দীপ্তেন্দ্র রায়চৌধুরী: জম্মু–কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি বলছেন, পাকিস্তানের সঙ্গে কথা বললেই নাকি সীমান্তপারের মদতে জঙ্গিহানা বন্ধ হয়ে যাবে!‌
আরএসএসের সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত বলছেন, তাঁরা তিনদিনের মধ্যে তৈরি হয়ে দেশরক্ষার জন্য যুদ্ধে যেতে পারেন!‌
সেনাবাহিনীর ওপর যারা পাথর ছুঁড়ছে তাদের ওপর সেনাদের গুলিতে কেউ মারা গেলে সেনাদের বিরুদ্ধেই এফআইআর হচ্ছে। কিন্তু যারা পাথর ছঁুড়েছে, তাদের বিরুদ্ধে হচ্ছে না!‌
প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সীতারামন বলছেন, পাকিস্তান তাদের জঙ্গিপনার যোগ্য জবাব পাবে। বলছেন, তিনি সেনাদের পাশে আছেন। অথচ মেহবুবা কিন্তু নির্মলার সঙ্গে কথা বলেই রাজ্য পুলিসকে সেনার বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করতে বলেছিলেন!‌‌
এই খণ্ডচিত্রগুলো মেলালে একটা অস্পষ্ট ছবি ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। ভারত–পাক সীমান্তের নিরাপত্তা, পাক মদতে অবিরত জঙ্গি আক্রমণ, এবং কাশ্মীরি ছেলেমেয়েদের হতাশা ও বিপথগামিতা নিয়ে বিজেপি–আরএসএস ঘোর সঙ্কটে পড়েছে। আর একটা লোকসভা ভোট আসছে। অথচ ২০১৪ সালের প্রচারে নরেন্দ্র মোদি যেভাবে পাকিস্তানকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার কথা বলেছিলেন, তা দেওয়া সম্ভব হয়নি। বোধহয় সম্ভব ছিলও না। প্রচারে যা–ই বলে থাকুন, এখন মোদিও নিশ্চিত বুঝেছেন, পাকিস্তানকে চাপে ফেলতে ছাপ্পান্ন ইঞ্চির ছাতি কাজে আসে না। একবার অটলবিহারী বাজপেয়ীর অনুকরণ করে লাহোর গেলেন মোদি। তারপর ঠিক বাজপেয়ীর মতোই পাক রাষ্ট্র ও তার অনুগত জঙ্গিদের প্রবল প্রত্যাখ্যানের মুখে পাকিস্তানের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করলেন। তবে বাজপেয়ী যে কাজটা করতে পারেননি, ভিন্ন সময়ে ও পরিপ্রেক্ষিতে মোদি তা অনেকটা করতে পেরেছেন। লাগাতার চেষ্টা চালিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে পাক–বিরোধী হাওয়া তুলতে পেরেছেন। এই কাজটা করার জন্য মোটেই ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতির প্রয়োজন পড়ে না। তাছাড়া চীন এখনও পাকিস্তানের পাশে আছে। ফলে, অনেক বছর ধরে এই চেষ্টা চালিয়ে না–গেলে পাকিস্তানের জঙ্গিপালন বন্ধ হবে না।
বড় বড় কথা বলে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শোরগোল ফেলে, বামপন্থীরা সামগ্রিক ভাবে দেশের মানু্যের মনে তেমন কোনও প্রভাব ফেলতে পারেনি। উল্টো মতের সমর্থক হিসেবে সঙ্ঘপন্থীরা (‌বিশেষ করে স্মৃতি ইরানির মতো মন্ত্রীরা ও এবিভিপি)‌ ঠিক সেই বামেদের পথই অনুসরণ করেছিল। কিন্তু আসল কাজ কিছুই হয়নি। ঠিক কথা, দশ বছর ধরে (‌২০০৪–১৪)‌ কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সরকার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে পারেনি। প্রমাণ হয়ে গেছে, নরমপন্থা দিয়ে পাকিস্তানের মোকাবিলা করা যায় না। কিন্তু গরমপন্থা দিয়েই–‌বা মোদি কী করতে পারলেন?‌ যুদ্ধে হারিয়ে যেমন পাকিস্তানকে থামানো যায় না, তেমনই ছোটখাট সার্জিক্যাল স্টাইক করেও যে কাজ হয় না, তা এতদিনে প্রমাণিত। আইএসআই এখনও কাশ্মীরিদের বিপথে টানার পুরোদস্তুর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাহলে এবার কী করা হবে?‌ সরসঙ্ঘচালক ভাগবতের তা জানা নেই। মোদি তবু চুপ করে আছেন। তলে তলে কাজও করে চলেছেন পাকিস্তানের ওপর সর্বাধিক চাপ তৈরির জন্য। কিন্তু ভাগবত বড় বড় কথা বলার প্রাচীন অভ্যাস ছাড়তে পারছেন না। 
