ধ্রুবজ্যোতি নন্দী- অর্থনীতির বৃদ্ধিহার ২০১৯–২০ অর্থবর্ষের শেষ ত্রৈমাসিকে ৩.১ শতাংশে নেমে আসা, বা সম্পূর্ণ অর্থবর্ষের বৃদ্ধিহার গত ১১ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম ৪.২ শতাংশে নেমে যাওয়ার চেয়েও বড় সমস্যা হল, দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার বর্ষপূর্তির স্ফূর্তিতে নরেন্দ্র মোদি, তাঁর মন্ত্রিসভা, উপদেষ্টামণ্ডলী, বা সমর্থকরা কেউ এই সব সংখ্যার মধ্যে সঙ্কটের কোনও আভাস দেখতে পাচ্ছেন না। তাঁরা অনেকেই বরং এই বেহাল পরিস্থিতির দায় চাপাতে চেয়েছেন করোনা সংক্রমণের ওপর। কিন্তু সত্যিটা হল, বছরের শেষ ত্রৈমাসিকের ৯১ দিনের মধ্যে লকডাউনের ফলে অর্থনীতির চাকা বন্ধ ছিল মাত্র শেষ ৭ দিন। সারা বছরের হিসেব ধরলে ৩৬৫ দিনের শেষ ৭ দিন। করোনা সংক্রমণ দেশের অর্থনীতির ওপর কী ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে, এটা তার হিসেব নয়।
কেন্দ্রের পরিসংখ্যান মন্ত্রকের অধীন ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিক্যাল অফিস বা এনএসও শুক্রবার যে হিসেব দিয়েছে, তার থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, করোনা ঠেকাতে অর্থনীতির চাকা বন্ধ করে দেওয়ার আগে ঠিক কী অবস্থায় ছিল দেশের অর্থনীতি। সেই হিসেব দেখাচ্ছে, ২০১৬–১৭ অর্থবর্ষে যে জিডিপি–র বৃদ্ধিহার ছিল ৮.২ শতাংশ, টানা ৩ বছর ধরে নামতে নামতে ২০১৯–২০ অর্থবর্ষে সেটাই অর্ধেক হয়ে নেমে এসেছে  ৪.২ শতাংশে। তার মধ্যে ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ— এই ৩ মাস অর্থনীতির বৃদ্ধিহার ছিল ৩.১ শতাংশ। সেটাও আবার প্রাক্তন মুখ্য পরিসংখ্যানবিদ প্রণব সেনের মতে বাড়িয়ে দেখানো। তিনি বলেছেন, অন্তত ২ লক্ষ কোটি টাকার জল আছে এই হিসেবে। তবে সরকারি হিসেবেই এই ৩ মাসে ম্যানুফ্যাচারিং সেক্টর বা কারখানায় পণ্যের উৎপাদন বাড়ার বদলে কমেছে ১.৪ শতাংশ। নির্মাণক্ষেত্রের অবস্থা তার চেয়েও খারাপ। সঙ্কোচনের হার ২.২ শতাংশ। এর পর এসেছে করোনার ধাক্কা। যে আঘাতকে টেলিভিশন ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘‌ভারতের অর্থনৈতিক প্রগতির এক অনন্য সুযোগ!’‌ সেই ‘সুযোগ’–কে কাজে লাগাতে ২০ লক্ষ কোটি টাকার যে ত্রাণ সংস্থান করেছে মোদি সরকার, সে ত্রাণ কতটা কার্যকরী হয়েছে তার বিশদ হিসেবও পাওয়া যাবে আরও কিছুটা পরে।
এখন প্রাক্‌–করোনা অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সরকারি পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, অর্থনীতির বৃদ্ধিহার টানা ৩ বছর ধরে নেমেই চলেছে। তার সঙ্গে সঙ্গে নামতে থেকেছে শিল্পে নতুন বিনিয়োগ এবং দেশের মানুষের খরচ করার ক্ষমতা। