দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়

‘‌সোউ যে বেহারাঘর দেখুট ললিন, বেহারাবুড়ার ঠাকুর্দার ঠাকুর্দা তার ঠাকুর্দা পুত্র কামনায় নদীজলে সোনার থালা ভাসাই থিলা বলি না নদীর নাম হেলা সুবর্ণরেখা!’‌
সুবর্ণরেখা নদীর তীরে বেহারাঘর গ্রামের গরিব ধীবর ঝাড়েশ্বর পানি গল্পের নায়ক ললিনকে ব্যাখ্যা করছেন নদীর নামকরণের লৌকিক রহস্য। ২০১৯–এর আনন্দ পুরস্কারে ভূষিত উপন্যাস ‘সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা’। লেখক নলিনী বেরা। উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত, ওডিশা থেকে বঙ্গে বিস্তৃত নদীর তীরে গড়ে ওঠা বহু গ্রাম ও জনজাতির জীবনালেখ্য বুঝিয়ে দেয় যে, মানুষের আটপৌরে ইতিহাস ওই নদীর মতোই প্রাচীন। আর্য, শক, হুন, মোগল— কত মানুষ এসেছে এদেশে, সংস্কৃতি ও রক্তের মিশেল ঘটেছে, শহরের নব্য জীবন ও ভাষা জাতে উঠেছে। এই মান্য ঘেরাটোপের প্রান্তে অবস্থিত রাজু, তেলি, সদগোপ, করণ, কৈবর্ত প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠীর মানুষের নদীর মতো প্রাচীন জীবন ছঁাচভাঙা ‘হাটুয়া’ বাংলায় সরব হয় ঝাড়েশ্বরের মতো চরিত্রের সংলাপে। ওদের সুখ, দুঃখ ও পীড়নের কাহিনি বাঙ্ময় হয়ে ওঠে এক ব্যতিক্রমী সাহিত্যধারায়।
সম্প্রতি এই রাজ্যে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা দলিত সাহিত্য আকাদেমি প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদকে স্বীকৃতি দিল আরও একবার। নির্মাণের কল্পনা ও শিল্প–সুষমায় এই সাহিত্য যে মূলধারার বাংলা সাহিত্যের সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারে, ‘সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা’র লেখক তা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। তাই এই সাহিত্যের ভেতরের ক্ষমতাকে পুষ্ট করতে সরকারি উদ্যোগ সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকাশনা ও স্বীকৃতির মানদণ্ডে বিচার করলে দলিত সাহিত্যের বিশিষ্টতা সম্বন্ধে একটা সংশয় তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। নলিনী বেরা তো এর আগে বঙ্কিম স্মৃতি পুরস্কারেও সম্মানিত হয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে মুনশিয়ানার জন্যে প্রদত্ত এই পুরস্কার প্রখ্যাত দলিত লেখক অনিল ঘড়াইকেও দেওয়া হয়েছে। বেরিয়েছে কপিলকৃষ্ণ ঠাকুরের উপন্যাস ‘উজানতরির উপকথা’। দেবেশ রায় সম্পাদিত মারাঠি, কন্নড় ও গুজরাটি দলিত সাহিত্যের বাংলা অনুবাদ সঙ্কলন ‘দলিত’ প্রকাশ পায় সাহিত্য আকাদেমি থেকে। পাশাপাশি ঠিক একই সময় দলিত সাহিত্যের জন্য একটা স্বতন্ত্র ঘরানার দাবিদার বাংলা প্রাত্যহিকী ‘চতুর্থ দুনিয়া’ তাদের গল্প সংগ্রহ বই আকারে প্রকাশ করেছে। অদ্বৈত মল্লবর্মন যখন নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দলিত নিপীড়নের কাহিনি ‘‌তিতাস একটি নদীর নাম’‌ লিখলেন, অনেকেই মনে করেছিলেন যে, কথা–সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সে কাজ অনায়াস দক্ষতায় করেছেন ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসে। অদ্বৈত কি সেভাবে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারবেন? সকলের সংশয় নিরসন করে তিতাস আজ কালজয়ী।
