বাহারউদ্দিন

ক্লাসরুমে হজরত মহম্মদ (দঃ)–‌এর বিকৃত কার্টুন নিয়ে আলোচনা, স্যামুয়েল প্যাতি–‌র শিরচ্ছেদ এবং এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রঁর কয়েকটি মন্তব্যকে ঘিরে জর্ডন, কুয়েত, পাকিস্তান ও তুরস্কে ব্যাপক বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ‌্য করছি। পাকিস্তানে ফ্রান্সের পতাকা পোড়ানো হয়েছে। পেশোয়ারের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন অন্তত ৭ জন শিক্ষার্থী, আহত ৭২। এ ঘটনার সঙ্গে ফরাসি প্রেসিডেন্টের মন্তব্যের কোনও যোগাযোগ আছে কি না, তা নিশ্চিত নয়। কিন্তু আরব দেশগুলিতে ফরাসি পণ্য বর্জনের যে হিড়িক পড়েছে; যেভাবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান, মিঃ মাক্রঁকে ‘মানসিক চিকিৎসা’ করানো দরকার বলে ধর্মীয় সঙ্ঘাতকে উসকে দিয়েছেন, তা বিশ্বের প্রধান দুই সেমিটিক ধর্মাবলম্বীদের মনের সঙ্ঘর্ষের স্মৃতিকে ফিরিয়ে আনছে। ফরাসি পত্রিকা ‘শার্লি এবদো’ আবার ওই কার্টুনটি ছেপে উসকানির আগুন ছড়িয়ে দিতে চাইছে। খানিকটা সুযোগ পেয়ে বাংলাদেশে পরাজিত মৌলবাদ ফিরে আসতে চাইছে ময়দানে। সমাজের সম্মতি নেই। প্রশাসন সতর্ক। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, বাঙালির উদার আত্মশক্তি অচিরে পরিস্থিতি সামলে নেবে। কেন না এটাও তার সামগ্রিক সত্তার অন্যতম অঙ্গীকার।  
যাঁরা ফ্রান্স প্রেসিডেন্টের প্রতিক্রিয়া নিয়ে ক্ষোভে সোচ্চার, শিক্ষকের শিরচ্ছেদের ঘটনায় তাঁদের নিন্দা কোথায়? এটা যে কত বড় অন্যায় ও ইসলাম বিরোধী অপরাধ— তা অনেকেই খতিয়ে দেখছেন না। ঘোলা জলে মাছ ধরতে নেমে পড়েছে কেউ কেউ। এদের লক্ষ্য, ফ্রান্সের সাংস্কৃতিক ভাবমূর্তিতে কলঙ্ক লেপন। দ্বিতীয়ত, বিশ্ব জুড়ে পরিত্যক্ত ধর্মীয় সন্ত্রাসের রুগ্‌ণ দেহে বল সংযোগ। এসব কাজ সহজ নয়। তবু ছত্রভঙ্গ আইএস ও আল কায়দার ঘৃণ্য শক্তিকে সংগঠিত করার গোপন প্রয়াস নজরে আসছে। 
আল কায়দা আরব ভূখণ্ডে নির্মূল। আফগান মুলুকে তালিবানের সহায়তার নামকে–‌ওয়াস্তে টিকে আছে। আফ্রিকায় মিশে গেছে স্থানীয় সন্ত্রাসবাদীদের অস্তিত্বে। আবু বক্কর বাগদাদির আইএস–‌এর উত্থানে আল কায়দার আবিশ্ব সশস্ত্র বিপ্লব থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয় তরুণরা। যারা তাদের অস্ত্র ও অর্থ জোগাত, তারাও শিবির বদল করে আইএস–‌কে অর্থ জোগাতে থাকল। আইএস সিরিয়া ও ইরাকে রুশ মার্কিন কৌশলের (স্ট্র্যাটেজি) মুখোমুখি দাঁড়াতে পারল না। তুরস্ক সীমান্তেও কুর্দ বাহিনী তাদের ঠেকিয়ে রাখল। সিরিয়া, ইরাক, ফিলিস্তিন ও লেবাননে ইরানের মদতপুষ্ট হিজবুল্লাহ এক ইঞ্চিও জমি ছাড়ল না তাদের। এরকম পরিস্থিতিতে মার্কিন ঘেঁষা আরব দেশগুলির সামনে দুটি সমস্যা দেখা দেয়, একদিকে হিজবুল্লার ক্ষমতা