নবনীতা ভট্টাচার্য
পুরো স্কুল বিল্ডিংটাই এখন ঢুকে পড়েছে এক ফালি মোবাইলের মধ্যে। সারাদিন ধরে সেখানে চলছে পঠনপাঠন। স্কুলের ঘণ্টা নেই, টিফিন ব্রেক নেই, নেই ছুটির মজা। বন্ধু নেই, স্কুলের ইউনিফর্ম নেই, নেই স্কুল ব্যাগ, নেই টিফিন বক্স। নেই বন্ধুর সঙ্গে টিফিন ভাগ করে খাওয়ার মজা, নেই ক্যান্টিনে গিয়ে লুচি আলুর দম খাওয়ার মজা। আছে শুধু মোবাইল বা ল্যাপটপের সামনে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা।
দিদিমণি পড়িয়ে চলেন একা। আর ঘরের মধ্যে ছাত্র বসে থাকে একা। বন্ধুরা সব মোবাইল স্ক্রিনে ছোট ছোট জানলায় আটকে। কোনও বন্ধুকে দেখব কী করে!‌ মোবাইলে দিদিমণি যেন মনে হচ্ছে তাকিয়ে আছে আমারই দিকে। অন্যমনস্ক হওয়ার জো নেই। কারণ স্ক্রিনে দিদিমণি আর বাড়িতে মা। পড়তে পড়তে জানলা দিয়ে আর চোখ যায় না আকাশে। ক্লাস থেকে বের করে দিলে পড়ার বই থেকে মুক্তির আনন্দ আর নেই। আমার স্কুলটা হারিয়ে গিয়েছে হঠাৎ। উঁচু ক্লাসের যে দাদা আর দিদির হাত ধরে বড় হওয়ার শুরু, তাদের সঙ্গে আবার কবে দেখা হবে কে জানে।
স্কুলের বাগান, সিঁড়ি, দোলনা, খেলার মাঠ। প্রিয় দিদিমণি, প্রিয় স্যরের সঙ্গে আর দেখা হয় না। আর কোনও ব্যক্তিগত কথা হয় না। হঠাৎ যেতে যেতে মাথার চুলে বিলি কেটে দেয় না কেউ। নীচু ক্লাসের ফেলে আসা দিদিমণিরা দেখা হলে ছুড়ে দিত স্নেহের হাসি। এক একটা দিন ভরে যেত এই সব পাওয়াতেই।
আমার প্রিয় টেবিল–চেয়ার, আমার বসার জায়গা। বিভিন্ন হাতের কাজ। লেখা, আঁকা ছবি, বন্ধুরা মিলে করা কোনও প্রোজেক্টের কাজ। স্কুল মানে তো শুধু পড়াশোনা নয়। স্কুল মানে তো ভালবাসা। স্কুল মানে ছোটবেলা। স্কুল না থাকলে স্কুলে যাওয়ার ইচ্ছে বা অনিচ্ছে নেই। তাই বাড়ি ফেরার আনন্দও নেই। স্কুলের একদিনের ছুটি নেই। নেই কোনও উৎসবে বাবা মা–কে নিয়ে গিয়ে স্কুল দেখানো। নেই ক্লাসে ওঠার আনন্দ। ফেল করার ভয়। নেই কোনও খাতা চেক, সই সাবুদ। গার্জেন কল। দিদিমণির নালিশ। কানমলা খাওয়ার মজা। বন্ধুদের সঙ্গে বৃষ্টিতে ভেজা নেই। এর বই ওর ব্যাগে, ওর খাতা এর ব্যাগে গুলিয়ে যাওয়া নেই। স্কুল বাস নেই। বাসে উঠে আরামে ঘুমিয়ে পড়া নেই। নিজের বলে একটা স্কুল এখন আর নেই ছোটদের।
আছে শুধু নেট, হেডফোন, নিরন্তর স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা। ‘‌দিদিমণি টয়লেট যাব’‌ একজন কেউ বললেই সবাই একে একে টয়লেট যেতে চায়!‌ এ মজা কোথায়? একঘেয়ে টিফিনে মুখ ভারী, ওর কী মজা প্রতিদিন নতুন নতুন টিফিন আনে। এ সব নির্ভেজাল আনন্দ হারিয়ে যাচ্ছে। আগামী দিন কি ভুলে যাবে স্কুল মানে ছোটদের আশ্রয়। কোনও স্মৃতি আর থাকবে না তবে স্কুল বাড়ি ঘিরে? মোবাইলে দেখা দিদিমণির মুখ কি চিনতে পারব আমি আগামী দিনে? পায়ে হাত না দিলেও হাসিমুখে দাঁড়িয়ে বলতে পারব, ভাল আছেন? দিদিমণি কি মনে করতে পারবে? সব বাচ্চাই ইউনিক। সেই বাচ্চা কে?‌ দিদিমণির ল্যাপটপে ছোট ছোট খোপে গুটিসুটি মেরে থাকা ছবিতে আগামী প্রজন্মকে ছোঁয়া শক্ত। তুই ভারি দুষ্টু ছিলি, তুই ভারি শান্ত। তুই বড্ড কথা বলতিস ক্লাসে। তুই খুব চুপচাপ। এভাবে আর চেনা হবে না কাউকে।
বইয়ের পাঠ ছাড়াও দিদিমণিরা নিজের মতো করেও নিজেদের ভালবাসা, আদর্শ ভরে দিতে চায়। যা কিছু ভাল, তা রেখে যেতে চায় প্রিয় ছাত্রদের কাছে। যাতে সে মনে রাখে তাঁকে। যাঁকে দেখলেই পিলে চমকে ওঠে, লুকিয়ে পড়তে মন চায়। সে সব অনুভূতি মরে যাচ্ছে। নীচু ক্লাসের যে বন্ধুটি দাদা ডেকেছিল, সে কেমন আছে কে জানে!‌
স্কুল খুললেও নাকি পুরনো নিয়ম আর চলবে না। সব ক্ষেত্রেই দূরত্ব আর মাস্ক থাকবে। সব বাচ্চা এক রকম সব দিদিমণিও বুঝি এক। আমরা বুঝি যন্ত্র হয়ে যাব। মুখোশের আড়ালে কেউ আর হাসবে না, কাঁদবে না। ইশারা বা ইঙ্গিত বুঝবে না কেউ। স্কুল শেষে ফিরবে যে মন, সে কি আরও কঠিন যন্ত্রমানব হয়ে ফিরবে? কে জানে!‌

জনপ্রিয়

Back To Top