ধ্রুবজ্যোতি নন্দী: বোলপুরে নির্মাণ–কর্মীদের একটি ইউনিয়নের জেনারেল সেক্রেটারি শেখ জিয়ারুল। মানুষের সঙ্গে যোগযোগ রেখে চলা, দিনভর মোটরবাইকে ঘোরা তৎপর পরিশ্রমী চরিত্র, বয়স সাতচল্লিশ, বাড়ি লোহাগড় (বীরভূম)। ঘরবন্দি জিয়ারুলকে ফোনে ধরলাম। দেশের অর্থমন্ত্রী বৃহস্পতিবার বলেছেন, মহিলাদের জন ধন অ্যাকাউন্টে প্রতি মাসে ৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে পরের ৩ মাস। জিয়ারুলের উদ্বিগ্ন প্রতিক্রিয়া, পুরুষদের বাদ দিলে সে–‌টাকা আর ক’‌জন পাবে! হাতে কাম–‌কাজ নাই, বাড়ি বসে আছে সব, খাবেটা কী? আজ বাদে কাল তো সবাইকে ঋণ–‌লোন খুঁজতে হবে। ঘটি–‌বাটি হারিয়ে পথে বসবে সবাই!‌
সরকারি তথ্য বলছে, দেশে জন ধন অ্যাকাউন্ট আছে মোট ৩৮.২৮ কোটি, যার মধ্যে মহিলা অ্যাকাউন্ট ২০.৮ কোটি। মাসে ৫০০ টাকা করে ৩ মাসে খরচের জন্যে সরকার বরাদ্দ করেছে ৩০,৬০০ কোটি টাকা। কিন্তু এই আকালে বেহদ্দ গরিব মানুষ যখন গৃহবন্দি হয়ে নিরন্ন দিন কাটানোর আশঙ্কায় প্রহর গুনছে, তখন শুধু মহিলাদের দেব, পুরুষদের দেব না, এই কৃপণতার কোনও ব্যাখ্যা আছে?
ব্যাখ্যা নেই ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প মনরেগা নিয়ে নির্মলা তঞ্চকতারও। ১০০ দিনের কাজে দৈনিক মজুরি ছিল ১৮০ টাকা। ভোগ্যপণ্যের মূল্য সূচকের সঙ্গে যুক্ত বলে যে–মজুরি বাড়ানোর সময়ও এসে গিয়েছিল। করোনা–‌মোকাবিলায় আপৎকালীন সরকারি অনুদানের নামে দৈনিক মজুরি বাড়ল ২০ টাকা, হল ২০০ টাকা। কিন্তু এই অন্তরিন অবস্থায় ‘সামাজিক দূরত্ব’ বঁাচিয়ে ১০০ দিনের কাজ চলবে কী করে? সে তো অসম্ভব!‌ তা হলে সে–টাকা কি হাতে আসবে করোনা–‌দুর্বিপাক কেটে যাওয়ার পর ১০০ দিনের কাজ আবার চালু হলে? সেটা আপৎকালীন অনুদান? জিয়ারুলের আর্তি, যঁাদের জব কার্ড আছে তঁাদের অ্যাকাউন্টে মাসে কিছু কিছু টাকা পাঠানো যায় না? সেটারই দরকার ছিল। মনরেগা প্রকল্পে নথিভুক্ত সবাইকে এপ্রিল আর মে— এই দু’‌মাস ধরে বিশেষ সাহায্য দেওয়ার। আর, মনরেগা প্রকল্পে কেন্দ্রের কাছ থেকে সব রাজ্যের সমস্ত পাওনা এখনই মিটিয়ে দেওয়ার। শুধু মনরেগা প্রকল্পই নয়, পণ্য পরিষেবা কর বাবদ রাজ্যের প্রাপ্য ফেলে না রেখে এখনই মিটিয়ে দিলে এই করোনা–‌যুদ্ধে রাজ্যগুলোকেও তো শক্তিশালী করা হয়। না, অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন সে–‌পথের ধারকাছ দিয়েও যাননি।
টেলিভিশনে নির্মলার ঘোষণা শেষ হতে না হতেই ‘আজকাল’ সম্পাদক ফোনে মন্তব্য করলেন, গত বছর সেপ্টেম্বরে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে বাণিজ্য–‌জগৎকে ১.৪৫ লক্ষ কোটি টাকা রাজস্ব ছাড়ের বিশেষ প্যাকেজ উপহার দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। অথচ এই ভয়ঙ্কর করোনা–‌বিপর্যয়ে ঘরবন্দি দেশের দরিদ্রতম লোকজনের জন্যে সরকারের হাত দিয়ে গলল মাত্র ১.৭০ লক্ষ কোটি টাকা! জানি না এ বিষয়ে তিনি সবিস্তার লিখছেন কি না, কিন্তু সম্পাদকের এই প্রতিতুলনাটা যত বার মনে পড়ছে, তত বারই বেশ কয়েকটা প্রশ্নের ভূত ঘাড়ে চেপে দম বন্ধ করে দিচ্ছে। বড় ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সম্পর্কে এই সরকার যে উদ্বেগ দেখায়, দেশের হতদরিদ্র মানুষজনকে নিয়ে আপৎকালেও সেই উদ্বেগ দেখা যায় না কেন? এই ঘোর দুঃসময়ে, যখন সারা দেশ জুড়ে সমস্ত কাজকর্ম বন্ধ, যঁারা চাকরি করেন তঁারাও সবাই যখন নিশ্চিত