আসলে বাংলা সাহিত্যে দলিত রচনা সংবর্ধনা লাভের পর অনেকেই মনে করতে আরম্ভ করেন যে, বঞ্চিত প্রান্তিক মানুষের দুর্দশার কথা তুলে ধরার একটা রীতি মূলধারার লেখকদের উপজীব্য ছিল বরাবরই। মানিকবাবুর মতো শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ী এবং ১৯৩০ ও ’‌৪০–এর দশকের কল্লোল ও কালিকলম গোষ্ঠীর প্রগতিশীল লেখকদের অনেকেই এই কাজ করে গেছেন। সুতরাং আজ যাকে দলিত সাহিত্য বলা হচ্ছে, তা আসলে মূলস্রোতের বাংলা সাহিত্যের একটি প্রক্ষেপ মাত্র। প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য শ্রেণি–বৈষম্যকে দেগে দেওয়া ঠিক। কিন্তু এদের মধ্যে যঁারা হিন্দু সমাজ ব্যবস্থার চতুর্বর্ণ নির্মাণের প্রান্তে, তঁাদের দুর্গতি, অস্পৃশ্যতার মতো সামাজিক লাঞ্ছনার অতিরিক্ত পীড়নে বেশি ভয়াবহ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘ধর্মের অধিকার’ (১৯১১) নিবন্ধে গ্রামবাংলার নমঃশূদ্রদের ওপর ব্রাহ্মণ্য সম্প্রদায়ের অত্যাচার দেখে দুঃখ করে বলেন, মানুষ প্রকৃতিগত ভাবে এমন নীচ হতে পারে না, যদি ধর্মের কুবিচার তঁাকে বাধ্য না করে। কোনও সংবেদনশীল বর্ণহিন্দু লেখকের পক্ষে দলিতদের এই জটিল সঙ্কটের চেহারা অনুধাবন সম্ভব হলেও নিজের জীবন দিয়ে সেই অভিজ্ঞতাকে পরখ করতে না পারলে গল্পে, কবিতায়, গানে তার যথার্থ নান্দনিক পরিবেশন সম্ভব হয়ে ওঠে না। অদ্বৈত মল্লবর্মন যে আর্তি রচনা করেন, তা সেই অর্থে দলিতের মর্মবেদনা, যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রান্তবাসীদের তেমন স্পর্শ করে না। তাই সাহিত্য আকাদেমি দেবেশ রায়ের দলিত সঙ্কলন প্রকাশ করলেও চতুর্থ দুনিয়ার মতো স্বতন্ত্র দলিত মুখপত্রের প্রয়োজন থেকেই যায়।
বঙ্গদেশে বর্ণবিদ্বেষ থেকে উদ্ভূত সঙ্কটের প্রকৃতি বহুদিন শ্রেণি–বৈষম্যের সামগ্রিক প্রকরণের মধ্যে প্রচ্ছন্ন ছিল। হিন্দু অস্পৃশ্যরা তাদের অন্বিষ্ট আত্মপরিচয়ের খোঁজ নিয়ে সজাগ হতে গিয়ে সর্বহারার বৃহৎ পরিচয়ের মধ্যে শেষ পর্যন্ত নিজেদের হারিয়ে ফেলত। মহাত্মা গান্ধী ‘হরিজন’ শব্দটি ব্যবহার করে চতুর্বর্ণ হিন্দু সমাজের মধ্যেই অস্পৃশ্যদের সামাজিক সম্মান পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছিলেন। আম্বেদকর মনে করেছিলেন যে, ‘হরিজন’ পরিচয়ের মধ্যে বর্ণহিন্দু ব্যবস্থাকে পরোক্ষ স্বীকৃতি দেওয়ার ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে। আম্বেদকর যখন মহারাষ্ট্রে অস্পৃশ্যতা বিরোধী আন্দোলনকে হিন্দু সমাজের সংস্কার কর্মসূচি থেকে মুক্ত করে রাজনৈতিক অধিকারের আন্দোলনে পরিণত করেছেন, তখন এখানকার অস্পৃশ্য সম্প্রদায় হয় হরিজন পরিচয়ের মধ্যে আত্মতৃপ্তি খুঁজছে অথবা বর্ণবিদ্বেষের লাঞ্ছনা শ্রেণি–সংগ্রামের ঔদ্ধত্যের অন্তরালে লুকিয়ে রেখেছে।
১৯৫৮–তে মহারাষ্ট্রে সঙ্ঘটিত হয় প্রথম দলিত সাহিত্য সম্মেলন। উনিশ শতকের সমাজ সংস্কারক জ্যোতিবা ফুলের আদর্শে প্রাণিত হয় স্বতন্ত্র দলিত সাহিত্য সংগঠনের ধারণা। অস্পৃশ্যদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হিন্দু সমাজের মনুবাদী বিচ্ছিন্নতাকে পাল্টা অস্ত্র করে নিজেদের স্বতন্ত্র অধিকার ও সাহিত্য প্রকরণ সৃষ্টির কর্মকাণ্ড ষাটের দশকের শুরুতে সংহত চেহারা নেয়। এদিকে, যেটুকু অস্পৃশ্যতা বিরোধী মনোভাব বাংলায় ক্রিয়াশীল ছিল, ১৯৪৭–এ দেশভাগের পর তা খানিক ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে। হরিচঁাদ ঠাকুরের নেতৃত্বে নমঃশূদ্র