সুদীপ্ত চক্রবর্তী: সাম্প্রতিক সময়ের তীব্রতম জলসঙ্কটের মুখোমুখি আমাদের দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। প্রাক–বর্ষা বৃষ্টিপাতের হিসেবে ২০১২ সাল বাদে গত ৬৫ বছরে এত কম বৃষ্টি কখনও হয়নি। এবার দেশের ৪৩.৬২% অঞ্চল খরার কবলে। কয়েক বছর ধরেই মহারাষ্ট্র, ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, তেলেঙ্গানা স্বল্পবৃষ্টির ফল ভোগ করছে। কিছুই কি করার নেই সরকারের? শুধু ‘‌মন কি বাত’‌ অনুষ্ঠানে জল সঞ্চয় অভিযানে জন–অংশীদারির বার্তা দিলেই কি সমস্যার সমাধান? আদৌ তা নয়। জলের অভাবে কৃষির যে ক্ষতি, তা বহুলাংশে সরকারি নীতির ফলাফল। একটু তলিয়ে দেখলেই বিষয়টা পরিষ্কার হবে। প্রসঙ্গত, চেন্নাই বা বেঙ্গালুরুর মতো শহরে জলের আকালের সঙ্গে গ্রামাঞ্চলে খরা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার মধ্যে একটা মূলগত ফারাক আছে। শহরাঞ্চলে জলাভূমি ও জলের বিভিন্ন স্বাভাবিক আধার বুজিয়ে এবং মাটির তলার জল ব্যাপকভাবে তুলে নিয়ে অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে জলের আকাল দেখা দিচ্ছে।
মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র–‌সহ বিভিন্ন রাজ্যে খরা মোকাবিলায় ছোট ছোট নালার ওপরে বাঁধ (check dam) সরকারি খরচে এলাকার মানুষের শ্রমে নির্মাণ করা হত। সেই বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও থাকত এলাকার বাসিন্দাদের ওপর। আগে যেখানে নালায় শুধু বর্ষার সময়েই জল থাকত, এই বাঁধের কারণে সারা বছর জল থাকে। যা দিয়ে সংলগ্ন অঞ্চলের কৃষিকাজ হতো। সম্প্রতি সরকার এরকম বাঁধ তৈরি, পুরনো বাঁধের সংস্কারের জন্য টাকা বরাদ্দ বন্ধ করে দিয়েছে। কেন? কারণ নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের জল সংক্রান্ত নীতির দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তন। এই ছোট ছোট বাঁধগুলি কেন্দ্রীয় সরকারের ‘‌ওয়াটারশেড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’‌-এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। 
প্রাসঙ্গিক কারণেই প্রশ্ন আসবে, এই ‘‌ওয়াটারশেড’‌ বিষয়টি কী? ওয়াটারশেড হচ্ছে এমন একটি অঞ্চল, যেখানে বৃষ্টির জল কিছু পরিমাণ যেমন মাটিতে থেকে যাবে, তেমনই বাকি অংশ নির্দিষ্ট পথে বাহিত হয়ে নালা, খাল, বিল, নদীতে (বাঁধ যুক্ত) গিয়ে জমা হয়। ১৯৮০ সাল থেকে ধারাবাহিক আলোচনা, পর্যালোচনা, বিভিন্ন স্তরে কথাবার্তার পর ‘‌দি ইন্টিগ্রেটেড ওয়াটারশেড ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম’‌ ২০০৯ সালে আমাদের দেশে চালু হয়। এই প্রকল্পের মধ্য দিয়ে প্রতিটি ওয়াটারশেডের অন্তর্গত অঞ্চলে বৃষ্টির জলকে উপযুক্ত ও পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে এবং মাটি, জল ও জঙ্গল সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করা হয়। প্রতিটি ওয়াটারশেডের আওতায় প্রায় ৫ হাজার একর জমিকে খরার হাত থেকে রক্ষার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। দশকের পর দশক ধরে, পৃথিবীর বিভিন্ন জলস্বল্পতায় ভোগা দেশে এই পদ্ধতি জল সংরক্ষণের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাতেও কার্যকরী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। আমাদের