তাঁরা যা–কিছু বড়াই করতেন, সে সবই যে আজ প্রশ্নের সামনে, মোহন ভাগবত জানেন। তাই তিনি নতুন জিগির তুলতে চাইলেন। বললেন, সামরিক সংগঠন না হলেও, আরএসএসের লোকেরা তিনদিনের মধ্যে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে পারেন, যে কাজটা করতে সেনাবাহিনীর ছ–সাত মাস সময় লাগে!‌ ‘‌এই রকমই আমাদের ক্ষমতা,’‌‌ বলেছেন তিনি। তারপর যোগ করেছেন, ‘‌যদি দেশের প্রয়োজন হয়, আর সংবিধান অনুমতি দেয়, তাহলে আরএসএস সীমান্তে গিয়ে দেশের নিরাপত্তার জন্য লড়তে তৈরি আছে।’‌ খুব সহজেই বোঝা যাচ্ছে এই শেষের লাইনটা বলবেন বলেই তিনি আগের কথাগুলো বলেছিলেন। অর্থাৎ রাজনীতির মঞ্চ মাত করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। তাঁরা কতবড় দেশপ্রেমিক সেটাই বোঝাতে চেয়েছিলেন তিনি। এমন কথা বলার অধিকার সকলেরই আছে (‌যদিও কাজে তা করে দেখানোর ক্ষমতা নেই)‌। কিন্তু তার আগে যে কথাগুলো তিনি বলেছেন, সেগুলো নেহাতই অর্থহীন প্রলাপ। রাহুল গান্ধীরা বলেছেন, ফৌজকে হেয় করেছেন ভাগবত। খুব ভুল বলেননি। শুধু দেশপ্রেম আর মানসিক দৃঢ়তা নিয়ে সীমান্তে দাঁড়িয়ে পড়লেই যুদ্ধ করতে পারবেন বলে যিনি মনে করেন, তাঁর অজ্ঞতা অপরিসীম। তিনি জানেনই না, কতটা শারীরিক সক্ষমতা লাগে সীমান্ত পাহারা দিতে। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ তো পরের কথা। শুধু কতটা শারীরিক সক্ষমতা লাগে, সেটা বোঝার জন্য ভাগবত দ্রাসে গিয়ে কয়েকদিন থেকে আসতে পারেন। অথবা গ্রীষ্মকালে ৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় রাজস্থানের মরুভূমিতে উটের পিঠে পিঠে ঘণ্টা ছয়েক ঘুরে আসতে পারেন। তা হলে বুঝতে পারবেন, তাঁর প্রগলভতা ছিল নেহাতই শিশুসুলভ। 
কাশ্মীরে বিজেপি সমর্থন করছে মেহবুবা মুফতির সরকারকে। মেহবুবা বলেছেন, রক্তক্ষয় থামাতে পাকিস্তানের সঙ্গে কথা বলা দরকার। কিন্তু কথা বললেই পাকিস্তান জঙ্গি হানা বন্ধ করবে, তার নিশ্চয়তা কে দেবে?‌ কিছু মিডিয়াকে আক্রমণ করে মেহবুবা প্রশ্ন তুলেছেন, আজ যদি অটলবিহারী বাজপেয়ী লাহোর বাসযাত্রা (‌১৯৯৯)‌ করতেন, তাহলে এই সব মিডিয়া কী বলত?‌ সেই মিডিয়াগুলি সম্পর্কে তাঁর আপত্তি থাকতেই পারে। কিন্তু মেহবুবা কী জানেন না, সেই বাসযাত্রার পর পাকিস্তান কি ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র করেছিল?‌ আমরা যতদূর জানি, কার্গিল তো তাঁর রাজ্যেই পড়ে। জম্মু–কাশ্মীর বিধানসভার ভেতরেই ন্যাশনাল কনফারেন্স বিধায়ক আকবর লোন স্লোগান দিয়েছেন, ‘‌পাকিস্তান জিন্দাবাদ।’‌ তাঁর কথা ছেড়ে দিলাম। তিনি বিরোধী দলের লোক। কিন্তু মেহবুবা মুফতি তো বিরোধী পক্ষের নয়। তিনি বিজেপির জোটসঙ্গী। তিনি কাশ্মীরের যুবকদের জঙ্গিপনাকে প্রশ্রয় দেবেন, পাথরবৃষ্টির মধ্যে পড়া জওয়ানদের বিরুদ্ধে এফআইআর করাবেন, আর কাশ্মীরের বাইরে বিজেপি জাতীয়তাবাদের জিগির দেবে, এর অর্থ কী?‌ বিজেপি নেতাদের কী ধারণা মানু্য বোকা?‌ কাশ্মীর সরকার এমন সব কাজ করছে, যার জন্য সুপ্রিম কোর্টকে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। আর বিজেপি সমর্থন করে চলেছে সেই কাশ্মীর সরকারকে।
আশ্চর্যের কথা হল, প্রায় চার বছর সরকার চালিয়েও বিজেপির অনেকে, এবং তাঁদের মেন্টর আরএসএসের কর্তারা বুঝতে পারলেন না, খামোখা বড় বড় কথা বললে নিজেদের হাস্যকর করা ছাড়া কোনও উদ্দেশ্য সাধিত হয় না। পাকিস্তানই হোক, অথবা জাতীয়তাবাদ, এই সব নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করলে শুধু দেশের ক্ষতি হয়। জঙ্গিদের যাঁরা সমর্থন করেন, তাঁদের দেশের মানুষই বর্জন করেন। আর পাকিস্তানকে বড় বড় কথা বলে মোকাবিলা করা যায় না। পাক রাজনীতিকেরা, রাষ্ট্রনায়কেরা তার চেয়েও অনেক বড় বড় কথা বলতে দক্ষ। ভারত এখন পাকিস্তানের থেকে অনেক, অনেক দূর এগিয়ে গেছে। পাকিস্তানিদের অনুকরণ না–করে এখন গঠনমূলক পথে ভাবনাচিন্তা করা দরকার। এর মধ্যে কি কোনও রকেট সায়েন্স আছে যে ভাগবত ও তাঁর সঙ্গীরা তা বুঝতে পারছেন না?‌

জনপ্রিয়

Back To Top