দাউদ হায়দার

অন্নদাশঙ্কর রায়ের শিশুতোষ কবিতা–‌ছড়ার সূচনা কিশোর মাসিক ‘‌মৌচাক’‌–‌এ। লিখছেন ‘‌লন্ডন ফগ’‌ (‌১৯২৭)‌। ‘‌লন্ডনের শীত’‌ (‌১৯২৯)‌। ‘‌লন্ডনের গ্রীষ্ম’‌ (‌১৯২৯)‌।
‘‌লন্ডনের গ্রীষ্ম’‌ শুরু :‌ ‘‌কী লিখি মৌচাকের তরে?‌
কী লিখি মৌচাকের তরে,
আষাঢ় মাসে গ্রীষ্ম আসে
বসন্ত যায় বনবাসে
সূর্য হেসে ঘুমিয়ে পড়ে
আমার মুখের হাসির পরে
(‌অংশ)‌
৪২ লাইনের দীর্ঘ কবিতা, বিশেষত শিশু কিশোরের পক্ষে। উল্লেখিত তিনটিই দীর্ঘ। ‘‌মৌচাক’‌ শতবর্ষী। ভাঙেনি। মধু এখন জমাট। মাঝখানে অবশ্য মৌচাকে মৌমাছির আনাগোনা, ভিড় কম ছিল। প্রায়–‌অদৃশ্য। শমিত সরকার এম সি সরকার প্রকাশনের দায়িত্ব নিয়ে পুনরায় মৌচাক স্ফীত করেছেন। বেরুচ্ছে। এ বছর পুজো সংখ্যাও বেরিয়েছে, মোটাসোটা নয় ঠিকই কিন্তু মধুরসে টইটম্বুর।
আমাদের পাবনার দোহারপাড়ার বাড়িতে মৌচাক–‌সহ আরও শিশুকিশোর পত্রিকা, বাঁধাই করা। পাক–‌ভারত যুদ্ধের (‌৬–‌১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫)‌ পরে ভারতের সব মালামাল বন্ধ, কলকাতা থেকে বইপত্রও। মৌচাকের হুল ও মধু থেকে বঞ্চিত। আরও কষ্টের, ১৯৭১–‌এ, এপ্রিলের গোড়ায়, পাকিস্তানি জল্লাদ সেনারা আমাদের বাড়ি আক্রমণ করে। পুড়িয়ে দেয়। বাড়িতে ছোটখাট লাইব্রেরি ছিল। এমন কিছু উল্লেখ্য নয়। কিন্তু বই, পত্রিকা আলমারি ভর্তি। পুড়ে ছাই। আশ্চর্য এই, ছোট চাচার ঘরে ঢুকে, আগুন দিতে গিয়েও দেয়নি। ঘরের দেওয়ালে রবীন্দ্রনাথের দাড়ি–‌আলখাল্লা, মাথায় টুপি দেখে ভেবেছে হয়তো কোনও পির–‌হুজুরের ছবি। রক্ষা পায় ঘর, বইপত্র, রবীন্দ্রনাথের ছবি। ছোট চাচাকে বললুম, ঠাকুরই আপনার ঘর রক্ষা করেছেন। উত্তর, ‘‌রবীন্দ্রনাথই বাঙালিকে রক্ষা করেছেন। করছেন।’‌ করলেও, ‘‌মৌচাক’‌–‌এর শোক এখনও।
বাংলার পুরনো তথা গত শতকের প্রথমার্ধের তিন–‌চারটি সাহিত্য প্রকাশন ঐতিহাসিক। গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় অ্যান্ড সন্স। এম সি সরকার। ডি এম লাইব্রেরি। শরৎচন্দ্র একসময় গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় অ্যান্ড সন্স ছেড়ে এম সি সরকার–‌এ আস্থাশীল। কেন, অজানা। 
এম সি সরকারের প্রতিষ্ঠাতা মহিমচন্দ্র সরকার। জানতেন, কে ‘‌স্বর্ণদায়ক’‌। সবচেয়ে বেশি জানতেন তাঁর পুত্র সুধীরচন্দ্র সরকার। রবীন্দ্রনাথকে পাননি ঠিকই, কিন্তু জানতেন রবীন্দ্র–‌পরবর্তী সাহিত্যের কেউকেটা কারা। রাজশেখর বসু থেকে শুরু করে অন্নদাশঙ্কর রায়, বুদ্ধদেব বসু এমনকী যদুনাথ সরকার (‌স্যর খ্যাত। ঐতিহাসিক)‌ তাঁর কব্জায়। প্রকাশিত করেছেন বই। জহর চিনতেন জহুরি। আরও বেশি সুপ্রিয় সরকার (‌তাঁর পুত্র)‌। ডাকনাম বাচ্চু। এই নামেই প্রকাশক মহলে সমধিক পরিচিত। সকলের ‘‌বাচ্চুদা’‌। ‘‌এম সি সরকার প্রাইভেট লিমিটেড’‌ খাতায়–‌কলমে, দোকানের সাইন বোর্ডে এবং মুদ্রিত বইয়ের প্রকাশ ঠিকানায়। সাধারণ মানুষ প্রাইভেট লিমিটেড বলে না। না বললেও, প্রাইভেট লিমিটেডই বটে। বংশ পরম্পরায়। উত্তরাধিকার পুত্র। বই প্রকাশ, বই ব্যবসা ছাড়া অন্য কোনও পেশায় জড়িত হননি।
