সুদীপ্ত চক্রবর্তী: কবি ভারভারা রাও, শ্রমিক আন্দোলনের নেত্রী সুধা ভরদ্বাজ, সাংবাদিক গৌতম নওলাখা, আইনজীবী অরুণ ফেরেইরা ও সমাজকর্মী ভার্নন গঞ্জালভেস— বর্তমানে গৃহবন্দি এই ৫ সমাজকর্মীর বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ, এঁরা মহারাষ্ট্রের ভীমা–কোরেগাওঁতে এলগার পরিষদের সভায় হাঙ্গামা ছড়ানোয় প্ররোচনা দিয়েছিলেন। এই সভাটি হয়েছিল ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর। এই সভায় হাঙ্গামা হয়, প্রায় তিনদিন তার রেশ থাকে। একজন নিহতও হন। এই হাঙ্গামা নিয়ে পুলিস মামলা করে। গত জুন মাসে ভীমা–‌কোরেগাঁও মামলায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়— প্রকাশ্যে আসে দুটি ‘‌‌চিঠি’। পুনে পুলিস বাছাই কিছু সংবাদমাধ্যমের হাতে সেই চিঠির প্রতিলিপি তুলে দেয়, যাতে নাকি আমাদের দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ‘‌হত্যার ষড়যন্ত্র’‌ বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করা আছে। এই চিঠির ভিত্তিতেই ২৮ আগস্ট, একসঙ্গে দেশের ছয়টি শহরে হানা দেয় পুলিস। গ্রেপ্তার করা হয় পাঁচজনকে। আরও তিনজনকে খুঁজছে। যাই হোক, গ্রেপ্তার করলেও সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে পুলিস এই ৫ ‘‌ষড়যন্ত্রকারী’‌কে নিজেদের হেফাজতে নিতে পারেনি। 
এই ধরপাকড়, আইন–‌আদালত, মামলা ইত্যাদির পিছনে রয়েছে এক ইতিহাস। এর জন্য আমাদের ফিরে যেতে হবে বেশ কিছু বছর আগে। মহারাষ্ট্রের ইতিহাসে বীর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছেন শিবাজি। প্রায় সাড়ে চারশো বছর আগে ছত্রপতি শিবাজির মারাঠা সাম্রাজ্য বিস্তার ও রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন দলিত ‘‌মাহার’‌ সম্প্রদায়ের বীর যোদ্ধারা। ইতিহাস বলছে, ১৬৮৯ সালে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের হাতে যুদ্ধে নিহত হন শিবাজির পুত্র শম্ভাজিরাজ। মোগল সম্রাটের ফরমানে তখন মৃত শম্ভাজিরাজের দেহ সৎকার করতে কেউ সাহস করছিল না। তখনই এই দলিত মাহার সম্প্রদায়ের গোবিন্দ গায়কোয়াড় দিল্লির সম্রাটের নির্দেশ অমান্য করে শিবাজি–‌পুত্রের মৃতদেহ সৎকার করার সাহস দেখিয়েছিলেন। বীর ও সাহসী সম্প্রদায় হিসেবে মাহারদের শিবাজি অত্যন্ত কদর করতেন। কালক্রমে ভারতে ব্রাহ্মণ্যবাদের আধিপত্য বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে মারাঠা সাম্রাজ্যে মাহারদের গুরুত্ব কমতে থাকে। শিবাজির মৃত্যুর প্রায় দুশো বছর পরে এই মাহার সম্প্রদায়ই ব্রাহ্মণ্যবাদ প্রধান মারাঠা সাম্রাজ্যে ‘‌অস্পৃশ্য’‌ আখ্যা পায়। দলিতদের প্রতি ঘৃণা এমন পর্যায়ে পৌঁছয় পেশোয়া (‌উচ্চবর্ণ হিন্দু)‌ প্রধান গ্রামে দলিত মাহারদের প্রবেশ করতে হলে কোমরে ঝাঁটা এবং গলায় কলসি বাঁধতে হত। এর কারণ ছিল মাহারদের পায়ের ছাপ ও থুতুতে যেন ব্রাহ্মণ তথা উচ্চবর্ণের হিন্দু পেশোয়াদের গ্রাম অপবিত্র হয়ে না যায়!