সিদ্ধার্থ জোয়ারদার: রাস্তার কুকুর ও অন্য প্রাণীদের ওপর দুর্ব্যবহার ও অমানবিক আচরণের কথা সংবাদমাধ্যমে মাঝেমধ্যেই পরিবেশিত হতে দেখা যাচ্ছে। যে কোনও সংবেদনশীল নাগরিকেরই এতে বিচলিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সভ্য সমাজে এটিকে একাধারে নীতিগতভাবে অমানবিক ও আইনগতভাবে অন্যায় বলে মনে করা হয়। এমন–কি, দণ্ডনীয় অপরাধ বলে এই সমস্ত অন্যায়ের শাস্তির মাপকাঠি চিহ্নিত করা আছে। অথচ প্রাণী মানুষের সাহচর্য পেয়েছে মানবসভ্যতার আদিকাল থেকে। মানুষ নিজের প্রয়োজনেই বন্যপ্রাণীকে পোষ মানিয়েছে। দুধ, মাংস, ডিম, চামড়া, উল পাওয়ার পাশাপাশি জমি চাষ, মালবহন এবং যাতায়াতের জন্য প্রাণীকে কাজেও লাগিয়েছে। অন্যদিকে কুকুর, বিড়াল বা ময়না/‌টিয়ার মতো সহচরী পোষ্যও মানুষের আবেগের সঙ্গে যুক্ত থেকেছে। এই পারস্পরিক সম্বন্ধ ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক যুগ যুগ ধরেই চলে এসেছে।
মানুষের কাছাকাছি থাকতে থাকতে গৃহপালিত পোষ্যরা কোনও এক সময়ে পারিবারিক সদস্যও হয়ে উঠেছে। তাই তাদের ব্যথাবেদনা, রোগকষ্টও মানুষের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে স্বাভাবিকভাবেই। মানুষ তার নিজের চিকিৎসার পাশাপাশি তার ‘‌একান্ত আপন’‌ পোষা প্রাণীটিরও চিকিৎসা করতে চেয়েছে সাধ্যমতো। এই চিকিৎসার ধরন বরাবর মানুষের মতোই হয়ে এসেছে এবং তা এখনও চলেছে আগের মতোই।
পূর্ব ভারতের প্রাচীনতম ও স্বাধীন ভারতের দ্বিতীয় প্রাণিচিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেঙ্গল ভেটেরিনারি কলেজের ১২৫তম প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে এদেশে প্রাণিচিকিৎসা বিজ্ঞানের গৌরবময় ইতিহাস একবার স্মরণ করে নেওয়া যাক। ভারতবর্ষে প্রাণী পালনের প্রচলন হয় সভ্যতার আদিকালে, খ্রি.‌পূ.‌ ৬০০০ থেকে ৪০০০ এই সময়কালে। সিন্ধুসভ্যতার সময়কালে (‌খ্রি.‌‌পূ.‌‌ ২৫০০)‌ হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোয় মানুষ ও প্রাণীর সখ্যের পরিচয় মেলে পুরাতাত্ত্বিক নানা নিদর্শনের মধ্যে দিয়ে। প্রাণী পালন যে একটি সহজাত প্রবৃত্তি ছিল, তার বহু প্রমাণ মিলেছে বিভিন্ন সূত্র থেকে। তখন গবাদি প্রাণী ছাড়াও ঘোড়া, কুকুর, হাতি, পাখি (‌মুরগি ও অন্যান্য)‌ পোষার রেওয়াজ ছিল। দেহ থাকলেই অসুখবিসুখ থাকবে;‌ আর রোগবালাই থাকলে তার উপশমে চিকিৎসার প্রকরণও থাকতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষাব্যবস্থা তখনও চালু ছিল না। কিন্তু অভিজ্ঞতা ও বিশেষ পারদর্শিতার গুণে নিশ্চয়ই কেউ কেউ প্রাণিচিকিৎসার কাজ করতেন। তঁাদের নাম আমরা কেউ না জানলেও বুঝতে অসুবিধা হয় না গাছগাছড়া ও জড়িবুটির সাহায্যে তঁারা সেই সময় না জানি কত দুরারোগ্য ব্যাধির উপশম করতেন।
