আফরোজা খাতুন: সেই ফোনটা এসেছিল ২০১৪ সালে। হজে যাওয়ার অনুমতি পাবে না শুনে আমার এক মহিলা আত্মীয় ফোন করেছিল। অসম্মানে আহত, হতাশ হয়ে অভিযোগ জানাচ্ছিল। কোনও মেয়ে হজে যেতে চাইলে নির্দিষ্ট তালিকার মধ্যে থেকে একজন পুরুষসঙ্গীর সঙ্গে যেতে হত। নইলে খারিজ হত হজে যাওয়ার আবেদন। সুস্থ স্বামীর আচমকা মৃত্যুতে শোক সামলানো কঠিন হয়েছিল আমার এই আত্মীয়ের। মনকে শান্ত করতে হজে যাওয়ার সিন্ধান্ত নেয়। কিন্তু বাধ সাধল নিয়মের জুলুম। অভিজ্ঞরা বোঝালেন কেন তার আবেদন গ্রাহ্য হবে না। সে যেতে চেয়েছিল ফুপা শ্বশুর, ফুপু শাশুড়ির (পিস শ্বশুর, পিস শাশুড়ি) সঙ্গে। জানতে পারল এই সঙ্গীদের সঙ্গে যাওয়ার ছাড়পত্র পাওয়া যাবে না। স্বামী, বাবা, ভাই, চাচা, মামা, খালু, ভাগনে, ভাইপো (‌যাদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক গড়া যায় না)—‌ এইরকম নিকট সম্পর্কের পুরুষের সঙ্গেই একমাত্র যেতে পারবে। মনের শান্তি খুঁজতে গিয়ে আরও অশান্তির আগুনে জ্বলে উঠেছিল সে, মেয়েদের অধিকারহীনতার কথা জেনে। নির্দিষ্ট তালিকার মধ্যের কোনও পুরুষ সে আর জোগাড় করতে পারেনি। এক হিতাকাঙ্ক্ষী পরামর্শ দিয়েছিলেন, ভাই–ভাইপো জোগাড় করে দেবেন। তবে একটু বেশি খরচ করে আলাদা যেতে হবে। মিথ্যে বলে ধর্মস্থানে যাবে না বলে এই পরামর্শে সাড়া দেয়নি। তাই এতদিনেও তার আর হজ করা হল না। 
অবশেষে ইসলাম ধর্মের জন্মস্থান সেই আরবেই তিন বছর আগে ২০১৪ সালে শিথিল হয়ে গেছে এই নিয়ম। পুরুষ অভিভাবকের নিয়ন্ত্রণে মহিলাদের হজে যাওয়া আর বাধ্যতামূলক নয়। সৌদি আরবের সম্মতির জেরে এখন ভারতের মুসলিম মহিলারাও কিছুটা হলেও বলীয়ানের পথে এগোল। হজযাত্রার নতুন নির্দেশনামায় এদেশেও মিলল সম্মতি। কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত, মহিলারা ‘‌মেহরাম’‌ অর্থাৎ পুরুষসঙ্গী ছাড়াই হজে যেতে পারবে। তবে একজন পুরুষের শূন্যতার কারণে চারজন মহিলা মিলে দল গড়তে হবে। চার মহিলার সম্মিলিত শক্তিই হজে যাওয়ার ছাড়পত্র পাবে। এবং তাদের বয়স হতে হবে পঁয়তাল্লিশের ঊর্ধ্বে। আমার সেই আত্মীয় খুশি। তার মতো খুশি আরও অনেক মহিলাও। পুরুষবিহীন হজে যাওয়ার দ্বার যে খুলল। প্রসঙ্গত, আরবের সম্মতির পরের বছরই ২০১৫ সালে হজের জন্য পুরুষসঙ্গী ছাড়া মহিলাদের প্রথম গ্রুপ সৌদি আরব ভ্রমণ করেছিল এমনই দাবি রাজ্যসভার কংগ্রেস সাংসদ হুসেন দালওয়াইয়ের। পাকিস্তানে ২০১৭ সাল থেকেই এই নিয়ম চালু। 
কী প্রমাণ হল? আবহমানকাল থেকে চলে আসা কোনও আইন বা নির্দেশ কি পরিবর্তন করা যায় না? সময়, সমাজ, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে মানুষের জীবনধারণ পাল্টায়। আইনও পাল্টায়। জীবনের স্বাভাবিক দাবিকে কোনও বন্ধনে বেঁধে আটকে রাখা যায় না। ধর্মের জিগির তুলে নারীদের নিয়ন্ত্রিত করার ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার পিতৃতান্ত্রিক প্রচেষ্টা তো অব্যাহত। তাই তালাক ধর্মের ব্যাপার, এমন কথার শোরগোল তুলে মৌলবাদীরা মেয়েদের নিজের করায়ত্ত রাখতে চায়। তালাক বা বিচ্ছেদ চাওয়ার মধ্যে কোনও অন্যায় আছে বলে মনে করি না। অন্যায় রয়েছে