৫ সেপ্টেম্বর ছিল শিক্ষক দিবস। কেমন আছেন আজকের শিক্ষকেরা?‌ কোন অবস্থানে দঁাড়িয়ে শিক্ষক–ছাত্র সম্পর্ক?‌ এই জরুরি প্রশ্নগুলি নিয়ে কিছু ভাবনা–‌দুর্ভাবনার কথা জানিয়েছেন  অশোক অধিকারী

১৯৬২ সাল। ড.‌ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ ভারতের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন। তাঁর গুণমুগ্ধ ছাত্র–‌ছাত্রীরা স্যরের কাছে তাঁর জন্মদিন ৫ সেপ্টেম্বর দিনটিকে ভাবগম্ভীর পরম্পরায় পালন করার অবদার নিয়ে হাজির হলেন। সবটা শুনে রাধাকৃষ্ণণ ছাত্র–‌ছাত্রীদের বললেন, ‘‌আমার প্রথম ও প্রধান পরিচয় আমি একজন শিক্ষক। সেজন্য আমার জন্মদিন সমগ্র শিক্ষক সমাজকে উপলক্ষ করে পালিত হলে সেটাই হবে আমার প্রতি সর্বোৎকৃষ্ট শ্রদ্ধাজ্ঞাপন’‌। সেই শুরু। তার আগে ১৯৫৮ সাল থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যবস্থাপনায় খুব সংক্ষিপ্ত একটি উদ্যোগ চালু থাকলেও তা আসলে প্রাণ পেল ১৯৬২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। সেই হিসেবে ‘‌শিক্ষক দিবস’‌ এবারে ৫৬ বছরে পা দিল। যিশু খ্রিস্টের ৫৫১ বছর আগে চীন দেশে জন্মেছিলেন বিশিষ্ট দার্শনিক ও শিক্ষক কনফুসিয়াস। তাঁর জন্মতারিখ ২৮ সেপ্টেম্বর দিনটিকে মান্যতা দিয়ে বিশ্বে প্রথম চীন দেশে শিক্ষক দিবস পালনের রেওয়াজ চালু হয়। পরবর্তীতে সমগ্র বিশ্বে মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে শিক্ষক সমাজের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার অঙ্গীকারে ১৯৯৩ সালের ৫ অক্টোবর ‘‌ইউনেস্কো’‌ ও ‘‌ওয়ার্ল্ড ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস’‌ যৌথভাবে ওই তারিখে ‘‌বিশ্ব শিক্ষক দিবস’‌ পালনের ঘোষণা করে। তা সমানভাবে বর্তমানেও চালু আছে। ২০১৮–‌র ৫ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবর সারাদেশে তথা মায় বিশ্ব প্রণাম জানাবে সমাজগড়ার কারিগরদের।
‘‌শিক্ষক’‌–‌এর সংজ্ঞা নির্ণয়ে স্মরণাতীতকাল থেকেই একটি প্রত্যয় গ্রথিত হয়ে আছে সমাজ মানসে। শিক্ষাবিদদের অভীক্ষায় নানা সময়ে নানা পর্যবেক্ষণ প্রণত আবেগে স্পষ্ট হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যেহেতু তা সমাজ নিরপেক্ষ কোনও তাতবাত নয়, তাই নির্দিষ্ট খাঁচায় ফেলে তার একটি ‘‌মার্কা’‌ করে দেওয়াও সম্ভব নয়। রাধাকৃষ্ণণ নিজেও যেমন শিক্ষকের মাত্রা নির্ণয়ে ‘‌মধ্যমেধা’‌, ‘‌উচ্চমেধা’‌, ‘‌উচ্চতর মেধা’‌, ও ‘‌অতি উচ্চমেধা’‌ এই চার প্রকার আঙ্গিকের কথা পেড়েছেন তাঁর ভাবনায়। কিন্তু