দীপেন্দু চৌধুরি- সুন্দরবনের সাগরদ্বীপ। মূলত তিনটে গ্রাম। ‘বেগুয়াখালি’ (লাইট হাউস), ‘সুমতিনগর’ এবং ‘‌বোটখালি’‌। এই তিনটে গ্রামের মানুষ ঘরসংসার করছেন ভাঙনকে সঙ্গী করে। নদীভাঙনের গ্রাস থেকে বাঁচতে এক জায়গা থেকে ঠঁাইনাড়া হয়ে সরে যান অন্য ‘‌নিরাপদ’‌ জায়গায়। সেই জায়গা নদীর গ্রাসে গেলে আবার অন্যত্র। কিন্তু এলাকা ছেড়ে যেতে চান না। ‘‌ক্লাইমেট চেঞ্জ’‌, বা জলবায়ুর পরিবর্তনের কথা শোনেননি ওঁরা কেউ। 
সাগর ব্লকের আধিকারিকরা বলছেন, প্রতি বছর গঙ্গাসাগর মেলা এগিয়ে আসছে ১৫ মিটার করে। অদূর ভবিষ্যতে কপিলমুনি আশ্রমও স্থানান্তরিত হতে পারে। এমন আশঙ্কাও আছে। কপিলমুনির যে মন্দিরটি এখন আমরা সাগরদ্বীপে গেলে দেখতে পাই, সেটা চতুর্থ মন্দির। তৈরি হয়েছিল ১৯৭০ সালে। স্থানীয়দের কারও কারও মতে, এটি সপ্তম মন্দির। নদী ভাঙনের কারণেই মন্দির জায়গা বদলেছে বারে বারে।
কাজেই কপিলমুনি যেখানে রেহাই পাচ্ছেন না, সেখানে সাগর ব্লকের ওই গ্রামের মানুষরা কোন ছাড়!‌ বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভাঙনের সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে। কাজেই, সাগর দ্বীপের উপাখ্যান মানেই জল, নদীবাঁধ ভাঙা এবং বাড়ি বদলানোর গল্প। নদীর অচেনা মতিগতির সঙ্গে লড়াই। সম্প্রতি নদীর ভাঙন নিয়ে এক কর্মশালার সুবাদে সাগরদ্বীপে গিয়ে পরিচয় হয়েছিল ঘোড়ামারা গ্রামের ২০ বছরের রেশমা খাতুনের সঙ্গে। সাগর কলেজের ইংরেজি অনার্সের ছাত্রী রেশমাদের বাড়ি ছ’বার ভাঙনের গ্রাসে হারিয়ে গেছে। কয়েক বছর অন্তর ‘আইলা’‌র মতো বিধ্বংসী ঝড় ওদের বাড়িঘর উজাড় করে দেয়। তছনছ হয়ে যায় জমিজিরেত। তার দোসর ভয়ঙ্কর ভাঙন। সাগর ব্লকের ‘ঘোড়ামারা’ গ্রামের অর্ধেকই তো সেই সর্বনেশে ভাঙনের হাত ধরে ডুবে মরেছে।
রেশমাদের পরিবার ৩০ বছর আগে ভিটেছাড়া হয়ে সাগর ব্লকের জীবনতলা মনসা গ্রামে আশ্রয় নেয়। রেশমা ইংরেজি অনার্সের ছাত্রী, কিন্তু প্যারিস পরিবেশ চুক্তির বিষয়ে কিছু জানে না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বে কী প্রভাব পড়ছে, সে নিয়েও স্পষ্ট ধারণা নেই। শুধু শব্দজোড়ার সঙ্গে পরিচয় আছে। ওদের পরিবার চাষবাস করে। সঙ্গে মাছচাষের ব্যবসা। রেশমার প্রশ্ন, জমি যদি নদীর গর্ভে চলে যায়, বাপ–দাদারা চাষ করবে কী করে? মাছের জন্য পুকুর কাটা হবে কোথায়? 
রেশমার দাদা মফিসুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ৩০ বছর আগে ঘোড়ামারা দ্বীপ থেকে সাগর ব্লকে এসে ওদের পরিবার ০.৪ হেক্টর জমি পেয়েছে সরকার থেকে। কিন্তু এখনও জমির পাট্টা পায়নি। একই অভিজ্ঞতা ঘোড়ামারা থেকে স্থানান্তরিত হয়ে আসা ৩০০ পরিবারের। পাঁচ বছর আগে রাজ্য সরকার আঞ্চলিক নদীর মুখে লক গেট করে দিয়েছে। তবুও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। সাগরের জলের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে এই সঙ্কট, এটা রেশমাদের পরিবার বোঝে। কিন্তু ওরা বোঝে না ‘জলবায়ু পরিবর্তন’–এর ভাষা। সেই কারণে বাড়ির পুরুষরা জনমজুরি করতে যায় কেরলে, গুজরাটে মাছ ধরার ট্রলারের খালাসি হয়, বেঙ্গালুরুতে হোটেলে পরিচারকের কাজ করে। কলকাতায় লোকের বাড়ি কাজ করতে যায় সাগরদ্বীপের মেয়েরা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এঁদের ‘পরিবেশ উদ্বাস্তু’ হয়ে জীবন কাটাতে হচ্ছে।
