বাহার উদ্দিন: পাকিস্তানের দুর্ভাগ্য, সত্তর বছরেও তার পরিচয় নির্ণীত হল না। সে গণতান্ত্রিক না সামন্তবাদী;‌ কেবল মুসলিম রাষ্ট্র না বহুত্ববাদী;‌ যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর অনুসারী না শাস্ত্রশাসিত একত্বের প্রবক্তা;‌ নির্বাচিত সরকার স্বাধীন না সামরিক বাহিনীর ছত্রছায়ায় নিছক পুতুলমাত্র। এ সব অনিশ্চয়তা, দিশাহীনতা প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই বহুভাষিক দেশটির ঘাড়ে দৃশ্যমান দৈত্যের মতো চেপে আছে। এক দেশ, এক ভাষা, এক ধর্মের আধিপত্যে যখনই সে ঐক্যের নামে চওড়া করতে চাইল, তখনই বেলুচিস্তানে, পূর্ববঙ্গে অসন্তোষ দেখা দিল। স্বায়ত্তশাসন দাবি করল বেলুচরা আর পূর্ববাংলার জনগণ ভাষা, সংস্কৃতি আর অর্থনৈতিক স্বাধিকারের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠল।
নানা গোষ্ঠীতে বিভক্ত বেলুচের বাসিন্দারা বৈষম্যের শিকার হয়েও ভৌগোলিক কারণে, উপজাতীয় গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জন্যও ঐক্যের স্বরকে চাঙ্গা করতে পারল না। তাদের স্বাভিমান আর কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন এখনও ধুঁকছে। কিন্তু পূর্ববঙ্গের সচেতন জনতা যোগ্য নেতৃত্বের দৃঢ়তায় আশ্বাস পেয়ে গেল, গোড়াতেই। ভাষা ও আবহমান সংস্কৃতিও তাদের সহযোগী হয়ে উঠল, বাড়িয়ে দিল ভাবাবেগ, তখন অনুকূল পশ্চিম থেকে পূর্বের মানচিত্রের দূরত্বও। কৃষিজীবী থেকে নাগরিক মধ্যবিত্তের বড় অংশ বুঝতে পারল, জাতিগত স্বাতন্ত্র‌্য অটুট রাখতে হলে পশ্চিমিদের একপেশে ক্ষমতার আওতায় থাকা চলবে না। আর্থিক বিকাশ অধরা হয়ে থাকবে।
গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক, ষাটের দশক, সত্তরের দশকে অখণ্ড বাংলার পূর্বখণ্ড কী দেখল, বারবার ক্ষমতায় রদবদল। আরোপিত রাজনৈতিক অস্থিরতা, দমনপীড়ন, সামরিকতন্ত্রের উত্থান, জাতিবিদ্বেষ, সুপরিকল্পিত সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার, পশ্চিমিদের আমলাতান্ত্রিক স্বৈরাচার আর দুর্নীতির নৃত্য। দেখল মুষ্টিমেয় ভাগ্যবানদের একপেশে অর্জনের রাজত্ব। এরকম পরিস্থিতিতে কালক্রমে প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেল যে, অবাস্তব দ্বিজাতিতত্ত্ব অভিজাতদের রাজনৈতিক ভাঁওতা মাত্র।‌ ‌এর সঙ্গে আধুনিকতার যোগ নেই, সংযোগ নেই ইতিহাসের, সংখ্যালঘু আর সংখ্যাগুরুর সামাজিক অর্থনৈতিক ব্যবধান চিহ্নিত করে যে দেশের জন্ম, সেটা এক বিশাল ফাঁকিস্তান। এর কবল থেকে রেহাই প্রয়োজন, প্রয়োজন তথ্য আর জাতিসত্তার আদর্শিক তত্ত্বের ভিত্তিতে গণসংগ্রাম। সমাজের এরকম যাবতীয় ইচ্ছাকে (‌সোশ্যাল চয়েস)‌ গুরুত্ব দিয়ে শুরুতে গণতান্ত্রিক আন্দোলন, অবশেষে মরণপণ সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং এশিয়ায় প্রথম জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্মকে সম্ভব করে তুলল ওখানকার জনশক্তি। কামাল আতা তুর্কের তুরস্কের পর এ আর–এক বেনজির দৃষ্টান্ত। যা পশ্চিম এশিয়ায় ব্যর্থ, ব্যর্থ ইউরোপ ও আফ্রিকার বহু দেশে।
