ড.‌ দেবাশিস চক্রবর্তী,  পিটসবার্গ, আমেরিকা- মাস তিনেক হতে চলল করোনাকে সঙ্গে নিয়ে জীবন কাটাচ্ছে গোটা পৃথিবী। কোনও দেশে এর প্রকোপ কম, কোথাও বেশি। তফাত এটুকুই। কি সংক্রমণ, কি মৃত্যু, আমেরিকা পয়লা নম্বরে থেকে নজর কেড়েছে বিশ্বের। শোনা যাচ্ছে, আগস্টের গোড়ায় মৃতের সংখ্যা দেড় লাখ ছোঁবে। তার ওপর গত দু’‌মাসে চার কোটি মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। অদূর ভবিষ্যতে এই সমস্যা থেকে বেরনোর সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। এখন প্রশ্ন উঠছে, যখন অন্য দেশগুলো এই ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণের কিছু না কিছু উপায় বার করছে, তখন আমেরিকার কেন এমন দুরবস্থা? এক কথায় এর উত্তর হল, অতিরিক্ত বাণিজ্য–‌মনস্কতা, ‘অবসেশন উইথ বিজনেস’। আমরা যারা আমেরিকায় থাকি, তাদের সারাক্ষণ মাথায় রাখতে হয়, জনসাধারণ অর্থনীতির সেবা করে। অর্থনীতি আমাদের সেবক নয়। যেন–‌তেন–‌প্রকারেণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে হবে, দরকার হলে আত্মত্যাগ করতে হবে। প্রাণত্যাগও যে করতে হতে পারে, সেটা অবশ্য করোনার মতো একটা ভয়াবহ মহামারী না এলে বোঝা যেত না। আমজনতা বিশ্বাস করে, তাদের অস্তিত্ব নির্ভর করছে বাণিজ্যের ওপর, আর তারা ভালভাবেই জানে, বাণিজ্য–‌বিরোধী কোনও নীতি সহ্যই করবে না মার্কিন প্রশাসন। সে শ্রম আইন হোক কি পরিবেশ, সবটাই হতে হবে বাণিজ্যমুখী। দ্বিতীয় যে বিশ্বাসে ভর করে চলে আমেরিকা, তা হল বাজার অর্থনীতিই শেষ কথা, সব সমস্যার সমাধান ওতেই। এই যে আবহাওয়ার বিরাট পরিবর্তন, আয়ের চরম বৈষম্য, ভয়ঙ্কর দারিদ্র, ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য ব্যবস্থা— এগুলো নিয়ে ভাবতেই রাজি নয় কেউ। সারাক্ষণ দৌড়চ্ছে কী করে আরও আরও রোজগার করা যায় তার পিছনে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই একই মানসিকতার হবেন, সেটাই তো স্বাভাবিক। করোনা মোকাবিলায় তাঁর সামনে দুটো পথ খোলা ছিল। এক, ভাইরাসের মারণ ক্ষমতার গুরুত্ব বুঝে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখা। দুই, ভাইরাসের গুরুত্ব কমিয়ে দেখানো, এ ‌বিষয়ে সত্য গোপন করা এবং আশা করা, একদিন নিজে থেকেই উবে যাবে করোনা। ট্রাম্প দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছেন কারণ তা আপাতদৃষ্টিতে অর্থনীতির দৌড়ে বাধা সৃষ্টি করেনি। বলা বাহুল্য, তাঁর দল এবং সমর্থকেরা এজন্য তাঁকে বাহবা দিয়েছেন।
‘আন্ডারক্লাস’ কথাটা আমেরিকার সমাজে খুব প্রযোজ্য। ‘সাপ্লাই সাইড ইকনমিক্স’-এর তত্ত্ব অনুযায়ী, এই মডেলে ধনীর থেকে গরিবের দিকে চুঁইয়ে আসবেই সমৃদ্ধির সোনালি ধারা। বাস্তবে কী হয়, তা অবশ্য আলাদা কথা। এই নীতিতে অর্থনীতি চলে বলেই আমেরিকায় তৈরি হয়েছে আন্ডারক্লাস। এই তালিকায় রয়েছেন কৃষ্ণাঙ্গ, কম আয়ের মানুষ, নার্সিংহোমগুলোতে পড়ে থাকা প্রবীণেরা, জেলবন্দি, আর আছেন বিপদসীমার সবচেয়ে কাছাকাছি করোনা যোদ্ধার দল যাঁরা হয় স্বাস্থ্যকর্মী নয়তো অন্য প্রয়োজনীয় পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত। এঁদের বেশির ভাগই ঘন জনবসতি এলাকায় থাকেন এবং এঁদের কাজের জায়গাও ঝুঁকিপূর্ণ। বেতন কম হওয়ায় এঁদের স্বাস্থ্যবিমা নেই অথবা থাকলেও খুব কম অঙ্কের। এই গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে ডায়াবেটিস, হার্টের অসুখ, হাইপারটেনশন জাতীয় অসুস্থতা বেশি।
সুতরাং করোনা পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে ছিল দুটি ট্রাম্প কার্ড। একদিকে অধিকাংশ আমেরিকান যে করেই হোক অর্থনীতিকে সচল রাখতে বদ্ধপরিকর, অন্যদিকে গরিব ও বেকার মানুষেরা জীবন বাজি রেখে রোজগার করতে মরিয়া। ফলে ডাক্তারদের সাবধানবাণী, বিজ্ঞানীদের ভবিষ্যদ্বাণী, সমাজতাত্ত্বিকদের কল্যাণ প্রকল্প, কোনওটাতেই কান দেওয়ার প্রয়োজন নেই। জীবন না জীবিকা, এই প্রশ্নে শুধু ট্রাম্প কেন, যে কোনও রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট একইরকমভাবে দ্বিতীয়টিকেই বেছে নিতেন। বিকল্প মানবিক নীতির সপক্ষে যে মত সোচ্চার হচ্ছে আমেরিকায় এই মৃত্যুমিছিলের পর, বুঝতে হবে, তা রাতারাতি আসার নয়। এজন্য দরকার জোরদার আন্দোলন। এই মুহূর্তে এটুকু বলা যায়, সেই আন্দোলনের দরজা হয়তো খুলে দিল করোনা।

জনপ্রিয়

Back To Top