প্রচেত গুপ্ত: দুটো খারাপ ঘটনার কথা বলি।
এই দুই ঘটনার পিছনে কোনও দুর্ঘটনা, কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেই। আছে ভয়ঙ্কর এক ব্যাধি। মারণব্যাধি। সেই মৃত্যু শুধু জীবনের নয়, প্রকৃতির নয়, সেই মৃত্যু শিক্ষা, চেতনা, মূল্যবোধ এবং মানবিকতার। এই ব্যাধি যদি আটকানো না যায়, সমাজকে, সভ্যতাকে অনেক বড় খেসারত দিতে হবে। ইতিমধ্যে দিতে হচ্ছেও।
ভয়ঙ্কর তথ্যটি হল, এই মারণব্যাধিতে গোটা বিশ্বে আমাদের দেশ সবথেকে বেশি আক্রান্ত। সরকারি হিসেব যাই হোক না কেন, বেসরকারি তথ্য বলছে, গত কয়েক বছরে এই ব্যাধিতে মৃত্যু হাজার ছাড়িয়েছে। আহতের সংখ্যা অনেক বেশি। আর মূল্যবোধ, মানবিকতার ক্ষয়?‌ সে তো সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না, তাই সে হিসেব উহ্য রাখছি।
এবার ঘটনার কথা বলি।
কদিন আগে দামোদরের চরে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে পিকনিকে গিয়েছিলেন শিক্ষক। সবার চোখের আড়ালে দুজন উঠে যায় রেলসেতুর ওপর। মোবাইল বাগিয়ে মনের আনন্দে, নানা ভঙ্গিমায় ফটো তুলতে থাকে। তুলতে তুলতে আত্মহারা হয়ে পড়ে। আত্মহারা?‌ নাকি দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য?‌ কখন যে ট্রেন ঘাড়ের কাছে চলে আসে দেখতে পায় না, বুঝতেও পারে না বেচারিরা। এমনকী সেতু কঁাপানো আওয়াজও ঢোকে না কানে। ট্রেনের ধাক্কায় একজন মারা যায়, আর একজন হয় গুরুতর আহত। সে কেমন আছে জানি না। কামনা করি, দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুক।
দ্বিতীয় ঘটনাটি কিছুদিন আগের। জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসা হাতির সঙ্গে নিজের ছবি তুলতে গিয়ে, হাতির শুঁড় ও পায়ের কাছে চলে গেলেন এক গ্রামবাসী। হাতিটি সহজেই তাঁকে বাগে পায় এবং পিষে মারে।
ব্যাধির নাম ‘‌সেলফি’‌। নিজের ফটো নিজে তুলব। নিজেকে নিজে দেখব। নিজের রূপে নিজে মজব। নিজের গুণ নিজে বিচার করব। শেষ হলে নিজেই সেই ফটো ছড়িয়ে দেব। সোশ্যাল মিডিয়ায় হাততালি কুড়োব। নিজস্বী নয়, আমি এই ব্যাধির নাম দিয়েছি ‘‌নিধনস্বী’‌। নিজেকে, নিজের বিবেক বুদ্ধিকে, বোধকে নিধন করবার ব্যাধি। ব্যাধি তো নয়, প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তিকে কুর্নিশ জানাতে হয়। ছোটবেলায় রচনা লিখতাম, বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ?‌ লিখতাম, ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে। আণবিক বোমা বানানো হবে, নাকি অভুক্তজনের মুখে অন্ন জোগাবে? এখন বুঝি, ভুল‌ লিখতাম। বিজ্ঞান সর্বদাই আশীর্বাদ। কেউ কেউ তাকে ‘‌অভিশাপ’‌ বানাতে যায়, শেষপর্যন্ত পারে না। মানু্ষের শুভবুদ্ধির কাছে হার মানতে হয়।
‘‌নিধনস্বী’র নামের প্রযুক্তিটির সবটাই অভিশাপ।
