সুদীপ্ত চক্রবর্তী: সম্প্রতি বিজেপি’‌র সর্বভারতীয় সভাপতির ‘‌রোড শো’‌ চলাকালীন গেরুয়া সংস্কৃতির ধারক কিছু গুন্ডা বিধান সরণির ওপর বিদ্যাসাগর কলেজে বাংলার নবজাগরণের প্রাণপুরুষ বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙেছে। স্বাভাবিক কারণেই গোটা রাজ্য এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় রাগে–ঘৃণায় সোচ্চার হয়েছে। যদি ধরেও নেওয়া যায়, ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ঘটনার ইন্ধন হিসেবে যথেষ্ট প্ররোচনা দেওয়া হয়েছে এবং যার পরিণতি এই মূর্তি ভাঙা, তা হলে স্বাভাবিক ও সুস্থ মস্তিষ্কে অন্য একটি প্রশ্ন চলে আসে। যারা প্ররোচনা দিল, তাদের কিছু না করে বিদ্যাসাগরের মূর্তির ওপর এরকম আক্রমণ কেন? বিদ্যাসাগর তো প্ররোচনা দেননি! 
তা হলে এই ঘটনার পিছনে নিশ্চয়ই অন্য কোনও কারণ আছে। আসলে গেরুয়া সংস্কৃতির ধারক ও বাহকদের লক্ষ্য বিদ্যাসাগর নন, লক্ষ্য বিদ্যাসাগরের ভাবমূর্তি, লক্ষ্য বাংলার নবজাগরণ। বাংলার নবজাগরণ কোনও সময়ই জাতপাত বা সাম্প্রদায়িকতার বেড়াজালে আটকে পড়েনি। নবজাগরণের প্রবক্তারা সব সময় এগুলোর বিরুদ্ধেই কথা বলেছেন। সেখানেই এই গেরুয়া–বাহিনীর রাগ। তাই বিদ্যাসাগর। 
প্রখ্যাত বাঙালি পণ্ডিত কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য (১৮৪০-১৯৩২) দীর্ঘ চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় বিদ্যাসাগরের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘‌বিদ্যাসাগর নাস্তিক ছিলেন, এ কথা তোমরা বোধহয় জানো না; যাঁহারা জানিতেন, তাঁহারাও কিন্তু সে বিষয় লইয়া তাঁহার সঙ্গে কখনও বাদানুবাদে প্রবৃত্ত হইতেন না।... পাশ্চাত্য সাহিত্যের ভাব–বন্যায় এ দেশের ছাত্রের ধর্মবিশ্বাস টলিল, চিরকাল–পোষিত হিন্দুর ভগবান সেই বন্যায় ভাসিয়া গেলেন, বিদ্যাসাগরও নাস্তিক হইবেন, তাহাতে আর বিচিত্র কী?’‌ (বিপিনবিহারী গুপ্ত–সঙ্কলিত ‘‌পুরাতন প্রসঙ্গ’‌, বিদ্যাভারতী, নতুন সংস্করণ)
আর তৎকালীন সময়ে বিদ্যাসাগরের আত্মমূল্যায়ন কী ছিল? ‘‌ব্রজবিলাস’‌–এ ঈশ্বরচন্দ্র লিখেছেন, ‘‌এমনকী পবিত্র সাধুসমাজের প্রাতঃস্মরণীয়, বহুদর্শী চাঁই মহোদয়েরা তাঁহাকে (ঈশ্বরচন্দ্র) খ্রিস্টান বলিয়া থাকেন।’‌ (দেবকুমার বসু সম্পাদিত ‘‌বিদ্যাসাগর রচনাবলী’‌, চতুর্থ খণ্ড)
ছোটবেলা থেকেই আমরা জেনে এসেছি, বিদ্যাসাগর ছিলেন ‘‌দয়ার সাগর’‌। অসহায়, পীড়িত দরিদ্র নরনারীর সেবায় অকৃপণভাবে আজীবন বিদ্যাসাগর দান করে গেছেন, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। কর্মাটাঁড়ে বহু গরিব সাঁওতালকে তিনি চাল–ডাল থেকে শুরু করে জামাকাপড় দিয়ে নানাভাবে সেবা করেছেন। জনৈক মেথরানির কলেরা হলে তাঁকে চিকিৎসা করে সুস্থ করাই শুধু নয়, অনেক দুঃস্থকে তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করে সারিয়ে তুলেছেন। শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্নের লেখা ‘‌বিদ্যাসাগর চরিত’‌ থেকে বিদ্যাসাগর সম্পর্কে জানা যায়, ‘‌পূজার সময় কার্মাটাঁরের সাঁওতালদের জন্য প্রতি বৎসর সহস্র টাকার অধিক বস্ত্র ক্রয় করিয়া বিতরণ করিতেন। শীতকালে জঙ্গলপ্রদেশে অত্যন্ত শীত হয়, সাঁওতালদের গায়ে শীতবস্ত্র নাই দেখিয়া প্রতি বৎসর যথেষ্ট মোটা চাদর ও কম্বল ক্রয় করিয়া তাহাদিগকে বিতরণ করিতেন।’‌ প্রসঙ্গত, শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন ছিলেন বিদ্যাসাগরের সহোদর ভাই। কোনও মন্দির প্রতিষ্ঠা বা দেবদেবীর পুজোয় বিদ্যাসাগর কোনও অর্থ ব্যয় করেননি। এই সত্যতা তাঁর বিখ্যাত উইল দেখলেই পরিষ্কার বোঝা যায়। স্বাভাবিক কারণে বর্তমান রামপন্থীরা বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙবেন, এতে আশ্চর্যের কী!
