কৃষ্ণপ্রিয় দাশগুপ্ত: দেশে এখন ভাবাবেগের ধুম লেগেছে!‌ পান থেকে চুন খসলেই আবেগ মাথাচাড়া দিচ্ছে। নানাবিধ ভাব বিকশিত হচ্ছে। প্রবলবেগে সেই ভাব আবেগের মোড়কে ঢুকে পড়ছে। শুরু হচ্ছে অসভ্যতা। উন্মত্ত তাণ্ডব। ‘‌পদ্মাবতী’‌ ঈ–‌কার ত্যাগ করার পরেও নিস্তার পায়নি। রাজ্যে রাজ্যে তাণ্ডব চালাচ্ছে কর্ণী সেনা। তাদের বিরাট দাপট। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশও তারা পাত্তা দেয় না। দেশের সরকার তাদের মদত দিচ্ছে। নইলে এত সাহস পায় কোথা থেকে ওই সেনারা!‌ বিজেপি–‌আরএসএস চায় এই দেশটাকে হিন্দুরাষ্ট্র করতে। বিজেপি–র নেতারা সংবিধানও বদলে দেবেন বলছেন। কবে রামমন্দির তৈরি হবে, তার দিনক্ষণ ঘোষণা করে দিচ্ছেন। কেউ আবার উড়িয়ে দিচ্ছেন ডারউইনের তত্ত্বকে। সবকিছুর মূলে রয়েছে ‘‌হিন্দুত্ব’‌। রয়েছে মনুবাদী তত্ত্ব। দেশটাকে ক্রমেই পঁাচ হাজার বছর আগের ভারতে পিছিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে উন্মত্ত হিন্দুত্ববাদীরা। ‘‌পদ্মাবত্‌’‌–‌কে নিয়ে যে অসভ্যতা হয়েছে এবং হয়ে চলছে, তা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সবকিছুই হচ্ছে খুবই পরিকল্পনামতো। কেন্দ্রের তো একটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক আছে;‌ তাদের ভূমিকা কী?‌ যে রাজ্যগুলিতে কর্ণী সেনার আস্ফালন চলছে, সেই রাজ্যগুলির পুলিস কী করছে?‌ টিভিতে এসে ওই সেনাদলের যে মাতব্বরেরা এত হুমকি দিচ্ছেন, তঁাদের বিরুদ্ধে দেশের প্রশাসন কী ব্যবস্থা নিয়েছে?‌ এই দেশেই তো ফেসবুকে একটু বিরোধিতার কথা প্রকাশ পেলেই গ্রেপ্তার হতে হয় সেই ব্যক্তিকে, তাহলে এক্ষেত্রে অন্য ভূমিকা কেন সরকারের?‌ এদেশেই বিরোধী কণ্ঠস্বরকে বেছে বেছে খুন করাটা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে গেছে। কালবুর্গি, পানসারে, দাভোলকর— শেষে গৌরী লঙ্কেশ। এই হত্যাকাণ্ড কারও কোনও তাৎক্ষণিক উত্তেজনার পরিণতি নয়। সবই একটা নির্দিষ্ট কর্মসূচির অন্তর্গত। এদেশে, দলিত বলে, রোহিত ভেমুলাকে আত্মহত্যা করতে হয়। দলিত বলে, বেছে বেছে আক্রমণ করা হয়। গরুর দোহাই দিয়ে মুসলমানদের খুন করা হয় হিন্দুত্বের নামে। এই অসভ্যতা–বর্বরতা এখন দেশের দৈনন্দিন ঘটনা। এই বর্বররা এমন–কি বিবেকানন্দ–‌রবীন্দ্রনাথকেও তাদের সঙ্গী ভাবে!‌ হিন্দুধর্মের ঠিকাদার এই বর্বরদেরই সুপরিকল্পিত কর্মসূচি দেখছি আমরা এখন। ‌‌‌
কোনও কালো টাকা ঘরে ফেরেনি। ঘরে ঘরে বিকাশ হয়নি। বিজ্ঞাপন ছাড়া কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না ‘‌অচ্ছে দিন’‌। বরং প্রধানমন্ত্রী এখন ‘‌পকোড়া‌’‌ ভাজতে বলছেন বেকারদের। এটাই স্বচ্ছ ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি। নোটবন্দি হয়েছে, জিএসটি‌ হয়েছে, ক্রমে ক্রমে নাকি দেশটা ‘‌ডিজিটাল ইন্ডিয়া’‌ হবে। অর্থাৎ, আধুনিক হবে। আবার একই সঙ্গে ‘‌নিরামিষ ভারত’‌ নাকি হবে। অপূর্ব একদল বর্বর জোকারের হাতে পড়েছি আমরা!‌
