‌ওপরের হেডিংয়ের পাদঃপূরণ করে বলা যাক...‌ সুনীতারা বাস্তবে। বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে। সিঙ্ঘমরা সিনেমায় সুন্দর, সুনীতারা বাস্তবে। ‌
যে বাস্তবে শেষমেশ আমজনতার ইচ্ছেপূরণ হয় না। যে বাস্তবে দুষ্টের দমনকর্ত্রী সুনীতাদের ওপরওয়ালার মর্জিতে বদলি হতে হয়। তারপর ফোনে ইস্তফা আউড়ে চলে যেতে হয় ‘সিক লিভ’–এ। ভাগ্যিস যেতে হয়!‌ নইলে তো সত্যি সত্যিই তাঁর ‘লেডি সিঙ্ঘম’ নামকরণ সার্থক হত। গত মঙ্গলবার তাঁর ফেসবুক লাইভ দেখে মনে হল, গভীর চাপে সুরাট পুলিশের তরুণী সদস্য (‌নাকি এখন ‘প্রাক্তন সদস্য’)‌ সুনীতা যাদব। সামনে গ্লুকোজ মেশানো জলের গ্লাস। তাতে চুমুক দিতে দিতে মোট ৩৭ মিনিটের লাইভের প্রায় ৩০ মিনিট ধরে সুনীতা বলে গেলেন, তিনি কতটা অসুস্থ। রাতে ঘুমোতে পারছেন না। মাথা ঘুরছে। সবে ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ি ফিরলেন (নিজের বক্তব্য প্রমাণে ফেসবুক জনতার দরবারে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনও পেশ করলেন)‌। 
আরও জানালেন, শরীরটা বিশেষ জুতের না থাকায় আপাতত ফোনে ইস্তফা দিয়েছেন। একটু ভাল বোধ করলে দপ্তরে গিয়ে লিখিত পদত্যাগপত্র জমা দেবেন। ওই বাক্যটায়, ওই মোড়টায় বাস্তব আলাদা হয়ে গেল সেলুলয়েড থেকে। যেমন হয় সুনীতাদের বাস্তবে। আপনার–আমার বাস্তবে। 
তার আগে পর্যন্ত ‘সুরাট লোকরক্ষক দল’–এর (কাগজে–কাগজে, চ্যানেলে–চ্যানেলে তাঁকে ‘কনস্টেবল’ লেখা বা বলা হলেও তিনি তা নন। কনস্টেবলের চেয়েও একধাপ নিচে। তিনবছর পুলিশে কাজ করছেন। আরও দু’বছর করলে ‘কনস্টেবল’ পদে উন্নীত হবেন)‌ সদস্য সুনীতার সঙ্গে তাঁর ওপরতলার অফিসার, গুজরাটের স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং তাঁর পুত্রের কথোপকথন সিনেমার মতো লাগছিল। দেখতে দেখতে হাঁ করে ভাবছিলাম, এমনও হয়?‌ হতে পারে?‌ বাস্তবে? ‌এই জীবনে?‌ এই দেশে?‌ 
চিত্রনাট্যটি এইরূপ— 
গত ৮ জুলাই রাতে সুরাটের মিনিবাজার এলাকায় ডিউটিতে ছিলেন সুনীতা। সাড়ে ১০টা নাগাদ তিনি দেখেন নাইট কার্ফু ভেঙে কয়েকজন যুবক গাড়ি নিয়ে ইতিউতি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কারও মুখে মাস্ক নেই। প্রথমত, রাতের কার্ফুভঙ্গ। দুই, কোভিড–সময়ে মাস্কবিহীন। ব্যারিকেডের সামনে গাড়ি আটকান সুনীতা। এবং প্রথমেই ইগনিশন থেকে চাবিটি খুলে নেন। এসব সময়ে রসক্ষ্যাপা, উচ্ছঙ্খল এবং উড়নচন্ডী যুবকরা যা করে থাকে, ওই