অলোক ভট্টাচার্য: রাহুল গান্ধী গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে যে নরম হিন্দুত্বের পথ অবলম্বন করেছিলেন, আসন্ন কর্ণাটক বিধানসভা নির্বাচনেও সেই পথই অনুসরণ করতে চলেছেন এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এই নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক চলছে এখনও। রাহুল গুজরাটের প্রচারে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে জোর গলায় কিছু বলেনইনি, উপরন্তু তিনি নিজেকে শিবভক্ত এবং পৈতেধারী ব্রাহ্মণ সেটাই প্রমাণ করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে কংগ্রেসের অতীত ইতিহাসটা যদি একটু খতিয়ে দেখা হয় তাহলে আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে রাহুল গান্ধীর এই আচরণ একেবারেই অস্বাভাবিক নয়।
প্রথমেই এই প্রশ্নটা মনে আসে যে কংগ্রেস কি দল হিসেবে কখনও অবিমিশ্র ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করে এসেছে?‌ তাদের হিন্দুত্বকে আমরা নরম হিন্দুত্ব বলছি। এটা ঠিকই উগ্র হিন্দুত্বের পথে কংগ্রেস কখনও হাঁটেনি;‌ তবে হিন্দুত্বের একটা চোরা স্রোত বরাবরই দলের অন্দরে ফল্গুধারার মতো বয়ে চলেছে। সংবিধান রচনার দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের নিয়ে গঠিত গণপরিষদের বিভিন্ন সভায় সংবিধানে ‘‌সেকুলার’‌ শব্দটির অন্তর্ভুক্তিকরণ এবং ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘‌সেকুলার’‌ অর্থাৎ ‘‌ধর্মনিরপেক্ষ’‌ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করার প্রশ্নে ধারাবাহিকভাবে বহু বিতর্ক হয়েছিল, যা গণপরিষদের কার্যবিবরণীতে (‌Constituent Assembly Dibate) ‌বিবৃত আছে। গণপরিষদের বিশিষ্ট সদস্য অধ্যাপক কে টি শাহ বহু লড়াই করেছিলেন ‘‌সেকুলার’‌ শব্দটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্তির জন্য। কিন্তু প্রত্যেকবারই তাঁর প্রস্তাব খারিজ হয়ে যায়। জওহরলাল নেহরু এবং বি আর আম্বেদকর এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু তাই বলে তাঁরা ধর্মনিরপেক্ষতার বিরোধিতা করেননি। ‘‌সেকুলার’‌ শব্দটিতে তাঁদের আপত্তি ছিল কারণ ইউরোপীয় ভাবধারায় ‘‌সেকুলার’‌ বলতে যা বোঝায় ভারতীয় ভাবধারায় ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে তা বোঝায় না। কিন্তু আম্বেদকর এই যুক্তি দিয়েছিলেন যে সংবিধানের বহিরঙ্গে না থাকলেও তার অন্তরে নিহিত আছে ধর্মনিরপেক্ষতার সারবস্তু। ভবিষ্যতে ভারত যে তার রচিত সংবিধান–নির্দেশিত পথেই চলবে সংবিধানেই তা সুনিশ্চিত করা হয়েছে। গণপরিষদে কে টি শাহ এবং তাঁর সমর্থকদের যুক্তি ছিল, পুরো সংবিধানটাই যখন প্রকৃতিগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ তখন সংবিধানে ‘‌সেকুলার’‌ শব্দটির উল্লেখ এবং ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করতে অসুবিধা কোথায়?‌ অন্যদিকে আম্বেদকর, নেহরু ও তাঁর সমর্থকদের মতামত ছিল যে সংবিধানের বিভিন্ন ধারা–উপধারায় যখন ধর্মনিরপেক্ষতার ভাবনা অভিব্যক্ত রয়েছে তখন আলাদা করে ‘‌সেকুলার’‌ শব্দটির উল্লেখ না থাকলে ক্ষতি কী?‌
ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে গণপরিষদের সদস্যদের মধ্যে তর্ক–‌বিতর্কে তিনটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছিল:‌ (‌১)‌ গণপরিষদের কিছু সদস্য চাইছিলেন যে ভারত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষিত হোক। সংবিধানে মৌল অধিকার–সহ রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মনিরপেক্ষতার যে প্রতিশ্রুতি বিধিবদ্ধ হয়েছিল সেই ব্যাপারে তাঁরা সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হতে পারছিলেন না। তাঁদের দাবি ছিল, ‘‌সেকুলার’‌ শব্দটাই সুনির্দিষ্টভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হোক। (‌২)‌ অন্য একটি গোষ্ঠী পূর্বোক্ত মত খারিজ করে জনজীবনে ধর্মের স্থানকে স্বীকৃতি দেওয়া হোক, এমনই মতামত ব্যক্ত করেন। বহু ধর্ম, বহু ভাষা, বহু জাতির একটি দেশে সরাসরি ধর্মনিরপেক্ষতার বিরোধিতায় না গেলেও এই ভাবনাটিকে তাঁরা প্রায় গৌণ করে দিতে চাইছিলেন যাতে ভারত একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র তথা হিন্দুরাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে পারে। (‌৩)‌ আর একটি গোষ্ঠী পূর্বে উল্লিখিত দুটি দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে মধ্যপন্থা অবলম্বন করেন। তাঁরা দ্বিতীয় গোষ্ঠীর মতামতকে সমর্থন না করেও সংবিধানে ‘‌সেকুলার’‌ শব্দটির সন্নিবেশ প্রয়োজন মনে করেনি। এই গোষ্ঠীর কয়েকজন সদস্য ধর্মের প্রশ্নটা এড়ানোর জন্য ‘‌কম্পোজিট কালচার’‌ তথা ‘‌সমন্বিত সংস্কৃতি’‌ শব্দবন্ধটি নির্বাচন করেন।
গণপরিষদের সদস্যদের মধ্যে অনেকেই ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করার পক্ষপাতী ছিলেন সেটা উপরিউক্ত আলোচনাতেই বোঝা গেল। এঁদের মধ্যে অনেকেই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সদস্য ছিলেন। আজ বিজেপির যে মতাদর্শ তার অনেক কিছুই কংগ্রেসের সেই সব সদস্যের চিন্তায় ছিল। গণপরিষদের অন্য এক সদস্য ফ্র‌্যাঙ্ক অ্যান্টনির বক্তব্যের মধ্যে তা সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে এক ধরনের রক্ষণশীল চেতনার প্রভাব লক্ষ্য করে তিনি বলেছিলেন, ‘‌অধ্যক্ষ মহোদয়, আমি কাউকে কোনওভাবে আঘাত করতে চাই না। কিন্তু তাও আমাকে বলতে হচ্ছে যে এই মহান পার্টির সদস্যেরা, যাঁরা বিধিমতে কংগ্রেসের সদস্য, তাঁরাও অনেকেই তাঁদের বোধ–বিশ্বাসের দিক থেকে আরএসএস ও হিন্দু মহাসভার সদস্য। আমার দুর্ভাগ্য যে প্রতিদিন আমার কংগ্রেস পার্টির প্রভাবশালী ও মান্যবর নেতাদের সেইসব বক্তৃতা পড়তে হয় যাতে তাঁরা বলছেন যে ভারতের স্বাধীনতা মানেই হিন্দুরাজ্যের প্রতিষ্ঠা, ভারতীয় সংস্কৃতি বলতে কেবল হিন্দু সংস্কৃতিই বুঝতে হবে। এতেই সংশয় সৃষ্টি হয়।’‌ কংগ্রেস দল সম্পর্কে এত বড় সত্য কথাটা অ্যান্টনি সেদিন সর্বসমক্ষে প্রকাশ করে দিয়েছিলেন। গণপরিষদের কার্যবিবরণী সম্পর্কে লেখা পড়তে পড়তে অনুভব করতে পারি সদস্যদের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে শেষ পর্যন্ত কোথায় যেন একটা সংশয়, একটা দোলাচল থেকেই গেছিল।