‌ এই আচরণের ফলে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের ওপর মাহারদের ক্ষোভ জমা হতে থাকে। এই বিষয়টিকে নিজেদের বাণিজ্য তথা সাম্রাজ্য বিস্তারে কাজে লাগায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ব্রিটিশরা। ১৮১৮ সালের ১ জানুয়ারি ভীমা নদীর তীরে কোরেগাঁওতে পেশোয়া রাজের বিশাল মারাঠাবাহিনীকে পরাস্ত করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনা। সেই যুদ্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে বেশ কিছু দলিত মাহার যোদ্ধা বীরত্বপূর্ণ লড়াই করেন ও জয় ছিনিয়ে আনার নির্ণায়ক শক্তি হিসেবে ভূমিকা নেন। যুদ্ধ শেষে বীর শহিদ মাহার যোদ্ধাদের স্মরণে ব্রিটিশরা ভীমা–‌কোরেগাঁওতে একটি শহিদস্মারক স্তম্ভ স্থাপন করে। ১৯২৭ সালে, পরবর্তীকালে স্বাধীন ভারতের সংবিধান প্রণেতা আম্বেদকর সেই শহিদ স্তম্ভে শ্রদ্ধা জানান। তিনি মাহারদের সেই ঐতিহাসিক লড়াই ও জয়কে শোষণ ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে ন্যায়প্রতিষ্ঠার জয় হিসেবে বর্ণনা করেন। তারপর থেকেই প্রতিবছর ১ জানুয়ারি বিজয়–উৎসব ও শহিদ স্মরণ করে থাকে মাহার সম্প্রদায়।
স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন আসে, এবারে কী এমন হল, যাতে দাঙ্গা–হাঙ্গামা ছড়িয়ে পড়ল?‌ এ কথা সকলেই জানেন, পেশোয়াদের বিরুদ্ধে মাহারদের জয়ের এ বছর ২০০ বছর পূ্র্তি। কিন্তু ঘটনা ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগেই অন্যদিকে মোড় নিল। গোটা দেশেই বিভিন্নভাবে দলিত বা পিছিয়ে পড়া অন্য ধর্মের মানুষদের ওপরে যেভাবে উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন সংগঠন অত্যাচার, আক্রমণ চালাচ্ছে, এখানেও সেই প্রভাব এসে পড়ে। মনে রাখা প্রয়োজন, দেশের মূল সমস্যা (‌বেকারত্ব, নোটবন্দির কুপ্রভাব, জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি, কৃষকের ফসলের ন্যায্য মূল্য ইত্যাদি)‌ থেকে নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের বিভিন্ন কার্যকলাপ। ভীমা–‌কোরেগাঁওতে মাঠে নামে শিবা প্রতিষ্ঠান, হিন্দু একতা মঞ্চ ইত্যাদি সংগঠন। ‘‌জাতিভেদ প্রথা আসলে দেশের দুর্বলতা নয়, শক্তি’‌— এই মতবাদের প্রচারক সঙ্ঘচালক গোলওয়ালকরের আদর্শে বিশ্বাসী মিলিন্দ একবোটে ও শম্ভাজি ভিড়ে’‌রা দাবি করেন, শিবাজিপুত্র শম্ভাজিরাজের মৃতদেহ দলিত মাহাররা সৎকার করেনি, করেছিল বীর মারাঠারাই। আর সেই কারণেই শম্ভাজিরাজের সমাধিস্থলে ঠাঁই পাওয়া ফলক থেকে গোবিন্দ গায়কোয়াড়ের নাম তুলে দিতে হবে, কারণ সে দলিত মাহার এবং তাঁদের কোনও ভূমিকাও এক্ষেত্রে ছিল না। শুধু নামফলক মুছে ফেলার দাবি তুলেই শম্ভাজি এবং মিলিন্দ থেমে থাকেনি;‌ তারা মহারাষ্ট্র সরকারের কাছে নতুন করে ইতিহাস লেখার আবেদন জানায়। মহারাষ্ট্র সরকার সেই আবেদন গ্রহণও করেছে। এইসব সরকারি বদান্যতায় উৎসাহিত হয়ে ২০১৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর ভীমা–‌কোরেগাঁও সভার ঠিক দু’‌দিন আগে গোবিন্দ গায়কোয়াড়ের সমাধিস্থল আক্রমণ ও তছনছ করে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের নেতা–‌কর্মীরা। নষ্ট করে দেওয়া হয় নামফলক। মহারাষ্ট্র সরকার গন্ডগোল এড়াতে ভীমা–‌কোরেগাঁওতে ১৪৪ ধারা 