যুবকরাও সেটাই করেন। দ্রুত প্রভাবশালী বন্ধুকে ফোন। সেই ফোনের কিছু পরেই উইন্ডশিল্ডে ‘এমএলএ’ বোর্ড সঁাটা গাড়িতে অকুস্থলে হাজির হন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী কুমার কানানির পুত্র প্রকাশ কানানি। পিতৃপরিচয় দিয়ে বোধহয় খানিক ভুলই করেছিলেন তিনি। কারণ, সুনীতা তাঁকেও রোখাগলায় প্রশ্ন করেন, তিনিই বা কোন সুখে লকডাউনের সময় নাইট কার্ফু ভেঙে রাস্তায় বেরিয়েছেন। মন্ত্রীতনয় জানান, তিনি এসেছেন বন্ধুদের সাহায্য করতে। আপাত–ভিআইপি’র গাড়ি থেকে ‘এমএলএ’ লেখা বোর্ডটি একটানে খুলে নিয়ে সুনীতা সপাটে বলেন, বিধায়ক যখন গাড়িতে নেই, তখন কেন তিনি ওই বোর্ড লাগিয়ে ঘুরছেন?‌ 
ভিআইপি–সন্তানরা এরপর সাধারণত কী করেন?‌ বাবাকে আকুল ফোন করেন। প্রকাশও করেন। কিন্তু সুনীতা কি আর ছোড়নেওয়ালি?‌ মন্ত্রীর সঙ্গেও তাঁর কিঞ্চিৎ উত্তেজিত বিতন্ডা হয়। 
শর্টস–টি শার্টের মন্ত্রীপুত্র এবং খাকি উর্দি পরিহিতা মহিলা পুলিশকর্মীর চড়া বাদানুবাদের যে ভিডিও (‌গোটা দৃশ্যটা অদূরে দাঁড়ানো সাদা পোশাকের এক পুলিশকর্মী মোবাইলে তুলে রেখেছিলেন)‌ গোটা দেশে ভাইরাল হয়েছে, সেটা একঝলক দেখলে বোঝা যাবে, কেন সুনীতাকে ‘লেডি সিঙ্ঘম’ বলে ডাকা শুরু হয়েছে। খানিক ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ আর ঠেট গুজরাটিতে কথোপকথনের ফলে বাক্যগুলো একটু দুর্বোধ্য ঠেকছিল। কিন্তু এটুকু বোঝা গেল যে, মন্ত্রীর ছেলেকে সুনীতা বলছেন, ‘বাবাকে বলে গান্ধীনগরে বদলি করে দিবি?‌ দে বদলি করে!‌’ জবাবে মন্ত্রীর পুত্র বলছেন, বদলি কেন‌?‌ তিনি চাইলে সুনীতাকে ওখানেই টানা ৩৬৫ দিন দাঁড় করিয়ে রাখতে পারেন‌! জবাবে গলা আরও চড়িয়ে সুনীতা বলছেন, ‘আমি কি তোর বা তোর বাবার চাকর (‌গুলাম)?‌ নাহ্‌ রে, আমি তোদের চাকর নই! আমি এই খাকি উর্দির চাকরি করি।’ ‌ 
উত্তেজিত কথোপকথনের সময় মন্ত্রীপুত্রের আইনভঙ্গকারী এক বন্ধু পাশ থেকে মিনমিন করে একটা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। হাতের লাঠি উঁচিয়ে সুনীতা তঁাকে সটান বলেন, ‘চুপ রে!‌ আরেকটা শব্দ করলে এখানেই ফেলে পেটাব!‌’ 
অতঃপর তাঁর মোবাইল ফোনটি লাউডস্পিকার মোডে দিয়ে সুনীতা ধরেন তাঁর ঊর্ধ্বতন অফিসারকে। ‘সাহিব’ সম্বোধনের পর ওপাশ থেকে খানিক ধাতব এবং খানিক অস্পষ্ট গলা শুনে মোদ্দা বোঝা গেল, সিনিয়র এবং অভিজ্ঞ অফিসার সুনীতাকে সেখান থেকে চুপচাপ কেটে যেতে বলছেন। কিন্তু সুনীতা নাছোড়বান্দা। তিনি বাঁশের ব্যারিকেড পেরিয়ে গাড়ি যেতে দেবেন না তো দেবেনই না!‌ 
