দেবেশ রায়- গুরুদাস চলে গেল। ওকে আমার শেষ দেখা হল না। আমি ছাড়া সবাই জানত। আমার ছোট ভাই তো আমার সঙ্গেই থাকে। সে জেনেও কিছু বলেনি। অনেক ক্ষণ গল্প করে যাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করল, কেউ কি ফোন করেছিল?‌ আমার তো কানের অসুবিধে আছে। ফোন করতে পারি। আবার অনেক সময় অনেকের কথা শুনতে পাই না। ভাবলাম, তেমনই কিছু জিজ্ঞেস করছে। তা হলে ও সেই নম্বরে ফোন করে কথা বলে নিয়ে আমাকে জানাবে। না, তেমন কোনও ফোন তো আসেনি।
এত ঢাকাঢাকির পর মধ্যরাতে দিল্লি থেকে আমার ছেলের মেসেজ এল। — প্রথমে শুধু ছবিটা। গুরুদাসের সেই সরল হাসি দুই ঠোঁট জুড়ে। হাসলে সবাইকেই সুন্দরতর লাগে কথাটা ঠিক নয়। গুরুদাসকে লাগত। আমি খুশি হলাম। অনেকদিন গুরুদাস চুপচাপ আছে। আর তো চুপচাপ থাকার সময় নেই। নিশ্চয়ই আমাদের অর্থনীতির দুর্দশায় প্রথম কোপ পড়েছে শ্রমিকদের ওপর— তারই কোনও প্রতিবাদ করেছে গুরুদাস। তার পরই খবরটা ফুটে উঠল। আমার শরীর বেশ খারাপ। খেতে হবে কী শুতে হবে— ঠিক করতে পারছিলাম না। ছোটভাইকে ডাকলাম। সে উঠে এসেই জিজ্ঞেস করল, আমি কথা বলার আগেই, ‘‌কে জানাল?‌’‌ আমি বললাম, ‘‌বুড়ো’‌। ভাই বলল, ‘‌এত রাতে কি না জানালেই হত না?‌’‌ আমি বললাম, ‘‌হয়তো আগেই জানিয়েছে, আমিই পরে খুলেছি। তুই কি জানতি?‌’‌ ‘‌হ্যাঁ। বলিনি। রাতটা কাটার পর যেমন করে সবাই জানবে, তেমন করেই জেনে নিতে।’‌ ‘‌ওর শরীর এত খারাপ হল কবে?‌ নাকী আকস্মিক কিছু। হার্ট ব্লক না কী যেন বলে।’‌ ও তখন বিশদে বলল। রাতে আমার কাছে থাকতে চাইল। আমি জোর করলাম— আমি একা থাকতে পারব।
গুরুদাস আমার রাজনৈতিক নেতা ছিল না। পার্টি যখন ভাঙছে তখন কে কোথায় থেকে যাচ্ছে বা চলে যাচ্ছে তার কোনও ঠিক–‌ঠিকানা ছিল না। ভাঙাভাঙির পর দেখলাম— আমরা কয়েকজন বন্ধু এক নৌকোতেই আছি। এক বন্ধু, দীপেন, মাথায় শিল মেরে মরতে গিয়েছিল। মরতে না পারায় তাকে রাঁচির মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। এক বন্ধু, অন্য পার্টিতে গেছে।
আমরা তো পঞ্চাশ দশকের শুরুতে পার্টিতে আসি। তার পর পার্টিতেই আছি। আমার ছাত্রজীবন কেটেছে জলপাইগুড়িতে। গুরুদাসের কলকাতায়। ৫০–‌এর পর থেকেই কমিউনিস্ট পার্টিতে আসার রাজপথ ছিল— কলেজ ইউনিয়ন, ক্যাল এস‌এফ, বা জিলা এস‌এফ, সেই সুবাদে কেউ–‌কেউ পার্টি মেম্বার। যারা কলকাতায় ছাত্র আন্দোলন করত, তারাই প্রাদেশিক ছাত্রনেতা হত। আর যারা মফস্‌সলে করত তারা সেই মফস্‌সলের নেতা। গুরুদাস ছিল কলকাতার ছাত্রনেতা, আশুতোষ কলেজের ছাত্র ইউনিয়নের সম্পাদক, সেখান থেকে ক্যাল এস‌এফের সম্পাদক, সেখান থেকে প্রাদেশিক এস‌এফের নেতা, সেখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এস‌এফের নেতা। আমি তো জলপাইগুড়ির ছাত্রনেতা।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন এমএ পড়তে এলাম, তখন আমাদের চেনাজানা, বন্ধুত্ব, বন্ধুত্বাধিক সম্পর্ক কারও–‌কারও মধ্যে তৈরি হল। যেমন, দীপেন আর আমার মধ্যে। যেমন দীপেন–‌গুরুদাস ও আমার মধ্যে।
