শঙ্কু বসু- আমফান বিদায় নিয়েছে পাক্কা ৯ ‌দিন। যাবতীয় ঝড়ঝাপ্টা, বিপর্যয়, বিপদ সামলে শহর ফিরছে স্বাভাবিক ছন্দে। এই ক‌দিনেই বিপর্যস্ত রাজ্য সারিয়ে ফেলেছে তার শরীরের ৯৮ থেকে ৯৯ ভাগ ক্ষতচিহ্ন। ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়েছে। কারণ ঝড় থেমেছে কিন্তু ভাবনাটা অন্য জায়গায়। কিছুতেই থামছে না সমালোচনার ঝড়। বিরোধিতা আর বাঁকা কথার গতি যেন আমফানের চেয়েও মারাত্মক। নবম দিনেও তা সমান তাজা, একই রকম তীক্ষ্ণ। বিরোধীপক্ষ তো দেশের উন্নতির দোসর। অন্তত সংবিধান তাই বলে। শাসকদলের ভুলত্রুটি চিনিয়ে দিয়ে দেশের উন্নয়নে সে থাকে বিবেকের ভূমিকায়। কিন্তু আমফান–‌পরবর্তী বঙ্গে কার্যত উলট–‌পুরাণ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির কর্মদক্ষতা ও তৎপরতাকে খাটো করে দেখাতে আয়োজনের শেষ নেই। কোমর বেঁধে আসরে নেমেছে বিরোধী পক্ষ। একে করোনা, তার ওপর বিষফোড়া আমফান। কী কী করা যেতে পারে, কী করলে আরও ভাল হয়, এসব আলোচনা ও পরামর্শই যখন বিরোধীদের কাছ থেকে রাজ্য সরকারের পাওনা ছিল, তখন সমালোচনা, শ্লেষ আর বিদ্রুপ ছাড়া মুখ্যমন্ত্রীর ঝুলিতে আর বিশেষ কিছু যাচ্ছে না!‌ সত্য সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ!‌ তাহলে ত্রুটি কি ছিল না রাজ্য প্রশাসনের?‌ নিশ্চয়ই ছিল। আমফানের অন্তত সাতদিন আগে সরকার এবং বিদ্যুৎ পর্ষদের তৈরি হওয়া উচিত ছিল। তাহলে ১ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষের দুর্দশা কিছুটা ঠেকানো যেত। কিন্তু এটা তো অভিজ্ঞতার অভাব। কারণ, আমফানের মতো এমন ভয়াবহতা ইতিপূর্বে দেখেছেন কিনা মনে করতে পারছেন না ৯০ বছরের প্রবীণও!‌ 
আমেরিকায় বছরে স্বাভাবিক নিয়মেই পাঁচ–ছ‌টা মারাত্মক ঘূর্ণিঝড় (‌হ্যারিকেন)‌ হয়। তাই তারা জানে, কীভাবে এই দৈত্যের দামামার মোকাবিলা করা সম্ভব। প্রতিটি ঝড়ের আগে আমেরিকায় ‘‌হ্যারিকেন কিট’‌ বিক্রি হয়। যেখানে পুঙ্খানুপুঙ্খ নির্দেশ থাকে ঝড়ের আগে ও পরে কী কী করতে হবে। ওদেশে ঝড় আসার আগেই বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। ঝড় থামার ১২ ঘণ্টার মধ্যে আলোও জ্বালানো যায় না। তার মধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা বিধ্বস্ত এলাকার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন। এ সবই অভিজ্ঞতার নিরিখে। কিন্তু একজন মুখ্যমন্ত্রী শুধুমাত্র একটা টিমওয়ার্ককে সঙ্গী করে এতবড় বিপর্যয় সামলে উঠছেন মাত্র ৮–৯ দিনে, এ ঘটনা ইতিহাসে বিরল।