এমনও হয়?‌ হতে পারে?‌ বাস্তবে? ‌এই জীবনে?‌ এই দেশে?‌ 
একেবারে সিনেমার মতো না?‌ বলতে কী, এর পরের খানিকটাও সিনেমারই মতো। আইনভঙ্গকারী তিনজনকেই গ্রেপ্তার করে ভারাচা থানার পুলিশ। ঘটনাচক্রে, সুনীতা সেই থানাতেই কর্মরতা। পরে অবশ্য তিনজনই জামিন পেয়ে যান। ঠিকই আছে। সিনেমার মতো। আইন আইনের পথে চলল। দোষীরা গ্রেপ্তার হল। সৎ, কর্তব্যনিষ্ঠ পুলিশকর্মীর জয় হল। সিঙ্ঘম। বা লেডি সিঙ্ঘম। 
কিন্তু হল না। কারণ, কর্তব্যনিষ্ঠ পুলিশকর্মীকে রাতারাতি থানা থেকে বদলি করে দেওয়া হল সদর দপ্তরে। অর্থাৎ, তাঁকে আর কোনও থানা এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ফিল্ড ডিউটিতে রাখা হল না। কার্যত বসিয়ে দেওয়া হল বড়কর্তাদের নজরের সামনে। সদরে। পুলিশি পরিভাষায় যাকে বলে ‘শান্টিং’। এবং ওই পরিচ্ছেদ থেকেই সুনীতার কাহিনির স্টিয়ারিং মোচড় মারল সেলুলয়েড থেকে বাস্তবের পথে। 
যে বাস্তবে গুজরাটের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাংবাদিক বৈঠক ডেকে বললেন, সেই রাতে তাঁর ছেলে সিভিল হাসপাতালে ভর্তি তাঁর করোনা–আক্রান্ত শ্বশুরকে দেখতে যাচ্ছিল। তখনই সুনীতা তাঁর গাড়ি আটকান। মন্ত্রী বললেন, ‘আমার ছেলে ওই মহিলা পুলিশকর্মীকে হাতজোড় করে রাস্তা ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করে। ওর হাসপাতালে যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছিল। ওই মহিলা পুলিশ উল্টে ওকে বলেন, কেন এমএলএ বোর্ড লাগানো গাড়িতে চড়েছে আমার ছেলে। আমাকেও ফোনে প্রশ্ন করেন, প্রকাশ কার গাড়ি চালাচ্ছে?‌ আমি বলি, গাড়িটা আমার। কিন্তু আমার ছেলের সেটা ব্যবহার করার অধিকার আছে। আপনি দরকার হলে আইনি ব্যবস্থা নিন। কিন্তু গালাগাল দেবেন না। মনে হয়, ওঁর একবার বোঝার চেষ্টা করা উচিত ছিল যে, আমার ছেলে কী বলতে চাইছে। উভয় তরফেরই বোঝার চেষ্টা করা উচিত ছিল, অপরপক্ষ কী বলতে চাইছে।’ 
মন্ত্রী আরও বলেছেন, ‘উনি ব্যঙ্গ করে আমার ছেলেকে বলেন, পারলে গান্ধীনগরে বদলি করে দিন। আমার ছেলে জবাবে যথেষ্ট বিনয়ের সঙ্গেই বলে, তেমন কোনও ইচ্ছে ওর নেই। উনি যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন। উনি সমানে গালিগালাজ করেছেন। যে ভিডিও তোলা হয়েছে, সেটা চারভাগে ভাগ করে বাজারে ছাড়া হয়েছে। গালাগালগুলো সব বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
