অরূপ বসু- আমেরিকায় তখন রাত ৪টে। গভীর নিদ্রায় মগ্ন অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর স্ত্রী এস্থার ডাফেল। নোবেল কমিটির ফোন গেল। এবার অর্থনীতিতে প্রাপক নোবেল লরিয়েটের ৩ জনের দু’‌জন তাঁরা। অর্থনীতিতেই ভারতের দ্বিতীয় নোবেল লরিয়েট বাংলার আর এক সন্তান— অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়। অমর্ত্য সেনের মতোই গবেষণা ও অধ্যাপনার কাজে দীর্ঘদিন ইয়োরোপ ও আমেরিকায় থাকা সত্ত্বেও চলনে ও বলনে, ভাবনায় ও চেতনায় আজও পুরোপুরি বাঙালি। নোবেল কমিটির সুসংবাদ পাওয়ার ঘণ্টা দুয়েক বাদে কলকাতা থেকে তাঁর কাছে ফোন যায় আর এক অভিজিতের। চিকিৎসক অভিজিৎ চৌধুরি। অল্প সময়ে দুজনের কথাও হয়। বাংলায় দরিদ্র‌ মানুষের উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যাপারে দুই অভিজিৎই দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করছেন। বীরভূমে দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে গবেষণার সময় তাঁদের উপলব্ধি, গরিব ঘরের শিশুরা যদি পায়ে জুতো পরার এবং সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার সুযোগ পায়, তাতে অভ্যস্থ হয় তাহলে, অনেক রোগভোগই দূর হয়ে যাবে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানে একটা কথা আছে, র‌্যান্ডামাইজড কন্ট্রোল ট্রায়াল। একইরকম আর্থ–‌সামাজিক পরিবেশে একদল শিশু, কিশোরকে বিশেষ ধরনের ওষুধ দেওয়া হল চিকিৎসার জন্য। আর একদলকে দেওয়া হল না। দুটো ক্ষেত্রে কী প্রভাব পড়ল, তা নিরূপণ করাই র‌্যান্ডামাইজড কন্ট্রোল ট্রায়াল। অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ এই র‌্যান্ডামাইজড কন্ট্রোল ট্রায়ালটাই ফলিত অর্থনীতির ক্ষেত্রে ব্যবহার করলেন। আর অর্থনীতির জগতে আলোড়ন তুললেন। উন্নয়ন ও দারিদ্র‌্য দূরীকরণের নতুন দিগন্তের দ্বার খুলে দিলেন। শুধু অর্থ দিয়েই দারিদ্র‌্য দূর করা কঠিন। অর্থনীতির ছাত্র, শিক্ষকদের সঙ্গে অভিজিৎ বিনায়কের কাজটা নিয়ে কথা বলছিলাম। অভিজিৎ চৌধুরি, অশোক কোনারদের মতো চিকিৎসক যাঁরা অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়কের সঙ্গে কাজ করেছেন, তাঁদের সঙ্গেও কথা বলছিলাম। এটা বোঝা গেল, অভিজিৎ বিনায়কই প্রথম দেখালেন, দারিদ্র‌্য কখনই একমুখী নয়। তা বহুমুখী। এটা বিশ্বের সব দেশের সব জায়গায়ই বাস্তব সত্য। তাই, দারিদ্র‌্য মুক্তি ঘটাতে গেলে, দরিদ্র মানুষের উন্নতি ঘটাতে গেলে, শুধু তার আর্থিক দুর্বলতার দিকটা বিবেচনা করলেই হয় না। বিবেচনা করতে হয় তার মানসিক দারিদ্র‌্য সামাজিক দারিদ্র‌্য, অবস্থানগত দারিদ্র‌্য।
রতন খাসনবিশের সঙ্গে কথা বলছিলাম। মিলেনিয়াম গোল পত্রিকায় অভিজিৎ বিনায়কের একটি লেখা উল্লেখ করে এই বহুমুখী দারিদ্র‌্যের কথাই ব্যাখ্যা করছিলেন তিনি। তাই, শুধু অর্থনীতি নয়, সমাজ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অভিজিৎ বিনায়কের কাজের স্বীকৃতি চাঁদে ভারতের চন্দ্রযান অবতরণের চেয়ে কম কৃতিত্বের নয়। তিনি দেখিয়েছেন, এক দলিত শিশু ও এক ব্রাহ্মণ শিশু দুজনের দারিদ্র‌্য একরকম নয়। দুজনকে সমপরিমাণ আর্থিক সাহায্য দিলে দুজনে একই ভাবে বেড়ে উঠবে না। ব্রাহ্মণ শিশু যত সহজে বিদ্যালয়ে যাবে, দলিত শিশু তত সহজে বিদ্যালয়ে যাবে না। আবার পশ্চিমবঙ্গে এই ফারাকটা যেরকম, রাজস্থান বা হরিয়ানায় এই ফারাকটা কিন্তু তার চেয়ে অনেক বড়। উন্নয়নের ক্ষেত্রে, দারিদ্র‌্য মুক্তির ক্ষেত্রে