বাংলাদেশের সাফল্য এখনও পূর্ণাঙ্গ নয়। ৭৫ সাল থেকে তাকে নিরন্তর লড়তে হচ্ছে। কিন্তু ‘‌তলাবিহীন ঝুড়ি’‌ থেকে, প্রায় শূন্য অর্থনীতি থেকে তার যে বিস্ময়কর উন্নয়ন সেটাই তার ভরসা, ভরসা গণতান্ত্রিক অভিপ্রায় আর মুক্তবুদ্ধির চর্চা। তার লড়াই যেমন বহির্দেশীয় ষড়যন্ত্রের মোকাবিলায়, তেমনি শাসন কাঠামোকে ধর্মের নামে অধর্মীয়করণের চেষ্টা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। এখানে শেখ হাসিনার সরকারের কৃতিত্ব আর তারুণ্যের সম্মতি প্রশ্নহীন। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর থেকে ক্ষমতাবানদের প্রশ্রয়ে যে–অগ্নিগর্ভ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানতুল্য পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা থেকে আজ সে মুক্ত। ‘‌জিরো টলারেন্স’‌কে‌ উঁচু করে, ভিন্ন কোনও দেশের সাহায্য না নিয়েই জামাতে–‌ইসলামি, ছাত্র শিবির, জেএমবি ও অন্যান্য সংগঠনের জঙ্গিদের যেরকম উৎখাত করে দিয়েছে, যে–‌ভাবে দেশের নানা প্রান্তে ভারতীয় সন্ত্রাসবাদীদের আশ্রয়স্থল চুরমার করেছে— তা সন্ত্রাস–কবলিত পাকিস্তান, আফগান মুলুক, সিরিয়া ও ইরাকের, এমনকী ভারতেরও শিক্ষণীয় বিষয়।
শুধু সামরিক হস্তক্ষেপ করে সন্ত্রাস দমন সম্ভব নয়। সেনা হামলায় অনেক সময় সন্ত্রাসবাদীদের সামাজিক ভিত বেড়ে যায়। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের জিগির তুলে বহুমুখী জঙ্গিরা সঙ্ঘবদ্ধ লড়াইয়ে মরিয়া হয়ে ওঠে। সন্ত্রাসকে ‘‌আজাদির লড়াই’‌ বা ধর্মযুদ্ধের নাম দিয়ে আবেগপ্রবণ তরুণদের বিভ্রান্ত করে দেয়। পাকিস্তান আর কাশ্মীরে এই ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। গণসম্মতিকে প্রবল জনমতের উচ্ছ্বাসের চেহারা দিলে সন্ত্রাসদমন সহজতর হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র সাহস খুঁজে পায়, বুঝতে পারে জনতা আর নবপ্রজন্ম সঙ্গে আছে। ঢাকার শাহবাগ আন্দোলনের নিকটতম, উজ্জ্বলতম ঐতিহাসিক ঘটনা। লক্ষ লক্ষ তরুণ খোলা চত্বরে দাঁড়িয়ে পড়ল, যুদ্ধপরাধী ঘাতকদের বিচারের দাবি তুলল। সব দিক থেকে সতর্ক ও সচেষ্ট হয়ে উঠল সরকার।