জোর দিয়েছেন ‘‌অতি উচ্চমেধা’‌ সম্পন্ন শিক্ষকের দার্ঢ্যের ওপর। তিনি বলেছেন, ‘‌অতি উচ্চমেধা সম্পন্ন শিক্ষক’‌–‌ছাত্রদের পাঠদান ও গ্রহণে অনুপ্রাণিত করবেন, আর যে অনুপ্রেরণায় মাটি ও চারাগাছ এক কথায় শিক্ষক ও ছাত্র সুসম্পর্কের লালনপালনে ঋদ্ধ হবে, পরিশীলিত হবে। এখানে শিক্ষকের কোনও নোটবই পড়ে পরীক্ষা পাশের প্রসঙ্গই তিনি আনলেন না। যেটা তার বহিরঙ্গ। আন্তর্গত সত্যে উন্নীত হওয়ার অন্যতম সহায়ক বা অনুঘটক হলেন শিক্ষক নিজে। ভারতের জাতীয় শিক্ষানীতি (‌১৯৮৬)‌–তেও সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে 'No.‌ people can rise above the level of its teachers'‌। সেজন্যেই রবীন্দ্রনাথের‌‌‌ ‌‘‌অন্তরের শিশু’–‌কে শিক্ষকের অন্তঃকেন্দ্রে সর্বদা জাগিয়ে রাখতেই হয়। প্রসঙ্গত, প্রাজ্ঞঋষি শ্রীঅরবিন্দের একটি উক্তিও এ প্রসঙ্গে পাড়া যেতে পারে:‌ 'Every teacher should bear in mind that nothing can be taught, but everything can be learnt'‌‌। ‌খুঁজলে এ জাতীয় অনেক ভাবনার বিচ্ছুরণ নানা সময়ে মনীষার ভাবলোক থেকে সমক্ষে এসেছে। যেখানে ‌‌‌‌‌‘‌শিক্ষক’‌ নামক এই পবিত্র শব্দের বিনম্র উচ্চারণকে সালংকৃত করা হয়েছে নানা ভাবনায়। ড. ‌রাধাকৃষ্ণণের নামে তাঁর সভাপতিত্বে স্বাধীন ভারতে যে শিক্ষা কমিশন, সেখানেও সে কারণেই তিনি এই কমিশনের আদর্শ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিরূপণে যথার্থভাবেই শিক্ষা–‌শিক্ষক–‌ছাত্রছাত্রী, পাঠ্যক্রম, শিক্ষার মাধ্যম, নারীশিক্ষার মতো বিষয়গুলিকেই সবার আগে নজর দেওয়ার কথা বলেছেন। আর পরিবর্তনশীল জগৎবীক্ষায় কর্মযোগ ও তার সঙ্গে সম্পৃক্ত যে নীতিবোধ ও মূল্যবোধ তাকে অষ্টপ্রহর হৃদয়ে লালিত করার কথা বলেছিলেন। শিক্ষার লক্ষ্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি আরও এক নির্দিষ্ট মাত্রায় নিজের ভাবনাকে প্রক্ষিপ্ত করেছেন। 'A quest for democracy of justice liberty, equality and fraternity'‌‌।
‌‌১৯৪৭ সালের ১৫ ‌আগস্ট রাত ১২টার প্রাহ্নমুহূর্তে দেওয়া তাঁর ভাষণেও স্বাধীন ভারতের প্রতি একরাশ আশা, উদ্দীপনা আর আবেগের প্রতিপ্রভা আমাদের বারবার তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাবনত করে। তিনি বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘‌যদি আমরা প্রশাসনের উচ্চস্তরে দুর্নীতি নির্মূল করতে না পারি, সকল প্রকার স্বজনপোষণ নিশ্চিহ্ন করতে না পারি, ক্ষমতার মোহ, মুনাফা লিপ্সা, কালোবাজারি সমূলে উৎপাটন করতে না