এই বহুমুখী সমস্যা মাথায় রাখতে হবে। তাঁর সঙ্গে পুরস্কার পেয়েছেন একই কাজের জন্য তাঁর স্ত্রী বিদেশিনী এসথার। এই কাজের ক্ষেত্রেও তাঁরা অবশ্যই একে অপরের পরিপূরক। ২০১১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলিপুর হিস্ট্রি ক্যাম্পাসে এক অনুষ্ঠানে এই বহুমুখী দারিদ্র‌্য চিকিৎসা পরিষেবা পেতে মানুষকে কী সঙ্কটে ফেলেছে, কী ভাবেই বা তাকে বের করে আনা যায়, তা নিয়ে অভিজিৎ বিনায়ক ভাষণ দিয়েছিলেন। এই অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিল, পশ্চিমবঙ্গের লিভার ফাউন্ডেশন। তাঁকে এখানে নিয়ে আসার কৃতিত্ব অবশ্যই ডাক্তার অভিজিৎ চৌধুরির। ডাঃ চৌধুরির সহযোগিতায় ভাষণের পর অভিজিৎ বিনায়কের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, দারিদ্র‌্যের বহুমুখী সমস্যা দূরীকরণে সংবাদ মাধ্যমের একটা বড় ভূমিকা আছে। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই অধিকাংশ সময় সংবাদ মাধ্যম এই ভূমিকাটা পালন করে না। অভিজিৎ বিনায়ক এই পশ্চিমবঙ্গে তাঁর গবেষণার জন্য বেশ কিছুটা সময় দিয়েছেন। তার আগে রাজস্থানে একইভাবে দরিদ্র মানুষের সমস্যা নিয়ে কাজ করেছেন। জন্মের সময় থেকেই লিভার ফাউন্ডেশন পশ্চিমবঙ্গের কোয়াক ডাক্তারদের আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বিষয়ক প্রশিক্ষণ দিয়ে উপযুক্ত করে তোলার ওপর জোর দেয়। বাংলার গ্রামে দরিদ্রতম মানুষের বন্ধু এই কোয়াক ডাক্তাররাই। অভিজিৎ চৌধুরি লিভার ফাউন্ডেশনের একটি বড় ইউনিট নিয়ে এই বীরভূমে কোয়াক ডাক্তারদের প্রশিক্ষণের কাজ করছিলেন। তাঁর কাছে খবর ছিল, অভিজিৎ বিনায়ক রাজস্থানে কোয়াক ডাক্তারদের নিয়ে নাকি একটা কাজ করেছেন। ডাঃ চৌধুরি পশ্চিমবঙ্গে কোয়াকদের ওপর কাজ করার ব্যাপারে অভিজিৎ বিনায়কের যাতে সহযোগিতা পাওয়া যায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ তার জন্য ম্যাসাচুসেটস ইউনিভার্সিটিতে যান। প্রস্তাব শুনে অভিজিৎ বিনায়ক রাজি হন। বাংলার গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নতির ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আর্থিক সহযোগিতায় লিভার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ২০১২–‌১৩ সালেই কাজ শুরু করেন অভিজিৎ বিনায়ক। তাঁর সঙ্গে তাঁর ছাত্র জিষ্ণু দাসও ছিলেন। ২০১৫ সাল পর্যন্ত তাঁদের গবেষণার ফলাফল, ২০১৬ সালে বিজ্ঞান বিষয়ক আন্তর্জাতিক পত্রিকা সায়েন্সে প্রকাশিত হয়। ২০১৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিষেবার জন্য কোয়াকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে উন্নত করে স্বাস্থ্য পরিষেবা নিবিড় করার জন্য এই গবেষণালব্ধ ধারণা প্রয়োগ করে। অভিজিৎ চৌধুরি কলকাতায় বসে দূরদর্শনের পর্দায় খবরটা জেনে ফোন করে অভিজিৎ বিনায়ককে বলেছেন, এই আনন্দের দুর্ঘটনা কখন ঘটল?‌ অভিজিৎ বিনায়ক নাকি বলেছেন, এরকমভাবে বার বার যদি কেউ ঘুম ভাঙিয়ে দেয়!‌
আগামী ২২ অক্টোবর দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে অভিজিৎ বিনায়ক ও অভিজিৎ চৌধুরি দু’‌জনেরই থাকার কথা। সেদিনই কলকাতায় আসার কথা অভিজিৎ বিনায়কের।
সেলাম অভিজিৎ বিনায়ক। কলকাতা অভিনন্দন জানাতে নিশ্চয়ই তৈরি থাকবে। কিন্তু যাদের জন্য আপনি এতবড় কাজ করে চলেছেন, তাদের কাছে আপনার এই স্বীকৃতির খবর পৌঁছে দেবে কে?‌‌‌

অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

জনপ্রিয়

Back To Top