শোভনলাল চক্রবর্তী

বিজ্ঞান আমাদের ধর্ম নয়। ক্রিকেট, ফুটবল আর রাজনীতি— এই তিন মিলেই আমাদের ট্রিনিটি। আইপিএল, আইএসএল, মার্কিন ভোট, বিহার ভোট— আম বাঙালি এখন ভীষণ ব্যস্ত। ওসব বিজ্ঞান–টিজ্ঞান নিয়ে এখন মাথা ঘামানোর সময় নেই। সময় থাকলে নিশ্চিত খবর রাখতেন বিজ্ঞানে বাঙালির বিশ্বজয়ের। 
এখন অবশ্য কেন্দ্রের শাসক দল এবং তাদের নেতা–‌মন্ত্রীরাই আমাদের বিজ্ঞান শিক্ষক। সাধারণ মানুষের ভিতর অবিজ্ঞানের চাষ করাই এঁদের উদ্দেশ্যে। তাঁরা ডারউইনের বিবর্তনবাদ মানেন না, কারণ কেউ কোনও দিন কোনও বাঁদরকে মানুষে রূপান্তরিত হতে দেখেননি। এঁদের মতে ডারউইনের তত্ত্ব মানে, একটি বাঁদর বন থেকে বেরোবে এবং রাস্তায় নেমে মানুষ হয়ে যাবে! আর মানুষ হয়েই, কপালে গেরুয়া ফেট্টি বেঁধে জয় সিয়ারাম ধ্বনিতে আকাশ–‌বাতাস মুখরিত করে দেবে। এঁদের বিশ্বাস মহাভারতের যুগে মোবাইল ফোন ছিল, দূরদর্শন ছিল। গণেশের প্লাস্টিক সার্জারি, ময়ূরের ব্রহ্মচর্য,বলরামের টেস্ট টিউব বেবি, পুষ্পক রথ ওরফে বিমান—এরকম মণিমুক্তোর ছড়াছড়ি। অবিজ্ঞানের নবতম সংযোজন গোবরের বিকিরণের সাহায্যে করোনা দূর করার তত্ত্ব। হাসবেন না। যদি নর্দমার গ্যাস দিয়ে উনুন জ্বালানো যায়, যদি মেঘের আড়াল ব্যবহার করে ফাঁকি দেওয়া যায় রেডারের চোখ, যদি টারবাইন ঘুরিয়ে হাওয়া থেকে অক্সিজেন ও পানীয় জল নিষ্কাশন সম্ভব হয়, যদি এ প্লাস বি হোলস্কোয়্যার মন্থনে উঠে আসে প্লাস টুএবি–র বাড়তি অমৃতভাণ্ড, তবে ঘুঁটের টুকরো অনায়াসে মোবাইলের বিকিরণ ঠেকিয়ে দেবে, গোবরের বিকিরণ ঠেকিয়ে দেবে করোনা। ক্রমে মিলবে গরুর নিঃশ্বাসে অক্সিজেন, গরুর দুধে খাঁটি সোনা। বলা যায় না, গোমূত্রে যদি মিলে যায় করোনার টিকা? 
বিজ্ঞানমনস্করা হাসাহাসি করলেও যখন আইআইটি খড়্গপুরের অধিকর্তা বলেন, তিনি টেকনোলজিতে রামায়ণে বর্ণিত পুষ্পক রথের ভারতে ফিরে যেতে চান তখন চিন্তা হয় বই কী!‌ তাঁরা একটি ওয়েবিনারের আয়োজন করছেন যেখানে ভারতের এই সব পৌরাণিক কালের বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা হবে। চেষ্টা করা হবে সংষ্কৃতকে ন্যাচারাল প্রসেসিং ল্যাংগুয়েজ হিসেবে তুলে ধরার। আয়োজকরা বলছেন, পুষ্পক রথের মতো বহু বিষয়ের তাঁরা প্রমাণ–‌সহ ব্যাখ্যা দেবেন। যখন বৈদিক গণিত, প্রসেসিং ল্যাংগুয়েজ হিসাবে সংস্কৃত বা বাস্তুতন্ত্র ইত্যাদিকে বিজ্ঞান হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ বিজ্ঞানী মহল, তখন দেশের একটি অগ্রগণ্য বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের এই ধরনের প্রচেষ্টাকে ‘‌রাজনৈতিক’‌ বলে মনে করছেন অনেকে। 
আমেরিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান পত্রিকা ‘‌সায়েন্টিফিক আমেরিকান’‌ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিজ্ঞান নীতির প্রকাশ্য বিরোধিতা করছে। আমাদের দেশে অবশ্য  উল্টোটাই চোখে পড়ে। গেরুয়া শিবিরের পৌরাণিক বিজ্ঞান নিয়ে মাতামাতি করছেন অনেক বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ অধিকর্তা। তাঁদের সম্ভবত ওই পদে আনাই হয়েছে গোমূত্র থেকে সোনা নিষ্কাশনের আয়োজন করতে! 
তবে এই প্রবল অবিজ্ঞানের চাষের মধ্যেই এসেছে একটা খুশির খবর। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরি পৃথিবীর সেরা বিজ্ঞানীদের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের একাধিক শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে দেড়শোর ওপর বিজ্ঞানী–গবেষক। ওই মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় মোট এক লক্ষ বিজ্ঞানীকে প্রাথমিকভাবে বেছে নিয়েছিল। সেরা ২% বিজ্ঞানীর তালিকা প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি। সেখানে বাংলার মুখ উজ্জ্বল করেছেন রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারি প্রতিষ্ঠানের ১৫০ জন বিজ্ঞানী। 