জারি করলেও শম্ভাজি ও মিলিন্দের নেতৃত্বে এলগার পরিষদের সম্মেলনস্থলে 
আক্রমণ চালায় হিন্দুত্ববাদী কর্মীরা। মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় এর রেশ ছড়িয়ে পড়ে, যা আগেও বলেছি। 
এরপরে রাষ্ট্রশক্তি পুনরায় ঘুঁটি সাজাতে শুরু করে। হামলার অভিযোগে যখন মিলিন্দ এবং শম্ভাজি কোণঠাসা, তখনই তুষার দামগুড়ে একটা পাল্টা এফআইআর দায়ের করেন মহারাষ্ট্রের বিশ্রামবাগ থানায়। সেই অভিযোগে তিনি এলগার পরিষদের বিরুদ্ধে প্ররোচনামূলক উসকানি, ইতিহাস বিকৃতি, মাওবাদী যোগাযোগ ইত্যাদি উল্লেখ করেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই মহারাষ্ট্র পুলিস ধরপাকড় শুরু করে। ‘‌আরবান মাওইস্ট’‌ বলে গ্রেপ্তার হন রোনা উইলসন। এরপর সামনে আসে ষড়যন্ত্রের ‘‌চিঠি’। সেই চিঠিও শহর থেকে মাওবাদীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, নেপাল থেকে প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার জন্য অস্ত্র আমদানি ইত্যাদি অভিযোগে গ্রেপ্তার হতে হয় ভারভারা রাও’‌দের মতো মানুষদের। যদিও চিঠির সত্যাসত্য কোনও আইনি প্রক্রিয়াতেই প্রমাণিত হয়নি, এমনকী পুলিসের লিখিত অভিযোগেও সেই কথার উল্লেখ নেই। কবি, ৭৭ বছর বয়সি ভারভারা রাও নেপাল থেকে অস্ত্র আনেন, এমন অভিযোগের কথা পুলিস মুখে বললেও লিখিত অভিযোগে সে কথা উল্লেখ করেনি।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, গণ্যমান্য ব্যক্তি এই ঘটনার প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টে ভারভারা রাওদের হয়ে গিয়েছিলেন ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার, লেখিকা অরুন্ধতী রায়, অর্থনীতিবিদ প্রভাত পট্টনায়েকরা। এই প্রসঙ্গে গুজরাটের বিধায়ক জিগনেশ মেবানি বলেছেন, সারা দেশে নরেন্দ্র মোদির জনসমর্থন কমছে। এই গ্রেপ্তারির ঘটনা অঘোষিত জরুরি অবস্থার মতোই, ফ্যাসিবাদ ও গুজরাট মডেলের মিশ্রণ ঘটেছে।
আসলে বিভিন্ন আর্থিক রিপোর্টে কোণঠাসা নরেন্দ্র মোদির সরকার উগ্র হিন্দুত্ববাদের জিগির তুলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে বিরোধী ঐক্যে ফাটল ধরাতে চাইছে।
গৃহবন্দি সাংবাদিক, ইকনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি পত্রিকার সম্পাদকীয় পরামর্শদাতা গৌতম নওলাখা এ প্রসঙ্গে বলেছেন—
তু জিন্দা হ্যায় তো জিন্দগি কী জিত পর ইয়েকিন কর
অগর কঁহি হ্যায় স্বর্গ তো উতর লা জমিন পর
ইয়ে গম কে অউর চারদিন, সিতমকে অউর চারদিন
ইয়ে দিন ভি যায়েঙ্গে গুজর, গুজর যায়ে হজার দিন।
তু জিন্দা হ্যায়.‌.‌.‌
হ্যাঁ, আমরা এখনও বেঁচে আছি।‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top