এই সময়কালের বেশ কিছুটা পরে প্রাক্‌–বৈদিক যুগে (‌খ্রি.‌পূ.‌‌ ২৩৫০)‌ প্রথম প্রাণিচিকিৎসক হিসেবে যিনি স্বীকৃত, তঁার নাম শালিহোত্রা। ইনি ভেষজ উদ্ভিদের ব্যবহার ও উপকার বিষয়ে অসাধারণ তথ্য রেখে গেছেন। প্রাণী শল্যচিকিৎসায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। সাইনাস, ফিশ্চুলা, হাড়ভাঙা, লিগামেন্ট ও টেন্ডনের মেরামতিতে তিনি বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। গরুর বাচ্চা প্রসবের সময়ের সমস্যা (‌ডিসটোকিয়া)‌–র সমাধান এমন–কি পোড়া চামড়ার পরিবর্তে স্বাভাবিক চামড়া প্রতিস্থাপনও তিনি করে গেছেন। এরপর বৈদিক যুগের মাঝামাঝি (‌খ্রি.‌পূ.‌‌ ১০০০)‌ আমরা আর এক প্রাণিচিকিৎসকের কথা জানতে পেরেছি। তিনি হচ্ছেন হস্তী চিকিৎসা বিশারদ পলকল্য। তঁার লেখা গজ আয়ুর্বেদ বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছিল। পরবর্তিকালে মানুষের চিকিৎসার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণিচিকিৎসাশাস্ত্রেও বিশেষ অবদান রেখে গেছেন চরক ও সুশ্রুত (‌খ্রি.‌‌পূ.‌‌ ৬০০)‌। মৌর্য সাম্রাজ্যের মধ্যভাগে (‌খ্রি.‌পূ.‌‌ ৩৩২–৩২২)‌ প্রাণী পালন ব্যবস্থা বিশেষ উৎকর্ষ লাভ করে। এর কিছু পরে, প্রাণিচিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় অশোকের রাজত্বকালে, খ্রি.‌পূ.‌‌ ৩০০ সময়কালে। এই সময়ে প্রাণিচিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে ওঠে। হাসপাতালে অন্তঃবিভাগ ও বহিঃবিভাগ রোগী (‌প্রাণী)‌–র চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল।
পরবর্তিকালে, ভারতবর্ষে প্রাণিচিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাস ততটা স্পষ্ট নয়। মোগল সাম্রাজ্যের সময়কালে প্রাণী পালন বেশ উন্নত হলেও প্রাণিচিকিৎসা বিজ্ঞানের কোনও উল্লেখযোগ্য ঘটনা, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিত্বের পরিচয় পাওয়া যায়নি।
আধুনিক প্রাণিচিকিৎসা বিজ্ঞানের সূচনা ও ব্যাপ্তি ঘটেছিল অবশ্যই ইউরোপে। গবাদি প্রাণীর প্লেগ (‌ক্যাটেল প্লেগ)‌ বা ‘‌রিন্ডারপেস্ট’‌ অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে ছিল ভয়াবহ এক আতঙ্কের কারণ। চরম অর্থনৈতিক ক্ষতির হাত থেকে বঁাচতে প্রয়োজন ছিল এক বিজ্ঞানভিত্তিক আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার। ইংল্যান্ড ও ইউরোপের অন্যান্য দেশে গড়ে উঠেছিল ভেটেরিনারি কলেজ। এ ব্যাপারে ‘‌ক্যাটেল প্লেগ কমিশন’‌–এর সুপারিশের বিশেষ ভূমিকা ছিল। বস্তুত, ফ্রান্সের লিয়েন–এ প্রথম ভেটেরিনারি স্কুল গড়ে ওঠে ১৭৬১ সালে।
এর ১০০ বছর পর ১৮৮৩ সালে তৎকালীন বাংলার ব্রিটিশ সরকার বাংলায় একটি প্রাণিচিকিৎসা বিজ্ঞান সংস্থান (‌ভেটেরিনারি ইনস্টিটিউশন)‌ তৈরির জন্য একটি কমিটি গড়ে। কমিটি ১৮৮৩ এবং পরবর্তীতে ১৮৮৬ সালে একটি সংস্থান নির্মাণ করার প্রস্তাব দেয়। এই প্রস্তাবটি তৎকালীন বাংলার জমিপঞ্জীকরণ ও কৃষিবিজ্ঞানের নির্দেশক শ্রী এম ফিনুকেন–এর নজরে আসে। তিনি এ ব্যাপারে উদ্যোগী হন। ওই সময়ে তিনি খবর পান কলকাতার অদূরে সোদপুরে কলকাতার কিছু মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী প্রায় ১৩০০ গবাদি পশুর একটি আস্তানা ‘‌পিঞ্জরাপোল’‌ গড়ে তুলেছেন। ওই অঞ্চলে একটি ভেটেরিনারি ইনস্টিটিউশন গড়ার প্রস্তাবে পিঞ্জরাপোল কমিটি সায় দেয় ও ভবন নির্মাণের ব্যয় বাবদ ৩০ হাজার টাকা দিতে সম্মত হয়। ‘‌ক্যাটেল প্লেগ কমিশন’‌–এর অন্যতম সদস্য ডা.