তপোধীর ভট্টাচার্য- সাধারণ নির্বাচনের সাত দফা কার্যসূচিতে প্রথম দফা ইতিমধ্যে হয়ে গেল ১১ এপ্রিল। ৯১টি নির্বাচনী কেন্দ্রে ভোটাররা ভাল সংখ্যায় সাড়া দিয়েছেন। দ্বিতীয় দফায়, অর্থাৎ ১৮ এপ্রিল আমিও ভোটাধিকার প্রয়োগ করব শিলচরে। সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের সবাইকে ভাবতে হচ্ছে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে, এবারকার মূল কথাগুলি নিয়ে। এতে কোনও সন্দেহ নেই যে, ভারতের কোনও নির্বাচনই এমন মৌলিক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হয়নি। হয়তো জরুরি অবস্থার পরবর্তী ১৯৭৭ সালের নির্বাচন এর সঙ্গে খানিকটা তুলনীয়। দোর্দণ্ডপ্রতাপ ইন্দিরা গান্ধীকেও স্বৈরতন্ত্রী শাসনের জন্য ভারতের জাগ্রত জনগণ শাস্তি দিয়েছিল। আর, ৪২ বছর পরে সেদিনকার তুলনায় বহু গুণ বেশি সঙ্কটের মুখোমুখি আমরা। আমাদের বেছে নিতেই হবে জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে, সার্বিক বিনাশ ও পুনরুজ্জীবনের মধ্যে। সবচেয়ে বড় কথা, দাম্ভিক শাসকের প্রচারিত মিথ্যা ও দেশের বহুধা–‌তাড়িত মানুষের কাঙ্ক্ষিত সত্যের মধ্যে নির্দ্বিধায় বেছে নিতে হবে কী চাই এবং কোন্‌টা আদৌ চাই না। সুতরাং শাসক দল বেপরোয়া অতিনাটকীয় ভাবভঙ্গি ও কথার ফানুষ ছড়িয়ে এবং বহু হাজার কোটি টাকা খরচ করে বিভিন্ন চ্যানেল–সহ সামাজিক মাধ্যমে নিযুক্ত দলদাসদের সাহায্যে ভারতীয়দের মগজধোলাই অব্যাহত রেখেছে বলেই কি নিজেদের দায় আমরা ভুলে যাব?‌ না, তা হয় না। এবার আমরাও শাস্তি দেব ভেল্কিবাজ, মিথ্যা নায়ককে।
গত পঁাচ বছরে যতগুলি মেকি প্রতিশ্রুতি মুড়িমুড়কির মতো ছড়িয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি, তাদের হিসেব বুঝে নেওয়ার সময় এখন। কোথায় গেল বছরে দু’‌কোটি চাকরি, প্রত্যেকের ব্যাঙ্কের খাতায় পনেরো লাখ?‌ নোটবন্দি কীসের জন্যে?‌ কাদের স্বার্থে?‌ হাজার হাজার কোটি টাকা লুঠ করেও বিজয় মালিয়া,‌ নীরব মোদি,‌ মেহুল চোকসি পার পেয়ে যায় কেন?‌ শাসক দলের কোষাগারে এবং রাঘববোয়ালদের নিজস্ব ভঁাড়ারে লুণ্ঠিত ধনের কতটা বখরা ঠঁাই পেয়েছে?‌ তঁাবেদার চ্যানেলগুলির কীর্তনিয়ারা যতই মোদিধুন গাইতে থাকুক, রাফাল–‌কেলেঙ্কারির তিমি মাছ কি শাক দিয়ে ঢাকা গেছে?‌ কেন ৪৫ বছরে এখনই বেকারদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি?‌ কেনই–‌বা দেশের আর্থিক বিকাশের হার তলানিতে পৌঁছে গেছে?‌ বিভিন্ন দফায় যঁারাই ভোট দেবেন, মোদি–‌অমিত–‌অরুণদের এই সব জরুরি প্রশ্ন করতেই হবে। অবশ্য বিখ্যাত সেই উর্দু কবিতার পঙ্‌ক্তি আমরা শুনেছি:‌ ‘‌আমাদের হাজার বলা আর তোমার এক না শোনা’‌!‌
তবু, শাসক দলের রাজা–বাদশা–উজির এবং তাদের বেতনভুক ঢাক–‌বাজিয়েরা আমজনতার মগজে সন্ত্রাসী হানা চালিয়েই যাচ্ছে। যারা বেয়াদবি করে মোদিপ্রভুর নগরকীর্তনে দোহার হয় না, তাদেরই ‘‌দেশদ্রোহী’‌, ‘‌পাকিস্তানি’‌ বিশেষণ দিয়ে বাপান্ত করা হচ্ছে। এবার নির্বাচনে লক্ষ্য করছি, তারস্বরে প্রচারিত হচ্ছে:‌ এটা রাষ্ট্রবাদীদের সঙ্গে রাষ্ট্রদ্রোহীদের লড়াই।‌ কী সাঙ্ঘাতিক ফ্যাসিবাদী ঘোষণা!‌ ঠিক নাৎসি–জমানার 
ফুয়েরার হিটলারের ধরনে:‌ যারা বিনা প্রশ্নে স্বৈরতন্ত্রকে মান্যতা দেয় না, তারা সবাই দেশদ্রোহী। তার মানে, বিজেপি এ দেশে দেশপ্রেমের একমাত্র ঠিকাদার। সমস্ত বিরোধী 