একটা গণতান্ত্রিক দেশে ‘‌‌ফিল্ম সেন্সর বোর্ড‌’‌ থাকার আদৌ কোনও যৌক্তিকতা আছে কি না, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে। যদি ধরে নিই, ‘‌সেন্সর বোর্ড’‌–‌এর দরকার আছে;‌ তবে, তারাই তো পদ্মাবতীকে নিয়ে শেষ সিদ্ধান্ত নেবে। সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যাবে কেন বিষয়টা?‌ এইটুকু গণতান্ত্রিক সুস্থতা নেই দেশের?‌ কীসের এত ভয়?‌ একটা ছবি ওই কর্ণী সেনাদের সব আত্মমর্যাদাকে ধুলোয় লুটিয়ে দিতে পারবে?‌ এত ঠুনকো–‌পলকা মর্যাদা! ‌কতগুলো গুন্ডা ‘‌‌ভাবাবেগ‌’‌–‌এর নামে তাণ্ডব করবে, বাচ্চাদের স্কুলবাস আক্রমণ করবে, আর দেশের প্রশাসন চুপ করে থাকবে?‌ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি নাকি, এই ১২১ কোটির দেশে ‘‌‌৬০০ কোটি ভোট’‌ পেয়েছেন!‌ তাই কি ওই সরকারপন্থী গুন্ডাদের এত দাপট!‌ ভুলে ভরা দেশের শাসন। ভুলের মোহেই বীরদর্প তারা। তাই ডারউইনকে উড়িয়ে দিতেও দ্বিধা নেই তাদের। আর ধর্মীয় ব্যাখ্যা বা ইতিহাস এখন এই ভুলের আবর্তেই চরকিপাক খাচ্ছে। 
২৫ জানুয়ারি, পদ্মাবত্‌ মুক্তির দিন চেতন সাইনির মৃত্যুর দু’‌মাস পূর্ণ হল। মনে আছে চেতনকে?‌ ২৫ জানুয়ারির ঠিক দু’‌মাস আগে এই চেতন সাইনির ঝুলন্ত মৃতদেহ পাওয়া যায় রাজস্থানের জয়পুরে;‌ নাহারগড় কেল্লায়। কেল্লার কার্নিসে ঝুলন্ত চেতনের মৃতদেহের পাশে লেখা ছিল, ‘‌পদ্মাবতীর প্রতিবাদে‌’‌। তখনও পদ্মাবতী পদ্মাবত্‌ হয়নি। চেতন সাইনির মৃত্যু কি আত্মহত্যা?‌ তাঁর মৃতদেহের পাশে অনেক কথা লেখা ছিল। কী সেই লেখা?‌ ‘‌‌আমরা শুধু পুতুল ঝোলাই না পদ্মাবতী’‌। দেওয়ালে লেখা ছিল, ‘‌‌চেতন তান্ত্রিক মর গয়া’‌। জনশ্রুতি পদ্মাবতীর স্বামীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন এক ‘‌চেতন তান্ত্রিক’‌। তিনি পরবর্তিকালে আলাউদ্দিনের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেন। লোককথায় শোনা যায়, পদ্মাবতীর ছবি দেখিয়ে আলাউদ্দিনকে চিতোর আক্রমণে প্ররোচিত করেন চেতন। প্রশ্ন উঠেছে, সেই চেতনকে মনে করিয়ে দিতেই কি এখনকার চেতনকে খুন করা হয়েছে? কেননা এই ‌‘‌চেতন‌’‌  নামটার সঙ্গে পদ্মাবতীর ‘‌অসম্মান’‌–‌এর কাহিনী জড়িয়ে আছে। তবে, খুবই রহস্যময় এই মৃত্যু। কেল্লার দেওয়ালে আবার এ–‌ও লেখা দেখা গেছে, ‘‌কাফিরদের অবস্থা এমনই হয়।’‌ কর্ণী সেনা তো ‘‌কাফির’‌–‌এর কথা বলতে পারে না। তবে এটা কে লিখেছে?‌ চেতন সাইনির মৃতদেহ কী ইঙ্গিত দেয়?‌ এটা কি আত্মহত্যা না হত্যা?‌ তাঁর পরিবারের মত, ‘‌যেভাবে তিনি ঝুলেছিলেন তা কারও নিজের পক্ষে সম্ভব নয়।’‌ তবে?‌ পদ্মাবতী এখন পদ্মাবত্‌। কিন্তু চেতন সাইনির মৃত্যু এখনও রহস্যাবৃত। আদৌ কি কোনওদিন রহস্যের জট থুলবে?‌