পাকিস্তান এ ব্যাপারে পুরোপুরি ব্যর্থ। ভারতের ব্যর্থতাও কম নয়। সন্ত্রাসকে, সন্ত্রাসের ঘাঁটিকে গুঁড়িয়ে দেওয়া যদি ব্যক্তিকেন্দ্রিক অহঙ্কার, উগ্রজাতীয়তাবাদের ঝড়ো হাওয়া তোলার কিংবা ভোটপ্রচারের মারাত্মক ইস্যু হয়ে ওঠে, তাহলে বিপদ বাড়তে থাকে। সেনাবাহিনীর আত্মত্যাগ আর রক্তদান নিয়ে রাজনীতি সাধারণ মানুষকে, তাদের দেশপ্রেমকে খাটো করে দেয়। ভারতীয় সেনারা দেশপ্রীতিতে উদ্বুদ্ধ। পেশাগত কারণে কাশ্মীরে যতবার সফর করেছি, দেখেছি অতন্দ্র প্রহরীর মতো সীমান্তে, শহরে তাঁরা সতর্ক। পাকিস্তানি বাহিনীর কায়দায় সন্ত্রাসকে তাঁরা লালন‌পালন করেন না, প্রতিবেশী দেশের দিকে উসকে দেন না, নিয়ম মেনে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করতে হয়, করেছেন, গোপন ঘাঁটিতে হানা দিয়ে জঙ্গিদের উৎখাত তাদের উদ্দেশ্য। এই ধরনের বীরত্ব, নিখাদ দেশপ্রেম ভারতের গণতন্ত্রকে, তার রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে শক্তি জোগাচ্ছে। জনমতকেও সবল করছে।
এখানেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অনাকাঙ্ক্ষিত ভূমিকায় অবতীর্ণ। একসময়, তাঁরা ১৯৭১–‌এর আগে কেবল ক্ষমতাদখল আর সুবিধাভোগের ইচ্ছাকে বড় করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিপর্যয়ের পর থেকে ভারতকে শিক্ষা দেওয়ার এবং ছলেবলে কাশ্মীরকে ছিনিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব হাতে তুলে নেয়। জিয়াউল হক নির্বাচিত, সোশ্যালিস্ট ভুট্টোকে জেলে পুরে, জামাতে ইসলামির আমিরের অনুমতি নিয়ে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিলেন। নিজাম–‌এ মোস্তফা— ‌মনগড়া ইসলামি শাসনতন্ত্রের বুলি চওড়া করে সমর্থনের ভিত খুঁজলেন। পেয়েও গেলেন। তখন থেকেই গণতন্ত্রের নতুন বিপর্যয়ের আরম্ভ। সত্তরের দশকের শেষে ইরানে শিয়া বিপ্লবের সফলতা, আশির দশকে আফগানিস্তানে সোবিয়েত রাশিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপ ও তালিবানদের উত্থান, সোবিয়েতকে কমিউনিস্টদের কবল থেকে মুক্ত করতে রাশি রাশি অস্ত্র আর অর্থের সংযোগে পাক সেনারা বাড়তি উৎসাহ পেয়ে গেল। আমেরিকা আর ইউরোপ তখন পাকিস্তানের পাশে। আইএসআই, সিআইএ, পরস্পরের সহযোগী। মার্কিন সেনার তদারকিতে তালিবানদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, তাদের বহুবিভক্ত সংগঠনগুলিকে একমুখী করে তুলছে, সোবিয়েত হানায় উদ্বাস্তু আফগানরা পাকিস্তানে প্রবেশ করছে। যখন নাজেহাল হয়ে রুশ সেনা বিদায় নিল, তালিবানি রাষ্ট্রের মোল্লা ওমরের পাশে দাঁড়ালেন আল কায়দার ওসামা বিন লাদেন। ধর্ম আর রাজনীতির মিশেলে, মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহাবের (‌১৭০৩–‌১৭৮২)‌ ভাবশিষ্য বিশ্বজুড়ে ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠার ভুলমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে সশস্ত্র বিপ্লবের প্রবক্তা হয়ে উঠলেন। আমেরিকা তখনই বুঝল যে তাদের সোবিয়েত বিরোধী কৌশল বুমেরাং হয়ে গেছে। শুধু