গুরুদাস প্রথম দিকে আমাকে তেমন পাত্তা দিত না— কোথাকার জলপাইগুড়ির কে। আমাদের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়ন ছিল কমিউনিস্ট–‌বিরোধী কোনও ছাত্র সংগঠনের দখলে। আমাদের ওপর দায়িত্ব বর্তাল ইউনিয়ন দখলের। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্টি সেলে গুরুদাস আবিষ্কার করল— আমারও রাজনৈতিক সংগঠন ও প্যাঁচ–‌পয়জার করার বুদ্ধি আর কেরামতি আছে। তা ছাড়া দীপেন আমাকে এতটা খাতির করছে এটাও গুরুদাসের খেয়ালে এল। তারও ওপরে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাকে নামে চেনে অনেকে এটাও গুরুদাস লক্ষ্য করল— কারণ আমি জলপাইগুড়িতে থাকতেই ‘‌দেশ’‌–‌এ আমার কিছু গল্প অনেকের পড়া। গুরুদাস একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করল, তখনও আপনি, ‘‌আপনি পার্টি মেম্বার অথচ লেখেন ‘‌দেশ’‌–‌এ, কেন?‌’‌
আমি উত্তর দিলাম, ‘‌আপনি কি গল্পটল্প পড়েন?‌’‌
ও সাবধানি স্বরে বলল, ‘‌তেমন না। তবে তেমনই তো হয়। কমিউনিস্টরা তো তাদের নিজেদের কাগজেই লিখবে।’‌
আমি বললাম, ‘‌কমিউনিস্টরা কি আলাদা রকম কিছু লেখে?‌ কমিউনিস্ট–‌লেখক বলে কিছু আলাদা হয় না কী? তেমন লেখকদের লেখা আমার ভাল্‌ লাগে না।’‌
এই কথাতে গুরুদাস একেবারে হো হো করে হেসে উঠল। একেবারে হাত তালি দিয়ে। ও–‌ই এক এ–‌রকম হাসতে পারত, ঠিক জায়গায়, একেবারে প্রাণ খুলে, তার পরই কেশে ফেলত। এটাও বরাবরই। গোপন মতৈক্যে। নিজেদের নিয়ে ঠাট্টায়। এই রসিকতাবোধ ছিল ওর ব্যক্তিত্বের প্রধান গুণ, বিশেষ করে রসিকতা যদি নিজেদের নিয়ে হত। দীপেন একটু গুরুগম্ভীর ছিল। দীপেনের পাল্টা গুরুদাস আর আমার ছিল যুক্তফ্রন্ট।
বিশ্ববিদ্যালয় লনে কমিউনিস্ট–‌বিরোধী ছাত্র ইউনিয়ন হাঙ্গেরির ব্যাপারে এক সভা ডেকেছিল। তেমন কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে নয়— আশুতোষ বিল্ডিং থেকে বেরিয়েই দেখি সেই মিটিং বেশ শুরু হচ্ছে। গুরুদাসকে বললাম, ‘‌চলুন মিটিংটা ভেঙে দি।’‌ গুরুদাস বলল, ‘‌শুধু আপনি–‌আমি?‌’‌ ‘‌আমরা তো শুরু করে দি, দেখবেন‌, সবাই এসে যাবে।’‌ একটা দুষ্টুমির মুচকি হাসি হেসে গুরুদাস বলল, ‘‌চ–‌লু–‌ন। সাবধান থাকবেন, মাথায় চোট না লাগে।’‌ আমি বললাম, ‘‌মাইকটা দখল করে বক্তৃতা শুরু করব। আপনারা স্লোগান দেবেন।’‌ গুরুদাস এমন ভাবে পা বাড়াল যেন বেশ একটা রগড় হবে। আমি সোজা গিয়ে মাইক ধরে বলতে শুরু করলাম। সভার উদ্যোক্তারা ভাবল— এটা বোধহয় তাদেরই ব্যবস্থা–‌অনুযায়ী হচ্ছে। মিনিট কয়েক পর আমি যেই সোভিয়েত–‌বিরোধী চক্রান্তের কথায় এসেছি, গুরুদাস মিটিংয়ের ভিতর থেকে স্লোগান দিতে শুরু করেছে। কয়েকজনকে জুটিয়ে এনেছে। যারা এসেছিল তারা তাড়াতাড়ি উঠে মিটিং ছেড়ে দৌড়। প্রধানত মেয়েরা। মেয়েরা একবার উঠে গেলে সে মিটিং আর চলে?‌ উদ্যোক্তারা মিটিং বাঁচাবে, না আমাদের শায়েস্তা করবে— এই দ্বিধার মধ্যে আমরা বেশ জয়ীর মতো বেরিয়ে এলাম। সেনেট হলের সিঁড়ির সামনে দু–‌জনের কী তুমুল হাসি— একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে। এর পর তো আর ‘‌আপনি’‌–‌র পার্থক্য থাকে না। আমরা একেবারে ‘‌তুই’‌–‌এ নেমে এলাম, ‘‌তুমি’‌ ডিঙিয়ে।