সাগর ব্লক সুন্দরবন উন্নয়ন দপ্তরের অধীন। সুন্দরবনের জনসংখ্যা প্রায় ৮৫ লক্ষ। দারিদ্র‌্যের হার ৪৩.২৩ শতাংশ। এই হিসেবে ভারতের গড় দারিদ্র‌্যের সঙ্গে তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ভারতের গড় দারিদ্র ২১.৯২%। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার ঘোড়ামারা, লোহাচরা, বিশালক্ষ্মী মৌজার ৫৬০ একর চাষযোগ্য জমি নদীগ্রাসে চলে গেছে গত কয়েক বছরে। সরকারি তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, সাগর ব্লকের ১৪টা গ্রামের জমি নদীতে ভেসে গেছে। বিশালক্ষ্মী গ্রাম অনেক আগেই জলের তলায়। পরে লোহাচরা নামে জনপদটিও। টিকে ছিল ঘোড়ামারা গ্রাম। সাগর–ঘোড়ামারা এবং মৌসুমি— তিনটে অঞ্চল পাঁচ দশক আগে কলকাতার থেকে বড় এলাকা ছিল বলে দাবি করছেন সরকারি আধিকারিকরা। জম্বুদ্বীপ নামে একটি পরিত্যক্ত দ্বীপ রয়েছে। কেউ এখন বসবাস করে না। মৎসজীবীরা মাছ ধরতে যায়। ১৯৬০ সালেই এই দ্বীপের তিন–চতুর্থাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে।
বেগুয়াখালি গ্রামে দেখতে পেলাম অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের দুই মহিলা মীন ধরছেন। সঙ্গে দুজন ৮–১০ বছরের বাচ্চা ছেলে। মীন বিক্রি করে এই সব পরিবারের মাসে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা রোজগার হয়। কখনও আবার কিছুটা বেশিও হয়ে থাকে। অঞ্চলের মানুষের মূল উপার্জন চাষবাস থেকে। ৮৫% মানুষ চাষের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু যেসব অঞ্চলে জমির পরিমাণ কমে গেছে, সেই অঞ্চলের বাড়ির পুরুষরা গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যায়। বছরে দু’মাস মধু সংগ্রহ করতেও দেখা যায় এই সব অঞ্চলের পুরুষদের। সরকার বিকল্প চাষ হিসেবে এলাকায় মধু চাষে উৎসাহ দিয়ে থাকলেও, বাড়তি রোজগারের খোঁজে ভিনরাজ্যে পাড়ি দেয় এরা। আগে গভীর জঙ্গলে কাঠ কাটতেও যেত। কিন্তু কাঠ কাটা নিষিদ্ধ হয়েছে। তাই এঁদের মাছ চাষ আর মধু সংগ্রহের ওপর নির্ভর করতে হয়। 
সাগর–‌সহ সুন্দরবনের ভাঙনপ্রবণ এলাকায় নারকেল গাছ, ঝাউগাছ লাগানোর কাজ শুরু করা হয়েছে। সাগর ব্লকের প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েতের সামাজিক প্রকল্পে ৪০টি পরিবারকে ১০টি করে নারকেল গাছের চারা দেওয়া হয়েছে। সুন্দরবনের ১৯টি ভাঙনপ্রবণ ব্লকে যতগুলি গ্রাম পঞ্চায়েত আছে, প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েতকে ৩০০টি করে নারকেল গাছ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অঞ্চলের পরিযায়ী শ্রমিকদের পরিবারে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের মাধ্যমে বিকল্প কাজের ব্যবস্থা করছে রাজ্য সরকার।‌‌

ভাঙনের ঘরগেরস্থি। ছবি:‌ অম্লান বিশ্বাস

জনপ্রিয়

Back To Top