হতে পারছেন না চাকরি থাকবে কি না, থাকলেও কবে মাইনে পাবেন, মাইনের কতটা পাবেন, তখন অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক, রাজমিস্ত্রি, রং–‌মিস্ত্রি, কামার, কুমোর, ছুতোর, মুচি, ধোপা, নাপিত আর কোটি কোটি দিনমজুরের জীবনে নেমে–‌আসা অনিশ্চয়তার কথা কেন্দ্র ভাববে না কেন? চা–‌বিক্রেতা হিসেবে নিজের অতীতের কথা যিনি গর্ব করে বলে বেড়িয়েছেন এত দিন, তিনি কেন ভাববেন না সারা দেশ জুড়ে রাস্তার ধারের ছোট ছোট চায়ের দোকান, মুড়ি–‌তেলেভাজার দোকান, মিষ্টির দোকান, বিড়ি–‌সিগারেটের দোকানিদের আজকের অবস্থার কথা? আমরা যখন জানিই না এই দুর্দশার দিন শেষ হবে কবে, জানি না কবে আবার তঁারা ফিরতে পারবেন স্বাভাবিক আয়ে, তখন পুরুষ–‌মহিলা নির্বিশেষে জন ধন অ্যাকাউন্ট থাকা সবাইকে, আর তার সঙ্গে মনরেগা প্রকল্পে নাম–‌থাকা সকলকে দু’‌মাস ধরে ৫০০ টাকার অনুদান আপৎকালীন ত্রাণ হিসেবে দেওয়া যায় না কেন? ব্যাঙ্কে ঢুকবে না, এই টাকাটা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে হাতে–‌হাতে ঘুরবে।
২০১৮ সালের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী কিসান সম্মান নিধি নামে একটি প্রকল্প চালু করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার, যার আওতায় সমস্ত কৃষক পরিবারকে ২০০০ টাকার ৩টি কিস্তিতে বছরে মোট ৬০০০ টাকা দেওয়ার কথা। ২০১৫-১৬ সালের এগ্রিকালচারাল সেনসাস বা কৃষি গণনা অনুযায়ী দেশে জমির মালিক কৃষক পরিবারের সংখ্যা ১৪.৬৫ কোটি হলেও, এই প্রকল্পে এখনও পর্যন্ত নথিভুক্ত মাত্র ৮.৬৯ কোটি কৃষক পরিবার। ভাগচাষিরাও এই প্রকল্পের হিসেবের বাইরে। পিএম–‌কিসান নামে কৃষক কল্যাণের এই টুকরো প্রকল্পের মাত্র একটি কিস্তির ২০০০ টাকা এখনই ছাড়া হচ্ছে বলে জানিয়ে তার বরাদ্দ টাকা ঢুকিয়ে দেওয়া হল করোনা–‌মোকাবিলায় গরিবদের জন্যে ঘোষিত আপৎকালীন তহবিলে! তা হলে দঁাড়াল এই যে, ১ লক্ষ ৭০ হাজার কোটি বস্তুত একটি ফুলিয়ে–ফঁাপিয়ে দেখানো সংখ্যা, যার মধ্যে মনরেগা, পিএম–‌কিসানের মতো স্বাভাবিক অবস্থার বাজেটে সংস্থান–‌রাখা টাকা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে স্রেফ চোখে ধুলো দেওয়ার জন্যে।
তা হলে কি ভাল কিছুই দেখছি না আমরা ১.৭০ লক্ষ কোটি টাকার এই মহান ঘোষণায়? না, তা নয়, দেখছি তো। দেখছি দেরিতে, বড্ড দেরিতে হলেও করোনার ঘানিতে পিষে–‌মরা গরিবের কথা ভাবার কাজটা শুরু তো হয়েছে!‌ এই–‌যে প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনায় পরের তিন মাস ধরে পরিবার–‌পিছু মাসে ৫ কিলো করে চাল বা গম আর ১ কিলো করে ডাল দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, স্পষ্ট করে বলা না হলেও ধরে নিচ্ছি সেটা বিনামূল্যেই, এটাও খুবই ভাল। সরকারি হিসেব অনুযায়ী, ফুড কর্পোরেশনের গুদোমে গুদোমে এই মুহূর্তে মজুত চাল আর গমের পরিমাণ প্রায় ৫৮৫ লক্ষ টন। করোনা–‌বিভীষিকায় ঘরবন্দি নিরন্ন মানুষের কাছে এই মজুত চাল–‌গম–‌ডাল ঠিকঠাক পৌঁছে দিতে পারলে ভাতে মরার চেয়ে করোনায় মরা ভাল বলে তঁারা বিধিনিষেধকে বুড়ো আঙুল দেখাবেন না। আর, সবচেয়ে ভাল যেটা, ভাবছি এটা নির্ঘাত শুরু। একবার শুরু যখন হয়েছে, তখন গরিব মানুষের এই অভূতপূর্ব সঙ্কটের কথা আরও ভাল করে বুঝবে দেশের সরকার। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে আরও অনেক।‌

জনপ্রিয়

Back To Top