পারি, সেই সঙ্গে জনজীবনের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর উৎপাদনবৃদ্ধি ও তার সুষম বণ্টনের ব্যবস্থা করতে না পারি— তা হলে আমরা স্বাধীন ভারতের মূল লক্ষ্যে কখনওই পৌঁছতে পারব না’‌। সদ্যপালন করে আসা গৌরবের স্বাধীনতার ৭২ বছরে দাঁড়িয়ে রাধাকৃষ্ণণ–‌এর এ ভাষণের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেই যাচ্ছে নিরন্তর। 
কেমন আছে আজকের শিক্ষকদিবস!‌ কেমন আছে শিক্ষক ও ছাত্রের পদ্মমুখ টান। অনুভবের আর আবেগের জায়গা। ব্রত উদ্‌যাপনের অতন্দ্র প্রহরীকে কেন বারবার কষ্টিপাথরে যাচাই করছে সমাজ!‌ কেন ব্রত আর পেশার মানদণ্ডে দণ্ডিত হতে হচ্ছে মানুষ গড়ার কারিগরদের। রাধাকৃষ্ণণ যে নীতিবোধ আর মূল্যবোধের কথা বলতেন, কেমন আছে তারা এই বাজার সর্বস্ব আর্থ সামাজিক পরিমণ্ডলে। ১৯৬২–‌তে রাধাকৃষ্ণণ যখন রাষ্ট্রপতি হলেন, তখন তাঁর বেতন ছিল দশ হাজার টাকা। তার থেকে মাত্র দু হাজার টাকা রেখে তিনি বাকি আট হাজার টাকা ফিরিয়ে দিতেন শ্রদ্ধা ও সম্মানের সঙ্গে, যাতে বাকি অর্থ সমাজকল্যাণে ব্যয় করা হয় সেজন্য। শিক্ষাবিদ, শিক্ষাবেত্তাও গুরুশ্রেষ্ঠ রাধাকৃষ্ণণ–‌এর কাছেই মূল্যবোধ শিক্ষার প্রাথমিক পাঠ আমাদের সম্পূর্ণ হওয়ার কথা। কিন্তু এখনও সাহসের ওপর ভর দিয়ে দৃপ্ত কণ্ঠে দাপটের সঙ্গে বলা যায়, আমাদের দেশ এখনও আমেরিকা হয়ে যায়নি। যেখানে ছাত্র ও শিক্ষকের সম্পর্ক পণ্য মানসিকতার সরু সুতোর ওপর দুলছে। শিক্ষক ক্লাসে এলে ওপরের ক্লাসের ছাত্ররা ডেস্কের ওপর পা তুলে সমানে সিগারেট টানে। পা নামায় না। শিক্ষকদের শ্রদ্ধা না করার কারণ হিসেবে তারা বলে ‘‌উই পে ফর দেম’‌। আমাদের কাছে যা কষ্টকল্পিত। এখানে এখনও সমানে ‘‌শিক্ষক দিবস’‌–‌এর অনুষ্ঠানে শিক্ষকের জন্য চন্দনের ফোঁটা, গোলাপ আর একটি শ্রদ্ধাজড়িত প্রণাম বরাদ্দ থাকে। বাসে উঠলে স্যর বা দিদিমণিকে বসার সিট ছেড়ে দেয় আমাদের ছাত্রসমাজ। এখনও খেলার মাঠে শিক্ষক–‌ছাত্র ফুটবল খেলায় ছাত্ররা জেতে। গুরুপূর্ণিমার দিন ভারতরত্ন শচীন তাঁর গুরু রমাকান্ত আচরেকরের বাড়িতে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে আসেন। কেরলের বন্যায় মালাপ্পুরমের ভেঙ্গারা গাঁয়ের জয়সাল কেপি তাঁর নিজের পিঠকে পেতে দেন সিঁড়ি হিসেবে। যাঁর পিঠের ওপর পা দিয়ে বন্যাদুর্গতরা পার হন। ত্যাগের উৎসব ইদ–‌এর দিনে বাবার কাছে বায়না করে পঞ্চাশ টাকা দিয়ে আসে রওশনের কন্যা স্যর আর ম্যামেদের তোলা কেরল তহবিলে। টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে ত্রাণ–তহবিলে দান করে আমাদের প্রিয় ছাত্রছাত্রীরা। এখানেই তৈরি হয়ে যায় শিক্ষক দিবসের মূল্যবোধের শিক্ষা। 