নেহরু, গান্ধী, আম্বেদকরের মতাদর্শে দীক্ষিত একটি দলের রাজনৈতিক চলন যে ধর্মনিরপেক্ষতা অভিমুখী হবে সেটাই তো প্রত্যাশিত। কংগ্রেস সব সময় ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে অটল থাকেনি। তার পদস্খলন হয়েছে। এই দলটির বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে মেনে নিয়েও ক্ষেত্রবিশেষে সেই আদর্শকে লঙ্ঘন করা। কংগ্রেস নেতা–‌নেত্রীদের মধ্যে বরাবরই উচ্চবর্ণের হিন্দুদের প্রাধান্য ছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্বও দিয়েছিলেন মূলত উচ্চবর্ণের হিন্দুরা। অনেকেই আছেন যাঁরা বিজেপি ও কংগ্রেসের তুলনা করতে গিয়ে তেল আর জলের মিশ না খাওয়ার উপমা টানেন। এই দুই দলের সহাবস্থান নাকি একেবারে অসম্ভব। এই মত একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ লক্ষ্য করে দেখবেন বাম ডান নির্বিশেষে সমস্ত রাজনৈতিক দলই বিশ্বাস করে যে রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রু বলে কিছু হয় না। তাদের রাজনৈতিক চেতনার মধ্যে যদি এই বোধের অস্তিত্ব তাকে তাহলে তেলে–‌জলে মিশ না খাওয়ার প্রশ্নটা আসছে কোথা থেকে?‌ 
কংগ্রেস স্বাধীনতার পর নিরবচ্ছিন্নভাবে তিরিশ বছর দেশ শাসন করেছে। তখন তো বিজেপি ছিল না। আজ যারা বিজেপির সমর্থক, যারা বিজেপি–‌কে ভোট দেয়, তারা কি আগে কংগ্রেসেরই সমর্থক ছিল না?‌ কংগ্রেসের সঙ্গে মতাদর্শগত ঐক্য কিছুটা আছে বলেই তো তারা বিজেপি‌কে তাদের পছন্দের দল হিসেবে বেছে নিয়েছে। ১৯৮৬ সালে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী বীরবাহাদুর সিং রাজীব গান্ধীর নির্দেশেই অযোধ্যায় রামমন্দিরের জন্য সংরক্ষিত এলাকার তালা খুলেছিলেন। তারও বছর তিনেক পরে ১৯৮৯ সালে মুখ্যমন্ত্রী এন ডি তিওয়ারি রামমন্দিরের শিলান্যাস করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর প্রত্যক্ষ মদতে। এমন–কি রাজীব গান্ধী ১৯৮৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছিলেন এই অযোধ্যা থেকেই রামের পুজো দিয়ে। শাহবানু মামলার ক্ষেত্রেও আমরা কংগ্রেসকে অন্য চেহারায় দেখেছি। এ ছাড়াও রয়েছে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার পর কংগ্রেস নেতাদের প্রত্যক্ষ পরিচালনায় দাঙ্গা লাগিয়ে শিখ নিধনও তো সাম্প্রদায়িকতার বড় উদাহরণ। সুতরাং বিগত গুজরাট এবং আসন্ন কর্ণাটক বিধানসভা নির্বাচনে রাহুল গান্ধীর মন্দিরে মন্দিরে পুজো দেওয়া এবং পুরোহিত–আশীর্বাদধন্য হয়ে নির্বাচনী প্রচারে অবতীর্ণ হওয়ার যে চিত্র আমরা দেখেছি এবং দেখছি তা কংগ্রেস দলের ঐতিহ্য মেনেই হয়েছে এবং হতে চলেছে।‌

জনপ্রিয়

Back To Top