রোশেনারা খান: মামাবাড়ির বড় মজা, মজুর খেটে টাকা মেলে।মাস ছয় আগেও বেলাকে চিনতাম না। নাতাশা (‌বোনঝি) একদিন কলেজ থেকে ফিরে জানাল, ওদের বাংলা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের বেলা সীট নামে এক ছাত্রী নার্সিংয়ে চান্স পেয়েছে। অ্যাডমিশনও হয়ে গেছে। কাল ওকে হস্টেল ছাড়তে হবে, ওর দশ হাজার টাকার খুব দরকার। ও হোমে বড় হয়েছে, তেমন কেউ নেই ওর। তাই ওরা সবার থেকে টাকা কালেকশন করছে। মেয়েটিকে সেদিন ফোনে ভরসা দিয়ে বলেছিলাম, চিন্তা করিস না, সব ঠিক হয়ে যাবে। সকলের মিলিত উদ্যোগে ব্যবস্থা হয়েও গিয়েছিল। বেলা এখন মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের আন্ডারে তিন বছরের ‘‌জি এন এম’‌ কোর্স করছে।
পুজোর ছুটিতে ওকে একদিন আসতে বললাম। ছুটির দিনগুলো ও হোমেই কাটায় শুনেছিলাম। কিন্তু ফোন করে জানলাম, ও পূর্ব মেদিনীপুরের বাজকুলে মামাবাড়িতে রয়েছে। বেলা একরাত ছিল আমার বাড়িতে। জেনেছিলাম ওর বেদনভরা জীবনযুদ্ধের কাহিনী। বেলার জন্ম পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ‌কালিদহচড়া গ্রামের এক হতদরিদ্র পরিবারে। মেয়ে বলেই হয়তো (ওর যে এক দিদি রয়েছে, ও বড় হয়ে জেনেছে) ছোট বয়সে ওকে এক দম্পতিকে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ও একদিন ঘরে ফিরে দেখে, বাবাকে ছেড়ে মা পালিয়েছে। বাবা কারও কাছ থেকে মেদিনীপুর শহরে অনাথ বাচ্চাদের জন্য ‘‌হোম’‌ রয়েছে জানতে পেরে ওকে হোমে রেখে চলে যান। কোনও দিন আর খবর নিতে আসেননি। বেলা তখন দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। বাবা ছাড়া ওর আর কে আছেন, ও জানত না। হোমের অন্য আবাসিকদের পরিজনেরা যখন দেখা করতে আসতেন, ওর খুব কষ্ট হত। ও আড়ালে বসে কাঁদত।
হোমের স্কুল থেকে ২০১৪-তে বেলা ভাল পরীক্ষা দিয়েও দ্বিতীয় বিভাগে মাধ্যমিক পাশ করে। স্কুলের ম্যাডামরা খাতা রিভিউয়ের কথা বলে থাকলেও, তা হয়ে ওঠেনি। হোম থেকেই ওকে ‘‌রাঙামাটি কিরণময়ী হাই স্কুলে’‌ ভর্তি করে দেওয়া হয়। ২০১৬-তে বেলা এই স্কুল থেকেই উচ্চমাধ্যমিকে ‘‌স্টার’‌ পায়। নার্সিংয়ের জন্য আবেদনপত্র পাঠালে ‘‌আর জি কর’‌–এ ভর্তির তালিকায় সবার প্রথমে নাম থাকা সত্ত্বেও নানা কারণে বেলা ভর্তি হতে পারেনি। বাধ্য হয়ে ও ‘‌রাজা নরেন্দ্রলাল খান মহিলা কলেজ’‌–এ বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়। কলেজে কোনও ক্ষেত্রেই ওকে ফি দিতে হয়নি, উপরন্তু একজন অধ্যাপক ক্লাসের বাইরে পড়া বুঝিয়ে দিতেন। এক স্নেহময়ী অধ্যাপিকা ‘‌বিশ্ববীণা’‌ ও ‘‌সারদা কল্যাণ ভাণ্ডার’‌ নামে দুটি সংস্থা থেকে আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা করে দেন। কলেজের প্রত্যেকেই ওকে আপন করে নেন।
২০১৭-তে বেলা নার্সিংয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য আবার আবেদনপত্র জমা দেয়। এবার ‘‌মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ’‌– এ চান্স পেলে জমিয়ে রাখা সাহায্যের টাকায় নার্সিং স্কুলে ভর্তি হয়েছে। মাসে সাড়ে তিন হাজার টাকায় ওর কোনওরকমে  কুলিয়ে যায়। কন্যাশ্রীর টাকা প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। এরপর দুটি সংস্থা থেকে পাওয়া মাসিক বারোশো টাকায় কীভাবে চলবে? এই ভেবে ও কিছুটা দিশাহারা হয়ে পড়েছে।
বেলা মামাবাড়ি গিয়েছিল শুনে কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছিলাম। যাক, মেয়েটা অন্তত তার মামাবাড়ি খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু ও মামাবাড়ি যাওয়ার যে কারণ বলল, শুনে হতবাক হয়ে গেলাম। তিন/চার দিনের বেশি ছুটি পেলেই ও মামাবাড়ি যায় মজুর খেটে কিছু টাকা রোজগার করতে। মামাদের খাওয়া খরচ বাবদ টাকা দিয়ে যা থাকে, তাতে কিছুদিনের হাতখরচ চলে যায়। এখন ধান কাটতে গিয়েছিল।
