উদ্দালক ভট্টাচার্য: তারপর, রাজপুত্র রাক্ষসকে বধ করলেন। রাজার গড় রক্ষা করলেন। রাজা আগেই ঘোষণা করেছিলেন, যে এই রাক্ষসকে বধ করতে পারবে, সে পাবে অর্ধেক রাজত্ব আর রাজকুমারীকে। কথা রাখলেন রাজা। অর্ধেক রাজত্ব আর রাজকুমারীকে তুলে দিলেন রাজপুত্রের হাতে। অর্ধেক রাজত্ব, জমি জমা, ফসল, ধন–সম্পত্তি আর রাজকুমারীকে এক আসনে বসিয়ে দিল লোকগাথা। আজ সেই রাজকুমারী হাজার বছর পেরিয়ে উন্নাওয়ের রাস্তায় গা ভর্তি আগুন নিয়ে ছুটে যাচ্ছে থানায়। ধর্ষকরা তাঁকে পুড়িয়ে দিয়েছে। সেই রাজকুমারী বেঙ্গালুরুর রাস্তায় পড়ে আছে। কালো পোড়া দেহ নিয়ে। সেই রাজকুমারী যাঁর ধর্ষিত দেহ কখনও দাহ হচ্ছে দিল্লিতে, কখনও মুম্বইয়ে, কখনও অন্য কোনও ভারতীয় শহরে। 
আদিম লোকগাথায় নারী কোথায়?‌ রামায়ণের অগ্নিপরীক্ষা, দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণে। লক্ষণীয়, যে দুই মহান গাথার মূল দুই নারীচরিত্র যুগান্তরে ভারতীয় মানসে গেঁথে আছে, তার একজন সীতা। অন্যজন দ্রৌপদী। একজনকে অপহরণ করে নিজ গৃহে বন্দি করে রাখে অসুর। তাঁকে রক্ষা করেন স্বামী। কিন্তু সতীত্বের সন্দেহে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয় তাঁকে। অন্যজনকে সম্পত্তির মতো বাজি রেখে হারেন তাঁর পঞ্চস্বামীর অগ্রজ। তারপর, বিপুল উৎসাহে তাঁর শ্লীলতাহানি করা হয় সভায়। গোদা চোখে দেখলে নারী ও ধর্ষকের সম্পর্ক তো সেদিন থেকেই শুরু। এরপর কত গাথায়, কত কাব্যে বারবার নারী ধর্ষিতা হয়েছেন এবং তা অনুচ্চারিত রয়ে গিয়েছে আজন্মকাল। কিন্তু এই সম্পর্কের বাইরেও, মানে নারী পুরুষের ধর্ষক আর ধর্ষিতার এই সমীকরণের বাইরে কী কিছু নেই?‌ আছে তো। কিন্তু যা নেই, তা হল এর উৎসস্থল খুঁজে দেখার চেষ্টা। রোজকার জীবনে কোনটা আসলে নারী উপলব্ধিকে দুঃস্বপ্ন উপহার দেয়, সেটা এখনও পুরুষ জানে না। কারণ তার চৈতন্যে রয়েছে সীতা ও দ্রৌপদীর প্রত্নপ্রতিমা। যা তাকে বাধ্য করে একবগ্গা ভাবতে। সেটা তার অবচেতন থেকেই আসে। সেই পুরুষটি বুঝতেও পারে না। কারণ সমাজ তাকে বুঝতে সুযোগ করে দেয় না। 
পুরুষ মানে না যে নারীর থেকে অনুমতি নিতে হয়। আপেল গাছে আপেল হয়ে আছে, নধর আপেল, দেখলুম, জিভে জল এল, ছিঁড়ে খেয়ে নিলুম। এ যেন তেমনই। ওই গাছের সঙ্গে মেয়েটির পার্থক্য কোথায়?‌ আছে। সভ্য যাঁরা, তাঁরা এই অনুমতির অর্থ বোঝেন। যাঁরা অসভ্য, বোঝেন না। বোঝেন না যে অর্ধেক রাজত্বের প্রাণহীন আবাদি জমি কিংবা রাজকোষের অর্ধেক সম্পত্তির সঙ্গে নারীকে এক আসনে বসানো ধর্ষকামী মানসিকতা ছাড়া আর কিচ্ছু নয়। পুরুষের যৌন আকাঙ্ক্ষা, অপূর্ণতা এসব ছেঁদো কথা। কারণ রক্তমাংসের প্রত্যেকটি জীবের সেই আকাঙ্ক্ষা আছে। নারী পুরুষ নির্বিশেষে। নারীরা সে আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ সেভাবে করতে পারে না, পুরুষরা পারে। কারণ, ইতিহাস ও পুরাণ তাকে সেই অধিকারের আসনে বসিয়ে রেখেছে। তাই অনুমতিটা মামুলি এবং অপ্রয়োজনীয়। টম অ্যান্ড জেরির কার্টুন মনে পড়ে?‌ যেমন করে লালায়িত বেড়াল টম জেরিকে মাঝে মাঝে অনাবৃত মাংসপিণ্ড মনে করত, এদেশের প্রায় পূর্ণ শতাংশ পুরুষ নারীকেও তেমন গাছের আপেল বা মাংসপিণ্ড মনে করে। দিল্লিতে রাতের বাসে, একটা আপেল গাছ যাচ্ছে। লাল টুসটুসে আপেল সেখানে ভর্তি। ছিঁড়লুম আর খেলুম। উদর পূর্তি।  