দল অ্যান্টি–ন্যাশনাল। ‘‌নেশন কী’‌,‌ এই শিরোনামে রবীন্দ্রনাথ বহুপঠিত যে–‌প্রবন্ধটি লিখেছিলেন, শাসক দলের বাদ্যকরেরা তা পড়েছে কখনও, এতখানি দুরাশা করি না।‌ ‌ভারত কী, ভারতীয় পরম্পরার মানে কী, সহাবস্থান ও সহিষ্ণুতার তাৎপর্য কী‌, এ–‌সব বিষয়ে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথা ঘামায় না কখনও। সাধারণ নির্বাচনে কীভাবে সমস্ত রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে নির্লজ্জ ভাবে কাজে লাগিয়ে চলেছে ওরা, বিশেষ ভাবে নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি বলবৎ হওয়ার পরে (‌এবং কমিশনের বিভিন্ন সতর্কবার্তা সত্ত্বেও), তা ভোটাররা অবশ্যই লক্ষ্য করছেন। পুলওয়ামার শহিদ জওয়ানদের অকালমৃত্যু আর পাকিস্তানে তথাকথিত বিমান–‌হানার বৃত্তান্ত স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এবং তঁার দলীয় সভাপতি–সহ উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আর বহু ছোট–বড় নেতা দলের প্রচারে প্রতিদিনই বলে যাচ্ছেন নাটকীয় অঙ্গভঙ্গির সাহায্যে। এঁদের কাছে চক্ষুলজ্জা কেউ আশা করে না। কিন্তু খোলাখুলি সাম্প্রদায়িক প্রচারে এবং জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়ায় যেভাবে দেশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, এর দৃঢ় জবাব আসুক ওদের বর্জন করে।
এর আগেও ভারতের মানুষ দেশের বিভিন্ন প্রধানমন্ত্রীকে নির্বাচনী প্রচার করতে দেখেছেন, শুনেছেন। কিন্তু এবার যেভাবে এত বড় পদের মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত হতে দেখছেন এবং সমস্ত সৌজন্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আপত্তিকর বিদ্রুপ–সহ অপভাষা এন্তার প্রয়োগ করতে শুনছেন— এই অভিজ্ঞতা আগে হয়েছিল কি কখনও?‌ নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরে আয়কর, সিবিআই, ইডি প্রভৃতি দপ্তরকে বিরোধীদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে শাসক দল, তাতে কি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বিধ্বস্ত হয়ে যায়নি?‌ গত পঁাচ বছর ধরে ঘৃণা–বিদ্বেষ–আক্রোশকে যেভাবে সমস্ত অহিন্দু–সহ বিরোধী পক্ষের মানুষজনকে সন্ত্রস্ত করার জন্য ব্যবহার করতে করতে সাত পর্বের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, এতে দিবালোকের মতো স্পষ্ট, দেশের ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়ে গেছে। এবারকার ভোটের লড়াই তাই ফ্যাসিবাদ থেকে দেশকে বঁাচানোর লড়াই। আমাদের দেশে তো আমেরিকার ধঁাচে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা হয় না। বরং নির্বাচনের ফল বেরোনোর পরে সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দল বা সম্মিলিত গোষ্ঠী সংসদীয় নেতা নির্বাচন করে। প্রধানমন্ত্রী হন সেই ব্যক্তি। মোদির নামে ভোট চাইছেন কেন তবে বিজেপি–র প্রার্থীরা?‌ তা হলে কি এটা আসলে অশনি–‌সঙ্কেত?‌‌ ফ্যাসিবাদী অপশক্তি আমাদের সংবিধানকে তছনছ করে রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে পাল্টে দেওয়ার মতলব এঁটেছে কি?‌ তাই ভোট দিন সংবিধানকে বঁাচাতে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে অটুট রাখতে, দেশের মানুষকে বিদ্বেষপ্রবণ ধর্মান্ধদের হাত থেকে রক্ষা করতে। আমাদের ভোট হোক বজ্রের মতো অব্যর্থ।