বৃদ্ধি। আরেক দিকে আইএস–‌এর তৈরি ধর্মহীন, রাজনীতিহীন নৈরাজ্য। সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর তাঁর অনুগত যোদ্ধাদের ভরসা হয়ে ওঠেন আইএসএর–‌আল বাগদাদি। স্বেচ্ছাচারিতা আর ভুল স্বপ্নের নায়ক। কোনও রাষ্ট্রই তাঁর পাশে দাঁড়ায়নি। স্বঘোষিত বিপ্লবী, স্বঘোষিত খলিফা। মৃত্যু তাঁকে তাড়া করতে করতে আল ফোরাতের (ইউফ্রেটিস) সীমাবদ্ধ জমিতে আটকে দেয় এবং ওসামা বিন লাদেনের মতোই একদিন ঝাঁঝরা হয়ে গেল দেহ। অনিবার্য পরিণাম। 
সংগঠিত অথবা অসংগঠিত সন্ত্রাসবাদীরা বুঝতে পারে না, আধুনিক রাষ্ট্রের সামনে তাঁরা ঘাসের মতো তুচ্ছ। যৎসামান্য অস্ত্র, অর্থ ও লোকবল নিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের মহাশক্তির সঙ্গে লড়াই স্লোগানে মুখরিত হয়ে কয়েকটি অন্তর্ঘাতী, আত্মঘাতী উন্মাদনা ঘটিয়ে দেওয়া যতটা সহজ, ততটাই কঠিন লড়াইয়ে টিকে থাকা। যে রাষ্ট্র তাদের ব্যবহার করে, তারাই একদিন ফ্রাঙ্কেনস্টাইনকে খতম করে দেয়। আমেরিকা ও তার সহযোগীদের মদতে লাদেনের উত্থানের কাহিনি কে না জানে? লাদেনের উচ্চাকাঙ্ক্ষায় রাষ্ট্র নির্মাণের স্বপ্ন যখন জাগ্রত হল, তাঁর বিরুদ্ধে ডাকাত ডাকাত আওয়াজ উঠল, তখনই, তাঁর হত্যাকাণ্ডের আগেই রচিত হয়ে গেল আশু হত্যার পরিকল্পনা। একই ছকে খুন হতে হল বাগদাদিকেও। বাগদাদির মৃত্যুতেই খতম আল কায়দা আর আইএস–‌এর মানচিত্র। ছত্রভঙ্গ তাদের অস্তিত্ব। তাদের প্রত্যাবর্তন আর সম্ভব নয়। কারণ কোনও রাষ্ট্র ওদের সমর্থন করেনি, তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করেছে, অস্ত্র দিয়েছে, প্রয়োজন শেষে পাশ থেকে সরে গেছে, আর এই মওকায় ইরানমুখী হিজবুল্লাহ শুধু উপসাগরীয় এলাকায় নয়, সুদান ও ইয়েমেনেও তার ক্ষমতামত্ততা বাড়িয়ে তোলে। 
পশ্চিম এশিয়ায় প্রোআরব আর অ্যান্টি ইরানের সঙ্ঘাত চলছে। ইসলামের শান্তির শাশ্বত বার্তাকে, যুদ্ধ বিরোধিতাকে লঙ্ঘন করে রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সশস্ত্র অথবা ঠান্ডা লড়াই এখন মুখ্য। এজন্য ইসলামকে দায়ী করা অন্যায়। এটা ইসলামের সঙ্কট নয় (মাক্রঁর ভাষায়, ক্রাইসিস অফ ইসলাম)। সঙ্কট রাষ্ট্রনীতি আর আধিপত্যবাদের। আরব অনৈক্যের সুযোগ নিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে, বিভিন্ন আরব রাষ্ট্রের ভেতরেও তার প্রভুত্ব দাবি করেছে ইরান। সৌদি আরবের মতো বিত্তবান এবং মুসলিম বিশ্বের একচ্ছত্র অভিভাবক এ প্রভুত্ব মানবে কেন? বাধ্য হয়ে তাদের আমেরিকার ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াতে হচ্ছে। গোপনে কোনও কোনও রাষ্ট্র ইসরাইলের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়াচ্ছে। আমিরশাহি ও বাহরিন প্রকাশ্যে তেলআবিভের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলছে, মূলত