বিষয়টি নিয়ে আগেও কথা বলেছি। কিছুদিন আগে খবরের কাগজে একটা খবর পড়ে মনে হল, আবার বলবার সময় হয়েছে। এবার একটু কড়া ভাবে বলবার সময়। খবরটা ছিল এরকম— কলকাতার কাছে এক জায়গায় খেতজুড়ে ফুলের চাষ হয়েছে। পথের দু’‌পাশে শুধু ফুল আর ফুল, রং আর রং। শীতের মরশুমে এই রঙের মেলা দেখবার জন্য বহু মানুষ ভিড় করছেন। ছোটখাটো একটা পর্যটন–কেন্দ্র গড়ে উঠছে যেন। আহা!‌ ফুল দেখতে মানুষ ছুটছেন, এর মতো আনন্দসংবাদ আর কী হতে পারে?‌ কিন্তু হায়রে!‌ ফুলচাষিদের মাথায় যে হাত পড়েছে। ফুল দেখতে গিয়ে উৎসাহী মানুষ ফটো তুলতে নেমে পড়ছে খেতে। যাবতীয় বোধবুদ্ধি, কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে গাছ মাড়িয়ে, দুমড়ে–মুচড়ে সেলফি তুলছে। ফুলের পাশে নিজেকে সুন্দর দেখতে গিয়ে ফুলের দফারফা করছে। কীভাবে হাঙ্গামা থামানো যায়, তাই নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন থেকে সাধারণ মানুষ সবাই চিন্তাভাবনা শুরু করছে। এ তো শুধু সৌন্দর্য নয়, অর্থনীতিরও ক্ষতি।
অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সের এক হিসেব বলছে, মোবাইল বাগিয়ে সেলফি তুলতে গিয়ে‌‌‌ ২০১১ অক্টো‌বর থেকে ২০১৭ নভেম্বরের মধ্যে আমাদের দেশে ২৫৯ জন মারা গিয়েছেন। বাকি সময়ের হিসেব তো ধরাই হয়নি। আর বেশিরভাগ সময়েই এই ধরনের মৃত্যুকে পুলিশের খাতায় শুধু ‘‌দুর্ঘটনা’ বলে লেখা হয়। সেলফির কথা বলা হয় না।‌ ফলে হিসেবে অনেকটাই সত্য তথ্য ঢোকে না। গোটা দুনিয়ায় ‘‌নিধনস্বী’ তে যত জন মারা যায়, তার অর্ধেকই নাকি ভারতের!‌ এই তথ্য সত্য হলে সেটা যেমন ভয়াবহ, তেমন লজ্জার।

সেলফি বিপর্যয়ের ঘটনাগুলি একটু বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যাবে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ‘‌হিরো’‌ ‌বা ‘‌হিরোইন’ সাজবার হ্যালুসিনেশন থেকেই এই বিপদ ডেকে আনা। বঁাধের ধারে, খাদের কিনারায়, ট্রেনের মাথায়, হাতির পায়ের নীচে, গলায় ময়াল সাপ জড়িয়ে, আহত চিতাবাঘের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করতে গিয়ে— মর্মান্তিক পরিণতি। শুধু অশিক্ষিত, নির্বোধরাই এই মোহে আচ্ছন্ন নন, এই মোহের জালে আটকেছেন বহু শিক্ষিত, বুদ্ধিমানেরাও। বছর কয়েক আগে বঁাধের জলে নৌকোবিহার করছিলেন কয়েকজন ঝকঝকে তরুণ ইঞ্জিনিয়ার। এক সময়ে তাঁরা ফেসবুক লাইভ এবং সেলফিতে ছবি তোলা শুরু করেন। সবাই একজোট হয়ে নৌকোর একদিকে চলে যান আরও রোমাঞ্চকর ছবির জন্য। পর্দাথবিদ্যায় কৃতী ছাত্ররা ভুলে যান ভারের বেশিটাই যদি অক্ষরেখার একদিকে সরে যায়, তা হলে নৌকোর মতো যানের ‘‌ভরকেন্দ্র’ টলমল হতে বাধ্য।‌ তাই হল। নৌকো উল্টে, জলে ভেসে তরুণ ইঞ্জিনিয়ারদের মৃত্যু হল। ‌এই ঘটনাকে কি আমরা শুধুই দু্র্ঘটনা বলব?