মতুয়াদের শ্রীচৈতন্যের ভক্তিভাবে উদ্বুদ্ধ সাংস্কৃতিক বিপ্লব হিন্দু ধর্মাশ্রয়ী কৃষ্টি থেকে তখনও সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারেনি। আম্বেদকরের সহযোগী যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ১৯৪৩–এ কলকাতায় ‘জাগরণ’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করে বিচ্ছিন্নবাদী সংস্কারের পূর্বাভাস দিলেন প্রথম। কিন্তু দেশভাগের পর এই উদ্যোগ পূর্ববঙ্গে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) স্থানান্তরিত হয়। পূর্ববঙ্গের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় উৎখাত হয়ে যখন বর্ণহিন্দু ও নমঃশূদ্ররা শরণার্থী হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করতে আরম্ভ করে, তখন থেকেই এই রাজ্যে জাতপাতের বৈষম্য আরও তীব্র ও জটিল আকার নিতে থাকে।
মনোরঞ্জন ব্যাপারীর আত্মচরিত ‘ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন’ বা কপিলকৃষ্ণ ঠাকুরের ছোটগল্প ‘অন্য ইহুদী’র মতো রচনা হিন্দুত্ববাদী বর্ণবৈষম্যের সেই মর্মান্তিক ছবি তুলে ধরেছে। ভারতবর্ষে দলিত আত্মপরিচয়ের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেহারাটি আরও সংহত হয় ১৯৭২–এ মহারাষ্ট্রে দলিত প্যান্থার নামক মঞ্চ গড়ে ওঠার পর। আর ১৯৯৪–এর জুলাই মাসে কলকাতার গড়িয়ার বি আর আম্বেদকার গ্রন্থাগারে বাংলা দলিত সাহিত্য সংস্থার সৌজন্যে দলিত প্যান্থারের ২৩তম প্রতিষ্ঠা দিবস উদ্‌যাপনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা দলিত সাহিত্য পূর্ণ অবয়ব নির্মাণের লক্ষ্যে পা বাড়ায়।
দলিত সাহিত্যের যে স্বাতন্ত্র্যের কথা আমরা বলছি, তা কাহিনির বিষয়বস্তু ও পরিবেশনের মধ্যে নিহিত। তা সে সুবর্ণরেখা বা তিতাসের মতো গ্রামের কথ্য উপভাষায় লেখা হতে পারে, আবার মহাশ্বেতা দেবীর শহুরে প্রমিত বাংলায় ব্যঞ্জনা লাভ করতে পারে। এ কালের দুই প্রখ্যাত ফরাসি দার্শনিক গিলেজ দেল্যুজ ও ফেলিক্স গুট্টেরি ‘হোয়াট ইজ এ মাইনর লিটরেচার?’ শীর্ষক প্রবন্ধে এই বিষয়টা খানিক ছুঁয়ে গেছেন। তঁাদের মতে, অন্ত্যজ মানুষ ভাষার প্রমিত রূপ ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির সীমানা পেরিয়ে সম্প্রদায়ের দুর্দশা ও আশা–আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করার রাজনৈতিক ভঙ্গি অবলম্বন করে। সেই অর্থে ‘মাইনর লিটারেচার’ শব্দবন্ধে যেমন একটা অ্যাঁভা গার্দ বিশিষ্টতার সুর শোনা যায়, তেমনই তথাকথিত ‘মুখ্য’ সাহিত্যের স্বতন্ত্র আভিজাত্যের প্রতি কটাক্ষের সূত্রও খুঁজে পাওয়া যায়। বাংলা দলিত সাহিত্য মূলস্রোতের ব্রাহ্মণ্যবাদী আভিজাত্যের পঙ্‌ক্তি থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে বহুত্ববাদী ভারতীয় পটভূমিতে আত্মমর্যাদা খুঁজে বেড়ায়। 
আজ বাড়তে থাকা দলিত উৎপীড়ন, হাথরসের মতো ঘটনা, সংবেদনশীল মানুষের মনে প্রশ্ন জাগায়, ওরা কত অসহায়, ওদের মনুষ্যত্বকে নৃশংসভাবে হত্যা করা কত সহজ! হিন্দুত্ববাদী বর্ণভেদের ঘৃণ্য চেহারা লিঙ্গবৈষম্য ও পুরুষতন্ত্রর আস্ফালনে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। এই অবস্থায় দলিত হন্যে হয়ে প্রতিবাদের ভাষা খোঁজে। বাংলা দলিত সাহিত্য আকাদেমি সেই পথেরই দিশারি।
লেখক রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক

জনপ্রিয়

Back To Top