‌প্রচেত গুপ্ত

এই ভয়ঙ্কর করোনাকালে নানা ধরনের লড়াইয়ের কথা বলেছি। শুনলে মন ভাল হয়ে যায় এমন সব লড়াই। চিকিৎসক, সেবাকর্মী, পুলিশ, শিক্ষক, হাসপাতাল, সাহিত্যিক, কবিতা, গান থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়া, সমাজসেবা— যতটা দেখছি বলছি। বিখ্যাত থেকে সাধারণ মানুষ কোনও তফাত রাখছি না। যে যেভাবে আমাদের শরীর, মন, পরিবেশ ভাল রাখবার চেষ্টা করছেন, তাদের কথা বলছি। এখনও অনেকে বাকি রয়েছেন। অনেকে র‌য়েছেন আড়ালে। আমার সামর্থ্য সীমিত। তবে চেষ্টা করছি।
আজ একদম অন্যরকম এক মানুষের কথা বলব। মানুষটা এই অতিমারীর সময়েও নির্ভয়ে, নিঃশব্দে মানুষের উপকার করে চলেছেন। শুধু মানুষ নয়, উপকার করছেন জীবের। আমি এই অন্যরকম মানুষের খবর পেয়েছি তরুণ কথাসাহিত্যিক শুভ্রদীপ চৌধুরির কাছ থেকে।
‘‌জানেন দাদা, এই করোনার সময়েও একটি মানুষ সাহস নিয়ে কাজ করে চলেছে। যখন কেউ কারও বাড়ি যায় না, কারও ডাকে সাড়া দেয় না, বিপদে পড়লে ফিরে তাকাতে চায় না, তখন এই মানুষটি ছুটে যাচ্ছে।’‌
মানুষটির নাম কুন্তল মালাকার। বয়স ৪২ বছর। স্ত্রী, পুত্র পরিবার নিয়ে থাকেন দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটে। কীভাবে তিনি এই সঙ্কটকালে মানুষের পাশে আছেন?‌
সাপ ধরে। হ্যঁা, সাপ ধরে। ফোনে কথা বললাম লম্বা সময়। অনেক কথা। সবটা আজ বলছি না। পরে যদি সুযোগ পাই বিস্তারে বলা যাবে। এখন ছোট করে বলি। বাড়িতে, দোকানে, বাজারে, গোডাউনে, খেতে, সরকারি অফিসে সাপের দেখা পেলেই ডাক পড়ে কুন্তলবাবুর। শহরে, গ্রামে সর্বত্র। তঁার কথা, দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার এমন কোনও থানা নেই যেখানে কাজ করেননি কুন্তলবাবু। এই জেলায় সাপের উপদ্রব খুব। শীতে, গরমে সব সময়েই সাপ ঢুকে পড়ে ঘরে। কুন্তলবাবুর ডাক পড়ে। কোনও রকম আঘাত না দিয়ে তিনি সাপ ধরবার টেকনিক জানেন। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। সাপ ধরে এনে জমা দেন বনদপ্তরে। বনদপ্তর গভীর জঙ্গলে সেই সাপ ছেড়ে দিয়ে আসে। দিনের পর দিন এই কাজ করছেন অভাবী কুন্তলবাবু। তবে টাকার জন্য করেন না। টাকা চানও না কারও কাছ থেকে। করেন ভালবেসে। নেশায়। তঁার কথায় এতে মানুষও বঁাচছে, জীবটিও বঁাচছে। থাকছে ভারসাম্য, রক্ষা হচ্ছে পরিবেশ। কেউ ডাকলে কখনও ‘‌যাব না’‌ বলেন না কুন্তলবাবু। বললেন, ‘‌মানুষ তো বিপদে পড়েই ডাকে। তাছাড়া বিপদ তো সাপটিরও। ভয় পেয়ে কেউ আঘাত করলে সেও তো মারা যেতে পারে। তাই আগে ছুটে যাই।’‌
জিজ্ঞেস করলাম, ‘‌এই করোনার সময় কী করছেন?‌’‌
কুন্তলবাবু বলেন, ‘‌এই সময়ে সাপের ভয় বেশি। একেই তো প্রায় গরমকাল থেকে করোনার প্রকোপ শুরু হয়েছে। এখন বর্ষা পেরোতে চলল। লকডাউনে মানুষ বেশি সময় বাড়িতে থাকছে। চারপাশের জঙ্গল সাফ করছে, পুরনো ইটের স্তূপ সরাচ্ছে, গর্ত বোজাচ্ছে, ভাঙা দেওয়াল মেরামত করছে। সেখান থেকে আশ্রয় হারিয়ে সাপ ঢুকে পড়ছে ঘরে। আমার ডাক পড়ছে।’‌
‘‌আপনি চলে যাচ্ছেন!‌ করোনার ভয় করছে না?‌’‌
কুন্তলবাবু ফোনের ওপাশ থেকে একটু হেসে বললেন, ‘‌এটাও তো ভয়। আমি মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস পরে যাচ্ছি। বাড়ির লোকজনকে সরে যেতে বলছি। তারপর কাজ করছি। এই সময় বিষধর সাপে কামড়ালে তো আরও সমস্যা। সাপ ধরে এনে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে জমা দিয়ে দিচ্ছি। আমি না গেলে কে যাবে?‌’
কুন্তল মালাকারের কথা শুনে মুগ্ধ হই। সাহস এবং কর্তব্যবোধ একেই বলে!‌ সরাসরি কোভিড–‌১৯–‌এর বিরুদ্ধে হয়তো লড়াই করছেন না, পরোক্ষে তো এও একরকম লড়াই। নয় কি?‌ নইলে তো মানুষকে আরও বিপদে ফেলে করোনাই হাসত। যেমন যে–‌কোনও বিপদে ফেলে সে হাসছে। হার্ট অ্যাটাক থেকে পা ভাঙা পর্যন্ত।