মনে পড়ছে অমর্ত্য সেনের লেখা একটি কথা, ‘‌প্রতিষ্ঠানগুলিকে যতই উৎকৃষ্ট বলে ধরে নেওয়া হোক না কেন, জগতে কী ঘটে যাচ্ছে সে সম্পর্কে সচেতন না থাকলে তাদের উপর ভরসা রাখা যায় না’‌। ঠিকই, বাজার এখন আমাদের যাবতীয় খুঁটিনাটি হাসিকান্না, সম্পর্ক, চাওয়াপাওয়া সবই ঠিক করে দিচ্ছে। নিউক্লিয়ার পরিবারে সন্তান এখন বাবা–‌মা’‌র স্বপ্নপূরণের যন্ত্র। সন্তান জন্মের পরই মা–‌বাবার সিদ্ধান্তে সিলমোহর পড়ে যায়। একে জয়েন্টে বসাব। শৈশবের আতুপাতু আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, আবেগ আর সম্পর্কের স্থানগুলিকে স্থানু করে দিচ্ছে আমাদের আকাশচুম্বী চাহিদা। চাহিদা আর জোগানের অর্থনীতির ক্লাস থেকে পালিয়ে যেতে চায় শিশুমন। অভিভাবক সন্তান আর শিক্ষকের মধ্যে একটি দূরত্ব বাড়তেই থাকে সযত্নে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একলা হয়ে গিয়ে তারা নিজের কাছে বিচ্ছিন্ন, অচেনা–‌অজানা নিজেরই তৈরি করা এক জগৎ–‌এর অধিবাসী হয়ে মনমরা মেঘলা আকাশে বিচরণ করে। আর তখনই ‘‌ব্লু–‌হোয়েল’‌–‌অথবা ‘‌মোমো’‌–‌র আত্মসর্বস্ব একবগ্গা জীবনের ‘‌ফ্লেন্ড রিকোয়েস্ট’‌ তাড়া করে ফেরে তার না বুঝে ওঠা জীবনকে। তাই এমসিকিউ, এসএকিউ আর টিক দেওয়ার জগৎ থেকে সরিয়ে পরীক্ষা পাশের পড়ার বাইরে আরও কিছু অবান্তর কথা বলার স্বাধীনতা শিক্ষক অভিভাবক হিসেবে আমাদের করে দিতেই হবে তাদের। নইলে লেখাপড়ার প্রকৃত ‘‌উদ্দেশ্য’‌ হেরে ভূত হয়ে যাচ্ছে ‘‌ব্যবস্থা’‌র কাছে। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাকে ‘‌বাহন’‌ না করে ‘‌বহন’‌ করার যে আক্ষেপ তার থেকে কীভাবে আমাদের ছাত্রছাত্রী সমাজকে ভারবহনের লজ্জা থেকে আনন্দপাঠে নিয়ে যাওয়া যায় সে চর্চা বিক্ষিপ্ত স্তরে শুরু হলেও এখনও অচলায়তনের ‘‌ডাকের সাজ’‌ ঘোচাতে সবস্তরে আমাদের দৈন্যতা অব্যাহত আছে। সেই একা হয়ে যাওয়া অভিমানী ছাত্র বা ছাত্রটির ঊর্ধ্বে দাঁড়িয়ে আমাদের ছাত্রসমাজ যেন বলতে পারে ‘‌মেরেপাশ ব্যাঙ্ক ব্যালান্স হ্যায়। বাংলো হ্যায়’‌ নয়। ‘‌মেরে পাশ মা হ্যায়’‌। ‘‌স্যর হ্যায়, ম্যাম হ্যায়’‌। বিবেক, মুল্যবোধ আর সারা জীবনের সঞ্চয় পাথেয় করে আজকের শিক্ষক দিবস সাহসে ভর করে গেয়ে উঠুক, ‘‌মোরা শিক্ষক,‌ মোরা শিক্ষক, মোরা শিক্ষক/‌, সকলের মোরা পরমাত্মীয় ধরণীর মোরা দীক্ষক’‌। ‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top