‌ দমকল, সেনা, বিদ্যুৎ পর্ষদ, পুলিশ, অন্য রাজ্যের বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং প্রশাসনের মিলিত প্রয়াসই এই মহাযজ্ঞের নেপথ্যে। যার প্রধান পুরোহিত মমতা ব্যানার্জি। একটা এতবড় ঝড়ের পর বিদ্যুৎব্যবস্থাকে সচল রাখা বড় কম কথা নয়। যাঁরা দু–‌‌তিন দিনেও আলো এল না, পাখা ঘুরল না বলে, তেড়ে গালিগালাজের ফোয়ারা ছোটাচ্ছেন, তাঁরা কি জানেন ২০১২–তে উত্তর আমেরিকায় হ্যারিকেন ডেরেকোর শিকার হয়েছিলেন ৪২ লক্ষ মানুষ। বিদ্যুৎ আসতে সময় লেগেছিল প্রায় ১০ দিন!‌ একই বছরে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় স্যান্ডি ধ্বংস করেছিল মার্কিন মুলুকের ৬৮৭০ কোটি টাকার সম্পত্তি। ‌‌‌‌টানা দু ‌সপ্তাহ অন্ধকারে ডুবে ছিল নিউ ইয়র্ক এবং নিউ জার্সি–সহ মেরিল্যান্ড, ওয়াশিংটন ডিসি। সালটা ২০১৭। ঘূর্ণিঝড় মারিয়াতে ওলটপালট হয়ে যায় পুয়ার্তোরিকো। ৪১ শতাংশ ক্ষতি হয় গ্রামীণ এলাকায়। শহরে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ২৯ শতাংশ। ১২০ দিন বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন ছিল গোটা এলাকা। কোথাও কোথাও ৩২৮ দিনও লেগেছিল বলে শোনা যায়। এটাই ছিল আমেরিকার ইতিহাসে দীর্ঘতম ব্ল্যাকআউট। আর বিশ্বে দ্বিতীয়। পৃথিবীর দীর্ঘতম ব্ল্যাকআউটটি ব্রাজিলের দখলে। সালটা ১৯৯৯। বিস্ময়টা অবশ্য অন্য জায়গায়। ঝড়ের কারণে বিদ্যুৎ–‌বিপর্যয়ে এ যাবৎ সবচেয়ে নাজেহাল হয়েছে যারা, তারা সবাই উন্নত দেশের তালিকায়। আর ভারতের মতো তৃতীয় বিশ্বের একটা দেশের একটা রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ দেখিয়ে দিল, কীভাবে তুমুল বেকায়দা এবং বিপর্যয় সামলে মাথা তুলে দাঁড়ানো যায় ক‌দিনের মধ্যেই। এত বড় ম্যানেজমেন্টের পাঠ ভারত তো বটেই, গোটা বিশ্বও আগে পেয়েছে কিনা সন্দেহ। ‌এ শুধুমাত্র বিপর্যয়–‌মোকাবিলা নয়। মমতা ব্যানার্জির এই ভূমিকা ভবিষ্যতের ‘‌অ্যাকাডেমিক রিসার্চ’‌–এর বিষয়। তছনছ হয়ে–‌যাওয়া অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং প্রযুক্তিগত পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রণে আনতে তাঁর যে দক্ষতা এবং তৎপরতা তা উচ্চশিক্ষায় গবেষণার যোগ্য। গবেষণার বিষয় প্রবল রাজনৈতিক চাপান–‌উতোর সামলে তাঁর স্থিতধী থাকার রসায়নও। শুধু কি রাজনীতি?‌ কিছু সংবাদমাধ্যমও তো মেতে উঠেছে মুখ্যমন্ত্রীকে তুলোধোনা করতে। কিন্তু ঝড়ের আগে এবং পরে এই সংবাদমাধ্যমই পারত সাধারণ মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দিতে। অপপ্রচার আস্তিনে রেখে মানুষের কানে ঠিক খবরটা তুলে দিতে। কিন্তু হল কই!‌‌ তবু ‘‌একা কুম্ভ’‌ হয়ে লড়ে গেলেন এবং লড়ে যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী। সব কিছু সামলে আমপান এবং করোনা–‌ইতিবৃত্তে এক অন্য ইতিহাস লিখলেন মমতা ব্যানার্জি। ওঁকে কুর্নিশ।‌

জনপ্রিয়

Back To Top