শাবাশ কুন্তলবাবু। নিজে ভাল থাকুন। মানুষ এবং জীবজগৎকে ভাল রাখুন।
আবার আপনার সঙ্গে দেখা হবে।
এবার একটু বকুনির কথা। ‌
আজ কত তারিখ?‌ ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০। ধরা যেতে পারে মার্চ মাসের ১৩ তারিখ থেকে আমাদের এখানে করোনা নিয়ে আলোচনা চলছে। সতর্ক হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, হাত ধোবেন, মাস্ক পরবেন। তাহলে কতদিন হল? ৬ মাস। এই ৬ মাসে বিশ্বে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন ৯ লক্ষের বেশি মানুষ। প্রায় ৩ কোটির বেশি মানুষ আক্রান্ত। অতি লজ্জার কথা, এরপরেও বহু মানুষ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। হু–‌এর প্রধান বলছেন মাস্ক পরুন। পৃথিবীর সব বিজ্ঞানী, চিকিৎসকরা বলছেন মাস্ক পরুন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা বলছেন মাস্ক পরুন। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রীরা বলছেন মাস্ক পরুন। মিউনিসিপ্যালিটি, কর্পোরেশন, জেলা পরিষদের প্রধানরা বলছেন মাস্ক পরুন। আবেদন–‌নিবেদন করা থেকে হাতজোড় পর্যন্ত করছেন। তারপরেও বহু মানুষ মাস্ক পরছেন না। শুধু পরছেন না এমন নয়, তাই নিয়ে যুক্তিও দিচ্ছেন। আমি আগেও বলেছি, আজ আবার বলছি, পড়াশোনা জানা মানুষ এই অশিক্ষিতপনা বেশি করছেন। কিছু বে–‌আক্কেলে ধনবান এবং কিছু গুন্ডা মস্তানও এই কাজ করছে। শুনলাম, একটি স্কুলে মিড–‌ডে মিল দেবার সময় এক অভিভাবক মাস্ক ছাড়া ভিতরে ঢুকতে যান। তাকে এক শিক্ষিকা বাধা দেন। সেই অভিভাবক বলেন, ‘‌আগে ভাইরাস দেখান, তারপর মাস্ক পরব।’‌  যারা মাস্ক পরছেন না তাদের চারটে যুক্তি। এক, সরকার বলছে তাই পরব না। দুই, মাস্ক পরে কোনও লাভ নেই। যার করোনা হবার তার হবেই। তিন, মাস্ক পরে গরম লাগে, কাজ করা যায় না। এবং শেষ যুক্তি, ভিতুরা মাস্ক পরে, আমি সাহসী, মাস্ক পরব না।
প্রথম দুটি নিয়ে কোনও কথা বলে লাভ নেই। মূর্খ এবং গুন্ডাদের এড়িয়ে চলাই ভাল। আর যারা গরম লাগার কথা বলছেন, তাদের কথা মানছি। কিন্তু করার তো কিছু নেই। মৃত্যু যে গরমের থেকেও ভয়ঙ্কর। তাই না?‌ জামা কাপড় পরলেও তো গরম লাগে?‌‌ কাজ করতে অসুবিধে হয়। কী করব? পরব না?‌‌ গোটা বিশ্বে একটি ঘটনাও কি ঘটেছে, যেখানে মাস্ক পরবার কারণে মৃত্যু হয়েছে?‌ না, ঘটেনি। তবে করোনায় মারা গিয়েছেন ৯ লক্ষ মানুষ।
যারা মাস্ক না পরে সাহস দেখান তাদের বলি, জীবনে সাহস দেখানোর অনেক জায়গা রয়েছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অবিচারের মিথ্যে, মিথ্যের বিরুদ্ধে। একটু আগে তো কুন্তলবাবুর কথা বললাম। ওসব জায়গায় তো বেশিরভাগজনই কেঁচো হয়ে থাকি। আমি সব থেকে বেশি থাকি। বেচারি মাস্কের বিরুদ্ধে সাহস না–‌ই বা দেখালাম। তাই না?‌
আমি মাস্ক না পরলে বিপদ শুধু আমার নয়, বিপদ আমার পরিবারের, পরিবারের বাইরে বহু মানুষের। তাই মাস্ক না পরবার অধিকার আমার নেই।
অনেক আবেদন–‌নিবেদন হয়েছে, এবার প্রশাসন যদি মাস্ক নিয়ে কড়া না হয়, বড় ক্ষতি হবে। যে বোঝে না, যে বুঝতে চায় না, যে গুন্ডা তার বিরুদ্ধে কড়া হতেই হবে। যেমন লকডাউন নিয়ে হতে হয়েছে। তখন দেরি হয়ে যাবে না তো?‌
একটা আশার কথা দিয়ে আজকের লেখা শেষ করি।    
ভ্যাকসিন আসছেই। খুব দ্রুতই আসছে। এই আসার পথের ত্রুটি–‌বিচ্যুতি তাকে আরও নিখুঁত করছে। আরও নিরাপদ করছে। যারা ভ্যাকসিন কোনও দিন আসবে না বলে ভয় দেখিয়েছিলেন, তারা সবার আগে লাইন দেবেন। আমরা খুশি হব। ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top