গবেষণাখাতে বরাদ্দের অভাব, পরিকাঠামোর অপ্রতুলতা এবং নানা প্রশাসনিক বাধা–বিপত্তি কাটিয়ে এই বঙ্গ বিজ্ঞানী ব্রিগেড যেভাবে দেশ তথা বাংলার শিক্ষাকে বিশ্ব মানচিত্রে তুলে ধরেছেন তাকে কুর্নিশ জানাক বঙ্গবাসী। রাজ্যের যে বিশ্ববিদ্যালয়টির পেছনে একটা সময় আদাজল খেয়ে লেগেছিল গেরুয়া বাহিনী, চালিয়েছিল তাণ্ডব, হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেছিল বিশ্ববিদ্যালয়টিকে, সেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় তিরিশ জন অধ্যাপক গবেষক এই তালিকায় জায়গা করে নিয়ে প্রমাণ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মান। একটি চপেটাঘাত দিয়েছেন তাঁদের, যাঁরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার স্পর্ধা দেখিয়েছিলেন। রাজ্যের আর কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোথাও এত জনের নাম নেই। কলকাতা, কল্যাণী এবং বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন এই তালিকায় রয়েছেন। তালিকায় রয়েছে ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অফ সায়েন্স, সাহা ইনস্টিটিউট, বোস ইনস্টিটিউট, আইএসআই কলকাতা, বিশ্বভারতী, আইআইইএসটি শিবপুর, আইআইটি খড়্গপুর,এনআইটি দুর্গাপুরের মতো একাধিক প্রতিষ্ঠান। এই তালিকায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন অনেক বিজ্ঞানী গবেষকের নাম আছে যাঁরা এখন অবসরপ্রাপ্ত। 
সেরাদের তালিকায় নাম আছে ‌প্রয়াত অধ্যাপক বিজ্ঞানী দীপঙ্কর চক্রবর্তীর। দীপঙ্করবাবুর হাতেই গড়ে ওঠে যাদবপুরের এনভায়রনমেন্টাল স্টাডিজ ডিপার্টমেন্ট। জলে মিশ্রিত আর্সেনিকের প্রকোপ ঠেকাতে তিনি নিজেই ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠান। প্রথমে কলকাতা সংলগ্ন এলাকায় এবং পরে সুদূর সুন্দরবনে  তিনি আর্সেনিকের প্রকোপ কমাতে বহু কার্যকরী ব্যবস্থা নিয়েছিলেন, যাকে একটা সময়ের পর মান্যতা দেয় সরকার। ভারতের আর্সেনিক আক্রান্ত বহু মানুষ তাঁর কাজে উপকার পেয়েছেন। বিশ্বভারতীর প্রাক্তন উপাচার্য, বর্তমানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী স্বপন দত্ত রয়েছেন এই তালিকায়। তাঁর গবেষণার ফলেই তৈরি হয়েছে ভিটামিন ও লৌহ যৌগের গুণাগুণ মিশ্রিত চাল, যা ভারত সরকারের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অনুন্নত শ্রেণির মানুষের প্রকল্পে এখন বিলি হচ্ছে। স্বপনবাবু এখন কাজ করছেন পাট নিয়ে। পাটের জিন পরিবর্তন করে সেখানে তুলোর ফাইবার গুঁজে দেওয়া যায় কিনা, সেই কাজ চলছে। সফলতা এলে পাটকেও ব্যবহার করা যাবে কটনের মতো। বহু মানুষকে নতুন করে কাজ দেওয়া যাবে, খানিকটা হলেও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ আসবে কিছু মানুষের কাছে। তৃণমূল স্তরে বিজ্ঞানের সুযোগ–‌সুবিধা কীভাবে পৌঁছে দেওয়া যায় তা নিয়ে স্বপনবাবুর ভাবনার শেষ নেই। বিজ্ঞান মানেই আমরা যে সব হেডলাইন মার্কা কাজ বুঝি, স্বপনবাবুর মতো মানুষরা সে সব থেকে দশ হাত দূরে। তাঁরা বিজ্ঞানের সুফল তুলে দিতে চান একবারে প্রান্তিক মানুষটির কাছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক ফারুক রহমান জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানে তাঁর কাজের নিরিখে স্বীকৃতি পেয়েছেন। তিনি কাজ করেছেন মহাকাশের ওয়ার্ম হোল নিয়ে। স্বীকৃতি পেয়ে ফারুক যা বলেছেন তা যারা আজ বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করছে তাদের শোনা দরকার। ফারুক বলেছেন, তাঁর বাবা ছিলেন পেয়ারার চাষি। অভাবকে সঙ্গী করেই তিনি এগিয়েছেন। ফলে তাঁর কাছে কোনও অভাবই আর বাধা নয়। এমন ভাবে যিনি ভাবতে পারেন, আমাদের ভাবাতে পারেন, তাঁর তো সিদ্ধিলাভ হবেই। স্রেফ নিজের ইচ্ছা আর সক্রিয়তা, এই দুটো বজায় রাখলেই অনেক দূর এগোনো যায় তা প্রমাণ করে দেখালেন এই বিজ্ঞানীরা। তাঁদের নতমস্তকে প্রণাম। প্রণাম সারা বাংলার পক্ষ থেকে।
 

জনপ্রিয়

Back To Top