বিদ্যাসাগর প্রকাশ্যে ধর্মীয় ভণ্ডামির বিরুদ্ধে ছিলেন। তিনি নিজের মা–বাবা ছাড়া অন্য কোনও দেবদেবীর মূর্তি বা ছবির কাছে মাথা নত করেননি। শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্নের ‘‌বিদ্যাসাগর চরিত’‌ অনুসরণে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন— বিদ্যাসাগর পিতৃদর্শনে কাশীতে গমন করিলে, সেখানকার অর্থলোলুপ কতকগুলি ব্রাহ্মণ তাঁহাকে টাকার জন্য ধরিয়া পড়িয়াছিল। বিদ্যাসাগর তাহাদের অবস্থা ও স্বভাবদৃষ্টে তাহাদিগকে দয়া অথবা ভক্তির পাত্র বলিয়া জ্ঞান করেন নাই, সেইজন্য তৎক্ষণাৎ অকপটচিত্তে উত্তর দিলেন, ‘‌এখানে আছেন বলিয়া আপনাদিগকে যদি আমি ভক্তি বা শ্রদ্ধা করিয়া বিশ্বেশ্বর বলিয়া মান্য করি, তাহা হইলে আমার মত নরাধম আর নাই।’‌ ইহা শুনিয়া কাশীর ব্রাহ্মণেরা ক্রোধান্ধ হইয়া বলিলেন, ‘‌তবে আপনি কী... মানেন?’‌ বিদ্যাসাগর উত্তর করিলেন, ‘‌আমার বিশ্বেশ্বর ও অন্নপূর্ণা উপস্থিত এই পিতৃদেব ও জননীদেবী বিরাজমান।’‌
বিদ্যাসাগর যে কাশীর ব্রাহ্মণ, বিশ্বেশ্বরকে তাচ্ছিল্য করে নিজের বাবা–মা–‌‌কে সকলের ওপরে স্থান দিলেন, বর্তমানে সেই কাশীর হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী প্রার্থী নরেন্দ্র মোদি এবং তার দলের দ্বিতীয় ব্যক্তি অমিত শাহের দলবল বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভূলুণ্ঠিত করবে তাতে অবাক বা আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।
বিদ্যাসাগর যে নাস্তিক ছিলেন, ঈশ্বরে তিনি যে বিশ্বাস করতেন না, ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তিনি চিরকাল অবস্থান নিয়েছেন তা তাঁর বিভিন্ন লেখায়, তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন লেখায় বারবার ফুটে উঠেছে। অনেকেই এই পৃথিবী–‌সহ মানবজাতি সৃষ্টির নেপথ্যে একজন স্রষ্টার কল্পনা করেন, ঈশ্বরের হাত আছে বলে বিশ্বাস করেন। বিদ্যাসাগরের মধ্যে সেই বিশ্বাস ছিল না বা থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবনের নানা অভিজ্ঞতায় সেই বিশ্বাসকে ত্যাগ করেছিলেন। একবার পুরীর সমুদ্রে এক স্টিমার-ডুবির ফলে প্রায় ৮০০ যাত্রী ডুবে মারা যান। ওই খবর পেয়ে বিদ্যাসাগর অত্যন্ত ব্যথিত হন এবং সেই প্রসঙ্গে যা বলেছিলেন তা চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখিত ‘‌বিদ্যাসাগর’‌ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে। বিদ্যাসাগর যদি বর্তমান সময়ে ওই কথা বলতেন, তাহলে নিশ্চিত করে বলা যায় মোদি–শাহ’‌রা তাঁকে পাকিস্তানে পাঠানোর নিদান দিতেন বা ‘‌আরবান নকশাল’‌ নামে দাগিয়ে দিতেন। বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, ‘‌দুনিয়ার মালিক কি আমাদের চেয়ে নিষ্ঠুর যে, নানা দেশের নানা স্থানের অসংখ্য লোককে একত্রে ডুবাইলেন! আমি যাহা পারি না, তিনি পরম কারণিক মঙ্গলময় হইয়া কেমন করিয়া ৭০০–৮০০ লোককে একত্রে ডুবাইয়া ঘরে ঘরে শোকের আগুন জ্বালিয়া দেন! দুনিয়ার মালিকের কি এই কাজ? এই সকল দেখিলে কেহ মালিক আছেন বলিয়া সহসা বোধ হয় না।’‌
 

জনপ্রিয়

Back To Top