আফগানিস্তানের নয়, পাকিস্তানেও তালিবানপন্থীরা, আল কায়দার যোদ্ধারা ঢুকে পড়ছে। পাক শাসকদের মূল ভিত পাক সেনারা হরকত উল মুজাহিদ, মরকজ আল দাওয়া, আহলে হদিস, লস্কর–‌এ তৈবা এবং অধিকৃত কাশ্মীরে হিজবুল মুজাহিদিনকে কাশ্মীরের দিকে উসকে দিল। অখণ্ড স্বাধীন কাশ্মীরের প্রবক্তা জেকেএলএফকে পাকিস্তান আর সমর্থন করছে না, সমর্থনের যাবতীয় সরঞ্জামে, অর্থে সুসজ্জিত করে তুলছে অর্ধশিক্ষিত, যুক্তিরহিত মোল্লাদের, যারা একসময় আফগানিস্তানে সোবিয়েত রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, আল কায়দার কৌশলে প্রশিক্ষণ নিয়েছে এবং ইসলামের সন্ত্রাসবিরোধিতা ও যুদ্ধবিরোধিতার সঙ্গে পরিচিত নয়। এদেরই পাক সামরিকতন্ত্র আর কাশ্মীরলোভী আমলাতন্ত্র প্রক্সি যুদ্ধে লেলিয়ে দিল। পাকিস্তানের শান্তিপ্রিয় মানুষ যারা যুদ্ধ চায় না, জঙ্গিবাদকে সমর্থন করে না, সাচ্চা ধর্মবিশ্বাসী কিংবা আধুনিক নাগরিক— তাঁদের সবাই মোল্লাশাসিত সন্ত্রাসের শিকার হতে লাগলেন। জঙ্গিদের বোমায় ভোটের আগে ঝাঁঝরা হয়ে গেলেন বেনজির ভুট্টো, গুলিতে মারাত্মক জখম হলেন মালালা ইউসুফজাই, পাকভূমিতে এরাই বারবার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ক্ষমতামত্ততা জাহির করছে, কাশ্মীরের ওপার থেকে এপারে এসেও হানা দিচ্ছে এবং ভারতজুড়ে তাদের অপকাণ্ড ছড়িয়ে দিতে সশস্ত্র হুঙ্কার ও হামলা ছড়াচ্ছে।
হরকুত উল আনসার, আফগানিস্তানে যার গর্ভগৃহ, হরকত উল মুজাহিদিন যারা কাশ্মীরে ভিন্ন নামে সংগঠিত, লস্কর–এ তৈবা যাদের সঙ্গে শ্রীনগরে এই লেখকের দেখা হয়েছে, তাদের সদস্য আর সমর্থকদের নিয়ে সাধারণ, নামেমাত্র মওলানা মাসুদ আজহার আজ এক খতরনাক জঙ্গি নেতা। তার জনভিত্তি নেই, মিশরের হাসান আল বান্না–‌র (‌১৯০৬–‌১৯৪৯)‌ ইখওয়ানুল মুসলিমিন কিংবা ত্রিশের দশকে অবিভক্ত ভারতে জামাতের প্রতিষ্ঠাতা আবু আলা মত্তদুদির মতো তাত্ত্বিক আদর্শ নেই, কেবল পাক সামরিক জুন্তার কৌশলী মদতে সে এখন বিশ্বের নজরে। জৈশ মুহাম্মদি এমন কোনও বড় সংগঠন নয়, যাদের আয়ত্তে আনা যায় না, মাসুদ আজহারও তেমনি ক্ষমতাধর, সংগঠন গড়তে ওস্তাদ ব্যক্তি নয়, যাকে বাগে আনা মুশকিল। তার অন্ধ আবেগ আর বিদ্বেষকে ব্যবহার করছে যারা, তারা অচিরে বুঝতে পারবে সে পাকিস্তানের শত্রু। সভ্যতারও শত্রু। পাকিস্তান যদি আর্থিক ও সামাজিক বিপর্যয় থেকে রেহাই চায়, তবে মাসুদ আর তার সহযোগীদের আড়াল না করে অবিলম্বে শায়েস্তা করতে হবে। জঙ্গিপনার বিরুদ্ধে গড়তে হবে সর্বোচ্চ জনমত। তাহলে লাগাতার দুর্ভাগ্যের অবসান ঘটবে। গোটা দক্ষিণ এশিয়াও হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে। পাশের বাড়ির আগুন বড় ভয়ঙ্কর। পুড়িয়ে দেয় পরিবেশ ও প্রতিবেশকে।‌

জনপ্রিয়

Back To Top