ড. প্রদীপকুমার দত্ত- বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই দেশে গণতান্ত্রিক–‌ ধর্মনিরপেক্ষ–‌ গণতান্ত্রিক শিক্ষা ধ্বংস করে শিক্ষার গৈরিকীকরণের এবং ছাত্রছাত্রীদের যুক্তিবাদী মানসিকতা গড়ে ওঠার যেটুকু সুযোগ আজও শিক্ষাব্যবস্থায় অবশিষ্ট আছে, তাও ধ্বংস করার পরিকল্পনা করছে। এজন্য সরকার একের পর এক পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছে। সম্প্রতি বিদ্যালয় স্তরের শিক্ষাব্যবস্থা ও পাঠ্যক্রম সংস্কারের নামে বেশ কিছু পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেছেন কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী প্রকাশ জাভরেকর। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ভারতীয়ত্ব জাগ্রত করাই এর উদ্দেশ্য বলে তিনি জানিয়েছেন।
গত এপ্রিল মাসে মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে অনুষ্ঠিত বিরাট গুরুকুল সম্মেলনে মন্ত্রী বলেছেন, শিশুদের শিক্ষা দেওয়ার সবচেয়ে ভাল পদ্ধতি হল গুরুকুল পদ্ধতি। সম্প্রতি তিনি জানান, সরকার বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন ঘটিয়ে এই পদ্ধতিকে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে। তিনি বলেছেন, বিজেপি–‌র আদর্শগত পরামর্শদাতা আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত এবং গুরুকুল পদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত শিক্ষাবিদদের পরামর্শগুলিকে নতুন শিক্ষানীতিতে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বিবেচনা করা হবে। ভারত শিক্ষার রাজধানী ছিল। আধুনিক গুরুকুলগুলি শিক্ষার প্রসার করছে, যা প্রাচীন ও বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার একটি নিখুঁত সংমিশ্রণ। মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থাকে ব্যর্থ বলে অভিহিত করে নতুন শিক্ষানীতিতে বৈদিক শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে ঘোষণা করেছেন। এই সম্মেলনে উপস্থিত কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী সত্যপাল সিং আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, প্রতিটি শিশুকে প্রথম পাঁচ বছরের জন্য গুরুকুলে পাঠাতে হবে। বৈদিক শিক্ষাই শিশুদের আদর্শবান ও নীতিনিষ্ঠ হতে শেখাবে। প্রকাশ জাভরেকর বলেছেন, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের প্রাচীন ভারত সম্বন্ধে শিক্ষা দেওয়ার জন্য ‘ভারত বোধ’ নামে একটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তার বিষয়বস্তু এমনভাবে তৈরি করা হবে যাতে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা তা পড়তে উৎসাহিত হয়। তাতে শেখানো হবে বিজ্ঞান, বৈমানিক বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান ইত্যাদিতে প্রাচীন ভারত কতটা উন্নত ছিল। অর্থাৎ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রাচীন ভারতের গৌরবোজ্জ্বল প্রকৃত অবদান তুলে না ধরে, ঐতিহ্যের নামে প্রাচীনত্বের অলীক মহিমা প্রচার করা হবে। জাভরেকরের বক্তব্যের পরেই মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান তাঁর বক্তব্যকে সমর্থন করেন। এভাবে ভারতীয়ত্বের নামে অবৈজ্ঞানিক ও অনৈতিহাসিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে চলেছে কেন্দ্রের বিজেপি–‌পরিচালিত সরকার। এই সম্মেলনে উপস্থিত মোহন ভাগবত বলেছেন, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিবর্তন করতে হবে। তাঁর মতে, পাশ্চাত্ত্য শিক্ষা প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরি করে আর ভারতের ট্র্যাডিশনাল শিক্ষা বিশ্বের কল্যাণের কথা ভাবে। সেই ট্র্যাডিশনাল শিক্ষা ফিরিয়ে আনা উচিত— সরকারের সাহায্যে বা সরকারের সাহায্য ছাড়াই। তিনি এ কথা বললেও, আরএসএসের মতাদর্শে বিশ্বাসী বিজেপি–‌পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার সঙ্ঘ–‌পরিবারের আদর্শে ও পরামর্শে দেশে গণতান্ত্রিক–‌ ধর্মনিরপেক্ষ–‌ গণতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থার যেটুকু অবশিষ্ট আছে তা ধ্বংস করতে সচেষ্ট। কেন্দ্রীয় সরকারের এই অপপ্রয়াস রামমোহন, বিদ্যাসাগর, জ্যোতিবা ফুলে, রবীন্দ্রনাথের মতো ভারতীয় নবজাগরণের নেতারা যে ধর্মনিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক শিক্ষার কথা বলেছিলেন, তাকে নস্যাৎ করছে। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। তাঁদের এই অপপ্রয়াস সফল হলে দেশের অগ্রগতি ব্যাহত হবে এবং দেশে মধ্য যুগের অন্ধকার নেমে আসবে। শুধু কেন্দ্রীয় সরকার নয়, বিভিন্ন বিজেপি–‌পরিচালিত রাজ্য সরকারও একই কাজ করছে, যাতে ছাত্রছাত্রীদের মনে গণতান্ত্রিক ধ্যানধারণা গড়ে না ওঠে এবং তাদের মধ্যে যুক্তিবাদী মানসিকতার পরিবর্তে অন্ধতার সৃষ্টি হয়, সেই সঙ্গে দেশে ফ্যাসিবাদের জমি প্রস্তুত হয়। এর সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হল ‘গুজরাট স্টেট বোর্ড অফ স্কুল টেক্সটবুক্‌স’ প্রকাশিত সমাজবিজ্ঞান বইয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের ত্রুটি দেখানো হয়েছে এবং মানবতার ঘৃণ্য শত্রু ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদকে মহিমান্বিত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, গান্ধীজির তুলনায় হিটলার বড়। অষ্টম শ্রেণির বইয়ে ‘গান্ধীযুগ ও জাতীয় আন্দোলন’ শীর্ষক অধ্যায়ে ‘নেতিবাচক দিকগুলি’ নামে একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনের নেতিবাচক দিকগুলি কী। দশম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান বইয়ে ‘হিটলার, দি সুপ্রিমো’ এবং ‘নাৎসিবাদের আভ্যন্তরীণ অবদান’ শীর্ষক দুটি অধ্যায় রয়েছে। এই বইয়ে ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদের জয়গান করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদ জার্মানিতে বলিষ্ঠ জাতীয় গৌরববোধ জাগ্রত করেছিল এবং আমলাতন্ত্র ও প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি করেছিল। এ ছাড়া আরও কিছু অবদান(!) বিস্তারিত ভাবে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু ফ্যাসিবাদ ও
নাৎসিবাদের যে অমানবিক দিকগুলিকে, যেমন ইহুদিদের ওপর নির্মম অত্যাচার, ৬০ লক্ষ ইহুদিকে গ্যাস–‌চেম্বারে হত্যা করা, ট্রেড ইউনিয়নগুলির প্রতি নির্মমতা, যারা মুসোলিনি বা হিটলারের সংজ্ঞা অনুযায়ী ন্যায্য নাগরিক নয় তাদের ওপর অত্যাচার প্রভৃতি, বিশ্বের মনীষীরা ও সমস্ত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ নিন্দা করেছে, তার বিন্দুমাত্র উল্লেখ এই বইয়ে করা হয়নি। ‘নাৎসিবাদের মতবাদ’‌ শীর্ষক অনুচ্ছেদে হিটলারের প্রশংসা করে বলা হয়েছে, ‘একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে হিটলার অল্প সময়ের মধ্যে জার্মান সরকারকে মর্যাদা ও সম্মান প্রদান করেছেন। তিনি বৃহত্তর জার্মান রাষ্ট্র গঠন করেছেন.‌.. জার্মান জাতির শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরেছেন... জার্মানিকে সমৃদ্ধ করেছেন।’‌ অবশ্য এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, কারণ বিজেপি যে আরএসএসের মতাদর্শ নিয়ে চলে তাদের নেতা গোলওয়ালকর তাঁর ‘উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইন্ড’ বইয়ে বলেছেন, ‘জাতি এবং তার সংস্কৃতির বিশুদ্ধতা বজায় রাখার জন্য জার্মানি সেমেটিক জাতি— ইহুদিদের— শুদ্ধকরণ করে বিশ্বকে বিস্মিত করেছেন। এখানে তার সর্বোচ্চ জাতীয় গর্ব প্রকাশ করা হয়েছে। জার্মানি দেখিয়েছে যে–‌সমস্ত জাতি এবং সংস্কৃতির মূলগত পার্থক্য রয়েছে তাদের একটি ঐক্যবদ্ধ জাতিতে সংগঠিত করা প্রায় অসম্ভব, যা আমরা যারা হিন্দুস্থানে থাকি তাদের কাছে শিক্ষণীয়।’‌
বিজেপি ও আরএসএসের গণতান্ত্রিক–‌ ধর্মনিরপেক্ষ–‌ গণতান্ত্রিক শিক্ষা ধ্বংস করার পরিকল্পনা, ফ্যাসিবাদের জমি প্রস্তুত করা ও দেশকে মধ্যযুগে নিয়ে যাবার হীন অপচেষ্টার বিরুদ্ধে শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, ছাত্র, সমস্ত শিক্ষানুরাগী ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে প্রতিবাদে সরব হতে হবে এবং তা ব্যর্থ করার জন্য সর্বতোভাবে প্রয়াসী হতে হবে।

লেখক অবসরপ্রাপ্ত প্রধান, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা

জনপ্রিয়

Back To Top