মতো দেশে, যেখানে ২০১২ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের থেকে কমছে (ব্যতিক্রম ২০১৩ সাল, সে বছর স্বাভাবিকের থেকে ৮% বেশি বৃষ্টি হয়েছিল), সেখানে এই ওয়াটারশেড প্রকল্পের কোনও বিকল্প ছিল না। ছোট ছোট নালায় এইভাবে চেক ড্যাম তৈরি করা ছিল ইন্টিগ্রেটেড ওয়াটারশেড ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের অঙ্গ। আমাদের দেশের বিশেষজ্ঞরাও এই প্রকল্পের পক্ষে মত দিয়েছিলেন।
২০১৫ সালের জুলাই মাসে কেন্দ্রীয় সরকার নতুন প্রকল্প নিয়ে আসে— ‘‌প্রধানমন্ত্রী কৃষি সিঞ্চয়ী যোজনা’‌। এই প্রকল্পের জন্য স্লোগান দেওয়া হয়— ‘‌হর খেত কো পানি’‌, ‘‌পার ড্রপ মোর ক্রপ’‌। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়াটারশেড ম্যানেজমেন্ট-এর বৃহত্তর প্রেক্ষিত থেকে নতুন প্রকল্পে নির্দিষ্ট ছোট কৃষিজোতের সীমাবদ্ধতায় আটকে পড়া নীতিগত দিক থেকে একটি বড় চ্যুতি। ওয়াটারশেড ম্যানেজমেন্ট-এর মাধ্যমে শুধু সেচ নয়, জল সংরক্ষণ ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার যে বিষয়গুলি জড়িত ছিল তা ধাক্কা খেল। আগে কৃষকদের জল–নিবিড় শস্য (Water Intensive crops) চাষের বদলে কম জলে সম্ভব এমন চাষে উৎসাহিত করা হলেও, বর্তমান চালু প্রকল্পে তা অনুপস্থিত। যেমন, গত কয়েক বছরে মহারাষ্ট্রে আখ ও তুলো চাষের পরিমাণ বেড়েছে, কারণ কর্পোরেট সংস্থা ও সুদখোর মহাজন আখ ও তুলো চাষে লগ্নি করতে উৎসাহী। কৃষিক্ষেত্রে আখ ও তুলো চাষ জল–নিবিড় শস্য হিসেবে পরিচিত (ধান–গমও জল–নিবিড় শস্য)। খেয়াল করলে দেখা যাবে, বর্তমানের খরাপ্রবণ অঞ্চলগুলিতে সমস্যার বাড়বাড়ন্ত কিন্তু ২০১৫ সাল থেকেই শুরু। সম্প্রতি তথ্য জানার অধিকার আইনে জানা গেছে, শুধুমাত্র মহারাষ্ট্রে ২০১৫ সাল থেকে কৃষক আত্মহত্যার সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে (সংখ্যার হিসেবে ১২,০২১ জন)। নতুন প্রকল্প চালু হওয়ার পর যদিও সরকারিভাবে পুরনো প্রকল্পটি বাতিল ঘোষণা হয়নি, শুধুমাত্র নতুন প্রকল্পের একটি ক্ষুদ্র লোকদেখানো অংশ হিসেবে সেটিকে রেখে দেওয়া হয়েছে। ২০১৪–১৫ সালে ওয়াটারশেড ম্যানেজমেন্ট প্রকল্পে যেখানে কেন্দ্রীয় বাজেটের ২,২৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, নীতি পরিবর্তনের ফলে সেখানে ৩৫% ব্যয়বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে; বরাদ্দকৃত টাকার পরিমাণ ১,৪৮৭ কোটি টাকা।
জানা গেছে, গত কয়েক বছরে ওয়াটারশেড ম্যানেজমেন্ট প্রকল্পের মূল নীতি থেকে সরে এসে শুধুমাত্র জলসেচের জন্য বড় বাঁধ, বাঁধ (Dam without gates) নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে টাকা বরাদ্দ হচ্ছে। ফলে, আগে যে নালা বা নদীতে সারা বছর জল পাওয়া যেত, এখন সেখানে বৃষ্টির মুখাপেক্ষী হয়ে কৃষকদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে; আরও বেশি বেশি অঞ্চল জল না পেয়ে খরাপ্রবণ হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি কর্পোরেট সংস্থা মাটির তলার জল ব্যাপক ভাবে তুলে চাষ ও অন্য কাজে লাগাচ্ছে শুধু মুনাফার লোভে। জল সংরক্ষণের কোনও ব্যবস্থা না থাকায় ‘‌সারফেস ওয়াটার’‌ যেমন কমছে, তেমনই মাটির তলার জল তুলে