মার্কিন ফাঁদে পা দিয়ে। এ পথে শামিল হওয়ার সম্মতি দিয়ে বিপদে পড়েছে সুদান। সৌদি মনোভাব ঝুলছে। ভয়, অভিভাবকত্ব হারাবে, আর তাদের আসনটি দখল করে নেবে তুরস্ক। আশঙ্কা অমূলক নয়। লিবিয়া নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে তুরস্কের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, মৌলবাদকে এরদোয়ানের প্রশ্রয়, আদালতের সাহায্য নিয়ে ঐতিহাসিক সৌধের ধর্মান্তর, পূর্ব ভূমধ্যসাগরের খনিজ সম্পদের অনুসন্ধানে ইস্তানবুলের আগ্রাসী ঝোঁক, আজারবাইজান ও আমেনিয়ার সঙ্ঘাতে তুরস্কের হস্তক্ষেপ— এরকম বিভিন্ন ঘটনা ও প্রত্যাঘাতে সৌদি আরব প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকেই প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতে শুরু করেছে। এরদোয়ানও সমানভাবে সরব। ফিলিস্তিনিদের স্বপ্ন ও স্বাধীনতার প্রশ্নে তাঁর সরবতা আমেরিকা ও ইওরোপীয় ইউনিয়ন সুনজরে দেখছে না। লক্ষ্য করছে, ওসমান তুর্কিদের হারানো খেলাফতকে জাগিয়ে তোলার পরিকল্পিত অভিপ্রায়। 
ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ সঙ্কট প্রবল। দক্ষিণপন্থীরা প্রেসিডেন্ট মাক্রঁর ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে। গত পাঁচ বছরে সন্ত্রাসী হামলায় দুশোরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। চাপা অসন্তোষ থামেনি। এর মাঝে কার্টুন বিতর্ক, তথাকথিত সামাজিক মাধ্যমের প্ররোচনা, শিক্ষকের শিরচ্ছেদ এবং সর্বশেষ ঘটনাগুলির রাজনীতি মিঃ মাক্রঁকে তাঁর অবস্থান থেকে সরে যেতে বাধ্য করছে। আগামী বছর দেশে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন। ওদিকেও তাকাতে হচ্ছে, অতএব দেখাতেই হবে সন্ত্রাস দমনে তিনি কত কঠোর এবং ইসলাম নিয়ে তাঁর মনোভাব সাধারণ ইওরোপিয়ানদের থেকে খুব একটা আলাদা নয়। দ্বিতীয়ত, মুসলিম বিশ্বের অভিভাবকত্ব নিয়ে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে, সেখানেও তাঁকে তুরস্ক বিরোধ চাঙ্গা করতে হবে। কারণ তুরস্কের এরদোয়ান সহজ অঙ্কের মানুষ নন। জটিল হিসেবনিকেশে অভ্যস্ত। তার নিশানের নিশানা সুনির্দিষ্ট। ক্ষমতার দীর্ঘমেয়াদি বিস্তার। এজন্যই তাঁর ইস্যু দরকার। নতুন ইস্যুটির নাম ফ্রান্সে ‘ইসলাম ফোবিয়া’‌র শাখা বিস্তার। এ ফোবিয়ার বৃদ্ধি মানেই ক্ষমতার বীজতলায় সার নিক্ষেপ। এরদোয়ানের ক্ষেত্রে যেমন, মিঃ মাক্রঁর বেলায়ও তেমনি এ এক ভয়ঙ্কর বাস্তব। রাজনীতিতে ধর্মীয় ভাবাবেগের ব্যবহার যে কী বিপজ্জনক, মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে, ক্রসেড পর্ব থেকে, বাবরি পর্ব পর্যন্ত শত শত ধ্বংসকাণ্ড আর অজস্র গণহত্যা তার সাক্ষী হয়ে আছে। সাবালক হব না আমরা? এত কাণ্ডের পরেও?  

জনপ্রিয়

Back To Top