সুবিধে বুঝে তালাক দেওয়ার নিজস্ব ধরনে। ব্যক্তি–ফয়দার হাত থেকে জীবন সুরক্ষিত করার তাগিদেই বেশিরভাগ মুসলিম দেশ বা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের সংস্কার করেছে। আমাদের দেশেও অধিকার আন্দোলনের কর্মীরা শুরু করেছে মুসলিম নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলন। সময়ের গতিতে, জীবন–জীবিকার তাগিদে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাব ধর্ম–আইনকে আধুনিক ভাবনায় ভাঙতে ভাঙতে;‌ আর মেয়েদের অধিকারের প্রশ্নে আইনের চাকা দেড় হাজার বছর পিছনে ঠেলে দেব? তাই স্বাগত মহিলা হজযাত্রীদের জন্য নতুন এই নিয়মকে।        
তবু কিছু প্রশ্ন যে এসেই যায়। ছেলেরা কোন বয়সে হজে যাওয়ার ছাড়পত্র পায়? কতজনের দল হলে তবে যেতে পারে? সেখানে তো কোনও শর্ত নেই। মেয়েদের আইনে তা হলে এত শর্ত কেন? সমাজ–ধর্ম পিতৃতান্ত্রিক। আইনও সেখানে পিতৃতন্ত্রের চাপমুক্ত হয়ে তৈরি হচ্ছে না। যে মহিলা চাকরির প্রয়োজনে একা দেশ–বিদেশ ঘোরেন, যে মহিলা একা হাতে ব্যবসা সামাল দিয়ে পোক্ত হয়ে উঠেছেন, যে মহিলা পাল্লা দিয়ে সব ক্ষেত্রে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছেন, হজে যেতে চাইলে তাঁকেও চারজনের দলেই ভিড়তে হবে। পুরুষসঙ্গ ছাড়া মেয়েদের হজে যাওয়ার বয়স নির্ধারণ করা ও দল তৈরি করার শর্তের মধ্যেও কি মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় না? পুরুষ ছাড়া হজে যাওয়ার অনুমতি ছিল না সেটা যেমন মেয়েদের অধিকার হনন, একইভাবে শর্তের মধ্যেও রয়েছে মেয়েদের স্বাভাবিক অধিকারকে নিয়ন্ত্রণ। ভ্রমণ বা তীর্থভ্রমণে অধিকাংশ মানুষ দল বাঁধতে ভালবাসে। আবার একা যাওয়াও কারও পছন্দের হতে পারে। সেটা পছন্দ করার অধিকার যদি পুরুষের থাকে, তবে মেয়েদের ক্ষেত্রে আজকের এই ছাড়পত্রে সেই অধিকার এল না কেন? সঙ্গী যদি না পায় অথবা পছন্দ না হয় তখন? সরকারি অফিসের এক উঁচু পদের অফিসার কিছুটা খুশি, অনেকটা হতাশ হয়ে বললেন, ‘আমার স্বামী হজে যাওয়া পছন্দ করেন না, তাই আমারও যাওয়া হয়নি। অনেকদিনের ইচ্ছে এবার হয়তো পূরণ হবে। কিন্তু সঙ্গী নিতে হবে কেন? আমি তো একাই চলতে পারি। আমার অর্জিত অর্থে সংসার পুষ্ট হয়। ঘরে বাইরে কোন কাজটা পারি না? তা হলে ধর্মস্থানে যাওয়ার ব্যাপারে এত সীমাবদ্ধতা এখনও টিকিয়ে রাখা হল? পুরুষের সঙ্গ আর বাধ্য-বাধ্যকতায় রাখা হল না। তার বদলে দল তৈরির কথা এল। বয়সের রেখা টানা হল। পঁয়তাল্লিশে বুঝি মেয়ে সাবালিকা? তার নিচে নাবালিকা? আমরা চলতে-বলতে সক্ষম নয়, সেটাই আর একবার প্রকট হচ্ছে। পথ খুলেও, পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখা।’ 
ভারতীয় নারীর অধিকারের সূচনা-মুখ একটু একটু করে খুললেও সংশয় দূর হচ্ছে না। পুরুষসঙ্গী ছাড়া মুসলিম মহিলাদের হজযাত্রা কতটা বাস্তবায়িত হবে‌?‌ যেখানে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে চাপান‌উতোর আর ফতোয়া। এর পাশাপাশি ধর্মকেন্দ্রিক ‌ভোটের রাজনীতি আর পুরুষতন্ত্রের চোখ রাঙানিতে মুসলিম মহিলারা আদৌ এর সুবিধে নিতে পারবেন কিনা ভবিষ্যৎ তা বলবে।   
 

জনপ্রিয়

Back To Top