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে হুহু করে বাড়তে থেকেছে বেকারত্ব। বেকারত্বের এমন ভয়াবহ চেহারা ভারত দেখেনি গত অর্ধশতাব্দী জুড়ে। করোনা–বিপর্যয় শুরু হওয়ার পর প্রথম মাসে, মানে এপ্রিলে দেশের ৮টি মূল শিল্পক্ষেত্র, যাদের কোর সেক্টর বলা হয়, সেখানে আঘাতের মাত্রাটা কী বিশাল, তারও একটা প্রাথমিক হিসেব দিয়েছে এনএসও। তাতে বলা হচ্ছে, এপ্রিলে দেশে সিমেন্ট উৎপাদন কমেছে ৮৬ শতাংশ, ইস্পাত কমেছে ৮৪ শতাংশ, বিদ্যুৎ কমেছে ২৩ শতাংশ, কয়লা উৎপাদন কমেছে ১৬ শতাংশ। অথচ এই গভীর সঙ্কট নিয়ে প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী বা কেন্দ্রের শাসক দলের ছোট–বড় কোনও নেতার মুখে কোনও উদ্বেগের কথা নেই! শুরুতে সেই জন্যেই বলছিলাম, এই নীরবতাই আজ দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা। এবং, সমস্যা চিনতেই পারছেন না যাঁরা, তাঁদের মাথা থেকে সেই সমস্যার সমাধান বেরোবে, সেটা আশা করাও বাতুলতা। করোনা–বিপর্যয় মোকাবিলার জন্যে সরকারি তহবিলে হাত প্রায় না দিয়ে মূলত রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ভরসায় যে আপৎকালীন অর্থ সরবরাহের কথা ঘোষণা করা হয়েছে, তার ছত্রে ছত্রে এই অপরিণামদর্শিতা।
কিন্তু অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে? সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা এখন নিরন্তর গবেষণা করে চলেছে করোনা–বিপর্যয়ের মাত্রা নিয়ে, অর্থনীতির সম্ভাব্য সঙ্কোচন নিয়ে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর শক্তিকান্ত দাস স্বীকার করেছেন, চলতি বছরে অর্থনীতি সঙ্কুচিত হবে। কতটা? তিনি এখনই মুখ খুলতে চাননি। এদিকে, ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর অ্যাপ্লায়েড ইকনমিক রিসার্চ এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক ফিনান্স অ্যান্ড পলিসি–র সূত্রে পাওয়া পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে জুন— এই ৩ মাসে শিল্পক্ষেত্র এবং পরিষেবা ক্ষেত্রের সম্ভাব্য বৃদ্ধিহার যথাক্রমে (‌–)‌৫৪ শতাংশ‌ ও (‌–)‌১৬ শতাংশ। ফলে দেশের অর্থনীতি ২৬ শতাংশ সঙ্কুচিত হওয়ার আশঙ্কা। বলা হয়েছে, তারপর থেকে অর্থনীতির চাকা ঘুরবে এতই ধীরে যে, ২০২০–২১ অর্থবর্ষের শেষেও বৃদ্ধিহার হবে ঋণাত্মক, সামগ্রিক অর্থবর্ষে অর্থনীতি সঙ্কুচিত হবে ১৩ শতাংশ। আর্থিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণের জন্যে বিখ্যাত মার্কিন সংস্থা গোল্ডম্যান স্যাক্স বলছে, অতটা নয়, সারা বছরের হিসেবে সঙ্কোচন হবে ৫ শতাংশ। জাপানি সংস্থা নোমুরার অনুমানও কাছাকাছি, (‌–)‌৫.২ শতাংশ। কিন্তু এহেন বিপদবার্তা সম্যক অনুধাবন করে তার প্রতিকারের ব্যবস্থা করার মতো কোনও যোগ্যতার পরিচয় কি গত ৬ বছরে দিতে পেরেছে নরেন্দ্র মোদির সরকার? নাকি, অভিজিৎ বিনায়ক ব্যানার্জি, কৌশিক বসু, রঘুরাম রাজনের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশিষ্ট অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা যখন যে পরামর্শ দিয়েছেন, তাকে অগ্রাহ্য করেই চলে এসেছে এই সরকার গত ৬ বছর ধরে? জল যখন গলা পর্যন্ত উঠে এসেছে, তখনও বর্ষপূর্তির স্ফূর্তিতে তো কোনও বিরাম দেখা যাচ্ছে না।‌

চিত্রণ: অর্ঘ্য চৌধুরি

জনপ্রিয়

Back To Top