দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৭০ বছরে অনেক কিছুতেই আমরা অনেক সাফল্য অর্জন করেছি। যে কয়েকটি বিষয়ে আমরা ব্যর্থ হয়েছি তার মধ্যে অন্যতম প্রধান স্বাস্থ্য। ভোর কমিটি ছাড়াও ডাঃ শ্রীনাথ রেড্ডি কমিশন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রস্তাব, কেন্দ্রীয় বাজেটের ৫% না হলেও অন্তত ৩% যেন স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় করা হয়। সেটা না করে সরকার সম্পূর্ণ অন্যদিকে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্যই আনতে চলেছে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশন (‌এনএমসি) বিল‌। এই বিল প্রসঙ্গে আসার আগে একটা জিনিস বলি, ডাক্তার–‌রোগীর যে অনুপাত হওয়া উচিত, তাতে এই মুহূর্তে ভারতবর্ষ পৃথিবীর পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় করা হয় মাত্র ১.৩৬ শতাংশ। যেটা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়মবিরুদ্ধ। স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় না বাড়ানোর ফলে একটা বেডে থাকতে হয় তিনজন রোগীকে! আর এর পাশাপাশি চিকিৎসা কেন্দ্রে থাকেন অপ্রতুল ডাক্তার, থাকে অসম্পূর্ণ পরিকাঠামো।
ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশন নামে যে বিলটি আনা হচ্ছে সেটা সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক, দমনমূলক, অবৈজ্ঞানিক এবং জনবিরোধী। এই কথাগুলো যে বললাম তার প্রত্যেকটির কারণ আছে। অগণতান্ত্রিক, কারণ যে মেডিক্যাল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া আছে তার অনেক ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে, কিন্তু সেটা একটা নির্বাচিত সংস্থা। নিয়মনীতি মেনে সেখানকার সদস্যরা নির্বাচিত হন। কিন্তু নতুন স্বাস্থ্য বিলে যে নতুন কমিটির প্রস্তাব রাখা হয়েছে সেখানে থাকবেন মূলত সরকারের ঠিক করে দেওয়া আমলারা, যাঁরা নির্বাচিত নন। সঙ্গে থাকার কথা কয়েকজন চিকিৎসকের। তা হলে যেটা দাঁড়াচ্ছে, দেশের স্বাস্থ্যনীতির নির্ধারক হবেন যাঁরা, তাঁদের বেশিরভাগই চিকিৎসক নন, সরকারি আমলা। এমনকী কমিশনের সর্বোচ্চ পদেও থাকবেন একজন অ–চিকিৎসক। দ্বিতীয়ত, এটা জনবিরোধী এবং বিজ্ঞানবিরোধী— যেটা ভয়ঙ্কর জায়গায় আমাদের দেশকে নিয়ে যাবে। অ্যালোপ্যাথি বা মডার্ন মেডিসিন সিস্টেমের যে মেডিক্যাল কাউন্সিল আছে এখন তার সঙ্গে আয়ুষ বা আয়ুর্বেদ, ইউনানি, হোমিওপ্যাথি, ম্যাগনেটোথেরাপি— এই সমস্ত বিষয়ের চিকিৎসকদের যোগ করে সারা ভারতে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের তালিকা তৈরি করা হবে! এটা একটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার! আর এটার মধ্য দিয়ে সমস্ত প্যাথিকে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসাপদ্ধতির সঙ্গে এক আসনে বসিয়ে একটা বকচ্ছপ বা হাঁসজারু ব্যবস্থা চালু করার ভয়ঙ্কর প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ ছাড়া এভাবে হাতুড়ে চিকিৎসা আর ক্রসপ্যাথিকে উৎসাহ দেওয়া ছাড়াও এই বিলের মাধ্যমে রাজনৈতিক বা ব্যবসায়ীদের তৈরি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোর পোয়াবারো হবে। বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলিতে ৬০% থাকবে ম্যানেজমেন্ট কোটা। ফলত চুলোয় যাবে মেধাভিত্তিক ভর্তির প্রথা।
একজন ডাক্তারি ছাত্রকে সাড়ে চার–‌পাঁচ বছর ধরে অনেকগুলো সেমিস্টার পরীক্ষা দিয়ে অপরিসীম পরিশ্রম করে তবেই ডাক্তারি পাস করতে হয়। এই বিলে ডাক্তারি পাসের পরেও গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো একটি নতুন লাইসেন্সিং পরীক্ষার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। অথচ আয়ুষ চিকিৎসকদের তিন সপ্তাহের একটি ব্রিজ কোর্স করিয়ে এমবিবিএসের সমমর্যাদা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় স্বাস্থ্য বিষয়টা আমাদের দেশে কেন্দ্র এবং রাজ্যের যৌথ তালিকাভুক্ত। এই বিল এলে রাজ্যের মেডিক্যাল কাউন্সিলগুলোর শুধু স্বাতন্ত্র‌্যই ক্ষুণ্ণ হবে না, তার অস্তিত্বও থাকবে কিনা সন্দেহ আছে। স্বাস্থ্যকে পুরোপুরি কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণাধীনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। 
এতে শুধু ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য–‌শিক্ষা ব্যবস্থার সর্বনাশ হবে তাই নয়, সমস্যা জর্জর স্বাস্থ্য পরিষেবা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে। ব্যক্তিগত এবং সমষ্টিগতভাবে একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি সর্বান্তকরণে এর বিরোধিতা করছি।‌

ডাঃ কৌশিক লাহিড়ী

জনপ্রিয়

Back To Top