এই যে একটা ছবি নিয়ে দেশে এত কাণ্ড, দেশটার অবস্থা কী এখন?‌ পদ্মাবতী বা পদ্মাবত্‌ নিয়ে মত্ত তাণ্ডবকারীরা জানেন কি দেশের মোট সম্পদের ৭৩ শতাংশই রয়েছে দেশের মাত্র ১ শতাংশের হাতে?‌ দেশের ১ শতাংশ ধনকুবেরের সম্পদ গত এক বছরে ২০.‌৯ লক্ষ কোটি টাকা বেড়েছে। দেশের ২০১৭–১৮ অর্থবর্ষের বাজেটের সমান এই বৃদ্ধি। অচ্ছে দিন আর কাকে বলে!‌ এই না হলে ‘‌‌সবকা বিকাশ’‌!‌‌ দেশের কোটিপতিদের সম্পদ গত বছর বেড়েছে ৪.‌৮৯ লক্ষ কোটি টাকা। দেশের রাজ্যগুলোর স্বাস্থ্য এবং শিক্ষাখাতে বাজেটের ৮৫ শতাংশ খরচের সমান এই বৃদ্ধি। এই যে এত কোটি কোটি টাকা, এই সম্পত্তি দেশের ৩৭ শতাংশেরই পারিবারিক সূত্রে পাওয়া। কোটিপতিদের মোট সম্পত্তির ৫১ শতাংশ এঁদের হাতে। বিশ্বের ৭৪টি দেশের মধ্যে সার্বিক উন্নয়নের যে সূচক প্রকাশ পেয়েছে, সেই সূচকের মাপকাঠিতে ভারতের স্থান ৬২ নম্বরে। আগের বছর ৭৯টি উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে আমাদের দেশ ছিল ৬০তম। এবার ৬২তম। চীন ২৬তম এবং পাকিস্তান ৪৭তম। এত যে ‘‌‌জিডিপি’‌–‌র গল্প শুনি, এই সব পরিসংখ্যান তো তাকেই প্রশ্ন করে। ‘‌সবকা বিকাশ’‌–‌এর এই নমুনা!‌ ওই যে তরোয়াল হাতে তাণ্ডব করে চলেছে কর্ণী সেনার পাগড়িধারীরা, তারা জানে এই পরিসংখ্যান?‌ আরএসএস কী বলে?‌ ডারউইন নিয়ে নতুন কথা শোনালেন যে কেন্দ্রীয় বিজেপি মন্ত্রী, তিনি জানেন না?‌ তিনি তো মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা দেখার দায়িত্ব তাঁরই। কী অবস্থায় রয়েছে দেশের শিক্ষা?‌ দেখা যাক।
দেশের রাজধানীর নাম বলতে পারে না ৩৬ শতাংশ কিশোর–‌কিশোরী। দেশের মানচিত্রকে চিহ্নিত করতে পারে না ৫৮ শতাংশ পড়ুয়া। তিন অঙ্কের সংখ্যাকে এক অঙ্ক দিয়ে ভাগ করতে পারে না ৫৭ শতাংশ। আরও আছে, পাঁচশো টাকার কয়েকটা নোট দেখিয়ে যোগ করতে বললে, বলতে পারে না ৪৪ শতাংশ পড়ুয়া। বাটখারা দেখিয়ে কত ওজন হচ্ছে জানতে চাইলে বলতে পারে না ২৪ শতাংশ। তিন হাজার টাকার জামার ১০ শতাংশ ছাড় হলে কত হয়?‌ বলতে পারে না ৬২ শতাংশ পড়ুয়া। কেন্দ্রীয় সরকারেরই সমীক্ষায় ধরা পড়েছে এই ছবি। ‘‌অ্যানুয়াল স্টেটাস অব এডুকেশন রিপোর্ট’‌–‌এ ধরা পড়েছে এই ছবি। বলা দরকার এই সমীক্ষা গ্রামের। এভাবেই গড়ে উঠছে দেশ— ডিজিটাল ইন্ডিয়া!‌ পকোড়া ভাজা ছাড়া গতি নেই।
কৃষকের আত্মহত্যা অব্যাহত। কালো টাকার দেখা নেই। কোথাও কোনও বিকাশ বিকশিত হচ্ছে না। স্বচ্ছ চোখেই ‌‘অচ্ছে দিন’‌ ‌ধরা পড়ছে না। বেকারেরও চাকরি নেই। আসছে ২০১৯–‌এর নির্বাচন। ‘‌হিন্দুত্ব’‌ ছাড়া গতি নেই। তাই তাণ্ডব, অসভ্যতা, বর্বরতাই হাতিয়ার। এ ছাড়াও গতি নেই। কোনও  ভাবাবেগই আকস্মিক নয়। সবই সুপরিকল্পিত মনে হয়। গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো জ্বলজ্বল করছে গুজরাট বিধানসভা ভোটের ফল। ফলে, এমন অসভ্য–‌বর্বর ভাবাবেগ এখন মাঝে মাঝেই মাথাচাড়া দেবে। কেননা, ভোট আর ভাবাবেগ পরিপূরকের মতো পরস্পরনির্ভর।‌‌
 

জনপ্রিয়

Back To Top