হতে পারে উত্তেজিত হয়ে তিনি কিছু কটূকাটব্য করেছিলেন। ফেসবুক লাইভে সেটা খোলাখুলি বলেও দিলেন সুনীতা। হাতে সম্ভবত কোনও সামাজিক অনুষ্ঠান–সঞ্জাত মেহেন্দি, নখে লাল নেলপালিশ, চোখে হালকা কাজলের ছোঁয়া, বিন্যস্ত ভ্রু, মাথায় চুল টান করে পনিটেলে বাঁধা। ফেসবুক লাইভে সুনীতা বলছিলেন, ‘আমি তো ভগবান নই। একজন সাধারণ এল আর (‌লোকরক্ষক)‌ অফিসার মাত্র। হতে পারে উত্তেজিত হয়ে কিছু বলেছি। এখন আমার নামে অনেককিছু বাড়িয়ে বলা হচ্ছে। কিন্তু তাতে কি সত্যিটা মিথ্যে হয়ে যাবে?‌ আপনি ভাল হলে আমি ভাল। খারাপ হলে খারাপ। কেউ যদি ভাবেন আমি ক্ষমতা দেখাতে, লেডি সিঙ্ঘম হতে এসেছি বা রাজনীতিতে যেতে চাই, তাহলে সেটা তঁাদের ভাবনা। এটা গণতন্ত্র। সকলেই তাঁদের ভাবনার কথা বলতে পারেন। তবে আমার ওসব কোনও ইচ্ছে নেই।’ 
সুনীতার আরও দাবি, তাঁকে খুনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। যে কারণে তাঁর বাড়ির সামনে দু’জন সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন রাখা হচ্ছে। অহরহ ভয় দেখানো হচ্ছে। তবু দমে যাচ্ছেন না সুনীতা। বলেছেন, ‘ক্ষমতা র‌্যাঙ্ক থেকে আসে না। খাকি উর্দি থেকে আসে। লড়াই তো সবে শুরু হল। এখনও অনেকদূর যেতে হবে। ওপরতলা থেকে অনেককেই কাজ করতে দেওয়া হয় না। তাই আমি আইপিএস হতে চাই। তারপর সকলকে দেখিয়ে দেব। প্রার্থনা করুন, সিস্টেমের বিরুদ্ধে কাজ করার হিম্মতটা যেন তখনও থাকে।’ 
সিনেমার মতো। বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। হিম্মত। সত্যের জয়। দুষ্টের দমন। শিষ্টের পালন। 
আশা করতে ইচ্ছে করে, যখন সুনীতা বলেন, ‘আমি জানি, আমি আমার জায়গায় ঠিক আছি। প্রত্যেকটা কাহিনিতে রাবণ থাকবেই। রাবণ না থাকলে রামের কোনও মূল্য থাকত না।’  
ঠিকই। তবে কিনা, এই কাহিনিতে রাবণ জামিনে মুক্ত। রাম আপাতত বনবাসে। সে বনবাস কোনওদিন কাটবে কিনা, সুনীতা যাদব আইপিএস হয়ে সিস্টেম শোধরাতে নামতে পারবেন কিনা, তখন এই সিস্টেম আরও গভীর এবং অপরিশোধনযোগ্য গাড্ডায় গিয়ে পড়বে কিনা, তা অতল ভবিষ্যতের গর্ভে নিহিত। তবে আপাতত এই কলাম লেখকের বিস্ময়টুকু কেটেছে। ‘লেডি সিঙ্ঘম’–কে চাকরিতে তুরন্ত ইস্তফা দিয়ে অন্তরালে চলে যেতে হয়েছে। বাস্তবে যেমন হয়। আপনার–আমার বাস্তবে। 
সিঙ্ঘমরা ছবিতে সুন্দর, সুনীতারা বাস্তবে। এমনই হয়। এই দেশে। এই জীবনে। এই বাস্তবে। ‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top