আচ্ছা, তর্কের খাতিরে ‘‌দুর্ঘটনা’‌ই না হয় ধরে নিলাম। সেই ‌দুর্ঘটনা ঠেকাতে নানার‌কম ব্যবস্থার কথা কাগজে পড়ি। কোথাও সেলফি জোন, কোথাও নো সেলফি জোন হয়েছে। অর্থাৎ কোথাও বোর্ড লাগানো হচ্ছে, ‘‌এখানে সেলফি গ্রহণ করা যাবে না’, কোথাও লেখা হয়েছে ‘‌যাবে’। এখানেই হচ্ছে গোলমাল। সেলফিকে ঘটনা–‌দুর্ঘটনা হিসেবে দেখাটাই ভুল। যেমন ভাবে গাড়ির দুর্ঘটনা এড়াতে নানা বিধিনিষেধ চালু হয়, এখানেও যেন তাই। ধীরে গাড়ি চালান, ট্রাফিক আলো মেনে চলুন। এভাবে হবে না। সেলফিকে দেখতে হবে ‘‌ব্যাধি’‌ হিসেবে। এক ধরনের নার্সিসিজম। নিজের রূপে নিজে মুগ্ধ হওয়া শুধু নয়, অন্যকে বিশ্বাস না করা। তোমার তোলা ফটোতে আমার রূপ তেমন ফুটবে না। আমিই জানি কীভাবে আমায় দেখতে ভাল লাগে। হায় রে নির্বোধ!‌
কোনও রকম ভুল বোঝাবুঝি যাতে না হয়, তার জন্য এই ফঁাকে বলে রাখি, আমরা সবাই জানি, ফটো তোলা নেশা, পেশা এবং শিল্প হিসেবে অতি উচ্চমার্গের একটি বিষয়। ফটোই পারে সভ্যতা, ইতিহাস, সমাজকে দলিল হিসেবে ধরে রাখতে। যুদ্ধের বিভীষিকা, নিরন্ন মানুষের কষ্ট, বৃদ্ধবৃদ্ধার চিন্তা–‌ক্লিষ্ট, অভিমানী মুখ আমার ফটোতেই দেখি। আবার বিজ্ঞানের জয়, তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, শিশুর সারল্যও ধরা থাকে ফটোয়। সুখ ও দুঃখের মুহূর্তকে ধরে রাখতে পারে একমাত্র ফটো। প্রকৃতির সৌন্দর্যকে ফটোই পারে আরও সুন্দর করে দিতে। বহু বিশ্বখ্যাত ফটোগ্রাফার র‌য়েছেন। তারা নমস্য। শিল্পী হিসেবে অতি সম্মানের। তবে আমি যে ফটোর কথা বলছি, তার সঙ্গে এই ফটোর কোনও সম্পর্ক নেই। মোবাইল হাতে পেয়ে এখন সবাই ফটোগ্রাফার। তবে এটাও ঠিক যে অনেকে মোবাইলে ভাল ছবি তোলেন। তা ছাড়া এমন সব পারিবারিক, ব্যক্তিগত মুহূর্তকে এখন ধরে রাখা যায় যা আগে ভাবা যেত না। প্রযুক্তিকে ধন্যবাদ।  
আমি এ ধরনের ফটো নিয়ে কোনও আপত্তি করছি না, করছি ‘‌নিধনস্বী’ নিয়ে। যার বীজ লুকিয়ে আছে স্বার্থপরতায়, আত্মপ্রচারে, মিথ্যে অহংবোধে। চারপাশ ভুলে নিজেকে নিয়ে মেতে থাকার এই খেলা খেলতে গিয়ে মানু্্ষ নিজের বিপদের কথাও ভুলে যাচ্ছে। আত্মপ্রেমে মাতোয়ারা। যা সে নয়, সেইভাবে নিজেকে দেখতে চায়। দেখাতেও চায়। তাই কখনও আমির খানের মতো ‘‌হিরো’‌ সাজতে চায়, কখনও জিম করবেটের মতো শিকারি। বাকিরা উচ্ছন্নে যাক, গোল্লায় যাক।
দুঃখের, তবু সত্য, এখন মিছিলে হঁাটবার সময়ও কেউ কেউ সেলফি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করেন। বুঝতে পারেন না, এতে আদর্শের মৃত্যু হয়। মিছিল সবার। একার নয়।
যারা মোবাইল ফোন বিক্রির জন্য নানা প্রলোভন দেখায়, তাদের সর্তক করতে হবে। দরকার হলে ‘‌নিধনস্বী’‌ তোলার প্রযুক্তিটি ফোন থেকে বাতিল করতে হবে। যে প্রযুক্তি খাদের কিনারায় টেনে নিয়ে যায়, যে প্রযুক্তি বাকিদের ভুলিয়ে শুধুই নিজেকে নিয়ে মাততে শেখায়, তাকে আটকাতে হবে।‌

জনপ্রিয়

Back To Top