র সরকার। সেক্ষেত্রে প্রজার শ্রমে রাজার অংশগ্রহণ সম্ভব না হলেও, প্রজার কর্মসংস্থান ও রোজগার সুনিশ্চিত করার দায় শাসকের। সেখানে কেন্দ্র সরকারের শ্রম মন্ত্রক জানেই না কতজন পরিযায়ী শ্রমিক মারা গিয়েছেন!‌ অতএব ক্ষতিপূরণেরও প্রসঙ্গ নেই। যে ছেলেটি পায়ে হেঁটে, এক বুক তেষ্টা আর এক থালা খিদে নিয়ে বাড়ি ফিরছে, তার জন্য একটু গরম ভাত আর জীবনধারণের নিরাপত্তাটুকু খুব দরকার। না হলে আরও বড় অতিমারী খিদের ভাইরাস আমাদের গিলে খাবে। আর সেক্ষেত্রে এলিট–সাবঅলটার্ন বিভাজন কিন্তু থাকবে না!‌

জনপ্রিয়

Back To Top