বিশেষ ভাবে বাংলাভাষী হিন্দু–মুসলমানের বাড়তি দায়িত্ব রয়েছে। দিনের পর দিন বাঙালিদের ‘‌উইপোকা’‌র মতো অবাঞ্ছিত বলে ঘোষণা করছে যে আধিপত্যবাদী অপশক্তি, তাদের হিসেব কড়ায়–‌গন্ডায় মিটিয়ে দিতে হবে। অসমের লক্ষ লক্ষ বাঙালিকে এনআরসি–র অজুহাতে এরাই উৎখাত করতে চাইছে। হিটলারের মৃত্যু–শিবিরের আদলে তৈরি অসমের বন্দি–‌শিবিরে বিনা বিচারে যে–‌সব বাঙালিকে পশুর মতো খেঁায়াড়ে আটকে রাখা হয়েছে, তাদের মধ্যে ৪৬ জন আত্মহত্যা করেছেন, নয়তো অকালমৃত্যু বরণ করেছেন। এ তো জহ্লাদের দেশ নয় যে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কঁাদতেই থাকবে!‌ বাঙালিকে হিন্দু–মুসলমানে বিভাজিত করার খুড়োর কল, অর্থাৎ ‘‌নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল’‌–এর দোহাই এখনও দিচ্ছে শাসক দল। অসমের বাইরে পশ্চিমবঙ্গে এবং অন্যত্র এই বিলের নামে উস্‌কানি দেওয়া অব্যাহত রয়েছে। বাঙালির বিরুদ্ধে এই–‌যে ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র, ভোট হোক তারও প্রতিবিধান করার জন্য। ওরা সাপের পঁাচ নয়, পঞ্চাশ পা দেখে ফেলেছে। ওরা ভোটারদের এন্তার টাকা দিয়ে সর্বত্র কিনে নিতে চাইছে। এই লজ্জাহীন দুঃশাসনদের সীমাহীন স্পর্ধার বিরুদ্ধে কথা বলুক আমাদের প্রতিবাদী ভোট। প্রমাণিত হোক, এই ভোট গরিব নিরুপায় মানুষের হাতিয়ার।
দেশের ভাল–মন্দ পরম্পরা–ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এবারকার সাধারণ নির্বাচনে। তাই প্রতিটি কেন্দ্রে বেছে নিন সেই প্রার্থীকে, যে ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে দুঃশাসনদের স্পর্ধার বিরুদ্ধে অবিচল। আর, সবচেয়ে বড় কথা, ভোটারকেই এই জরুরি বিবেচনা করে নিতে হবে, বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী শাসক দলকে ভোটে হারানোর সম্ভাবনা কার সবচেয়ে বেশি। ভোট দেওয়ার আগে এ বিষয়েও নিঃসন্দেহ হতে হবে, সেই প্রার্থী উগ্র অসহিষ্ণুতা, মধ্যযুগীয় কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন কি না।‌ সাধারণ মানুষের জীবিকা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, নিরাপত্তা–‌সহ সমস্ত মৌলিক চাহিদা সম্পর্কে তঁার বক্তব্য কী।‌ 
এই মুহূর্তে শিলচরে অশনি–‌সঙ্কেত আরও স্পষ্ট। আধিপত্যবাদের প্রতীক অসমিয়া গামছা গলায় ঝুলিয়ে, অসমিয়া গান বাজিয়ে, ভাষা–শহিদের শহর শিলচরে আত্মঘাতী ও আত্মবিস্মৃত জনতার একাংশ আজ (‌২৯ চৈত্র)‌ রোড শো করেছে। এমন দৃশ্যও দেখতে হবে শিলচরে, দুঃস্বপ্নেরও অগোচরে ছিল। তবে এতেই প্রমাণিত, বাঙালিদের মধ্যে অনেকেরই জাতির আততায়ীদের সঙ্গে গলাগলি করতে অসুবিধা হচ্ছে না। এনআরসি–র চরম লাঞ্ছনাও কোনও কিছু শেখায়নি তাদের। বিজেপি–কে যদি উৎখাত করা না যায়, অসমে বাঙালি বঁাচবে না। পশ্চিমবঙ্গেও নয়, তার অনেক দুর্লক্ষণ ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। আবারও লিখছি, এবার নির্বাচনে যদি মিথ্যাচারী ও বিদ্বেষপ্রবণ শাসক দলকে সর্বত্র পর্যুদস্ত করতে না পারি, ভারত আর ভারত থাকবে না। চিরদিনের মতো অবান্তর হয়ে যাবেন রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি সুভাষ, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, নজরুল, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌, জীবনানন্দ। কঁাঠালের আমসত্ত্ব যেমন হয় না, হতে পারে না, তেমনই বাঙালিও অন্ধকারের অপশক্তির লেজুড় হতে পারে না। হয় মৃত্যু, নয় জীবন। হয় নিশ্চিত সর্বনাশ, নয়তো নতুন দেশ। বেছে নিতেই হবে এবারকার সাধারণ নির্বাচনে, কী চাইছি!‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top