শুধু যৌন আকাঙ্ক্ষা এই পাশবিকতার একমাত্র ইন্ধন হতে পারে না। কিছুতেই পারে না। এর পিছনে আছে ক্রোধ। মানে, ‘‌তুই আমাকে পাত্তা দিবি না, দেখ, তোর কী হাল করি’‌। আর লিঙ্গ ভেদে এই ক্রোধই কেমন ঝপ করে পাল্টে যায়, সেটাও দেখার মতো। ধরে নেওয়া যাক শত্রুতা দুই পুরুষে। আড়ালে লুকিয়ে রইল এক পুরুষ। অন্য জন যেতেই খপ করে ধরে উত্তম মধ্যম মার। দরকারে খুন। আর যদি নারী পুরুষের মধ্যে এই শত্রুতা হয়। পুরুষটি লুকিয়ে থাকবে আড়ালে। নারীটি যেতেই প্রথমে তাঁকে খপ করে ধরবে। তাঁর ওপর যৌন অত্যাচার চালাবে। তারপর তাঁকে খুন করবে। কেউ শুনেছেন, দুই পুরুষ মস্তানে মারামারি করে একজন আরেক জনের যৌনাঙ্গ কেটে নিয়েছে?‌ বা মাঝরাতে দুষ্কৃতীরা চড়াও হয়ে নিরীহ এক পুরুষ পথচারীকে প্রথমে যৌন হেনস্থা করেছে, তারপর জ্যান্ত জ্বালিয়ে দিয়েছে। নাহ্‌। কিন্তু নারী হলে?‌ এক বাচিক শিল্পী ক’‌দিন আগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গোলমাল নিয়ে নিজের মত প্রকাশ করেছিলেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। যাঁদেরকে সমালোচনা করা তাঁরা সাধারণত এই ধরনের সমালোচনার উত্তর দেন, ‘‌ও পাকিস্তানের চর।’‌ বা, ‘‌ও দেশদ্রোহী।’‌ আর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম জড়ানো থাকলে, ‘‌ও গাঁজাখোর।’‌ এক্ষেত্রেও তেমনটা হতেই পারত। কিন্তু হবে কী করে, উল্টো দিকে যে একজন নারী। পুরুষ জানে যে নারীকে যৌনগন্ধী আক্রমণ করলেই সে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত হয়। তাই যাচ্ছেতাই ভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ইতরামি চলে। আসল কথা হল, নারীর প্রতি সমস্ত ক্রোধকেই পুরুষ শেষ পর্যন্ত যৌনতায় পর্যবসিত করে। না হলে কুরু–‌পাণ্ডব তো চাইলেই পারতেন একে অপরের ধুতি ধরে টেনে যুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা মিটিয়ে নিতে। সে তো তাঁরা করলেন না, বরং অস্ত্র সজ্জিত হয়ে যুদ্ধ করলেন। আর দ্রৌপদীর বেলায় কাপড় ধরে টান দিলেন। কেন?‌ 
কারণ আদিকাল থেকে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, প্রলেতারিয়েতের যেমন শৃঙ্খল ছাড়া হারানোর কিছু নেই, তেমন নারীরও একমাত্র ভূষণ লজ্জা। আর সে আবৃত লজ্জায় টান দিতে পারলেই নারীকে অর্ধমৃত করা যায়। কেউ বোঝেনই না যে বস্ত্রের সঙ্গে লজ্জা নিবারণের যোগ প্রাচীন নয়। কিছুটা জৈবিক কারণে মানুষ বস্ত্র ব্যবহার করতে শুরু করেছিল। তার সঙ্গে লজ্জার কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু ক্রমে সে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবে উলঙ্গ হলে সে লজ্জাহীন। সে কথা সামাজিক। তাই টানো দ্রৌপদীর কাপড় ধরে।
সেক্টর ফাইভের অফিসে এক নারী সহকর্মী সেদিন একটি বছর সতেরোর অন্য কর্মীকে প্রশ্ন করেছিল, ‘‌আচ্ছা, তুই বল তো, রেপ কেন হয়?‌’‌ সে অপ্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ উত্তর দিল, ‘‌মেয়েরাই তো ছোট জামা পরে বেরোয়, সেই জন্যই ধর্ষণ হয়।’‌ যেন প্রশ্নটা, ‘‌ভারতের জাতীয় সঙ্গীত কী?‌’‌ উত্তর, ‘‌জনগণমন।’ তাহলে?‌ এই সাধারণ, স্বাভাবিক, ডাল ভাত হয়ে যাওয়া ধর্ষণ–‌তত্ত্ব থেকে বাঁচার উপায় কী?‌ আছে। বাসে ফেরার সময় নারী সহযাত্রীর দিকে ঝুঁকে দাঁড়ানো কেন অন্যায়, কেন সোশ্যাল মিডিয়ার চ্যাটে কুপ্রস্তাব দেওয়া অপরাধ, কেন পুরুষের মতো নারীও ইচ্ছামতো পোশাক পরতে পারে, কেন বিবাহ–‌পরবর্তী সময়েও স্বামীকে যৌন সম্পর্কে অস্বীকার করার ক্ষমতা নারীর আছে, কেন রজস্বলা নারীর কর্মক্ষেত্রে ছুটি প্রাপ্য, কেন নারী শুধু মা হতে চায় না, বরং সফল মানুষ হতে চায়, এই এমনই হাজার হাজার প্রশ্ন যেদিন ‘‌পুরুষ’‌ বুঝবে, সেদিনই ধর্ষণ বন্ধ হবে। তার আগে পর্যন্ত দ্রৌপদী আর আসিফার মতো লক্ষ লক্ষ ভূত তাড়া করে বেড়াবে এই দেশকে। এটাই বাস্তব। মেনে নিন।‌‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top