কথাগুলো বলার ও শোনার সময় দুজনের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। ঝাপসা চোখে পথবাতির আলোয় ওর মুখের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্তের জন্য মনে হল, যেন আমার সামনে সিস্টার নাইটিংগেল দাঁড়িয়ে ! মনে মনে বললাম, বেলা তুই এগিয়ে যা। তোর দেখানো পথে আরও সহস্র বেলা, জুঁই, পারুল সমস্ত প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করে সেবার ব্রত নিয়ে এগিয়ে আসবে। শ্রম-সেবা-মমতা দিয়ে মানুষের শরীর ও মনের ব্যাধি সারিয়ে সমাজকে কলুষমুক্ত করবে।

অন্ধকারে আলোর পথ দেখাচ্ছে শুধু শিক্ষা
আলমিনা ও জেসমিন খাতুনের কাহিনী বেলার থেকে কিছুটা ভিন্ন হলেও, লড়াইটা কুর্নিশ করার মতো। আলমিনার জন্ম তমলুকের বারখোদা গ্রামে। প্রায় নিরক্ষর শেখ মইনুদ্দিন ও মাজেদা বিবির চার সন্তানের (তিন মেয়ে এক ছেলে) মধ্যে আলমিনা ছোট। বাবার চায়ের দোকানের আয়ে কোনওরকমে আলমিনার পড়াশোনা আর সংসার চলে। গ্রামের স্কুলে প্রাইমারি পাশ করে আলমিনা ‘‌বহিচাড় বিপিন শিক্ষা নিকেতন’‌–এ ভর্তি হয় এবং প্রত্যেক বছর ক্লাসে প্রথম হয়ে এগিয়ে চলে। নবম শ্রেণিতে (২০০৮ সাল) পড়ার সময়, বাবা আলমিনার বিয়ের জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। মা মাজেদা বিবি সামান্য লিখতে–পড়তে পারেন, তাই পড়াশোনার মর্ম কিছুটা হলেও বোঝেন। স্বামীর জবরদস্তি মেনে নিতে না পেরে একদিন মেয়ের হাত ধরে ঘর ছাড়তে বাধ্য হলেন। 
আশ্রয়ের জন্য ঠোক্কর খেতে খেতে, একরকম ভিক্ষা করেই   আধপেটা খেয়ে, উপবাসে থেকে আলমিনা পড়া চালিয়ে যায়। স্কুলের শিক্ষকরা, বিশেষ করে ভূগোলের শিক্ষক মৌসম মজুমদার নানাভাবে এই লড়াকু মেধাবী ছাত্রীটিকে আজও  সাহায্য করে চলেছেন। কোচিং সেন্টারের শিক্ষকরাও বিনা পারিশ্রমিকে পড়া বুঝিয়ে দিতেন। আলমিনা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম বিভাগে পাশ করে ইতিহাসে অনার্স নিয়ে তাম্রলিপ্ত কলেজে ভর্তি হয় এবং এখান থেকেই স্নাতকোত্তরে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়। আলমিনা মাধ্যমিক পরীক্ষার পর থেকেই গৃহশিক্ষকতা করে। ভবিষ্যতে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে  এবার হাউরের ‌ধামাইত শিক্ষক শিক্ষণ মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ভাবছিল, খরচ জোগাবে কীভাবে? আলমিনার মৌসম স্যর সোশ্যাল মিডিয়ায় সাহায্যের আবেদন জানালে, অনেকের সঙ্গে মহিষাদল রাজপরিবারের সদস্য শৌর্যপ্রসাদ গরগ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।
জেসমিন খাতুনের বাড়ি নদিয়ার কালিগঞ্জের রাউতাড়া গ্রামে। বাবা ওয়াদায় শেখ বোবা জড়বুদ্ধি, মা জায়েদা বিবিও নিরক্ষর। চার ভাইবোনের মধ্যে জেসমিনের দিদির পঞ্চম শ্রেণিতেই বিয়ে হয়ে যায়। জেসমিন পাশের গ্রাম আশা টিয়ার ‘‌নজরুল স্মৃতি বালিকা বিদ্যালয়’‌ থেকে ২০১২ সালে মাধ্যমিকে স্টার পায়। মেদিনীপুরে আল-আমিন মিশনের আবাসিক হিসেবে নিখরচায় উচ্চমাধ্যমিক দিয়ে প্রথম বিভাগে পাশ করে জেসমিন মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজে প্যারা মেডিক্যাল–এ ভর্তি হয়। সংসারে আয় বলতে বিঘা দুই জমির ফসল। জেসমিনের পড়ার খরচ জোগানোর জন্যই ছোট দু’‌ভাইয়ের পড়া মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। একজন নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে এক ঠিকাদারের কাছে কাজ নেয়। একেবারে ছোটটি বাবাকে নিয়ে চাষের কাজের ফাঁকে দিনমজুরি করে। জেসমিন ২০১৭–তে পাশ করে খুবই সামান্য টাকার বিনিময়ে ভগবানগোলায় একটি প্রাইভেট ল্যাবে কাজ নিয়েছে। একই সঙ্গে দূরশিক্ষার মাধ্যমে জিওলজিতে অনার্স নিয়ে ডিগ্রি কোর্স করছে, যাতে চাকরি পেতে সুবিধা হয়। ওর যে অনেক দায়িত্ব পরিবার ও সমাজের প্রতি।  
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের উদযাপনে বেলা, আলমিনা, জেসমিনদের আসার দরকার নেই। ওরা যেন এগিয়ে যেতে পারে, যেমন যাচ্ছে। এই পথ ধরে আরও সহস্র বেলা, জুঁই সব বাধা অতিক্রম করে একদিন এগিয়ে আসবে। সুস্থ বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়ে উঠবে। তখন আর ঢাকঢোল পিটিয়ে নারী দিবস পালনের দরকার হবে না।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top