‌ কেনেথ ম্যাকলিওড ও ফিনুকেন লাহেব ১৮৯০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিঞ্জরাপোল পরিদর্শন করেন। সিদ্ধান্ত হয়, ইনস্টিটিউশন তৈরির কাজ তাড়াতাড়ি শুরু করা হবে। এই সময়ে ভবন গড়ার স্থান নির্বাচন নিয়ে নানা প্রকার নাম উঠে আসে। সোদপুর ছাড়াও এন্টালি, শিবপুর, ভাগলপুর, বেলগাছিয়ার কথা আলোচিত হয়। শেষ পর্যন্ত বেলগাছিয়ার নামই ভবন নির্মাণের স্থান হিসেবে চূড়ান্ত হয়। পিঞ্জরাপোল কমিটির সভাপতি রাজা সিউ বক্স বগ্‌লা বাহাদুর ওই এলাকার ৩½‌ বিঘা জমি ও ভবন নির্মাণের জন্য ৩০ হাজার টাকা দান করেন। তৎকালীন বাংলার সরকার ১৮৯০ সালে ৪৩৮১ টাকার বিনিময়ে আরও ৫ বিঘা ২ কাঠা জমি অধিগ্রহণ করে। কলিকাতা মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক স্যর দিন্‌শ ম্যানোক্‌জি পেটিট প্রাণী হাসপাতাল বানানোর জন্য ২৫ হাজার টাকা দান করেন। শেষ পর্যন্ত ১৮৯২ সালের ২০ এপ্রিল গভর্নর জেনারেল স্যর চার্লস ইলিয়ট ইনস্টিটিউশনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ডা.‌ কেনেথ ম্যাকলিওড–এর নামাঙ্কিত ভেটেরিনারি স্কুল ও স্যর পেটিট–এর নামাঙ্কিত প্রাণী হাসপাতাল চালু হয় ১৮৯৪ সালের ১০ জানুয়ারি। ২০১৮ সালের প্রথম মাসে এই প্রতিষ্ঠানের ১২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী মর্যাদার সঙ্গে পালন করার আয়োজন করা হয়েছে।
১৮৯৬ সালে ভেটেরিনারি স্কুলটি কলেজের মর্যাদা পায় এবং বেঙ্গল ভেটেরিনারি কলেজ ও হাসপাতাল নামে চিহ্নিত হয়। বাংলার প্রাণিচিকিৎসা বিজ্ঞান সংক্রান্ত যাবতীয় পঠনপাঠন ও গবেষণার কাজ বেঙ্গল ভেটেরিনারি কলেজকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল। অধিকাংশ বাঙালি প্রাণিচিকিৎসকই এই কলেজের ছাত্র।
বেলগাছিয়ায় অবস্থিত বেঙ্গল ভেটেরিনারি কলেজ পরবর্তিকালে দু’‌বার কল্যাণীর কাছে মোহনপুরে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ এবং ১৯৮২ থেকে ১৯৯৫। প্রথমবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও দ্বিতীয়বার বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে শিক্ষা ও গবেষণার কাজ চলেছিল। ১৯৯৫ সালে (‌২ জানুয়ারি)‌ পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী ও মৎস্যবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে বেলগাছিয়ার বেঙ্গল ভেটেরিনারি কলেজ একটি পৃথক স্বয়ংসম্পূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা পায়। বাংলায় একমাত্র প্রাণিচিকিৎসা বিজ্ঞান সংক্রান্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয় বহন করে নিয়ে চলেছে।

লেখক পশ্চিমবঙ্গ‌ প্রাণী ও মৎস্যবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

জনপ্রিয়

Back To Top