পশ্চিমবঙ্গে সিপিআই করা খুব কঠিন কাজ ছিল ও আছে। এটা প্রধানত ছিল একটা সাংস্কৃতিক অভিযান। সেই সময় যুব সঙ্ঘের নেতা হিসেবে গুরুদাস যে–‌নেতৃত্ব দিয়েছে তা ঐতিহাসিক অর্থেই তুলনাহীন। গুরুদাসের জেদাজেদিতে একবার আমি এক বাস শিল্পী নিয়ে যুব উৎসবে এসেছিলাম জলপাইগুড়ি থেকে। ৬৮ সালে জলপাইগুড়ির প্রলয় বন্যার পরে যুব সঙ্ঘই প্রথম রিলিফ ও কিছু টাকা তুলে দিয়েছিল। আমাদের সম্পর্ক এমনই পারিবারিক ছিল যে, গুরুদাসের স্ত্রী জয়াকে আমি কোনও দিন বড় বলে ভাবতেও পারিনি। জয়ার গলার স্বর একটু নীচু তারে বাঁধা কিন্তু স্পষ্ট। ওই রকম কণ্ঠস্বর আমার খুব ভাল লাগত। আর জয়া–‌গুরুদাসের মেয়েকে তো এখনও আমি সাবালক মনে করতে পারি না। গুরুদাসও কোনও কাজে উত্তরবঙ্গের কোনও জায়গা থেকে জলপাইগুড়ি এলে সরাসরি আমার স্ত্রী কাকলিকে ফোন করে বলত, ‘‌আমি ঘণ্টা দুই পরে তোমার বাড়ি পৌঁছুব, আমার সঙ্গে পাঁচ থেকে দশজন থাকতে পারে। তারাও খাবে।’‌
গুরুদাসের এই অসামান্য গুণ ছিল, সে তার রাজনৈতিক কাজকে ব্যক্তিনিরপেক্ষ রাখত না, ব্যক্তিগতও রাখত না, এটা যেন সবাইয়ের কাজ, সবাই করতে বাধ্য। এই গুণের জন্যই তার পার্লামেন্টারি জীবন এত সফল। প্রত্যেক দলের নেতৃস্থানীয়দের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। অথচ এই সময়ই সে সর্বভারতীয় শ্রমিক আন্দোলনের নেতা হয়ে উঠেছে। কমিউনিস্ট পার্টির অনেক বড় নেতা পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে যত ব্যক্তিগত গুরুত্ব অর্জন করেছেন, ততই তাঁদের রাজনৈতিক কর্মক্ষেত্র থেকে সরে এসেছেন। গুরুদাস ঠিক উল্টো পথে গিয়েছে। যতই সে পার্লামেন্টের ভিতরে নিজেকে অনিবার্য করে তুলেছে, ততই সে অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতর হয়েছে ও শ্রমিক আন্দোলনের পক্ষেও নিজের নেতৃত্বকে অনিবার্য করে তুলেছে।
কোনও একটা বিনিয়োগে কালো টাকার ষড়যন্ত্র ভেদ করে গুরুদাস প্রায় ন’‌ ‌লাখ টাকার পুরস্কার পেয়েছিল। সেই টাকা তার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও আইনসঙ্গত। সে টাকা সে দিয়ে দেয় পাঞ্জাবের সন্ত্রাসে বিধবাদের জন্য কোনও সংগঠনকে ও আরও দুই সমতুল্য কাজে। আমি ওকে এই কারণে উচ্ছ্বসিত আনন্দ জানালে ও বলেছিল— ‘‌তুই পেলেও তাই করতি।’‌ আমি উত্তর দিয়েছিলাম— ‘‌আমি করতাম কী না সে তো অনুমাননির্ভর। তুই যে পারলি সে তো প্রমাণ হয়ে গেল।’‌
গুরুদাস চলে যাওয়ায় আমার ‘‌তুই’‌ বলে ডাকার বন্ধু কেউ আর রইল না। ও তো ওর সেই অদ্বিতীয় হাসিটুকু নিয়েই চলে গেল, আমাদের জন্য শুধু অশ্রুপাত রেখে। ও তো সবার বাঁচা সহজ করে দিত। সেটা এত কঠিন করে দিয়ে গেল কেন?‌ ‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top