নেওয়ায় জলস্তর আরও নিচে নেমে যাচ্ছে। পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়ানক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ধীরে ধীরে খরা কবলিত অঞ্চলের পরিমাণ বাড়ছে, বাড়ছে হাহাকার, কৃষক আত্মহত্যা। মাটি, জঙ্গল বা পরিবেশ সংরক্ষণের কোনও বিষয়ই বর্তমান নীতির সঙ্গে সংযুক্ত নয়। ওয়াটারশেড ম্যানেজমেন্ট প্রকল্পে ‘‌রিজ টু ভ্যালি অ্যাপ্রোচ’‌ ( Ridge To Valley Approach)-এর মাধ্যমে যেখানে মালভূমির ঢাল থেকে শুরু করে অপেক্ষাকৃত নিচু অঞ্চলেও জলের ব্যবস্থা করা যেত, সেখানে বর্তমান নীতিতে বড় বড় বাঁধ তৈরি করে শুধুমাত্র নিচু অঞ্চলেই জল সরবরাহ দেশের কৃষি কাঠামোকেই ধ্বংস করে দেবে। ২০১৬ সাল থেকে সরকার আর নতুন করে কোনও ওয়াটারশেড প্রকল্প তৈরি করেনি। ওয়াটারশেড ম্যানেজমেন্ট প্রকল্পে যেখানে ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা খরচ করে ২৮টি রাজ্যে ৩৯ লক্ষ হেক্টর জমিকে আওতায় আনা সম্ভব হয়েছিল, সেখানে নতুন প্রকল্পে মাত্র ১১.৫ লক্ষ হেক্টর জমির জলসেচের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরনো প্রকল্পের বদলে নতুন প্রকল্প কার্যকরী করায় দেশে খরার বিরুদ্ধে লড়াইকে ২০ বছর পিছিয়ে দেওয়া হল। নতুন নীতি গ্রহণের সময় যে সমস্ত সংগঠন তৃণমূল স্তরে খরার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে চলেছে তাদের সঙ্গে কোনও আলোচনাই করা হয়নি। 
স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন উঠছে, দেশ জুড়ে এই খরা কি তাহলে মনুষ্যসৃষ্ট? সোজা কথায় এর উত্তর একটাই— এটা মনুষ্যসৃষ্ট নয়, কর্পোরেট সংস্থাকে বড় বাঁধ ও লাভজনক (জল-নিবিড়) শস্য চাষের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য সরকার-সৃষ্ট খরা। যদি এই নীতি দেশে বলবৎ থাকে তাহলে আগামীতে খরাকেন্দ্রিক আরও বড় সমস্যা আমাদের দেশের জন্য অপেক্ষা করছে।

ওয়াটারশেড ম্যানেজমেন্ট প্রকল্পের ধারাবাহিক কার্যক্রম

১৯৭০- ‘‌খরাপ্রবণ এলাকা উন্নয়ন কর্মসূচি’‌ ও ‘‌ডেজার্ট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’‌ গৃহীত হয়।
১৯৮৬- বৃষ্টি-নির্ভর চাষের সুবিধার জন্য চালু হয় ওয়াটারশেড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট।
১৯৯৪- অর্থনীতিবিদ সি.এইচ. হনুমন্ত রাওয়ের নেতৃত্বাধীন কমিটি এলাকা উন্নয়নের সঙ্গে ওয়াটারশেড ম্যানেজমেন্ট যুক্ত করার সুপারিশ করে এবং তাতে সেই অঞ্চলের মানুষ ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে যুক্ত করার কথাও বলে।
২০০৩- ‘‌হরিয়ালি’‌ নামের নতুন নির্দেশিকা জারি; এতে স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থাকে নিয়ে কাজ করার কথা বলা হয়।
২০০৬- পার্থসারথি বিশেষজ্ঞ কমিটি ওয়াটারশেড ম্যানেজমেন্ট প্রকল্প মূল্যায়ন করে চালু রাখতে পরামর্শ দেয়।
২০০৮- নতুন নির্দেশিকা। এতে ‘‌খরাপ্রবণ এলাকা উন্নয়ন কর্মসূচি’‌, ‘‌ডেজার্ট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’‌ ও ওয়াটারশেড ম্যানেজমেন্ট প্রকল্প এক ছাতার তলায় নিয়ে এসে তৈরি হয় ‘‌ইন্টিগ্রেটেড ওয়াটারশেড ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম’‌, যা চালু হয় ২০০৯ সালে। ‌

জনপ্রিয়

Back To Top