প্রকাশকের স্মৃতিকথায় সুপ্রিয় সরকার তাঁর সময়কালের বিভিন্ন চিত্র চিত্রায়িত করেছেন। বিশেষত লেখককুলের সান্নিধ্য। কোন লেখকের কী রকম গুণপনা, কে সহজ সরল, গাম্ভীর্যে ভরপুর, বিস্তারিত করেছেন। সুপ্রিয় সরকার কলেজ স্ট্রিট মহল্লায় যথাযথ মুরুব্বি ছিলেন, ‘‌কলেজ স্ট্রিট’‌ পত্রিকা ওঁর প্রণোদনায় প্রকাশিত। ‘‌কলিকাতা পুস্তক মেলা’‌র প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। মূলত ওঁরই উদ্যোগে শুরু। সুপ্রিয় সরকার অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় ছিলেন, নিঃসন্দেহে। লেখক নির্বাচনে, ব্যবসায়ে। বনেদি প্রকাশক। বনেদিয়ানা প্রকাশনায়।
তিন প্রজন্মের পরে চার প্রজন্মের ঘাড়ে এম সি সরকারের দায়িত্ব। ভার নেন শমিত সরকার। একমাত্র পুত্র সুপ্রিয় সরকারের। এম সি সরকার প্রকাশিত পুরনো বইগুলো, চিরায়ত বই, ক্লাসিকস্‌ বলে সমাদৃত, শুরু করেন পুনর্মুদ্রণ। কিছু বই অবশ্য হাতছাড়াও হয়েছে। লেখকের উত্তরসূরি অন্য প্রকাশকের কাছে হস্তান্তর করেছেন বেশি টাকার লোভে। এই বছরই, কলকাতায় ফেব্রুয়ারি মাসে শমিতের সঙ্গে দেখা এম সি সরকার কার্যালয়ে। বলছিলেন, ‘‌উদ্ধার করতে হবে টাকাকড়ি খরচ হলেও। ঐতিহ্য ও গৌরব ফিরিয়ে আনব।’‌ ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার (‌স্যর)‌ কত বই লিখেছেন বাংলায়, বহু পাঠকের অজানা। প্রায় সব বই–‌ই এম সি সরকার থেকে প্রকাশিত। শমিত সরকার দুই মলাটে গেঁথে ‘‌যদুনাথ সরকার রচনা সম্ভার’‌ (‌বাংলা)‌ পাঠপিপাসীদের উপহার দিয়েছেন। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৯২২, মূল্য ৫০০ টাকা। প্রকাশকাল ২০১১ সাল। এক বছরেই নিঃশেষ। দ্বিতীয় সংস্করণ পরের বছর। সম্পাদনায় দুই ঐতিহাসিক, নিখিলেশ গুহ এবং রাজনারায়ণ পাল। সুসম্পাদিত। খুঁটিনাটি বহু বিষয়, তথ্য উল্লেখিত।
শমিত সরকারের ডাকনাম পম্পি। সম্বোধন করতুম ওই নামেই। চিঠি লিখতেন, ফোন করতেন নানা পরিকল্পনা নিয়ে। আগস্টে ফোনে বলেন, ‘‘‌‌আপনার ‘‌শ্রেষ্ঠ কবিতা’‌ এবং ‘‌প্রেমের কবিতা’‌ ছাপব। এবারের বইমেলায় বেরুবে।’’‌‌ এও বলেন, ‘‌আমার একমাত্র ছেলে রঙ্গন (‌শিলাদিত্য সরকার)‌–‌কে প্রকাশনায় যুক্ত করব। এম সি সরকারের পাঁচ জেনারেশন। আমার চেয়েও হয়তো অ্যাডভেঞ্চারাস হবে। প্রকাশনায় নতুন দিগন্ত প্রসারিত করবে।’‌ 
শমিত সরকারের মৃত্যুতে এম সি সরকারের ঐতিহ্য, গৌরবে ভাটা পড়বে না।

জনপ্রিয়

Back To Top